নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের বয়স হল একশো। এ বছর তার শতবর্ষ পূর্তি উৎসব হয়ে গেল। সারা দেশ জুড়ে এই সংগঠনের হাজার হাজার সদস্য। তার মধ্যে নামি-দামি মানুষজনও কম নেই। কিন্তু কেউ এতদিন ভাবেন নি এই সংগঠনের ইতিহাসের মাল-মশলা সংগ্রহ করে রাখার অথবা তার একটা ইতিহাস রচনার। কবি কামিনী রায়ের মতো তাঁরাও হয়তো মনে করেন, ‘অতীতের কথা কহি বর্তমান যদি যায় / সে কথাও কহিব না। ‘ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। ব্যতিক্রম সুনীলময় ঘোষ। তিনি তাঁর মতো করে সংগঠনের ইতিহাস লিখেছিলেন। শুনেছি সে বইএর একাধিক সংস্করণ হয়েছিল। কিন্তু সুনীলময়বাবু কাজ আরম্ভ করেছিলেন ভারি বয়েসে। তাই এদিক-ওদিক ছুটে-দৌড়ে তথ্য সংগ্রহ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবু প্রথম চেষ্টা হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবেন তিনি।
আজ থেকে তিরিশ বছর আগে অমরনাথ করণ নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের ইতিহাসের মাল-মশলা সংগ্রহের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তখন তিনি সদ্য এম এ পাশ করা তরতাজা যুবক। তাঁর প্রথম বইটি আদৃত হতে তিনি দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে সাহিত্য সম্মেলনের ইতিহাসে ঝাঁপ দিলেন বলা যায়। নবজাতক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই ‘সাহিত্য সম্মেলনের ইতিবৃত্ত’ (১৩০০-১৩৩০)। মোট নয়টি অধ্যায়ে আছে : জন বীমস ও বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠা ও পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও বরিশাল প্রাদেশিক সাহিত্য সম্মেলন, বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন–কাশিমবাজার (বহরমপুর), বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের পরবর্তী অধিবেশন, উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, আঞ্চলিক সাহিত্য সম্মেলন, সাহিত্য সম্মেলনের অবদান। নিরলস এই দোহারা চেহেরার মানুষটি সংসার, স্কুল ও পর্ণশ্রী সাহিত্য সম্মেলনের কাজ করেও সময় বাঁচিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক গ্রন্থাগার থেকে অন্য গ্রন্থাগারে, সংগ্রহ করেছেন তথ্য, সন্নিবেশিত করেছেন সেগুলি, তারপরে একের পর এক লিখে গেছেন ‘সাহিত্য সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথ’, ‘সাহিত্য সংহিতায় রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, ‘রবীন্দ্রনাথ ও টাউন হলে সাহিত্য সম্মেলন’, ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন ও রবীন্দ্রনাথ’, প্রভৃতি ‘মণিপূর্ণ খনিজাল’।

শতবর্ষের এই বছরটিতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি বই। বেশ মোটা অথচ সুদৃশ্য, শোভন। যেমন কাগজ, তেমনি ছাপা, তেমনি বাঁধাই। হ্যাঁ, আপনি আলোকচিত্রগুলির অস্পষ্টতার কথা তুলতে পারেন। কিন্ত সে দোষ লেখক-সংকলক বা প্রকাশকের নয়। প্রায় সব ছবি পুরাতন পত্রিকার পাতা থেকে এসেছে, আর তাই অস্পষ্টতা থেকে গেছে। তার উপর তখনকার সাদা-কালো ছবি অনেক পরে ছাপলে খুব একটা খোলে না।
প্রধম বইটি হল ‘শতবর্ষ অর্ঘ্য’ (১৯২২-২০২২)। প্রকাশক যৌথভাবে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি ও বাঙলার মুখ। উত্তরবঙ্গে রাজ্য সম্মেলনে বইটি উদ্বোধন করা হয়। ৩২৫ পাতার এই বইটিতে আছে : সম্মেলনের জন্মকথা—কানপুর ১৯২২, প্রথম অধিবেশন –বারাণসী ১৯২৩, রজত জয়ন্তী অধিবেশন –মুম্বাই ১৯৪৭, সুবর্ণ জয়ন্তী অধিবেশন — বারাণসী ১৯৭৮, অমৃতজয়ন্তী অধিবেশন –জব্বলপুর ২০০২, নব্বইতম অধিবেশন–কলকাতা ২০১৮। সব অধিবেশনকেআলোচনায় আনা সম্ভব হয় নি, একটি বইতে তা সম্ভবও নয়। যে অধ্যায়গুলির কথা আমরা বললাম তার লেখক তালিকা এই রকম : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, ক্ষিতীশচন্দ্র সেন, সুরেন্দ্রনাথ সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিদেব ঘোষ, বিমল ঘোষ, অন্নদাশংকর রায় প্রভৃতি। সাহিত্য সম্মেলন সম্বন্ধে কয়েকটি পত্রিকা যেমন উত্তরা, বিচিত্রা, প্রবাসী, মাসিক বসুমতী, ভারতবর্ষ, দেশ প্রভৃতির মতামত উল্লেখ করা হয়েছে। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের কালানুক্রমিক বর্ষপঞ্জি এ বইকে অপরিহার্য ও সমৃদ্ধ করেছে।এক নজরে এই সংগঠনের গতিবিধি বুঝে নেবার জন্য পাঠক-বান্ধব এইকাজটি করেছেন লেখক।

এবার আমরা হাতে নেব দ্বিতীব বইটি।নাম ‘শতবর্ষ সন্দর্শন’। প্রথমটির তুলনায় আরও হৃষ্টপুষ্ট। পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬০৮। প্রকাশক লালমাটি। এ বইটিকে বলা যেতে পারে ‘নানা রঙে বোনা’। নানা বিদগ্ধ মানুজনের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে সংগঠনের শতবর্ষের রূপটি। না, ভুল বললাম, শুধু সংগঠনের শতবর্ষের রূপ নয়, ধরা পড়েছে প্রবাসী বাঙালির জীবনচর্ষা (রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, প্রমথনাথ তর্কভূষণ, অমৃতলাল শীল, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, রাধাকমল মুখোপাধ্যায়) বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), ভূপৃষ্ঠের কম্পন (সুধাংশু কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়), যুক্ত প্রদেশের প্রাচীন শিক্ষা (রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়), হিন্দুর অধঃপতন (রমাপ্রসাদ চন্দ), সুর ও ছবি (সারদাচরণ উকিল), ভারতীব দর্শন সমুচ্চয় (তারকচন্দ্র রায়), মানব জীবনে সংগীতের প্রভাব (ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়), ভাগলপুরের বাঙালি সমাজ (হিমাংশুভূষণ রায়), রবীন্দ্রনাথ ও হিন্দি সাহিত্য (রামবহাল তেওয়ারি), প্রয়াগের কুম্ভমেলা ( শঙ্কু মহারাজ ), সংকেতময় সাহিত্য (রাজশেখর বসু), ইতিহাস ও সংস্কৃতি (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (, বাঙালির জীবন ও সাহিত্য (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়), চাইবাসার বাঙালি উপাখ্যান (বিনয়কুমার মাহাতা ), রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে অতুলপ্রসাদ (সুনীলময় ঘোষ), দায়বদ্ধতা : প্রসঙ্গ নাট্যকথা (মুকুল বন্দ্যোপাধ্যায়)। মোট সত্তরটি প্রবন্ধ দিয়ে সম্পাদক সাজিয়েছেন সেই মালা। বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধে, টুকরো টুকরো কথায় ছড়িয়ে আছে নানা মণিমুক্তো। জানো সাধু যে বুঝ সন্ধান।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক