সরোজকুমার দত্ত : অতি আধুনিক বাংলা কবিতা (গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা)
১৯৩৮ সালের শেষভাগে কলিকাতায় নিখিল ভারত প্রগতি সম্মেলনের যে অধিবেশন হয় তাহাতে শ্রীবুদ্ধদেব বসু ও শ্রীসমর সেন আপন আপন সাহিত্য রচনার বৈপ্লবিকতা ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করিয়া দুইটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। শ্রীযুত বুদ্ধদেব বসু-র প্রবন্ধ সর্ম্পকে আমরা প্রথম বর্ষের অগ্রণী’র দ্বিতীয় সংখ্যায় আলোচনা করিয়াছি, উহার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। শ্রীযুত সমর সেনের রচনার সমালোচনা করিতে বসিয়া তাঁহার প্রবন্ধের বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু বলা প্রয়োজন। কারণ, প্রথমত ঐ প্রবন্ধটি (In Defence of the ‘Decandents’) নাকি বিশেষ প্রতিপত্তিশালী উদীয়মান এক লেখক-সম্প্রদায়ের সাহিত্যিক অভিমত সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত করিতেছে, অর্থাৎ উহা কোনো সুসমৃদ্ধ দলবিশেষের সরকারি ইস্তাহারের সামিল এবং দ্বিতীয়ত উহা আলোচ্য কাব্যপুস্তিকার গ্রন্থকারের আত্মসমর্থন — In Defence of the ‘Decadents’। সমালোচকের সময়াভাব ও অগ্রণী’র স্থানাভাববশত প্রবন্ধটি হইতে বিস্তৃত আক্ষরিক উদ্ধৃতি সম্ভব নহে। সংক্ষেপে উহার মুখ্য বিষয়গুলি এই: (১) ধনতন্ত্রী সমাজে যে প্রগতি স্তব্ধ হইয়াচে বিপ্লবোত্তর সাম্যবাদী সমাজে সেই প্রগতি অব্যাহত চলিবে, অতএব প্রবন্ধকার আশাবাদী ও প্রগতিতে বিশ্বাসী; (২) ধ্বংসোন্মুখ ধনতন্ত্রী সমাজ ‘Decadent’ অতএব এ সমাজে সত্য, শিব ও সুন্দরের সাধনা অসম্ভব এবং ‘Decadents’ সাহিত্যই একমাত্র আন্তরিক সাহিত্য। এই আন্তরিকতার জন্য Decadents হইয়াও তাঁহাদের সাহিত্যে বৈপ্লিবক শক্তিমত্তা বর্তমান। নজীর ইংরেজ কবি T. S. Eliot–এর কাব্য; (৩) ধনতন্ত্রী সভ্যতার বর্তমান অবস্থার অন্তঃসারশূন্যতার যে-কোনোরূপ অভিব্যক্তিই বৈপ্লবিক শক্তি; (৪) কিষাণ-মজদুর লালঝান্ডা-ব্যারিকেড সংঘর্ষ লইয়া নাকি তাঁহাদের উত্তেজক সাহিত্য রচনার নির্দেশ বা ফরমাইস দেওয়া হইতেছে এবং ঐ সকল বস্তুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁহাদের না থাকায় রোমাণ্টিক হইবার ভয়ে ঐ নির্দেশ বা ফরমাইস তাঁহারা পালন করতে পারিতেছেন না।
কবির (১) অভিমত সম্পর্কে কবির সহিত আমাদের কোন বিরোধ নাই, আমরাও আশাবাদী ও সাম্যবাদী সমাজ ও প্রগতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু (২) অভিমতে কর্মভীরু বুদ্ধিজীবীর চিন্তার অন্তঃসারশূন্যতা পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। ধ্বংসোন্মুখ ধনতন্ত্রী সমাজ (আমাদের সমাজ কি সম্পূর্ণরূপে ধনতন্ত্রী?) যে Decadent, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। সে সমাজে সত্য, শিব ও সুন্দরের (as they are) সাধনা অসম্ভব, স্বীকার করি। কিন্তু বিগতপ্রাণ সত্যশিবসুন্দরের