দুর্গাপুজোর সময় আমরা যে শ্রীশ্রীচন্ডী পাঠ করে বা শুনে থাকি সেখানে দুর্গার কোন উল্লেখ নেই। সেখানে যে তিন দেবীর কথা বলা হয়েছে তারা হলেন মহাকালী, মহালক্ষী এবং মহাসরস্বতী। বাংলা বাদে ভারতের সর্বত্রই মহাসরস্বতীর পূজা হয়। তিনি চতুর্ভূজা এবং ত্রিনয়না। একমাত্র বাংলাতেই দ্বিভূজা সরস্বতীর রূপটি বহুল প্রচলিত।
দেবী সরস্বতীর বর্ণনায় আমরা দেখি তাঁর গায়ের রং কুন্দফুল, চাঁদ এবং তুষারের মতো শ্বেত শুভ্র। তাঁর পরনে সাদা শাড়ি। তিনি শ্বেতপদ্মাসনা, শ্বেতপুষ্পশোভিতা, শ্বেতচন্দনচর্চিতা। তিনি যেসব অলংকার করে রয়েছেন তারও রঙ সাদা। সরস্বতী হলেন শুচিতার প্রতীক। জ্ঞান হল নিরাকার এবং জ্যোতির্ময় আবার জ্ঞানই হলো পরমব্রহ্ম। তাই সব কিছুই রংবিহীন, শুধুই সাদা। দেবীর চার হাতে একটিতে অক্ষমালা একটিতে বীনা, একটিতে বই এবং একটি হাতে তিনি আশীর্বাদ দানরত। দেবীর বাহন হিসাবে ময়ূর এবং হাঁস দুটোই বহুল প্রচলিত। ময়ূর হলো সৌন্দর্যের প্রতীক এবং হাঁস হল সেই পরমহংস যে কিনা দুধ এবং জল মিশিয়ে দিলে তার মধ্যে থেকে দুধটুকু আলাদা করে পান করতে পারে অর্থাৎ জ্ঞান থেকে সার তত্ত্বটি আয়ত্ত করতে পারে।

দেবী সরস্বতীর জন্ম নিয়ে বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন মত থাকলেও, মূল ধারণা হলো তিনি জ্ঞান, বুদ্ধি ও শিল্পের দেবী এবং তাঁর জন্ম হয়েছে ব্রহ্মার মুখ থেকে (মানস কন্যা হিসেবে) অথবা বিষ্ণুর জিহ্বা থেকে, অথবা মহাজাগতিক সমুদ্র থেকে, যা সৃষ্টি ও জ্ঞানের উৎসকে নির্দেশ করে, এবং তাঁর আবির্ভাবের দিনটি বসন্ত পঞ্চমী (মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি) হিসেবে পালিত হয়।
ভগবতে বলা হয়েছে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই দৈত্য একবার মর্ত্যে ও স্বর্গে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তাদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে দেবী দুর্গার শরীর থেকে জন্ম হয় আর এক দেবী প্রকৃতির তিনি কৌশিকী। তিনিই সরস্বতী। কথিত আছে জগতের সকল জ্ঞানের আধার শ্রীকৃষ্ণের জিহ্বা থেকে জন্ম হয় দেবী সরস্বতীর। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণই মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পুণ্য তিথিতে বাগদেবী আরাধনার প্রবর্তন করেন। অপার্থিব জ্ঞানলাভের জন্য মাঘ মাসে দেবী সরস্বতী উপাসনা ছাড়া বিকল্প কোনও পথ নেই।
তাই বাংলার প্রায় প্রতিটা ঘরেই বাগদেবীর আরাধনা হয় মাঘ পঞ্চমীতে। অথচ এই বঙ্গে বিদ্যাদেবীর মন্দির কিন্তু রয়েছে হাতে গোনা। জেনে নেওয়া যাক সেরকম কিছু বাগদেবীর মন্দিরের কথা।

