| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সত্যজিৎ শতবর্ষে কয়েকটি ভাবনা… : দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় / ৬৯০ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৯ মার্চ, ২০২২

শহর ছেড়ে ছুটির সময়টায় যখন সবাই দূরে বেরিয়ে পড়ে, আমি ফিরি বারবার তখন ফেলুদার কাছে৷ আমি জানি, আমার মত অনেকেই বড় হয়েও ফিরে ফিরে পড়েন ফেলুদা। কিন্তু আমি আজ নেহাত ভালোলাগার জন্য ফেলুদা পড়ি না। তার বাইরে আরও কয়েকটা দিক আমাকে ভাবায়। সেই সন্ধানেই বারবার ফিরে যাই ফেলুদার কাছে৷ কি সেই খোঁজ?

সত্যজিতের গদ্যের কিছু রাজনীতি আছে, আছে কিছু সিনেম্যাটিক প্রয়োগ, আছে তাঁর অন্তরের উনিশ শতকীয় আলোও। এস্পল্যানেড চত্বরে কাজ সেরে যে কেরানি ফিরছে, তাঁর ক্লান্ত শীতের বিকেল হঠাৎ ফ্রিজ করে যেতে পারে সত্যজিতের হাতে আঁকা ফেলুদার অলংকরণগুলোর দিকে তাকালে। কোনও এক জলছবির ছোটবেলা বা কলতলার প্রথম পাপ রাখা রয়েছে অজান্তে এসব ছবির আড়ালে। সে সব দুপুরে ফেলুদা ছাড়া আর কেই বা ছিল আমাদের! কিন্তু এই নস্টালজিয়া ছাড়াও সত্যজিতের গদ্য পড়তে পড়তে অজান্তেই আমরা হয়ে উঠেছিলাম শহুরে, আর্বান সেন্সেবেলিটি আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। সত্যজিৎ কাটা কাটা বাক্যে আমাদের কিশোর মনকে সিনেম্যাটিক ‘কাট’-এ মজিয়ে ছিলেন। ইচ্ছে করেই বড় বড় ফন্ট ব্যবহার করেছিলেন তিনি, যাতে আমাদের ছোটবেলার মন অন্য দিকে না যায়। টান টান সাসপেনসের শেষে আমরা সবাই জানতাম, নিশ্চয়ই ফেলুদা আমাদের বাঁচিয়ে দেবে, কাজেই খুব ভয় পেলে চলবে না। সত্যজিৎ আমাদের মনকে শেখাতেন ঐতিহ্যর গুরুত্ব, শেখাতেন কৈলাসের দেশীয় মূর্তি যারা পাচার করে বিদেশে ব্যবসা করে বা যারা জাতিস্মরের খোঁজ পেয়ে শিশুদের নিয়েও খেলতে দ্বিধা করে না, তারা দুষ্টু লোক। এসব সত্যজিৎ বলেন না। কিন্তু আমরা বুঝে যাই অজান্তে। পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি ঘিরে এ শহরেই যে এংলো ইন্ডিয়ানদের বাস বা জটায়ুর উপন্যাস মুম্বই ফিল্মের টাকা আনলেও তা খুব উঁচু দরের না, এসবও আমরা বুঝতে বুঝতে বড় হই। অজান্তে আমাদের ভেতর ভাষা-শেকড়-শহরের গুরুত্ব ছড়াতে থাকে। আমরা কলকাতাকে, সত্যজিতের মতই, ভালোবেসে ফেলে দেখি, আজ যখন গোটা দুনিয়াটাকেই সস্তা দরে কিছু দুষ্টু লোক বিক্রি করে দিচ্ছে, তখন আমাদের এই শহরের বিকেলগুলোয় কেমন উত্তর-ঔপনিবেশিক কসমোপলিটন হাওয়া দেয় ধর্মতলায় এখনও…আমাদের টাকার বদলে রুচি, বোকামোর বদলে সিধে হওয়াগুলো ফেলুদার মতই নিউ মার্কেট ভেঙে ফেলার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে চায়, আমাদের অজান্তেই…

তবে, ফেলুদা নিয়ে ছবি হলে অনেকের মত আজ আর আমি দেখতে যাই না। কারণ সে ছবি কখনওই বাক্যের গভীরের এইসব মনকেমন ধরতে পারবে না। সেখানে পাতি ব্যবসার গন্ধ। আমি জানি, অনেকেই আমার মত যান না হলে একই কারণে। আর, আজকাল ফেলুদা যখন জটায়ুকে সবার সামনে লেগপুল করে তখন একটু কষ্টও হয়, কারণ, সত্যজিতের হাতে গড়া রুচিই তো আমাকে শিখিয়েছে ভদ্রতা, অপছন্দ হলে ইগ্নোর কর, সব সময় ভেতো বাঙালিকে নিয়ে হাসার কি দরকার! তবে, আবার যখন এই ফেলুদাই বেনারসের ঘাটে বলে, হয় মগনলালের অপমানের প্রতিশোধ নেবে নয়তো গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেবে, তখন কোথাও আবার সেই ‘আমার সত্যজিৎকেই’ খুঁজে পাই চুপি চুপি…

ফেলুদার কত গল্পে শুটিং ঢুকিয়ে দেন চুপিচুপি সত্যজিৎ । দার্জিলিং জমজমাট বা কৈলাসে এত শুটিং পার্টি কেন? আসলে প্রায় একই রকম কাজের ভেতর থেকেই তো ক দিন সময় বের করে এসব লিখতেন তিনি। তাই অনুষঙ্গগুলো এক রকম, নিখুঁত ওই ডিটেলিং। আজ বড়বেলায় এমন বহুকিছু খুঁজে পাই ফেলুদায়। চুপি চুপি পড়তে পড়তে খুঁজতে থাকি। নিজেই মজা পাই… বছর শেষ হয়ে আসছে। ছোটবেলার প্রিয় বই আবার পড়ুন। জীবনে নতুন মানে খুঁজে পেতে পারেন এই অসময়ে। নতুন বছরে এমন একটা রেজেলিউশান নিজের কাছে রাখতেই পারেন…ফেলুদা যে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি, তারা অন্তত এমন ছোট ছোট ইচ্ছের ভেতরেই জীবনের মানে খুঁজে পেত…টাকা, প্রযুক্তি, বাইপাসের ধারের আর্বানা সেখানে মধ্যবিত্ত পাড়ার বাড়িগুলো বা ধর্মতলার ক্লান্ত কেরানির বিকেলেকে গিলে নেয়নি…তবে গিলে যে নেবে সে কথা আঁচ করেছিলেন আগন্তুক উৎপল দত্তর ছদ্মবেশে প্রবীণ সত্যজিৎ…তখন অবশ্য দেরি হয়ে গেছিল…

২.

নীচের ছবিতে সত্যজিৎ রায় রাস্তায় বই খুঁজছেন। খুব চেনা একটা ছবি, যারা সত্যজিৎকে দেখেছেন তাঁরা জানেন। তবে আজ সত্যজিৎ শতবর্ষে এ ছবিটার অন্য একটা গুরুত্ব রয়েছে। এবং সেটা তাঁর কাজের সূত্রে রয়েছে বলেই এ লেখার সাথে এ ছবিটা দিলাম।

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে ‘রে’ সিরিজটি দেখছিলাম একটি কাজের জন্য। দেখলাম, সত্যজিতের গল্পগুলি নিয়ে বিপুলব্যয়ে ছবিগুলি বানানো হয়েছে। অথচ, মূল যে সুরটা সত্যজিৎ ধরেছিলেন গল্পগুলিতে, সেটাই মিসিং। সেটা হল, আর্বান সেনসেবেলিটি। আমাদের অনেকের ছোটবেলাই শুরু হয় ‘বহুরূপী’, ‘বিপিনবাবুর ব্যারাম’, ‘সহদেববাবুর পোট্রেট’ ইত্যাদি গল্পগুলো পড়ে। সত্যজিৎ এসব গল্পে মূলত একজন একা কেরানির গল্প বলেন, যার কোনও বন্ধু নেই। তাঁদের শখ বলতে ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটের বইয়ের দোকানে গিয়ে বইকেনা বা পার্ক স্ট্রিটের কোনও শখের কিউরিও শপে কোনও তেলরঙা পোট্রেট কেনা। এ ধরণের মানুষরা বা এ সমাজ বা শহরটা বিশ্বায়নের পর ধীরে ধীরে মুছতে মুছতে আজ এরকম একটা চকচকে শপিংমল অথচ গবেটমার্কা সমাজে এসে আমরা পৌঁছেছি। তাই এই ‘রে’ সিরিজই হোক বা হালফিল তাঁর গল্প থেকে বানানো অনুকূল ছবি বা তাঁকে নিয়ে করা হাজারো হালফিলের সস্তা কাজে আড়ম্বর নিয়ে সবই থাকছে, শুধু যেটা নেই তা হল, ওই সেনসেবেলিটিটা, কারণ তাঁর জন্য ওই জীবনটায় বাঁচতে হয় যে নোনাধরা চিলেকোঠায় বঙ্কুবাবু থাকেন সেখানে ছাত থেকে কেন জল পড়ে তবু কীভাবে সেখানেই ইউএফও নামতে পারে, সে মধ্যবিত্তের স্বপ্নে থাকাটা অনিবার্য যা আজ আর এক্সিক্টই করে না। তবু সত্যজিৎ শতবর্ষ বলে কথা, তাই আমাদের আস্তিনগুটিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে বোকামো মারাতে নেমে পড়তে হবে, এভাবেই…

সত্যজিৎ একাধিক ইন্টারভিউতে বলেছেন, কেন তাঁর এই শহরটা জরুরি। এমনকি বিদেশিদেরও তিনি বারবার বলেছেন, এই জটিল শহরের কমপ্লেক্সিটি তিনি ধরতে চান বারবার, অন্য শহরে গেলে ক্রমশই এই অর্গানিক ক্রিয়েটিভ টানটা তিনি অনুভবই করেন না, কারণ এখানেই তাঁর জন্ম-বড় হওয়া-পড়াশোনা ইত্যাদি। এই কথাগুলোর ভেতরে যে কলকাতা আছে, সেটা একটা উত্তর ঔপনিবেশিক কলকাতা। এখানে বিশপ লেফ্রয়ের জানলা দিয়ে বারবার তাই ফ্রান্সের লিজিয়ন দ্য অনার তাঁর শরীর খারাপ জেনে, ফরাসি সরকার এসে তাঁকে দিয়ে যান বা অস্কারের মঞ্চে দেখা যায় অসুস্থ সত্যজিৎ হাসপাতালে শুয়ে অস্কার ধরে কিছু কথা বলছেন। রেনেসাঁসের শেষ ছিটেফোটা হয়তো এভাবেই ফুটে ওঠে, যা বারবার বলে সিম্পল লিভিং আর হাই থিঙ্কিং আর তাই সত্যজিৎ পাজামা পরেই নেমে পড়েন ফুটপাথে বই খুঁজতে, একবারও ভাবেন না, পরেরদিন তাঁকে বার্গম্যানের পাশে বসে ইন্টারভিউ দিতে হবে হয়তো বার্লিন বা ভেনিসের মঞ্চে। যেমন তাঁর চরিত্র শঙ্কুকেও দুনিয়া যখন বারবার বলেন, বিদেশেই থেকে যেতে, শঙ্কু বলেন তা সম্ভব না, গিরিডি না গেলে তিনি কল্পনা করতেই পারবেন না কিছু। সেখানেই তাঁর শেকড় ভাষা আর শহর। তাই সেখান থেকেই তাঁর আন্তর্জাতিকতা…

এ কথাগুলো এই কর্পোরেট বড়লোকি লুম্পেন চালাক শহরে আমাদের আর বুঝতে পারার কথা না। আমাদের পরিচালকরা আর ফুটপাথে বই খোঁজ-এ না। তাঁদের বড্ড তারা। বোম্বেতে তাঁদের কোটি টাকায় এই গল্পগুলো বেচতে হবে। মনে পড়ছিল, সত্যজিৎ স্পিলবার্গ তর্জা, হলিউড ই-টি চুরি করায় বঙ্কুবাবুর বন্ধু সত্যজিৎ কি খেপেই না গেলেন! সেই রাগ কি আর এই পরিচালকদের হয়? না হয়তো। হলে, এই বিক্রিবাটা সম্ভব হত না। বরং সদানন্দের খুদে জগতের মতই ধরা দিত, কীভাবে সত্যজিৎ আমাদের কিশোর মনে এসব গল্পের মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে দিতেন এই টাকার বদলে রুচির জগতগুলো নানা ভাবে, যাতে বড় হয়ে আমরাও টাকার সামনে ঝুঁকে না পড়ি, আমরাও অন্যায় বিক্রিবাটা দেখে রেগে উঠি, আমরাও বলতে পারি, আমাদের টাকা দেখাবেন না, আমাদের সমস্ত শেকড় এ শহরে, আর টাকার চেয়ে আমাদের মানবিকতা বড়…ভাষা শহর আর শেকড় বড়ো…বাহ্যিক আড়ম্বর দেখে সেখানে অসমঞ্জবাবুর কুকুর হাসে না বরং অন্তরের পুজোই সেখানে আসল…

