সেদিন মেয়ের পাশের ফ্ল্যাটের লিজা মাথায় বাগান সাজিয়ে সকাল সকাল কোথায় যেন যাচ্ছিল। বাগানই তো! কি নেই সেখানে! চেরী, আঙুর, টম্যাটো, গোলাপ, জারবেরা, লতাপাতা দিয়ে তৈরি বাগান থুড়ি টিয়ারা।

চোখাচোখি হতেই একগাল হেসে বলল, আজ আমাদের সাও জোয়াও (Sao joao) ফেস্টিভাল। দেখবে তো এসো। পাঞ্জিমে, মীরামার বীচের কাছে।
গোয়ার বেশিরভাগ মানুষদের সবসময় ‘প্রাণে খুশির তুফান’। এই ঘনঘোর বর্ষায় ট্যুরিস্ট আসুক বা না আসুক। আমদানি কম হোক, কুছ পরোয়া নেই। এসো, আমরা নিজেরাই মজা করি গোছের।

বৃষ্টিভেজা গোয়াতে এখন এমনিতেই প্রাণের উৎসব। গাছগুলো সব চানটান করে ধোপদুরস্ত। সন্ধ্যে হতেই ঝিঁঝিপোকা আর ব্যাঙেদের কনসার্ট শুরু হয়ে যায়। রোজ রোজ জন্ম হচ্ছে কত চারপেয়ে, ছ’পেয়ে, সহস্রপদের। ব্যাক ওয়াটার ঢুকে পড়েছে গ্রামের ভেতর। ছিপ ফেলে বসে আছে ধ্যানমগ্ন মেছোরা। এদিক ওদিকের জমা জলে গা ডুবোলো তো আর ভারি গতর তুলতেই চায়না মোষগুলো। পাটকিলে গা আর সাদা মাথার শঙ্খচিল আকাশে ডানা ছড়িয়ে উড়লেও তার শ্যেনদৃষ্টি জমাজলের শিকারে। মনের আনন্দে আজকাল পেটপুরে খাচ্ছে পোকাখেকো পাখিরা। এমিলি, মিন্টো, জুনি, জোসেফ, পাবলোরা কি আর এসময় বন্ধঘরে বসে থাকতে পারে? ২৪শে জুন সেই জন দ্য ব্যাপটিস্ট নামের সন্ত মানুষটির জন্মদিন পালন করতে হবে না? সবাই তাই মিলে চার্চে গিয়ে প্রার্থনা সেরে ওয়াইন, কেক, ব্রেড খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া ফূর্তির সমুদ্রে।

লিজার কথামত মীরামার বীচের কাছে গিয়ে দেখি বাচ্ছা, বুড়ো, জোয়ান সব্বাই মাথায় একটা করে কোপেক (ফুলের টিয়ারা) পরেছে। পুকুরে ঝাঁপাচ্ছে। জোড়ায় জোড়ায় রেন ড্যান্স করছে। দাদু সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে এসেছে তার নাতি নাতনীকে। রঙিন শামিয়ানার তলায় চলছে গোয়ার মান্ডো সঙ্গীত। বাজছে গীটার, ঘুমট বা মাটির হাঁড়ির তালবাদ্য, বেহালা আরো কত কি!

এ আনন্দের উৎস, সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্টের জন্মকথাটি বড় সুন্দর। এই মহাত্মা সন্তটির মা এলিজাবেথ ছিলেন মাতা মেরীর এক আত্মীয়া। দুজনে একই সময় অন্তঃসত্ত্বা হন। ঈশ্বরের সন্তান মেরীমাতার কোলজুড়ে আসছেন শুনে আনন্দে এলিজাবেথের গর্ভ থেকে লাফ দিয়ে তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেন। সেদিন ছিল চব্বিশে জুন। তার মাত্র ছ’মাস পরে পৃথিবীর মানুষকে আলো দেখাতে জন্ম নেন যীশুবাবা। জন দ্য ব্যপটিস্ট পরবর্তী কালে যীশুকে জর্ডন নদীর জল ছিটিয়ে ব্যাপটাইজ করেন।

এই সন্ত মানুটির দিনযাপন ছিল প্রকৃতির কোলে। ফলমূল, বনের মধু ছিল তাঁর নিত্য আহার। শরীর ঢাকতেন লতা পাতার আড়ালে। তাঁর কথা স্মরণ করেই রোম্যান ক্যাথলিকরা সেদিন প্রকৃতির স্নেহচ্ছায়ায়, লতায়পাতায় সেজে ওঠে। একে অন্যকে ফল, মধু উপহার দেয়। নববিবাহিত দম্পতির কাছে কামনা করে সুস্থ সন্তান। অনাগত শিশুর জন্যে মঙ্গল প্রার্থনা।

ভারতের মাটিতে গোয়ার সাও জোয়াও তাই ধর্মের সীমা পার করে যেন এক বর্ষাবরণের প্রাকৃতিক উৎসব। মৌসুমী বায়ুর আবাহনী সঙ্গীত। প্রকৃতির সঙ্গে জুড়ে থাকার, উর্বরতা কে অভিষিক্ত করার প্রতীকী চিহ্ন। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধর্ম-সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার মেলমিলাপের প্রাচীন ধারা।
অসাধারণ…!!!!! সম্পূর্ন ভিন্ন এক সংস্কৃতিকে জানলাম কি সুন্দর করে, লেখনীর সুধারস এমনই!!! সাথের ছবিগুলো যেমন বর্ণময়, উজ্জ্বল ও সিক্ত বৃষ্টিরজলের আনন্দে, তেমনই রঙ্গীন, অপূর্ব তার বর্ণনা….!!! অসংখ্য ধন্যবাদ এমন নান্দনিক সৌন্দর্য্যে পরিপূর্ণ একটি উপহারের জন্য…!!
ভালোবাসা রইলো এমন সুন্দর পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্যে