পুনরুজ্জীবনের (Revival-এর নহে) সাধনাও কি অসম্ভব? এ সাধনা চক্ষু মুদিয়া, শিরদাঁড়া খাড়া করিয়া পণ্ডিচেরী-মার্কা সাধনা নহে, কিংবা মাঘোৎসবের সাম্বৎসরিক শান্তিপাঠ ও মানবকল্যাণ কামনাও নহে। এ সাধনার অর্থ – সংগ্রাম, stuggle। সমাজ যেখানে Decadent, সামাজিক কোনো আন্দোলনকে সেখানে বিপ্লবীরূপ পরিগ্রহ করিতে হইলে আপনার অঙ্গ হইতে Decadence-এর শেষ দাগ মুছিয়া ফেলিতে হইবে, সেইজন্য Decadent-সমাজ হইতে উদ্ভূত সামাজিক বিপ্লবী আন্দোলন communism–এ হতাশা, অবসাদ, আত্মবিলাপ সাফল্য-স্বপ্নভীরু পরাজিতের ক্লীবকান্নার স্থান নাই। চিন্তা, কর্ম ও উৎপাদনের উদ্দাম বিশৃঙ্খলার মধ্যে classical শৃঙ্খলা এই আন্দোলনের উপজীব্য ও Justification, Decadence-এর অবলুপ্তির প্রচেষ্টাই communism-এর সার্থকতা। বর্তমান Decadent যুগের যদি কোনো আন্দোলনে যুগধর্মের অজুহাতে Decadence প্রবেশ করে এবং যুগধর্মেরই দোহাই পাড়িয়া কায়েমী হইয়া বসে, রাষ্ট্রিক হৌক, সাহিত্যিক হৌক, সে আন্দোলনকে Decadent অতএব reactionary বলিবার নিষ্ঠুর কর্তব্যজ্ঞান যেন আমাদের থাকে। কোনো সাহিত্য যদি ক্ষয়িষ্ণু গলিত সমাজের উপদংশ ক্ষতগুলিকে যথাসম্ভব যথাযথভাবে প্রতিফলন করে, এবং তথাপি উদ্দেশ্যবিহীন হয় কিংবা কোনো ভাবাদর্শের সহিত সংশ্লিষ্ট না হয় তবে উহা যান্ত্রিক ও জড়ের জঞ্জাল হইতে বাধ্য এবং সাহিত্যিকের পক্ষে উহা এক নিকৃষ্ট শ্রেণীর লালসা নিবৃত্তির উপায়ও বটে। উপায় ও ভাবাদর্শই সাহিত্যের অন্তর, ইহাদেরই যুগল নিকষে সাহিত্যের আন্তরিকতার পরীক্ষা হয়। Decadent সমাজের সাহিত্যে Decadence আন্তরিকতার লক্ষণ নহে, ইহা কর্মবিমুখতা ও গোপন বিপ্লব-বিরোধিতার নামান্তর মাত্র। ইহা subjective initiative অস্বীকার এবং আত্মনিষ্ক্রিয়তা সমর্থনকল্পে ঐতিহাসিক অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস। ইহা Marxism নহে। বর্তমান জগতে Marxism ভিন্ন অন্য কোনো ভাবাদর্শ বৈপ্লবিক নহে একথা আমি বলিতে চাহি না: আমি বলিতে চাহি যে, যাহা Marxism নহে তাহাকে Marxism বলার মধ্যে বিপ্লব বা প্রগতির নামগন্ধও নাই। নিজের কাব্যের বৈপ্লবিকতা সপ্রমাণের জন্য শ্রীযুক্ত সেন ইংরেজ কবি T. S. Eliot নাম করিয়াছেন কিন্তু একথাটি সুকৌশলে চাপিয়া গিয়াছেন যে T. S. Eliot নিজেকে কোনোদিন Marxist বলেন নাই, বরঞ্চ তাঁহার সাম্যবাদবিরোধিতা যে Roman Catholic Church ও মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রে বিশ্বাসে আসিয়া ঠেকিয়াছে, তাহা তিনি স্পষ্টরূপেই স্বীকার করিয়াছেন। এ-উক্তি তাঁহার সাহিত্যের সহিত সম্পূর্ণ সুসমঞ্জস। ব্রিটিশ decadence-এর সর্বশ্রেষ্ঠ পদকর্তা T. S. Eliot নিষ্কলুষ decadence-এর সুদীর্ঘ পদাবলী রচনা করিয়া গেলেন অথচ তিনি Roman Catholic Monarchy-তে বিশ্বাসী। বলা বাহুল্য, সাম্যবাদের শত্রু, চিরজীবন ধরিয়া তিনি decadence নিঙড়াইয়া গেলেন, এক ফোঁটা বিপ্লব পাওয়া গেল না। শ্রীযুত সেন হয়তো বলিবেন যে তাহার সাহিত্যের objective মূল্য সর্ম্পকে তিনি সচেতন নহেন, প্রতিক্রিয়াশীল সাহিত্যিকের সাহিত্য বিপ্লবী সাহিত্যের ভিৎ তৈয়ারী করিয়াছে। কিন্তু তিনি গলিত ক্ষত দেখিয়া শিহরিয়া উঠিয়া পাতার পর পাতায় তার বর্ণনা-বিলাস করিলেন, গলিত ক্ষত আর কাহারও দেখিতে না হয় তজ্জন্য যাঁহার কাব্যে কোনো উৎকণ্ঠা বা প্রচেষ্টা দেখা গেল না, বিপ্লবী উৎকণ্ঠা বা বিপ্লবী প্রচেষ্টাহীন এই বিশুদ্ধ cynicism-এর উপর ভবিষ্যৎ বিপ্লবী সাহিত্যের ভিৎ যাঁহারা গড়িতে চাহেন তাঁহারা হয় নির্বোধ, না হয় প্রবঞ্চক। সাম্যবাদীগণ ইলিয়টী সাহিত্যকে প্রতিক্রিয়াশীল বলেন, Marxist সেন তাহাকে বিপ্লবী বলেন, কারণ ‘People Say’।
ধনতন্ত্রী সভ্যতার বর্তমান অন্তঃসারশূন্যতার যে কোনোরূপ অভিব্যক্তিই বৈপ্লবিক শক্তি নহে, living, passionate ও sensitive মনে এই অন্তঃসারশূন্যতার প্রতিক্রিয়াই প্রতিফলিত হয় বিপ্লবী সাহিত্যে, আন্তরিকতার খড়্গাঘাতে নিষ্ক্রিয় মস্তিষ্কবিলাস সেখানে মহূর্তে ভূলুণ্ঠিত হইয়া পড়ে। তাই একদা যখন রোমাঁ রোলাঁ গান্ধী-রামকৃষ্ণে বিশ্বাসী ছিলেন তখনও তাঁহার সাহিত্য বিপ্লবী সাহিত্য ছিল, প্রাক-বলশেভিক গোর্কীর সাহিত্যের বৈপ্লবিকতাকে বলশেভিকরা অস্বীকার করিতে পারেন নাই, অহিংস টলস্টয়ের সাহিত্য সর্ম্পকে লেনিনের প্রশাংসোচ্ছ্বাস তো বহুবিদিত। ভাবাদর্শের দিক হইতে দেখিলে D. H. Lawrence-এর সাহিত্যে প্রতিক্রিয়া চূড়ান্ত কিন্তু ভাবাদর্শ তো এখানে মুখ্য নহে। তাহার ভাববলিষ্ঠ জীবন্ত মন পত্রে-পত্রে যে রক্তসিক্ত পদচিহ্ন রাখিয়া গিয়াছে, তাহার বিপ্লবীরূপকে অস্বীকার করিব কোন দুঃসাহসে? অপরপক্ষে অলডাস হাক্সলির গান্ধীবাদে বিশ্বাসে কি আন্তরিক? যিনি জীবনে ভালোমন্দ কিছুতেই কোনদিন বিশ্বাস করিলেন না, তাহার হঠাৎ-বিশ্বাসের পশ্চাতে কি বিরাট ফাঁকি নাই? মন যেখানে জাগ্রত ও জীবন্ত, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও প্রবাহমান পারিপার্শ্বিকতার আঘাতে সাহিত্যের উদ্দেশ্য ও ভাবাদর্শ সেখানে আন্তরিকতায় উদ্বেল এবং ক্রমবিবর্তনের পথে সত্য উপলদ্ধির অভিমুখে গতিমান। এই সত্য উপলদ্ধির পথে পরিবর্তনশীল ভাবাদর্শের প্রতিটি মুহূর্ত বৈপ্লবিক বেদনায়, উৎকণ্ঠায়, আর্তক্রন্দনে নিবিড়। decadence-এর প্রতিটি বন্ধনরজ্জু ছেদনের সঙ্গে সঙ্গে তাই তাহার আর্ট হইতে যন্ত্রণায় আর্তনাদ ধ্বনিত হইয়া উঠে। শেষরজ্জু ছিন্ন হইবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাহার শান্তি নাই। এই অশান্তি, উদ্বেগ ও আর্তনাদ, মহাভুজঙ্গের নির্মোক পরিহারের এই প্রতিটি মুহূর্ত বৈপ্লবিক — Revolutionary evolution towards a revolutionary ideology। ইহা নিষ্ক্রিয় মস্তিকজীবীর বিলাপ-বিলাস নহে। ইহা decadent সমাজের progressive বুদ্ধিজীবীর প্রাকবিপ্লবী জীবনের বৈপ্লবিক পাথেয়। বর্তমান ইয়োরপীয় সাহিত্যে রোলাঁ, বার্বুস ও মালরোর শ্রেণীবিচ্যুতির পশ্চাতে এই প্রচন্ড বেদনার ঐতিহ্য বর্তমান। (চলবে)