চারপাশের অশিক্ষা দেখতে দেখতে আমার মত কেউ কেউ সত্যজিৎ-পন্থী আজও সত্যজিতের জগতে ঢুকে মুক্তি খোঁজেন আমি জানি। আর তারপরেই ‘রে’র মত হাজারো সিরিজ দেখে ধাক্কা খান, সেটাও জানি। কারণ, এসব গল্পের আর্বান সেনসেবিলিটি বা একাকিত্বের মাধুর্য বুঝতে যে সমাজমনটা দরকার, যারা এসব ছবি বানান তাঁদের কারও সে মনটা নেই…তাঁরা চেনেন না, ধর্মতলার কেরানিকে মাইনে পাওয়ার দিনে বাচ্চার জন্য খেলনা কিনে ফেরার পথে আউট্রাম ঘাটের হাওয়া খেতে গেলে কেমন দেখায়, সত্যজিৎ জানতেন, কারণ তিনি রাস্তায় হাঁটতেন, কখনও পুরোনো বই বা কখনও অন্য রকম মানুষের খোঁজে…

৩.

গড়পারের রায়বাড়িতেই রাখা ছিল বাঙালির শৈশব। মাঝে মাঝে এমনটাই মনে হয়। আজকাল যখন অন্ধকার হয়ে আসে দিন তখন আবার ঢুকে পড়ি রায়বাড়ির সেই শৈশবে। সেখানে দেখা হয়ে যায় একে একে নকু-গামা থেকে হিজিবিজবিজ হয়ে গুপী-বাঘা পেরিয়ে পিন্টুর দাদুর সাথে। কত রোদ রাখা এসব বাক্যের গভীরে তিন প্রজন্মের! বাংলার ছোটদের গল্প বলার কি নিদারুণ বাসনা ছিল এই বাড়িটির! জানিয়ে দেওয়ার বাসনা ছিল, দেশ-বিদেশের হরেক ব্যক্তিত্বের গল্প। সে গল্পগুলি নানা মানুষ লিখলেও কিছু কিছু মিলও থেকে যেত তাদের মধ্যে। তা নিয়েই আজ দু একটা কথা লিখব। আর, এ মিল একেবারেই আকস্মিক না বরং অনেক বেশি অবচেতনের বলেই আমার ধারণা…

সুকুমারের হাঁসজারু বা কুমড়োপটাশ চরিত্রগুলি আমাদের ধরে ফেলে বারবার। সুকুমারের ‘হ য ব র ল’র এক্সেটেনশানই একভাবে আজ খুঁজে পাই সত্যজিতের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে। তা যেমন হিজিবিজবিজ থেকে প্রোফেসার শঙ্কুতে তেমনি বৃহচঞ্চু বা খগম জাতীয় গল্পে পরিবর্তশীল জীবচরিত্রে। কোথাও রতনবাবু সাপ হয়ে যাচ্ছেন তো আবার কোথাও জঙ্গলের ডিম ফুটে বেরনো বড় আকারের পাখি মানুষের রক্ত খাচ্ছে বা কোথাও গাছ টেনে নিচ্ছে মানুষকে, হয়ে উঠছে নরখাদক। চিন্তার এই মোটিফ, বলা ভালো ননসেন্স থিঙ্কিংকের এই প্রয়োগ সুকুমার থেকে সত্যজিতে এসে বারবার কিছুটা সিরিয়াস হয়ে ধরা দিয়েছে। এমনকি ‘হলদে পাখির পালক’ বা ‘টঙলিং’-এও যে অদ্ভুতুড়ে জগত তাও যেন কত কাছে এ জগতের…

আজ যখন ফিরে যাই নলিনী দাশের লেখা রায়বাড়ির স্মৃতিচারণা বা ‘যখন ছোট ছিলাম’এ তখন যে জগৎটা

খুলে যায়, সে জগৎ আর এই অদ্ভুতুড়ে জগৎ মেলালে মিলে যায় বাঙালির ছোটবেলা। সেখানে আশাহীন এই বড়বেলার দিনকালে আবার মনকেমনের রোদ ওঠে, মনের চাপ চাপ রক্তগুলোর শুশ্রূষা করেন কি পরম আদরে আজও লীলা থেকে উপেন্দ্রকিশোর। কত রকম মানুষকে ঘুরে বেড়াতে দেখি আজও রায়বাড়িতে। কেউ ক্রিকেট খেলায় বিখ্যাত তো কেউ ছাদে টেলিস্কোপ লাগিয়ে দূরের মহাকাশ দেখছে, কেউ আবার সারাজীবন বিয়ে না করে লাল-নীল কালিতে ডাইরি লেখেন আর আত্মীয়দের খোঁজ নিয়ে বেড়ান। একটা অদ্ভুত কলকাতা খুলে যায় চোখের সামনে আমার এই বড়বেলার পাঠে…আমি আবার খুঁজে পাই যৌথবাড়ির হইহই, মানুষের একসাথে বেঁচে থাকার হলুদ সাবমেরিন যার একতলায় সারাদিন শব্দ করে ছাপা হয়ে চলে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা…

ভাবতে ভালো লাগে সেই কলকাতার আরেক বাড়ির কথা। হ্যাঁ, এলগিন রোডের বসু বাড়ি। সেখানেও নিত্য চলছে কল্পনার চাষবাস নানা ভাবে। শিশির বসুর লেখায় আবারও ফিরে ফিরে পড়ি সুভাষ বসুকে শেষ রাতে ছেড়ে আসার স্মৃতি। ছদ্মবেশী সুভাষ ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে মিলয়ে যাচ্ছে অদূরে ধীরে ধীরে। এই শেষবার তাঁকে দেখছেন শিশির। সুভাষের জন্য ক দিন আগেই ছদ্মবেশের পোশাক কিনে এনেছেন ধর্মতলা থেকে। এ বাড়িতেই ছোটবেলায় সুভাষ তাঁদের শোনাতেন লেনিনের গল্প। বলতেন, এ বাড়িতে সবাই ভাবে তাঁর কিছু হবে না, লেনিনকেও তেমন ভাবতেন সমকালের অনেকে…সুভাষ তারপর সত্যি চলে যাবেন একদিন…সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াবেন দানবীয় শক্তিতে…তারপর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না…কেউ বলবে তাঁকে গাজিয়াবাদের কাছে দেখা গেছে, কেউ বলবে জ্বলন্ত আগুন লাগা প্লেন থেকে ঝাঁপ দিতে গিয়ে তিনি মারা গেছেন, কেউ বলবে আজও তিনি বেঁচে দুনিয়ার সমস্ত বিদ্রোহে সামিল হচ্ছেন…ডিএনএ টেস্ট হবে তাঁর দাঁত খুঁজতে, তাঁর ছাইভস্ম রাখা থাকবে রেনকোজি মন্দিরে…

ভাবতে অবাক লাগে, এ কলকাতার দুটি বাড়িতেই কিছু আগে পরে এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে। তিলে তিলে যা নাড়িয়ে দেবে দুনিয়াকে। নলিনী দাশের লেখায় যেমন ছোটবেলার সত্যজিৎ বারবার বলেন, একদিন জার্মানি থেকে ফিল্ম শিখে এসে দুনিয়া কাঁপানো ছবি বানাবেন তেমনি নেতাজী শিশির বসুদের এলগিনের বাড়িতে বলেন লেনিনের স্বপ্নের কথা। বাঙালির এই স্বপ্নের জায়গাটা আমাকে ভাবায়, আমার চুপসে আসা বড়বেলায় রোদ্দুর ভরে দেয়, আমি দেখি বড়বেলার পড়ে আসা আলোর চেয়ে কি বিরাট শৈশবের বিস্ময়, নিজেকে তারপর চিমটি কেটে দেখে নি, বিস্ময় আজও বেঁচে আছে তো! কারণ, যেদিন বিস্মিত হতে ভুলে যাব, সেদিন আর হাঁসজারু আর খগমে মিল খুঁজে পাব না, জানব না কোন রসায়নে হিজিবিজবিজ আর শঙ্কু মিলে যায়, বুঝতে পারব না কোথায় রায়বাড়ি আর বসু বাড়ির মিল…আর কোথায় অমিল আমাদের রোদ-আলোর ছোটবেলার সাথে আজকের এই শীত-শীত নিভে আসা বড়বেলার…

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev