কলকাতায় এসে এই জায়গাগুলোকে ভালো লাগতে শুরু করেছিল সুরেখার।
সেই ভালোলাগা খুব নিরবচ্ছিন্ন নয়। তার সঙ্গে মিশে ছিল অন্য কিছুও। সে অনুভূতি নানা রকম।
যেমন এদিকের পাড়াটাকে সকালবেলা তার কখনোই শশব্যস্ত মনে হয়নি। এয়ারপোর্ট এক নম্বরের উল্টোদিকের গলি। বড় রাস্তা টপকে গলিতে ঢুকে হাঁটলে মিনিট পাঁচেক। সকালে সাড়ে-সাতটা আটটা বাজতে না বাজতে এয়ারপোর্টের মুখ, যা কলকাতা শহরের অন্যতম ব্যস্ত মোড় হয়ে ওঠে, এ পাড়াটা যেন সেই প্রতিযোগিতা থেকে দূরে। অথবা ব্যস্ত শহর কলকাতা এমন দু-একটা পাড়াকে এখনও অব্যহতি দিয়ে রেখেছে।
সুরেখার ভোররাতে একবার ঘুম ভাঙে আজানের শব্দে। গলির ভেতর দিকে একটা বাঁকের পর মাঝারি একটা মসজিদ। এই পাড়া যেন ওই মসজিদ ঘিরেই। মুখের কাছে একটা ঘুপচি টেলারিং দোকান, আজাদ টেলার্স। প্রায় সারাদিনই এক-একটু বিরতির পর খটরখট শব্দে পায়ে-চালানো সেলাই মেসিন ঘুরে যায় সেখানে। তার ওপাশে একটা মটর সাইকেল সারাইয়ের দোকান। কালি মাখা দু-তিনটে ছেলে বাইক সারায়। ভেতরের তাকে রাখা ছোট বক্সে হিন্দি এফ-এম চ্যানেল বাজে সারা দিন।
শনি রবি এই দুদিন সুরেখার ঘরে থাকা। সেসব দিনে ও কখনও পাড়া আর আশপাশের এলাকাটা দেখতে বেরিয়ে পড়ে। এই গলিটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে এক দিকে রেললাইন আর এক দিকে নতুন হওয়া এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত। এক্সপ্রেসওয়ের দিকটা নিচু জায়গা, এখনও অনেকটা সবুজ, কিন্তু চার পাশের নির্মাণের ঘনঘটায় বোঝা যায় সবুজের ছবিটা, সুপুরি গাছ ও পাড়ার একপাশে কাঠবাদাম গাছ সহ দ্রুত বদলাচ্ছে। তুলনায় ঠিক যেখানে দোতলার একটা ঘরে সুরেখা বাসা নিয়েছে সে-পাড়াটা যেন এই বদল থেকে একটু পিছিয়ে। ওর বাড়ির মালিক নেয়ামত আলি মাঝ-বয়সি মানুষ। গলির সামনের দিকে ইট-বালি-পাথরের ব্যবসা। ছেলে, দুই মেয়ে আর বউকে নিয়ে নিচের একতলায় নেয়ামত আলির সংসার। বাইরের সিঁড়িটা দিয়ে দোতলায় ওঠবার সময় কখনও তাদের কারও কারও সঙ্গে দেখা হয় সুরেখার।
বাগুইআটিতে বড় রাস্তার ধারে যে ওয়ার্কিং উওমেন্স হস্টেলে সুরেখার থাকা ঠিক হয়ে গিয়েছিল সেটা শেষ পর্যন্ত তেমন কোনও কারণ ছাড়াই না হয়ে যায়। চাকরি জয়েনের হপ্তা খানেক আগে ও দেখে এসেছিল হস্টেলটা। সব দিক থেকে সুবিধাজনক মনে হল তখন। কেষ্টপুরের খালের পাশের রাস্তা ধরে অটো এবং শাটলের যাতায়াত। ফলে সেক্টর ফাইভে অফিসে পৌঁছনো বা সন্ধের পর ফেরা দুই-ই সহজ। ঘর আর বেড দেখে হস্টেল ইনচার্জের সঙ্গে পাকা কথাও সেরে ফেলেছিল সুরেখা। কিন্তু তার দিন দুয়েকের মাথায় ওর মোবাইলে একটা এসএমএস। ‘ফর রিনোভেশন ওয়ার্ক উই আর নট গোয়িং টু টেক এনি নিউ বোর্ডার প্রেজেন্টলি।’ চাকরিতে যোগ দেওয়ার দিন তিনেক আগে হঠাৎই সুরেখা প্রায় জলে।
কারণ বর্ধমান থেকে যাতায়াত করে সেক্টর ফাইভের চাকরিটা কিছুতেই করা সম্ভব ছিল না। ভোর পাঁচটায় বেরনো, রাত নটায় ফেরা, সপ্তাহে টানা পাঁচ দিনের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। তাছাড়া আই-টি কোম্পানিতে কাজের যা ধরণ, অফিস ছেড়ে এসেও যেভাবে যখনতখন নেট-সংলগ্ন হয়ে থাকা, তার সঙ্গে বর্ধমান লোকালের ছ-ঘন্টার যাতায়াত এবং মিনিবাসে সল্টলেক-হাওড়া, এর কোনোটাই যায় না। ফলে আতান্তরে পড়া সুরেখা এদিকওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে ফোন করেছিল শবনমকে। শবনম পারভিন। ওদের বর্ধমানেরই মেয়ে। সুরেখার দু-বছর আগে ইউনিভার্সিটি থেকে বেরনো, পরে ম্যানেজমেন্টে একটা ডিপ্লোমা করে এক্সাইড-রবীন্দ্রসদন এলাকায় চাকরি। কলকাতাতেই কোথাও একটা থাকছিল শবনম। ও-ই বলেছিল এয়ারপোর্টের ভেতর দিকে পাড়ার ভেতর এক কামরার ঘরটার কথা। কলকাতায় আসার শুরুতে ও নিজেও কিছু দিন ছিল ওখানে। সুরেখাকে একদিন গিয়ে দেখে আসতে বলেছিল।
শবনমকে সুরেখা বলেছিল, তুমি তো একা থেকেছ, ফলে আমিও পারব। হাতে সময় কম। দেখার আর কী আছে!
শবনম বলেছে, না-পছন্দ হওয়ার কিছু নেই। এলাকাটা খানিক ঘিঞ্জি আর ঘরবাড়িগুলো গায়েগায়ে। ফিরতে রাত হলে কখনও একটু অস্বস্তি, তবে ওই অস্বস্তির বাইরে আর কিছু নয়। তোর কাজের জায়গাটা ঠিক কোথায়?
সুরেখা বলেছিল, সেক্টর ফাইভে নারকেলবাগান বলে একটা জায়গায় নামতে হয়। সল্টলেক হয়েও আসা যেতে পারে।
তাহলে তুই থাকতে শুরু করে দে। এয়ারপোর্ট এক নম্বর হয়ে নারকেলবাগান শাটল বা বাসে মিনিট পনেরর পথ। ওখানে থেকে শুরু কর। পরে মনে হলে অন্য কোথাও উঠে যাস।
কিন্তু সুরেখা উঠে যাওয়ার কথাটা প্রথম ছ-মাসে ভাবেইনি।
ভাবেনি তার প্রধান কারণ জায়গাটা থেকে ওর অফিসে যাতায়াতের সুবিধা। কুড়ি মিনিট নয়, টানা গাড়িতে মিনিট পনেরতেই নারকেলবাগান পৌঁছন যাচ্ছিল। সন্ধেয় ফিরতেও কোনও অসুবিধা ছিল না। ঘর যত ছোট হোক একটা দোতলায় একা, নিজস্ব বাথরুম, এই নিজস্বতাটুকুও তো অনেক। মাঝে বর্ধমান থেকে বাবা মা এলেন একদিন। একটু ঠাসাঠাসি, কিন্তু ওদেরও পছন্দ হল সুরেখার আপাতত থাকার ব্যবস্থাটা।
এভাবেই ওর তাড়া ছিল না অনেক দিন। পুরনো গোছের পাড়ার আরামটাও ও নিতে শুরু করেছিল। টেলারিং দোকানের খটাখট, বাইক সারাই দোকানে বেজে চলা গান, শনি বা রবিবার বাইপাস পর্যন্ত হেঁটে গেলে কলকাতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া গাড়ির অবিরাম দ্রুত গমন, ওকে টানছিল। ওকে যেন টেনে নিচ্ছিল কলকাতা অথচ কলকাতার মতো নয় এমন একটা এলাকা। কয়েক বছর এমন এক জায়গায় থাকাই যেতে পারত। কোনও দিন ফিরতে রাত সাড়ে-আটটা নটা হলে অসুবিধা লাগত ঠিকই, টেলারিং দোকানটা বন্ধের পর কারা যেন আড্ডা মারত মসজিদের সামনেটায়, তবে ও যা বুঝেছে তাতে ওকে নিয়ে কেউ কোনও দিন একটি কথাও বলেনি।