হাওড়ার পঞ্চাননতলায় বঙ্কিম পার্কের পাশে ১ নম্বর উমেশচন্দ্র দাস লেন। বঙ্গের প্রাচীনতম সরস্বতী মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম একটি সরস্বতী মন্দির রয়েছে এখানে। ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই মন্দিরে দেবীর নিত্য পূজা হয়।
হাওড়া জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক উমেশচন্দ্র দাস প্রথম এই মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যদিও তার পক্ষে মন্দিরটির নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ করার সুযোগ হয়নি। তার আগেই তার মৃত্যু ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর পিতার ইচ্ছা পূরণ করেন উমেশচন্দ্রর মেজো ছেলে রণেশচন্দ্র দাস। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার রণেশচন্দ্র কর্মসূত্রে রাজস্থানে থাকতেন। ১৯১৯-এর ২০ মার্চ জয়পুর থেকে তিনি দেবীর মূর্তিটি নিয়ে আসেন।
তখন থেকেই দেবীর আরাধনা শুরু হলেও, মন্দিরটি তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অবশেষে ১৯২৩ সালে জুন মাসে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার দিনে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। একচালা মন্দিরে হাঁসের উপর বীণা হস্তে দাঁড়ানো চার ফুট দৈর্ঘ্যের শ্বেত পাথরের মূর্তি।গর্ভগৃহে শ্বেতপাথরের বেদিতে ছোট সিংহাসনে রয়েছে শালগ্রাম শিলা।
৩৬৫ দিন দেবীর পুজো হলেও, বসন্ত পঞ্চমীর দিন মহাসমারোহে বাগদেবীর আরাধনা হয়। বাসন্তী রঙের শাড়িতে নতুন করে সাজানো হয় প্রতিমাটিকে। ১০৮টি মাটির খুড়িতে বিশেষ ধরনের বড় বাতাসা আর ফল রাখা হয় দেবীর নৈবেদ্য হিসেবে। গর্ভগৃহের মাথায় গম্বুজাকৃতির চূড়াঘর, চূড়ার চারপাশে পোড়ামাটির কাজ। শীর্ষে পদ্মের উপর কলস ও এিশূল। খিলানের মাথায় চারকোনে চারটি হাঁস। খিলানগুলি বীণা, পদ্ম প্রভৃতি দিয়ে অলঙ্কৃত। এটি শতবর্ষ প্রাচীন সরস্বতী মন্দির নামে পরিচিত। উমেশচন্দ্রর নামানুসারে পঞ্চাননতলা রোডের বঙ্কিম পার্ক সংলগ্ন ওই সরু গলির নাম রাখা হয়েছে উমেশচন্দ্র দাস লেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিধানচন্দ্র রায় এমন বহু মনীষীর পদধূলিতে ধন্য এই মন্দির চত্বর।

এবার বলবো নানুরের বেলুটি গ্রামের সরস্বতী পুজোর কথা। সম্ভবত বেলগাছের প্রাচুর্য থেকেই এই গ্রামের নাম বেলুটি। এই পুজোর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে মূর্খ কালিদাস থেকে মহাকবি কালিদাসের হয়ে ওঠার কিংবদন্তি। কথিত আছে এই গ্রামেই এক প্রাচীন মন্দিরে ছিল দেবীর শিলামূর্তি। কালিদাস যখন নিজের অজ্ঞতার কারণে দুঃখ পেয়ে এই মন্দিরের পাশের সরোবরে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন, তখন মা সরস্বতী তাঁকে দর্শন দিয়ে সমস্ত বিদ্যায় সিদ্ধিলাভের বর প্রদান করেন।
কথিত আছে গুপ্তযুগে গ্রামের এই সরোবরে সরস্বতীর পূর্ণাবয়ব শিলামুর্তি পাওয়া গেছিলো। কালাপাহাড়ের হাতে ভূলুণ্ঠিত হয় এই হিন্দু দেবালয়। তিনি সরস্বতীর বিগ্রহটি ছয় খণ্ড করে সরোবরে ফেলে দেন। দীর্ঘদিন জলের তলায় থাকার পর গ্রামবাসীদের চেষ্টায় পুনরুদ্ধার হয় এই খন্ডিত ছয়টি শিলা। আজও এই খন্ডিত ছয়টি শিলা নিত্য দুবেলা পূজা করেন গ্রামবাসীরা।
এখানকার দেবী খুব জাগ্রত। সরস্বতী পুজোর সময় বেলুটি গ্রামে অন্য কোন মূর্তি পূজা হয় না, এমনকি গ্রামের স্কুল দু’টিতেও আলাদা করে হয় না বাগ্দেবীর আরাধনা। সকলে পূজা করেন এই মন্দিরের শিলামূর্তিকেই। বহু দূর থেকে প্রচুর ভক্তের আগমন হয় বছর ভর। সরস্বতী পূজার দিন দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন এখানে পুজো দিতে। সময়ের সাথে সরোবর আজকে ছোট পুকুরে পরিণত হয়েছে এবং প্রাচীন মন্দির আজ দেউলের ঢিবি নামে পরিচিত। কালিদাসের জন্মস্থান নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, বিশ্বাসের উপর ভর করে সন্তানের মঙ্গল কামনায় বহু মানুষ আসেন এখানে পূজা দিতে।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী বল্লভপুর এলাকার সুপ্রাচীন সরস্বতী মন্দির। শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে দেবী বীণাপাণির আগমনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুজো। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে একই নিয়ম ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই মন্দিরে সরস্বতী পুজো হয়ে আসছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৎস্যজীবীদের জালে ধরা পড়া বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ এক মাছ ধরার সরঞ্জাম থেকেই এই পুজোর প্রচলন শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকাবাসীর উদ্যোগে এই পুজো একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্যের রূপ নেয়। ভীম একাদশীর পরে নিয়ম মেনে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী বীণাপানিকে।
তথ্য ঋণ : বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল এবং অন্যান্য।