সাধারণের কাছে যা ব্যর্থতার কারণ মনে হয়, অসাধারণের কাছে তাই সাফল্যের সৌরভ হয়ে ওঠে। একের দুর্বলতাই অন্যের সবলতার পরিচয় লাভ করে। এজন্য সৃষ্টিকর্মের জন্যই নয়, প্রখ্যাত বা বিখ্যাতদের চারিত্রিক প্রকৃতিতেও ব্যর্থতার সোপান বেয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানোর ইতিবৃত্ত আপনাতেই প্রত্যাশা জাগায়, সর্বজয়ী প্রতিভায় সাধারণে অসাধারণ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, দীনহীন অসহায়তার মধ্যেও প্রতিকূলতাকে জয় করার দুর্জয় প্রকৃতি ও অপরাজেয় মানসিকতার পরিচয়ে নেতিবাচক দিকগুলি আপনাতেই সাড়ম্বরে চর্চায় উঠে আসে, ঘুরেফিরেই আবর্তিত হয়। তাতে যে সবসময়েই সুফল ফলে,তাও নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে অসাধারণত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতায় তার আসল স্বরূপ অন্তরালে ঢাকা পড়ে, মূল্যায়নেও তার নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে তার পরিচয় অত্যন্ত প্রকট। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তাও সেক্ষেত্রে তা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেনি,বরং আরও বিরূপ করে তুলেছে। সেখানে শরৎচন্দ্রের শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবই তাঁকে আমজনতার সঙ্গী করে তোলে, রবীন্দ্রনাথের উচ্চতায় খাটো মনে হয়।
আসলে শরৎচন্দ্র দারিদ্রের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কুড়ি টাকার জন্য এফ এ পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর। সেকথা তিনি অকপটে স্বীকারও করেছেন। তা নিয়ে বিতর্ক নেই। দারিদ্রের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই তাঁর বেড়ে ওঠা,গড়ে তোলা জীবন। বাবার মৃত্যুর পর ভবঘুরে জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল আজীবন। সেখানে উচ্চ শিক্ষিত না হওয়ায় তাঁর বিপুল সাহিত্য ভাণ্ডার শুধুই সাধারণের পাঠ্য ভাবনা আপনাতেই ছড়িয়ে পড়ে। তাতে উচ্চ শিক্ষিতদের রসদ হয়ে ওঠেনির সরলীকরণের ঝোঁক প্রকাশমুখর। যেন শরৎচন্দ্র উচ্চ শিক্ষিত নন বলেই তাঁর সাহিত্য উচ্চ স্তরের হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের তো শরৎচন্দ্রের মতো এন্ট্রান্স পাশের সার্টিফিকেটও ছিল না। অথচ তার বহু বিদ্যাচর্চার আয়োজন সগৌরবে চর্চিত হয়। তার উপরে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শরৎচন্দ্রের অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য লেখেন, আমি তোমাদের জন্য লিখি’র বিনয়কে শিরোধার্য করে আমাদের সরলীকরণ আত্মগৌরব লাভ করে। অথচ শরৎচন্দ্র যেমন তাঁর দারিদ্রপীড়িত জীবনের কথা অকপটে বলেছেন, তেমনই আর্থিক কারণে পড়তে না পারার কথায় আরও বেশি করে পড়াশোনা করার কথা জানিয়েছেন।
‘শরৎ রচনাবলী’র অষ্টম খণ্ডে কানপুরে প্রবাসী ‘মিলন’ উপন্যাসখ্যাত লীলারানী বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা শরৎচন্দ্রের চিঠি (২৪ আগস্ট, ১৯১৯) থেকে তিনটি বিষয়ই স্পষ্ট। এক, সেই কুড়ি টাকার জন্য পরীক্ষা দিতে পারেননি। দুই, দারিদ্র থেকে বাঁচার জন্য ঈশ্বরের কাছে ‘জ্বর দেও’ বলে প্রার্থনাও করেছেন যাতে দুবেলা উপোস করে কাটানো যায়। শেষে শরৎচন্দ্রই আবার জানিয়েছেন, বাবার মৃত্যুর পর ‘১৪ বছর ১৪ ঘণ্টা ধরে’ পড়াশোনা করেছেন। অথচ তার সেই পড়াশোনায় দেখনদারি ছিল না, রীতিমতো নীরবে সাধনা মনে হয়। একলব্যের মতো তাঁর সেই সাধনা লোকচক্ষুর আড়ালে একান্ত সাধকের। তাঁর কথায়, ‘সেই যে একজামিন দিতে পারিনি, সেই রাগে।’ তাঁর সেই রাগ যে সফল হয়েছে, তা তাঁর সৃজনবিশ্বেই প্রতীয়মান। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতি জেনেছেন, রীতিমতো ইংরেজি সাহিত্য পড়েছেন, ফরাসিও কিছু শিখেছিলেন। বার্মার ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তার উপরে বিচিত্র অভিজ্ঞতাই তাঁকে সুশিক্ষিত করে তুলেছিল। অথচ কুড়ি টাকার অভাবে পরীক্ষা না দিতে পারার ব্যর্থতাকে হাইলাইট করতে গিয়ে আখেরে তাঁর সাহিত্যের প্রতিই বিরূপ ধারণা গড়ে উঠেছে যা একালেও সমান সচল, ভাবা যায়!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