কিন্তু অফিসের অমিত একদিন বলল, তুই কি বাইপাসের এদিকটায় থাকতে চাস! মুকুন্দপুরের কাছাকাছি। আমার চেনাজানা এক মাসিমা কিন্তু ভাড়াটে খুঁজছেন। তোর মতো আপাতত-একা এমন একজনকে পেলেই ওনার ভালো হয়।
অফিস ডেক্স-টপে চোখ রাখা ছিল সুরেখার। কলকাতায় ওরা একা থাকাটা সহকর্মীদের কেউকেউ জেনেছে। অমিত আসে সোদপুর থেকে। ট্রেনে বিধাননগর নেমে বাকিটা অটোয়। সুরেখা ওকে বলল, এই মুহূর্তে থাকা নিয়ে আমার ক্রাইসিস নেই। মোটামুটি মানিয়ে ফেলেছি। যাতায়াতটাও ঠিকঠাক।
অমিত বলে, তবু তুই এ জায়গাটাও দ্যাখ। এক ফ্লোরে দুটো ফ্ল্যাটের একটায় ভদ্রমহিলা থাকেন। সামনেরটা ছেলের। তালা দেওয়া। ওটাকেই মাসিমা আপাতত ভাড়া দিয়ে রাখতে চান।
কিন্তু তার জন্য আমি কেন!
অমিত বলল, তুই না। তোর মতো যে কেউ। পরপর ক-টা ঘটনার পর বয়স্করা শহরে কেউ আর একা থাকতে সাহস পাচ্ছে না। আবার অচেনা পরিবারকে ভাড়া দেওয়াতেও ভরসা নেই। মাসিমারও সেই দশা। সবাইকে বলছেন। আমি চাইছি ওনাকে তুই একদিন মিট কর।
মিট হলে তারপর!
তারপর পোশালে এলি, না হলে নয়। তবে তোকে বলছি নারকেলবাগান থেকে এয়ারপোর্ট আর মুকুন্দপুরের সময় কিন্তু একই।
খুব আগ্রহ থেকে নয়, সুরেখা এমনিই একদিন গেল মুকুন্দপুরে। অমিতের বলে রাখা ছিল। বাইপাসের বাস দাঁড়ানোর জায়গাটা থেকে বাঁ দিকে হাঁটলে দু মিনিট। বাড়ির নম্বর ধরে দোতলায় উঠে বেল বাজাল ও।
ছোট তিনতলা বাড়ি। পাঁচিল ঘেরা। মাঝামাঝি সমান দু-ভাগে যেন ভাগ করা বাড়িটা। পাড়ায় ঢুকতে দেখেছে আশেপাশের অন্য ক-টা বাড়িও যেন এ রকম। ভেতরে ফ্ল্যাট সিস্টেমে আলাদা আলাদা পরিবার থেকে যেতে পারে। ঢোকার মুখে পাঁচিলের ভেতর ঝোপ মতো কামিনী ফুলের গাছ দেখেছে ও। অল্প কয়েকটা ফুল। বর্ধমানের বাড়ির বাইরে অনেক দিন পর কামিনী ফুল ফুটতে দেখা গেল।
ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন। ইনিই তাহলে মাসিমা। অমিতের সব জানিয়ে রাখা ছিল। সুরেখাকে ডাকলেন ভেতরে। শান্ত চেহারা। মুখে আলগা হাসি। বেতের মোড়ায় ওকে বসতে দিয়ে বললেন, আমি কিন্তু সেই অর্থে ভাড়া খুঁজছি না। তোমাকে অমিত নিশ্চয়ই বলেছে।
সুরেখা বসবে কী! প্রতিটি মোড়ায় সুতোর কাজ করা সাদা ঢাকনা দেখে অবাক ও। ঘরের দেওয়ালে একটি মাত্র ছবি। যুবক রবীন্দ্রনাথ। ঘরের প্রতিটি আসবাবেই যত্ন ও রুচি। মাসিমা বললেন, এ পাশটায় আমি থাকি। দরজা খুললে মুখের ফ্ল্যাটটা ছেলের। ও দিল্লি যাওয়ার পর তালা দেওয়াই রয়েছে। এখানে এমন একজনকে চাইছি যে কাছাকাছি এসে থাকবে।
সুরেখা অবাক হয়ে দেখে চারপাশ। অন্য এক ভালোলাগা ছড়িয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতরে। কলকাতায় আসার পর এই প্রথম এ রকম কোথাও। ভেতর থেকে কাজের মেয়ে গোছের কেউ একজন চা আর জল দিল। সঙ্গে সন্দেশ। মাসিমা বললেন, কবে থেকে চলে আসতে চাইছ তাহলে!
তখনও পর্যন্ত কিছুই স্থির করেনি সুরেখা। এ তো শুধু দেখতে আসা। সিদ্ধান্ত জানানো কি আজই! ভেতরের ভালোলাগাটা প্রথম দিনের জন্য চেপেই রাখল ও। বলল, দু-একদিনের মধ্যে অমিতই আপনাকে জানাবে।
মাসিমা আবারও হাসলেন।
সেদিন ফেরার পথে বাসের জানালায় বসে সুরেখা ভাবে, মুকুন্দপুর আর এয়ারপোর্টের উল্টোদিক ওর কাজের জায়গা থেকে একই দূর। তবু দুই পাড়া যেন দুই জগৎ। একটি পাড়া পুরনো। সেখানে মসজিদ লাগোয়া টেলারিং দোকানে বুড়ো দরজি, গান বাজতে থাকা আধোঅন্ধকার বাইক সারানোর দোকান, বাইরের সিঁড়ি দিয়ে একা একা উঠে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। তুলনায় বাইপাসের ওদিকে কলকাতা যেন নতুন করে সেজে উঠতে চাইছে।
অমিতের সঙ্গে দেখা হল না পরের দিন। তারপরের দিনও নয়। হয়তো ছুটি নিয়েছিল ও। ফিরে আসার পর দুপুরে অফিসের লবিতে দেখা হয়ে গেল। সুরেখার দেখে আসার সবটাই অমিতের জানা। বলল, মাসিমা তো ধরেই নিয়েছেন আগামী মাস বা তারপর থেকে তুই থাকছিস।
সুরেখা অবাক একটু। বলল, সময় চেয়েছি, পাকাপাকি কিছু তো ওনাকে জানাইনি।
কিছু কি ভাবলি?
সুরেখা বলল, ভাবছি।
তাহলে তোর অরিজিনাল অ্যাড্রেস, আমাদের অফিসের ঠিকানা এসবগুলো দিয়ে রাখ। মাসিমাকে পাঠাই। এখন তো কাউকে থাকতে দিলেও তার ডিটেইলস্ থানায় ফর্মালি দিয়ে রাখতে হচ্ছে। তুই যদি ভাবিস তো এগুলো আমায় দে।
যে পাড়ায় সুরেখা থাকছিল সেখানে অবশ্য এসবের বালাই নেই। এয়ারপোর্টের উল্টোদিকের পাড়াগুলোতে অনেক লোককে দেখে নতুন আসা বা ভাড়াটের মতোই মনে হয় সুরেখার। তাছাড়া মসজিদের ওদিকে কিছু বাড়ি রয়েছে যা শুধু মাত্র কাচ্চাবাচ্চা সমেত ভাড়া থাকা লোকদেরই। মাঝেমাঝে পুলিশ আসে। গলির মুখে জিপ দাঁড় করিয়ে ভেতরে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারপর আবার চলে যায়। শবনমের কথায় থাকতে দিয়েছিল বলেই হয়ত বাড়ির মালিক ওর কাছে কখনও কোনও কাগজ চায়নি। অমিতের হাতে বর্ধমানের ঠিকানা অফিসের ঠিকানা পাঠিয়ে দিল সুরেখা। মাঝে মনে হয়েছিল মাসিমার সঙ্গে ফোনে একদিন কথা বলে। মাসিমার শান্ত স্বরটি আন্তরিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করা হয়নি ফোনটা।
অমিত বলল, আরেক দিন যা তাহলে। তোর ডিটেইলস্ পাঠিয়েছি। মাসিমা বলছেন আরেক দিন ও আসুক।
আবার একটা রবিবার। আবার সেই লম্বা বাইপাস। বাসস্ট্যান্ড থেকে চওড়া গলিতে দু মিনিট হেঁটে যাওয়া। প্রায় শব্দহীন গলিটাতে সুদৃশ সব বাড়ি। পাঁচিলের ভেতর ফুটে থাকা কামিনীফুল। কলিংবেল।
দরজা খুলল আগের দিন চা দিয়ে যাওয়া মেয়েটি। সুরেখাকে বসতে দিয়ে ভেতরে চলে গেল। সেই পরিপাটি করে সাজানো ঘরটি, সুতোর কারুকাজ, যুবক রবীন্দ্রনাথ, মন ভালো করে দেওয়ার নিঃশব্দ সব উপকরণ। তেমন নিঃশব্দ পায়েই ঢুকে এলেন মাসিমা। এসেছ…
সুরেখা উঠে দাঁড়াল একবার। মাসিমা হাত নেড়েই বসালেন ওকে।
কখন এলে কীভাবে এলে-র মতো দু-চারটি কথার পর মাসিমা সামান্য গম্ভীর যেন। বললেন, তোমার কাছে একটি ব্যাপার জানতে চাই।
সুরেখা সরাসরি মাসিমার দিকে। বলুন।
…ওই যে বর্ধমানের ঠিকানা, সেখানে কেয়ার অব্-এ যার নাম, তিনি তোমার কে হন?
সামান্য অস্বস্তি হয় সুরেখার। মুখের প্রসন্ন ভাবটি দমে আসে। বাইরে কোথাও একটি গাড়ির হর্ন। ও বলে, শাহনাজ আলি খান। আমার বাবা। বাবা ওখানে একটি স্কুলে পড়ান।
মাসিমার মুখে হাসি নেই। যেন কোনও কারণে হতাশ। বলেন, আর তুমি!
আমি তার মেয়ে সুরেখা। সুরেখা রেহান। ডাক নাম মালিনী…
বাইরে হর্ন দেওয়া গাড়িটি শব্দ করে রওনা হয়ে যায়। নিচের গলিতে তখন বাচ্চাদের গলা। কিন্তু আশ্চর্য নীরবতা সুরেখার বসে থাকা ঘরে। মাসিমা চুপ, জানালার বাইরে তার দৃষ্টি। পরিপাটি সুতোর কাজেরা মাকড়সার মৃত জালের মতো কাপড়ের ঢাকনায় পড়ে থাকে। যুবক রবীন্দ্রনাথ উদাসীন। মাসিমা বিড়বিড় করে এক সময় কথা বলেন। …অমিত আমাকে আগেই জানাতে পারত। আমি তো ওকে বলেইছি বাঙালি না হলে মুশকিল…।
একটিও কথা না বলে সুরেখা দোতলা থেকে গলিতে নেমে আসে।
পুরনো চিলে কোঠার ঘরটিতে যখন সে ফেরে রাত তখন প্রায় আটটা। তার আগে সুরেখা এদিক ওদিক ঘুরেছে। পাড়ার ভেতর চলে গেছে এক্সপ্রেসওয়ের দিকে। মসজিদের শেষ আজান শোনা গেছে দূর থেকে। গলির মোড়ের দোকানটিতে ক্লান্ত হিন্দি গান। দূরে রেললাইনের দিক থেকে ভেসে এল ট্রেনের বার কয়েক হুইসেল।
ঘরে ফিরে সুরেখার দেশের কথা মনে হয়। বাড়ির কথা। বাবা মা। ক্লাস এইটে পড়া ভাইয়ার কথা। সাইকেল নিয়ে সকালবেলা পড়তে যাচ্ছে ভাইয়া। উঠোনের একপাশে কামিনী ফুলের গাছ। বর্ষার ফুলে সাদা হয়ে থাকে গাছটি।
চিলেকোঠার ঘরে ফেরা মালিনীর চোখে জল এল সেদিন।
অনবদ্য। হৃদয় ছুঁয়ে গেল।