আরামবাগের হাটবসন্তপুর গ্রামের ঘোষালবাড়ির পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করল। আর এই দীর্ঘ সময় জুড়ে এই পরিবারের একজন সতী অর্থাৎ মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত সহমৃতা বধূ গোঁসাইমণির স্মৃতি আজও সম্ভ্রমের সঙ্গে বহন করে চলেছে এই পরিবার। এটিই এই পুজোর মূল বৈশিষ্ট্য। তাঁদের বিশ্বাস, সতী গোঁসাইমণি তাঁদের পরিবারকে কুলদেবী হিসাবে এতদিন ধরে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করে আসছেন। তাঁদের সমৃদ্ধির মূলেও আছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে তাঁর ব্যবহৃত একটি নথ ও নোয়া এখনও দেবীকে পরানো হয়। এই দুর্গা ‘আগুনখাকি দুর্গা’ হিসাবে পরিচিত। তখনও রাধানগরের মাটিতে রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম হয়নি। সতীদাহ প্রথা নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আশ্চর্য একটা আবেগ ছিল সারা দেশ জুড়ে। আমরা জানি রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বিলোপের জন্য লড়াই আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর।
কিন্তু তারও আগে লর্ড ওয়েলেসলির শাসনকালের শেষ দিকে ১৮০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর নির্দেশ অনুসারে ডাওডেসওয়েল সাহেব নিজামত আদালতের রেজিস্টার গুড সাহেবকে একটি চিঠি লেখেন। তাতে নির্দেশ দেওয়া হয়, আদালত যেন পণ্ডিতদের কাছে জানতে চায়, এই প্রথায় আদৌ হিন্দু ধর্ম বা শাস্ত্রের অনুমোদন আছে কি না? নিজামত আদালতের বেতনভোগী পণ্ডিত ঘনশ্যাম শর্মা সেই প্রসঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘যারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক, যাদের দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান আছে অথবা যারা সেই সময় রজস্বলা থাকবেন তারা ব্যতীত অন্য সকল স্ত্রী তাদের মৃত স্বামীর চিতায় সহমৃতা হতে পারবেন।’ পণ্ডিত শর্মা আরো লিখেছিলেন, ‘শাস্ত্রে আছে, সাপুড়ে যেমন গর্ত থেকে টেনে সাপ বের করে আনে সেই রকম সহমৃতা স্ত্রী নিজের স্বামীকে নরক থেকেও উদ্ধার করে আনতে পারেন। যিনি সহমৃতা হবেন তিনি মানবদেহে যত লোম আছে তত বছর স্বামীর সঙ্গে স্বর্গবাস করতে পারবেন।’ এই উত্তর পাওয়ার পর ইংরেজ সাহেবরা আর বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। সেই সময় হিন্দু সমাজ বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত বংশের লোকজন এই প্রথাটিকে তাঁদের বংশের একটি মর্যাদার প্রতীক হিসাবে সম্মান করতেন। তাঁরা মনে করতেন এটি অত্যন্ত পুণ্যের কাজ, সতীর ছাই বা কোনো চিহ্ন ছুঁয়ে বা ধারণ করে কোনো কাজে গেলে সেই কাজ সফল হয়, ইত্যাদি।
১৮২৩ সালে বেঙ্গল গভর্নমেন্টের কাছে পুলিশ যে রিপোর্ট দিয়েছিল তা থেকে জানা যাচ্ছে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মধ্যে সেই বছরে ৫৭৫ জন বিধবা সহমৃতা হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ২০৮ জনের বয়স কুড়ি থেকে চল্লিশের মধ্যে এবং বত্রিশ জনের বয়স কুড়ির থেকেও কম। ভাবতেই অবাক লাগে। সেই সময় সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে তথাকথিত পণ্ডিতদের কতোটা আবেগ ছিল সেই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর বেন্টিঙ্ক আইন করে সতীদাহ বন্ধ করে দিলেন। রামমোহন ও তাঁর অনুগামীরা যখন তাই নিয়ে আনন্দ উদযাপন করছেন সেই সময় ১১৪৬ জন বিশিষ্ট মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত দুটি আর্জি গভর্নর জেনারেলের কাছে পেশ করা হল। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপীমোহন দেব, রাধাকান্ত দেব, হরনাথ তর্কভূষণ, মহারাজা কালীকৃষ্ণ বাহাদুর প্রমুখ এই দলে ছিলেন। সেই আর্জিতে সতীদাহ রদের তীব্র বিরোধিতা করে এই প্রথা চালু রাখার জন্য তারা অনুরোধ জানান। এর পর ১৮৩০ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁদের একটি প্রতিনিধি দল বেন্টিঙ্ক এর বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং এই সতীদাহ রদ আইন যাতে বলবৎ না করা হয় তার দাবি জানান। উপায়ান্তর না দেখে বেন্টিঙ্ক তাদের ইংল্যান্ডের রাজদরবারে আবেদন করার পরামর্শ দেন। একটুও সময় নষ্ট না করে তারা বিরাট একটি সভা ডাকেন। এখানে ধর্মসভা নামে একটি সংগঠন স্থাপিত হয়। তাদের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্টের এ্যাটর্নি ফ্রান্সিস বেথিকে প্রতিনিধি হিসাবে ইংল্যান্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

