ভারতের সিনেমার ইতিহাসে ১৯৫৫ এবং ৫৬ সাল সর্ব অর্থেই যুগান্তকারী। এই দুই বছরে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ মুক্তি পায়। দেশে তো বটেই, বিদেশেও তাবড়ো তাবড়ো চলচ্চিত্র উৎসবে দুটি ছবিই আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বহুবিধ পুরস্কার ও সম্মানে সংবর্ধিত হয়। এই প্রথম, ভারতীয় সিনেমা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠা পায়। বিশ্ববিখ্যাত জাপানি চিত্রপরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া বলেন, এই বিশ্বে বাস করে সত্যজিৎ রায়ের ছবি না দেখার মানে সূর্য চাঁদ না দেখা। এটা ভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক এবং সত্যজিৎ রায় অবশ্যই সেই ইতিহাস-নির্মাণের প্রধান স্তম্ভ। এখনও পর্যন্ত (২০১৮, মে) ভারতবর্ষে আর কোনও চিত্রপরিচালক সত্যজিৎবাবুর মতো এমন পৃথিবীজোড়া সমাদর পাননি। রবীন্দ্রনাথ প্রথম এশীয় যিনি নোবেল পুরস্কার পান, ১৯১৩ সালে। ১৯৯২ সালে প্রয়াণের অব্যবহিত আগে সত্যজিৎবাবুকে ‘মোশন পিকচার্স অ্যাকাডেমি’ জীবনকৃতি অস্কারে ভূষিত করে— এই সম্মান বিরলতম। জীবনকৃতি অস্কারকে সিনেমার নোবেল পুরস্কার বলা হয়। সত্যজিৎবাবু প্রথম ভারতীয় যিনি এই শিরোপা পান। পথের পাঁচালী পর্বের পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টির বিচিত্র স্রোত সারা বিশ্ববাসী দেখেছে। ‘আবোল তাবোল’ স্রষ্টা সুকুমার রায় ও সুপ্রভা রায়ের এই পুত্র বার বার হলিউড থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া সত্বেও এই গ্রীষ্মপ্রধান কলকাতাকেই তাঁর নিজের শহর এবং কাজের জায়গা হিসেবে মান দিয়েছেন।

‘অপরাজিত’ ছবিটির পরে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘পরশ পাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘অপুর সংসার’, ‘দেবী’, ‘তিন কন্যা’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘অভিযান’, ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’, ‘নায়ক’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘অরণ্যের দিন রাত্রি’ প্রভৃতি কালজয়ী কাহিনীচিত্র। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষে কবিকে এই চিত্রনির্মাতা শ্রদ্ধা জানান তথ্যচিত্র নির্মাণ করে। এর সঙ্গে রয়েছে চলচ্চিত্র বিষয় তাঁর বাংলা ও ইংরিজি দুই ভাষায় লেখা বহু প্রবন্ধ, ফেলুদার গোয়েন্দা কাহিনি এবং প্রোফেসর শঙ্কুর কল্পবিজ্ঞান কাহিনি।

তিনি কাজ শুরু করেছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি যে কিমর-এ জুনিয়র ভিসুয়ালাইজার হিসেবে। এর পর তো তিনি বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকিয়ে হিসেবে ঐতিহাসিক কাজ করেন। বিশ্বভারতীর পরে সিগনেট প্রেস যে প্রচ্ছদ নির্মাণের নজির তৈরি করেছিল, তা দুজনের চেষ্টায়। তাঁদের একজন হলেন দিলীপকুমার গুপ্ত বা ডি কে, অন্যজন সত্যজিৎ রায়। ১৯৪৬ সাল থেকেই সত্যজিৎবাবু চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন। সংবাদপত্রে পড়লেন যে, অমুক লেখকের তমুক কাহিনি অবলম্বনে ফিল্ম নির্মাণ হবে। তখনই সেই বই সংগ্রহ করে পড়ে ফেলতেন এবং সম্ভাব্য চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করতেন। ১৯৪৭ সালে ভারতে প্রথম ফিল্ম সোসাইটি স্থাপন করেন সত্যজিৎবাবু এবং তাঁর বন্ধুরা- নাম, ক্যালকাটা সিনে ক্লাব। এটাও একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। ভাবুন, যে বছর দেশ স্বাধীন হচ্ছে, সে বছর এঁরা ফিল্ম সোসাইটি খুললেন। আসলে সত্যজিৎ রায় একজন প্রকৃত শিল্পী। তিনি জানতেন, ভালো শিল্প সবসময়ই ব্যাপক চর্চা দাবি করে।
চলচ্চিত্র-শিল্প সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় বলেছেন, লেখকের হাতে যেমন কথা, চলচ্চিত্র-রচয়িতার হাতে তেমনি ছবি বা ইমেজ ও শব্দ। এই দুইয়ে মিলে যে ভাষা, তার প্রয়োগে যদি মুনশিয়ানার অভাব হয়, তার ব্যাকরণ যদি রচয়িতার আয়ত্ত না থাকে এবং সব মিলিয়ে ছবির বক্তব্যেই যদি জোর না থাকে তাহলে ভালো ছবি হবে কী করে! তিনি আরও বলেছেন, এত যে লেখা হয়, তার কতটুকুই বা সাহিত্য হয়ে ওঠে! আগে তো শিল্পী, তারপর শিল্প।

শিল্পের ব্যাকরণ বা টেকনিক আয়ত্ত থাকার ওপর প্রচণ্ড গুরুত্ব দিতেন তিনি। গত কয়েক বছরে ফিল্ম স্কুলের সংখ্যা অনেকটা বেড়েছে। তবে এখনও যাঁরা কিছু ভালো ছবি করছেন, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি স্বশিক্ষিত। ওই যে সত্যজিৎবাবু বলেছেন, যেখানে শিল্পী নেই, সেখানে শিল্পের উপকরণ থাকলেও শিল্পের উদ্ভব সম্ভব নয়। তাঁর পর্যবেক্ষণ— নাটকের দ্বন্দ্ব, উপন্যাসের কাহিনি ও পরিবেশ বর্ণনা, সংগীতের গতি ও ছন্দ, চিত্রকলার আলোছায়ার ব্যঞ্জনা— সবই চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে। তাহলে ভাবুন, চলচ্চিত্র নির্মাতাকে সত্যজিৎ কথিত ছবির বিষয়, বক্তব্য ও উপস্থাপন আয়ত্ত করতে কতটা চর্চা করতে হবে। আজকের সময়ে সে কথা ভাবলে বিষণ্ণতা গ্রাস করে। সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালের ২ মে এবং প্রয়াণ, ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল। সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষের সামান্য আগে বিষণ্ণতা সরিয়ে আমরা তাঁকে স্মরণ করার চেষ্টা করছি।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২৭ এপ্রিল ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত