শ্রীযুত সেনের এই বক্তব্যকেই আমি আমার ভাষায় লিখিয়াছিলাম, ‘ধ্বংসোন্মুখ ধনতন্ত্রী সমাজ আজ ডেকাডেন্ট, অতএব এ সমাজে সত্য, শিব ও সুন্দরের সাধনা অসম্ভব এবং ডেকাডেন্ট সাহিত্যই একমাত্র আন্তরিক সাহিত্য। এই আন্তরিকতার জন্য ডেকাডেন্ট হইয়াও তাঁহাদের সাহিত্যে বৈপ্লবিক শক্তিমত্তা বর্তমান।’ সমাজবিপ্লবের যুগে সামাজিক ক্ষয়িষ্ণুতা সম্পর্কে চেতনা যদি শক্ত হয়, তবে সমাজে বা সমাজসাপেক্ষ সাহিত্যে তাহা বৈপ্লবিক শক্তি ভিন্ন আর কি হইতে পারে? ইহা কি অর্থবিকৃতি? ‘কনশাসনেস অফ ডেকাডেন্স ইজ সার্টেনলি অ্যা পাওয়ার’ (‘ইন ডিফেন্স অফ ডেকাডেন্স’) আমি ইহার অর্থ করিয়াছি, ধনতন্ত্রী সভ্যতার বর্তমান অবস্থার অন্তঃসারশূন্যতার যে কোনরূপ অভিব্যক্তিই বৈপ্লবিক শক্তি। শ্রীযুত সেনের আপত্তি ‘বৈপ্লবিক’ বিশেষণটির ব্যবহারে। এ আপত্তির অযৌক্তিকতার আমি পূর্বে একাধিকবার উল্লেখ করিয়াছি, পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। কনশাসনেস ও সাবজেক্টিভ ইনিশিয়েটিভ-এর অর্থ এক নহে। নিছক নিষ্ক্রিয় চেতনার উদ্দেশ্যহীন অভিব্যক্তি ও সক্রিয় চেতনার উৎকণ্ঠা, উদ্যম ও কর্মরূপের মধ্যে পরিবর্তন আছে বৈ কি? কর্মভীরু জ্ঞান ও সজ্ঞান কর্ম এক বস্তু নহে।
শ্রীযুত সেন যখন স্বীকার করিয়াছেন তিনি বিপ্লবী কবি নন তখন তাঁহার পরবর্তী অনুযোগ সম্পর্কে উত্তর করিয়া পূর্বতন বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করিতে চাহি না। তিনি বলিতেছেন, ‘গত দশবছরের বাংলা কবিতার যথেষ্ঠ উন্নতি হয়েছে।’ এই দশ বৎসরের মধ্যে বাংলা দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা অবিশ্বাস্যরূপে বৃদ্ধি পাইয়াছে, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অতি দ্রুত বৈপ্লবিক পরিবর্তন আরম্ভ হইয়াছে, সারা প্রদেশময় শ্রমিক ও কিষাণ অশান্তি দিনে দিনে সঙ্ঘবদ্ধ বিপ্লব-প্রচেষ্টার রূপ পরিগ্রহ করিতেছে, নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজে বেকারের সংখ্যা মারাত্মক হইয়া দাঁড়াইয়াছে এবং সেখানে অতিদ্রুত শ্রেণীবিচ্যুতি চলিয়াছে, গর্ভমেন্টের দমনমূর্তি রুক্ষ হইতে রুক্ষতর হইয়া উঠিয়াছে, চাষী ও দিনমজুরের দৈনন্দিন খন্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়া সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ব্যাপক সংগ্রাম সংহত হইয়া উঠিয়াছে, মধ্যবিত্তশ্রেণীর নিম্নাংশ কিষাণ মজুরশ্রেণীর সহিত স্বার্থসাম্যে ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে এবং রাজনীতি সাধারণের জীবনের সহিত অবিচ্ছেদ্যরূপে গ্রথিত হইয়া গিয়াছে। অথচ এই দশ বছরের বাংলা কবিতায় স্থানীয় রাজনীতির ছায়ামাত্র পড়ে নাই, ‘sickening sentimentalism’ বলিয়া ভাবাবেগকে পরিহার করা হইয়াছে এবং সৌখীন সাম্যবাদের বাকবিভূতি দিয়া নিষ্ক্রিয় মস্তিষ্কবিলাসের প্রবর্তন করা হইয়াছে। শিক্ষিত ও সাধারণের নিকটা কবিতাকে ক্রমশ দুর্বোধ্য করিয়া তোলা হইয়াছে, লেখক ও পাঠকের মধ্যেকার স্বাভাবিক ব্যবধানকে অস্বাভাবিক উপায়ে বহুবিস্তৃত করিয়া তোলা হইয়াছে। অসহযোগ আন্দোলনের কবি সত্যেন্দ্র দত্ত ও নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের কবি কাজী নজরুলকে বিদ্রূপ করা হইয়াছে। টেকনিকের বহু পরিবর্তন করা হইয়াছে, অর্থাৎ একই কথা বহুবার বহুভাবে বলা হইয়াছে। হত দশ বছরে যখন মানুষের জীবনে রাজনীতি অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে, সেই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের কাব্য হইতে নজরুল-সত্যেন দত্তীয় সামান্য রাজনৈতিক ঐতিহ্যটুকু পর্যন্ত মুছিয়া ফেলা হইয়াছে, অবশেষে ১৯৪০ সালের মে মাসে সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট প্রগতিক কবি স্বীকার করিলেন, আধুনিক বাংলা কবিতা যাঁরা লেখেন তাঁরা অনেকেই রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেননি, সেটা তাঁহাদেরই দুর্ভাগ্য। ‘কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই শক্তিমান লেখক, তাঁরাই এতদিন রাজত্ব করে এসেছেন এবং মধ্যবিত্ত সমাজের উপর কিছু কিছু প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছেন।’ এই প্রভাব বিস্তারের একটু নমুনা দিতেছি; ‘The damning is thus complete. He then thinks of perhaps a dozen or so his admirers and continues to use a medium of expression whose beauties commend themselves only to the dozen or so…’ (ইন ডিফেন্স অফ দ্য ‘ডেকাডেন্স’) প্রভাব বিস্তারের নমুনাই বটে। ভয় হয়, পাছে এই সাংঘাতিক উন্নতি আমাদের কপালে না টেঁকে। বর্তমানে তাঁহাদের সামাজিক চেতনা যথেষ্ঠ উদগ্র হইয়াছে, সামাজিক ক্ষয়িষ্ণুতা সম্পর্কে অনুভূতি সুতীব্রতম হইয়াছে, সাম্যবাদী সমাজের অবশ্যম্ভব্যতা সম্পর্কে তাঁহারা নিঃসন্দেহ হইয়াছেন, কংগ্রেস কর্তৃক মন্ত্রীত্বগ্রহণ মন্ত্রীত্ববর্জনে তাঁহাদের কাব্যের তুলাদন্ড উঠানামা করিতেছে (It would have been easier with Congress out of office, an active body in the anti-imperialist front. – Ibid.) তথাপি এখনও রাজনৈতিক আন্দোলনকে প্রতিফলিত করিবার সময় তাঁহাদের আসে নাই, তবে ভয় নাই বোধ হয় শীঘ্রই আসিবে, কারণ উপসংহারে শ্রীযুত সেন আমাদের বড় আশার বাণী শুনাইয়াছেন: ‘But a critical situation arises when we find that at a certain stage this also is not enough even from the point of view of poetic integrity. We will reach that stage very soon, and we must make a choice if we are to continue as living writers. This involves an entire reconstruction of our ways of living. An active part in the mass-movement will certainly help that poet who has been able to preserve his integrity. He will be able best to combine literary tradition with social content and will act as a releasing force. He will then perhaps cease to soliloquise and will begin to be representative. Such a reconstruction of living is not an easy job for the present generation of Bengali poets, most of them settled in life and approaching the critical age of thirty.’ অর্থাৎ এখনও তাঁহারা আলগোছে গণস্পর্শ বাঁচাইয়া, ‘dozen or so’ হাত ধরাধরি করিয়া কিছুকাল আত্মপরিক্রমায় অতিবাহিত করিবেন, তারপর গণ-আন্দোলন আরম্ভ হইলে (অর্থাৎ এখনও হয় নাই, অতএব তাঁহাদের আপাতত কোন কর্তব্য নাই) তাঁহারা রাতারাতি স্বগতোক্তি পরিত্যাগ করিয়া গণ-কবি হইয়া বসিবেন। রাতারাতি তখন তাঁহারা জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলাইয়া ফেলিবেন, কিন্তু মুস্কিল হইবে সেইসব কবিদের লইয়া যাহাদের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, এবং জীবনযাত্রা একরূপ পাকা হইয়া গিয়াছে। সাংঘাতিক ‘প্রবলেম’, ভাবিয়া কূলকিনারা পাইতেছি না। দশ বছরের প্রগতির কি এই পরিণাম? কিন্তু শ্রীযুত সেন বলিতেছেন, ‘To sacrifice all these in order to widen the appeal and rouse the people by direct propaganda will be a dangerous sacrifice.’
আমি গ্রহণ পুস্তিকার সমালোচনায় বলিয়াছি, এখনও বলিতেছি সরাসরি প্রোপাগান্ডা দ্বারা গণ-জাগরণ আনয়নের জন্য কেহ তাঁহাকে বলে না, বলিবেও না; কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের শ্রেণীবিচ্যুত দুর্গতগণের দুর্গতির বাস্তব ইতিহাস রচনা কিংবা শ্রমিক-কৃষকশ্রেণীর বাহিরে শ্রীযুত সেনের নিজের শ্রেণীর যে অংশ নানা কারণে প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে অক্ষম, তাহাদের জন্য aesthetic medium-এর সাহায্যে ‘Literature of exposure’ (Lenin) রচনা, তাহাদিগকে গণ আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন করিয়া তোলা, এক কথায় যে সাহিত্যিক-ঐতিহ্যের তাঁহারা উত্তরাধিকারী তাহার নিঃস্বার্থ সামাজিক সদ্ব্যবহার –তাঁহাদের আয়ত্তাধীন এইটুকুই যদি তাঁহারা করিতেন তবে নিঃসঙ্কোচে তাঁহাদিগকে আমরা প্রগতিক ও বিপ্লবী বলিতাম। (আশা করি ইহা অগ্রগামী ব্লক বা তাহার অনুচরী দলের উগ্র বামপন্থী ভাবাদর্শ নহে।) কিন্তু শ্রীযুত সেন বলিতেছেন: ‘With huge and vital section of population illiterate and dim in the background… We can at present only soliloquise, we cannot address the real audience.’ কিন্তু এই ‘রিয়েল অডিয়েন্স’ (গণ-সাধারণ কিংবা ডজন অর সো নহে) অ্যাড্রেস করার ক্ষমতা, ঐতিহ্য ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার তাঁহাদের আছে, অভাব সাবজেক্টিভ ইনিশিয়েটিভ-এর। এই অভাবকেই কি বলে ‘টু প্রিসার্ভ ওয়ান’স পারসোনাল ইন্ট্রিগ্রিটি?’ ইহাই কি ‘ইন দ্য লং রান’ ‘প্রগেসিভ কজ’-কে হেল্প করিবে? করে তো ভালোই। শ্রীযুত সেনের সম্প্রদায় গণ-আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। এবং যেহেতু যাঁরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং আছেন তাঁরাও এখনও পর্যন্ত বিপ্লবী সাহিত্য রচনা করিতে পারেননি, সেহেতু প্রথমোক্ত ভদ্রলোকদের কানামামা হিসাবে নেওয়াই ভালো। ‘নেই মামার চেয়ে কানামাম শ্রেয়’ (আমার সমালোচনার উত্তরে শ্রীযুত সেনের উক্তি)। (চলবে)