প্রথম দিনেই ১১,৬২০ টাকা চাঁদা সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। সেই সময়ে এই টাকার পরিমাণ কিন্তু অনেক। এর থেকেই বোঝা যায় সেই সময় সতীদাহ প্রথা আমাদের সমাজের অনেকাংশে কতোটা জনপ্রিয় ছিল। যাই হোক, ঘোষালবাড়ির পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, এই পুজোর -প্রাচীন সতীদাহের স্মৃতিসূচনা করেছিলেন এই বংশের পূর্বপুরুষ, মস্ত সাধক এবং নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ রামানন্দ গোস্বামী। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী গোসাঁইমণি তাঁর মৃত স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যান। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা বলেন, ‘রামানন্দের মৃত্যুর পর গোটা গ্রাম তখন ভেঙে পড়েছে তাঁকে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য। চতুর্দোলায় রামানন্দের দেহ নিয়ে শবযাত্রা শুরু হল, পিছনে গ্রামের শোকাকুল গ্রামবাসী। সবার আগে আগে সতীর বেশে চলেছেন গোসাঁইমণি। পরণে লালপাড় শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে জ্বলজ্বল করছে লাল টিপ, পায়ে আলতা, কাঁখে জলের কলস আর হাতে আম্রপল্লব। গ্রামের শেষ প্রান্তে বামুনপুকুরের পাড়ে চিতায় তোলা হল রামানন্দকে। তাঁরা নিঃসন্তান তাই স্ত্রী গোসাঁইমণিই মুখাগ্নির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। স্বামীর চিতা তিনবার প্রদক্ষিণ করে মুখাগ্নি করলেন তিনি। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল চিতা। সেই জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিলেন গোসাঁইমণি।’ তার পর অনেক বছর কেটে গেছে। এই বংশেরই পরবর্তী পুরুষ আর এক আরামবাগের দুর্গাপুজো বিখ্যাত সাধক, কৃষ্ণকান্ত তর্কবাগীশের জীবনে এক অলৌকিক ঘটনা ঘাটল ।
এক দিন নিকটবর্তী ভালিয়া গ্রামে তিনি ডাকাতের হাতে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে দুর্গা নাম জপ করতে থাকেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মহামায়ারূপী গোঁসাইমণি ডাকাতদের সামনে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে রক্ষা করেন ।এরপর স্বপ্নে দেখা দিয়ে মহামায়া তাকে বলেন, ‘আমি মহামায়া গোসাঁইমণি রূপে তোদের বংশে গিয়েছিলাম। শ্মাশানের ঈশান কোণে আমার চিতাভস্ম খুঁড়লে একটি সোনার নথ ও রূপোর বাঁধানো নোয়া পাবি। আমার মাটির প্রতিমাতে সেই নথ আর নোয়া পরিয়ে পুজো করিস। পরের দিন গ্রামের লোকজন সঙ্গে করে নিয়ে কৃষ্ণকান্ত সেখানে গিয়ে চিতাভষ্মের জায়গায় মাটি খুঁড়তেই নথ আর নোয়া উদ্ধার হয়। তার পর দেবীর স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী ষষ্ঠির দিন দুর্গাপ্রতিমাকে সেই নথ আর নোয়া পরানো হয়। সেই থেকে এই রীতি চলে আসছে ঘোষাল বাড়ির পুজোয়। গোঁসাইমণিদেবীর ব্যবহৃত সেই প্রাচীন নখ ও নোয়া এখনও দেখা যাবে ঘোষাল বাড়িতে। এখনও রামানন্দ সাধক এবং গোঁসাইমণির নামে এই পুজোর সংকল্প করা হয়। বংশানুক্রমে ঘোষাল পরিবারের সদস্যরাই পুজোর পৌরোহিত্য করেন। সকলের বিশ্বাস, এই দম্পতি এখনও অক্ষয় স্বর্গবাস করছেন এবং তাঁদের অকৃপণ আশীর্বাদের হাত এই পরিবারের উপর আছে। এবারেও সেই প্রাচীন রীতি ও প্রথা অনুযায়ী ঘোষাল বাড়িতে পুজো শুরু হয়েছে। পাড়া ও প্রতিবেশীরা, এমনকি আশপাশের গ্ৰাম থেকে এই পুজোয় ভিড় জমাচ্ছেন।