কার্তিকের বেলা শেষ হতে তেমন আর বাকি নেই।
ফসল উঠে যাওয়া মাঠের এক পাশে লম্বাটে খেজুর গাছ। কোমরে দড়ি বেঁধে গাছের মাথায় লেগে রয়েছে কেউ। পাতলা দা-এর এক-একটা টান পড়ছে গাছের গায়ে। কার্তিকের শেষে খেজুরের গা চেঁচে দিলেই নলি গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা রস এসে যাবে।
বেড়ার ধারে কচা গাছের ডালে লেজ ঝুলিয়ে বসা একটি ফিঙে। নিচে আঁধার হয়ে আসা আঁশ-শ্যাওড়ার ঝোপ। মাঝেমাঝে ডাল থেকে লাফিয়ে নামছে পাখিটি। ঠোঁটে করে পোকা তুলে আনছে। সেই সময় এক-একবার ডাক শোনা যাচ্ছে তার।
এই ডাক ছাড়া বাইরে এখন অন্য শব্দ নেই। মরিয়ম বিবির ছাগল ক’টি খানিক আগে ঘরে এসে গেছে। প্রতি সন্ধেতেই তারা মাথা নিচু করে ঘরে ফেরে। ওদের ফেরা নিয়ে মরিয়ম বিবির ভাবনা থাকে না। সে বরং এই সময় অন্য কিছু কাজ সেরে নেয়।
উঠোনের মাদুরে শুকোতে দেওয়া সরষে সারা দিন রোদ পেয়েছে হেমন্তের। মরিয়ম বিবি সেগুলো ঘরে তোলে। তুষ আর খুদ মাখা ভাত খেতে দেয় হাঁসেদের। ছাগলের ঘরের মুখে একফালি কাঠ চেপে দেয়। তার এই কাজকম্মে কোনও শব্দ নেই। বাইরে ফিঙের ডাকের সঙ্গে ঘরে তখন অন্য এক স্বর। সেই স্বর নিচু এবং ধারাবাহিক। যেন এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে তেলের ধারা নামছে। বেড়া দেওয়া ছোট ঘর দুটির চারপাশে সেই স্বর দোয়া-দরুতের মতো মিশে থাকে।
এই শব্দ অনেকটা স্বস্তি দেয় মরিয়ম বিবিকে। অনেকগুলো কথা ভুলিয়ে দিয়ে যায়। উঠোনটি ছাড়ালে ডান হাতে বাঁশবন। বাঁশের ঝোঁকানো মাথা নামাজের ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া। সেখানে ধুন্দুল আর আকন্দ ঝোপের আড়ালে বাঁশবনের মাটিতে গত শীতে শোয়ানো হয়েছে সরম আলিকে। সরম আলি গাজি। বাইশ বছর মরিয়ম বিবির সঙ্গে গেরস্থালি করা মানুষ। ওই কবরস্থান লাগোয়া বিঘে খানেক জমি, যেখানে এখন পেকে আসা ধান, বেঁচে থাকা অবস্থায় সরম আলি তার মালিক। তাই নিয়ে তার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, ক বছর আগে বন্যার পানিতে স্বপ্ন মুছে গেলে ওই জমির ধারেই দুহাতে মাথা চেপে বসে থাকা। আর এখন বাঁশবনের আঁধারে তার বরাদ্দ সাড়ে তিন হাত। গত বর্ষাতেই কবরের মাথার দিকটি বসে গেছে। মরিয়ম বিবি ছাগল চরানোর সময় দেখে গেছে একদিন। কবরের মাটি বসে যাওয়ার পর গোরে যাওয়া মানুষ ঘরের স্মৃতি থেকে আলগা হয়ে যায়। মেজ ছেলে হাপিজুল বাপের জায়গাটুকু ইট দিয়ে বাঁধিয়ে দেবে বলেছে। এর মধ্যে ঘুরেও গেছে দু’বার। কিন্তু তারই বা সাধ্য কতটুকু। মরিয়ম বিবি এই কার্তিকের সন্ধেয় বাঁশবনের তলে ঘনিয়ে ওঠা অন্ধকারটুকু দেখে। সবেবরাত-এর রাতে এ বছরই গোরস্থানে প্রথম মোম ধরিয়ে এসেছে।
কাজের ফাঁকে সে মাটির দাওয়ায় শব্দের মুখোমুখি এসে বসে। তার চোখ তখনও মাঠ আর বাঁশবনে। সামনে থেকে উঠে আসা স্বর এবার তার বুকের ভিতরটা ভরিয়ে দিতে থাকে। তাকে চারপাশ থেকে ছুঁয়ে যায়। মরিয়ম বিবি আবিষ্ট হয়ে শব্দের সামনে বসে থাকে।
অথচ তার সামনে যে বসা তার চোখে-মুখে ভাবান্তর নেই। যেন মরিয়ম বিবির বসাটুকুও লক্ষ্য করেনি। তার মাথার ওপর সাদা-কালো ছক কাটা ওড়না। ধনুকের মতো পিঠ আর ঝুঁকে পড়া মাথা পবিত্র কেতাবের পাতায়। প্রতি পৃষ্ঠার ডান থেকে বাঁ দিকে শুধু চোখ সরে যাচ্ছে বারবার। মরিয়ম বিবি বছর তিরিশের এই মেয়েটিকে দেখে। বাঁশবন থেকে চোখ সরিয়ে চেয়ে থাকে পাতলা ঠোঁটের ওঠানামার দিকে। একে নিজের মেয়ে বলে চিনতে কেমন ভুল হয়ে যায়। যেন এই সাঁঝবেলায় আসমান থেকে নেমে আসা কোনও হুরি একটানা কেতাব পড়ে চলেছে। হেমন্তের কুয়াশা জমছে বুনোঝোপের ফাঁকে, বাঁশবনে উড়ে বেড়ানো জোনাকি, শেখ-পাড়ার মসজিদে মগরিবের আজান সদ্য থেমে গেল, মরিয়ম বিবির মনে হয় এই কুয়াশা নামা কালে আসমান থেকে যেন ফেরেস্তারাও নামছেন। উঠোনের চারপাশে বসে তারা এখন সাবিকুন নাহারের কোরান পড়া শুনবেন।
মেয়ের উল্টোদিকে বসে মরিয়ম বিবি নিজের মেয়েটিকেও ভুলে যেতে চায়। ভুলে যেতে চায় বাদুড়িয়ায় বড়লোক শ্বশুরের ঘরে সাবিকুনের বিয়ে হওয়া অল্প কদিনের জীবন। এমনকী তার সেই খোলা পিঠ, বাপের ঘরে ফিরে কাপড় আল্গা করে যা সে বাপ-মাকে দেখিয়েছে, এই দিন শেষের কোরান শুনে, প্রতি সন্ধের কোরানেই মরিয়ম বিবি মেয়ের ফর্সা পিঠে সারিসারি মারের দাগগুলো ভুলে যেতে চায়। তখনও সরম আলি বেঁচে। বাপের দুশ্চিন্তা, মেয়েকে আড়াল করে কান্না, একলা থাকলে এখনও কানে বাজে মরিয়ম বিবির। এই সন্ধেয় নিজের মেয়েটিকে দেখতে দেখতে আরবি শব্দের ঘোরের মধ্যে মরিয়ম বিবি পেছনের অনেকগুলো দিন ভুলে যেতে পারে।
বাইরে শেষ পাখিরা ডাকে। সাবিকুন নাহারের কোরান পড়া শেষ হয়। রেহেল-এর ওপর রাখা বইটি ভাঁজ করে মাথা থেকে ওড়না নামিয়ে দেয়। জায়নামাজটি তুলে ঘরের কাজে ঢুকে পড়ে সে।
মরিয়ম বিবি সব দেখে। বারবার দেখেও ঘোর কাটে না তার। বই রেখে সাবিকুন বলে, হাঁস-ছাগল সব ঘরে তোলা হয়েছে? আগের দিন হাঁসের দরজা কিন্তু খোলা পড়েছিল।
মরিয়ম বিবি তখনও বইটিকে দেখে। হাঁস-ছাগলের প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলে, এই জন্যে বাপ তোরে মাদ্রাসায় দিয়েছিল। শিরীষতলায় নিয়ামত মৌলবির মাদ্রাসা। সেকি আজকের কথা!
সাবিকুন উঠে পড়ে। ঘরের কাজে ঢুকে যায়। ছাগলের দরজা দেখে আসে। রান্নার জায়গায় উঁকি দেয় একবার। মায়ের অসুখটা তার চেনা। কাছ থেকে দেখা প্রতিদিন। এর পরই মরিয়ম বিবি চলে যাবে হাবিজাবি কথায়। পর্দায় দেখা ছবির মতো কথা আসবে পরপর। তিন দিনের জ্বরে সরম আলির মরণ, বড় ছেলে সিরাজুলের কাজ খুঁজতে নিরুদ্দেশ হওয়া, হাপিজুলের কম পয়সায় রঙের কাজে নামা, সব এসে যাবে পরপর। এবং সব শেষে সাবিকুন নাহারের আর একবার বিয়ে দেওয়ার কথা। নতুন করে খোঁজ এসেছে গোপালপুর থেকে। আটুরিয়ার কারা যেন লোক মারফত যোগাযোগ করছে। মরিয়ম বিবি কথার ঝাঁপি খুলবে এক বিয়ে থেকে পিঠে ক্ষত নিয়ে ফেরা মেয়ের সামনে। ভিতরের ঘর থেকে সাবিকুন তাই আগেভাগে ধমক দিয়ে বসে, অনেক হয়েছে। এবার ওঠো। হাপিজুল বাড়ি আসতে পারে। ক’টা চাল না বাড়িয়ে দিলে খাবে কী?
মরিয়ম বিবি উঠে পড়ে। মেয়ের মুখের ধমক তাকে একটু নাড়িয়ে দিয়ে যায়। সে আবার ঘরের কাজে হাত লাগায়। ভিতরের ঘরের হারিকেনটা এনে রান্নার জায়গায় রাখে। চাল ধোয়ার জন্য এনামেলের থালা বার করে। কোরানের ভাবনা তবু ছেড়ে যায় না তাকে। হাতের কাজ সারতে সারতে মেয়েকে বলে, কথাগুলো আমারে একদিন বাংলা করে শোনাবি?
সন্ধেবেলা ঘরে মন দেওয়ার পর সাবিকুনের মন থেকে পাঠ-আলোচনা অনেকটাই সরে গেছে। মায়ের স্যাঁতসেঁতে কথাগুলো পছন্দ হয় না তার। আগের মতোই ধমকের গলায় বলে, তোমার ওপর মাঝে-মাঝে জেন্-এর ভর হয় নাকি! আরবিটা পছন্দ হচ্ছে না আজকাল! মাদ্রাসায় কে কবে বাংলায় কোরান পড়েছে?
মরিয়ম বিবি বলে, বই বন্ধ করার আগে তোর ঠোঁট দু’খানা কেঁপেছে। কথা বোঝার জন্য আমার ভেতরে ছটফট করছিল। আল্লা রসুলের কাছে ক্ষমা চেয়েছি বারবার।
সাবিকুন মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ তখন বাইরে। জোনাকি-জ্বলা মাঠ আর আকাশের দিকে। উঠোনের খোঁয়াড়ে ছাগলের পাল হঠাৎই গা-ঝাড়া দেয়। অন্ধকারে চেয়ে থেকে সাবিকুন বিড়বিড় করে বলে, ওয়া ইন খিফতুম শিক্বাক্বা বাইনিহিমা ফাব্আছু হাকামাম্ মিন্ আহলিহা… ইন্নাল্লাহা কানা আলিমান খাবিরা।
মা আর মেয়ে কেউ এর অর্থ বোঝে না। অন্ধকারে তারা শুধু এ-ওর মুখের দিকে তাকায়।
দুই
আগের রাতে হাপিজুলের বেশ দেরি হয়ে গেছে। মা আর বোন না খেয়ে বসে ছিল। হাপিজুল ফিরলে তিনজন একসঙ্গে খেয়েছে। সে সময় হাপিজুল নতুন একটি সম্বন্ধের কথা বেলেছে সাবিকুনের জন্য।
পাত্র তার খুড়শ্বশুরের ছেলে। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স। ছেলে-মেয়ে রেখে বউ মারা যাওয়ায় বাড়ির লোকেরা নতুন বিয়ের কথা ভাবছে।
পরদিনের সকালটা ঝলমলে। বাঁশবন আর মাঠের সীমানায় মরিয়ম বিবির ছাগল কয়টি মাথা নিচু করে ঘাস চিবিয়ে চলেছে। ঘরের ভিতর কাজ সারছে সাবিকুন। যাওয়ার আগে হাপিজুল মাকে বলে, তবে তারা লোক খারাপ নয়, টাকাপয়সা রয়েছে। আগের বিয়েতে পাওয়া মোটরসাইকেল নিয়ে সারাদিন ব্যবসা দেখে বেড়ায়। সাবিকুনের কথা বলাও হয়েছে একবার…।
মরিয়ম বিবি চুপ করে থাকে। মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। তারপর দূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে বলে, ফের শাদি না করালে ওরে দেখবে কে! কোনও একটা সংসারে ঢুকলে তখন নিজেরটা বুঝে নেবে।
সাবিকুন এ ব্যাপারে কিছুই বলে না। ঘরের কাজের মধ্যে সে অন্য কোনও ভাবনায় ঘুরে বেড়ায়।
তার মনে তখন গত রাতের কোরান শরিফের আয়াত। এমন তার মাঝেমাঝেই হয়। মায়ের অসুখের মতো অনেকটা। পবিত্র বইয়ের একেকটি আয়াত হঠাৎই মনে এসে যায়। বিশেষ করে সূরা ফাতেহা আর আননিসা-র একটি-দুটি অংশ, বই নাড়াচাড়ার সময় প্রায়ই যেগুলি চোখে পড়ে। সে কেবল আরবি উচ্চারণটুকু জানে। নিখুঁত আরবিতে কোরানের বেশ কয়েকটি আয়াত বলে যেতে পারে, কিন্তু বাংলা অর্থ জানে না। পড়ার সময় মানে জানার ইচ্ছে কখনও হয়নি। শিরীষতলার নিয়ামত মৌলবিও এমন কথা বলেননি কোনও দিন।
তবু কার্তিকের এই সকালে সাবিকুন নাহারের অন্য রকম কিছু সাধ হয়। তার সামনে খোলা মাঠ, নুয়ে পড়া বাঁশবন, আব্বার কবর। তার পেছনে ভাঙা বিয়ে, মরিয়ম বিবির ছাদ-ফুটো সংসার। যে আয়াতটি মনে পড়ছে তার মানে বোঝার জন্য ভিতরটা কেমন ছটফটিয়ে ওঠে। রাতের না-পাক কাপড়ে দাওয়ায় বসে মাথায় ঘোরে না-বোঝা কিছু আরবি শব্দ। মরিয়ম বিবি কাজের ফাঁকে মেয়েকে দেখে। ভাবে, নতুন সম্বন্ধ নিয়ে ভাবনা শুরু হল হয়তো।
সেদিন দুপুরে কার্তিকের মেঘ আকাশে তুলো হলে সাবিকুন আর একবার ফেলে আসা মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা ভাবে। ঘোষেদের আমবাগান ছাড়িয়ে জোড়া-পুকুর, ওপাশে ছোট্ট ঘরখানি। সাত বছর আগে ছেড়ে আসা পাঠশালা। শৈশবের অবাক দিনগুলি চোখের সামনে ছবি হয়ে যায়। মৌলবি স্যারের মেহেদি লাগানো দাড়ি, লম্বা মুখে কালো ফ্রেমের চশমা, মাথায় টুপি। শিরীষতলার আলো-আঁধারিতে এক মনে আরবি পড়ে চলেছেন। সামনে সার বেঁধে বসা সাবিকুনের মতো অনেকে। তাদের মাথায় ওড়না, গায়ে সালোয়ার। মৌলবি স্যারের খানিক অংশ পড়া হলে সমবেত স্বর আছড়ে পড়ছে মুলি-বাঁশের বেড়ায়। ঘরের এক পাশে কাচে বাঁধানো কাবা-শরিফ। ছবির মুখে মাকড়সার জাল। ইদ আর সবেমিরাজ-এ মৌলবি স্যার নিজের হাতে ছবি পরিষ্কার করেন।
সেদিন দুপুরে সাবিকুন আচমকাই মাদ্রাসা ঘরটিতে ঢুকে যায়। সবই প্রায় আগের মতো। সামনের ছাত্রীরা খাতায় কিছু লিখছে। স্যারের চোখ কেতাবের পাতায়। সাবিকুনকে এত দিন পর দেখে কেমন অবাক হন তিনি। ঠায় চেয়ে থাকেন দরজার দিকে। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলেন।
মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম দেয় সাবিকুন। হাসে। সামনের মেয়েরাও মুখ তুলে তাকায় তার দিকে। বসার জায়গা দেখিয়ে মৌলবি স্যার বলেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এখনও মনে রয়েছে আমাদের?
দু-এক জন ছাত্রীর ঠোঁটেও তখন হাসি। পাড়া সম্পর্কে সকলেই পরিচিত। সাবিকুনকে দেখে তারাও অবাক। মৌলবি স্যারের দিকে চেয়ে সাবিকুন বলে, একটি আয়াতের মানে বোঝার জন্য আপনার কাছে আসা। আপনি ছাড়া কার কাছেই বা যাব!
মৌলবি স্যারও হাসেন। খুশি ছড়িয়ে যায় চোখমুখে। সাবিকুনের আব্বার সঙ্গেও আলাপ ছিল তার। সরম আলিকে এখনও বেশ মনে পড়ে। বছর দশেক আগে এমনই এক দুপুরে মেয়েকে সে এখানে পৌঁছে দিয়ে যায়। মেয়ের কোরান পড়া নিয়ে আব্বা দু-একটি কথা বলেছিল মৌলবির সঙ্গে। তারপর অনেক পথ, অনেক দূর যাওয়া। রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সাবিকুনের ভাঙা-গড়ার জীবন। এত বছর পর পরিণত মেয়েটিকে দেখতে থাকেন নিয়ামত মৌলবি। সাবিকুন আয়াতটি আউড়ে গেলে তার চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে।
আরবির অর্থ হয় না আম্মা। এ ভাষা রসুলে পাক্ আল্লাহ্র গলায় শুনেছেন। আমাদের তাই এ ভাষা পড়া আর শোনাই হেদায়েত।
মৌলবি স্যারের ভেজা চোখে রসুলে পাক্-এর নাম। সাবিকুনের ভেতরটাও ছলছল করে ওঠে। গলার কাছে কেমন এক অনুভূতি। এ অনুভূতি আয়াতের মানে বোঝার চাইতেও অনেক বেশি। মরুভূমির মাঝে অবিশ্বাসী আর ইবলিস্ ঘেরা রসুলে পাক্-এর জীবন, তলোয়ারের ফলার নীচে শুয়ে গোষ্ঠী বাঁচানো, তার মধ্যে নিরিবিলি কোনও পাহাড়ে মাঝে মাঝে আল্লাহ্র বাণী শোনা। অদৃশ্য আল্লাহ্ তার প্রির নবীর কানে আচমকা এক-একটি আয়াত বলে যাচ্ছেন। মৌলবি স্যারের চোখের জলে সাবিকুন নাহারের আর একবার সেই পবিত্র জীবনের কথা মনে হয়, প্রিয় নবীর আলোকিত জীবন, যে জীবনের কথা সাবিকুন একদিন এই অন্ধকার ঘরে বসে শুনেছে। আয়াতের মানে বুঝতে চাওয়া তখন একটি ক্ষুদ্র আবেদনের মতো লাগে। সবার সামনে মাথা নামিয়ে বসে থাকে সাবিকুন।
সেদিন বাড়ি ফিরে আবার সে মন দেয় কোরানের পাতায়। সেই কার্তিকের সন্ধেয় ফেরেস্তার চাদরের মতো মিহি কুয়াশায় চরাচর ঢেকে গেলে সাবিকুন একের পর এক পাতা উল্টে যায়। সেদিন পড়ার গতি আগের চাইতে বেশি। যেন এক অকারণ ব্যস্ততা। আয়াতের মানে জানতে চেয়ে সে যে আল্লাহ্র বাণীকে রক্তমাংসের চেহারা দিতে চেয়েছে, এই ভয় ভিতর থেকে চেপে রাখে। যেন গুণাহ ধোয়ার জন্য সেই রাতে আরও অনেকখানি পড়ে ফেলা। আত্মসমর্পণের জন্য সাবিকুন নিজেকে ধরে রাখে কেতাবের পাতায়।
তারপর এক সময় পড়া শেষ হয়। বই বন্ধ করে রেহেল্-এর সামনে খানিকক্ষণ বসে থাকে। দুই চোখ স্থির। অর্থ হাতড়ানোর অশুভ উদ্বেগটি ভুলে যেতে চায়। যেভাবে তার মা মরিয়ম বিবি কোরান শরিফে অতীত ভোলে সেরকম। পাশের খোঁয়াড়ে ছাগলের পাল নড়াচড়া করে। ছরছর শব্দ হয় পেচ্ছাপের। তাদের গায়ের বোঁটকা গন্ধ ছড়িয়ে থাকে উঠোনে।
আর এই শব্দ আর বাজে গন্ধ তাকে আবার নাড়া দিয়ে যায়। যেন এরা ধ্যানের ভেতর ঢুকে পড়ে। বুকের মধ্যে আবার বাজ পড়ার শব্দ। নাকি ধেয়ে আসা দোজখ্-এর আগুন। বারবার মৌলবি স্যারের দু চোখের পানি মনে আনতে চায় সাবিকুন। অথচ কাবা-শরিফের ছবিতে মাকড়সার জালের বিস্তার মনে পড়ে। আয়াতের অর্থ জানার আকাঙ্ক্ষা কি মৌলবি স্যারের চোখের পানিতে ঢাকা পড়ে গেল!
মরিয়ম বিবি তখন বাইরে। রাতের উনুনে কাঠ পোড়ে। কাঠ ঠেলতে ঠেলতে সে সাবিকুনকে দেখে। খানিক আগে সে-ও কোরান পড়া শুনেছে। সেদিনের পড়া তার মন ছুঁতে পারেনি। বই রেখে সাবিকুন উঠে গেলে মরিয়ম বিবি আর একবার গত দিনের কথায় ফেরে। বলে, রবিবার হাপিজুল আসবে। এর মধ্যে তারে হ্যাঁ-না কিছু বলে দিতে হবে। আমি না থাকলে কে তোরে দেখবে!
মায়ের কথায় ঘুরে আসে সাবিকুন। খানিক আগে হলেও এ কথার উত্তর দিতে পারত। মন দিয়ে কোরান পড়লে ওই কেতাবই তার আশ্রয়। কেউ না থাকলে কেতাব তাকে দেখবে। আঁধারের পথেও নিয়ে যাবে হাত ধরে। কিন্তু বুকের ভিতর উথালপাথাল নিয়ে কথা কটি সে বলে ফেলতে পারে না। বরং স্থির দাঁড়িয়ে থাকে দাওয়ার এক কোনায়। হঠাৎই মনে হয়, যে বইটি পবিত্র, অথচ তার সঙ্গে কথা দেওয়া-নেওয়া করে না, সে কীভাবে আশ্রয় দেবে তাকে!
দাওয়া ছেড়ে সাবিকুন বাইরের অন্ধকারে এসে দাঁড়ায়। রাতচরা পাখি ডাকছে দূরে, সাবিকুনের বুকের ভিতর তোলপাড়। কোরানের সঙ্গে তার এত দিনের সম্পর্ক যেন একমুখী ভালোবাসার মতো। আরবির পবিত্র দেওয়ালে মাথা খুঁড়লে তা থেকে বেহেস্ত-এর খুশবু বেরোয়, ভালোবাসা বেরোয় কিনা সাবিকুন তা বোঝে না। কিংবা সে ভালোবাসা এত নিরপেক্ষ ও মহান যে সাবিকুন নাগাল পায় না। মৌলবি স্যারের দাড়ি ভেজানো চোখের পানিকেও সাবিকুনের অর্থহীন লাগে। আয়াতের পর আয়াতের মানে তার জানা নয়, দেওয়ালের সামনে সে কিছু উচ্চারণ নিয়েই ঘোরাফেরা করে। স্যারের চোখের পানি যত করুণই দেখাক পবিত্র দেওয়ালের ছোট পাথরও তাতে গলে না।
তিন
বোঝার আশা সে ছেড়েই দিয়েছিল মন থেকে। তবু শেষ আর একটি চেষ্টার কথা ভাবে। আর একটু বড় করে খোঁজা। অন্য ধরনের কারও কাছে যদি আয়াতের অর্থ জানা যায়। আর এই সময়ই তার মনে হয় সোলেমান ভাইয়ের কথা। বাজারের এক পাশে ইসলামি বই দোকানের মালিক।
সোলেমান ভাই হাইস্কুলে অংকের মাস্টার। সজ্জন মানুষ। চাকরির বাইরে ছোট এই দোকানটি করেন। যাতায়াতের পথে দোকানটি অনেক বার চোখে পড়েছে সাবিকুনের। ভেতরের তাকে সবুজ মলাটে বাঁধানো সব বই। আয়াতের মানে বুঝতে শেষ একবার সেখানে যাবার কথা ভেবে ফেলল সে।
সেদিন বিকেলে চারদিক আঁধার করা বৃষ্টি। বাইরে লোক নেই। পাখিরা ডাক ভুলে বাসায় ভিজছে। তবু সেই সাদা বৃষ্টির মধ্যে আব্বার পুরনো ছাতাটি মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ে সাবিকুন। মরিয়ম বিবি দেখতে পেয়েও কিছু বলে না। বরং দাওয়ায় বসে দেখে ঘন বৃষ্টিতে হারিয়ে গেল সরম আলির ছাতাখানা। হাপিজুল সম্বন্ধ আনার পর থেকেই মেয়ে যেন অন্য রকম উতলা। না বুঝেও মেয়ের এই উতলাভাব ভালো লাগে তার।
সোলেমান ভাইয়ের দোকানেও সেদিন অন্য খদ্দের নেই। বর্ষার দিনে তিনিও কোরান শরিফ পড়ছেন। ওপর দিকে একটি ছোট জানালা। সেখান থেকে আলো এসেছে বইয়ের ওপর। সাবিকুনকে দরজায় দেখে তিনি বেশ অবাক। স্থির চেয়ে থাকেন। যদিও চোখে তখন কেতাবের ঘোর। আস্তে আস্তে বই বন্ধ করে বলেন, আপনি হঠাৎ কী মনে করে। ঘরে চাচির শরীর খারাপ নয় তো!
সোলেমান ভাই উঠে দাঁড়িয়ে টুল এগিয়ে দেন বসার জন্য।
সাবিকুন বসে না। দরজার পাশ থেকে সামনের সারির বইগুলো দেখে। বইয়ের পাশে ছোট তাকটিতে নানা রকম আতর। সঙ্গে ফেজ-টুপি, দাফনের কাপড়, মাথা ঠান্ডা করা বেগমবিলাস তেল। সাবিকুন ছোট চিরকুটটি এগিয়ে ধরে বলে, একটা ছোট দরকারে আপনার কাছে আসা। কেতাবের এক জায়গায় একটু ঠেকে গেছি।
আনন্দ ছড়িয়ে যায় সোলেমান ভাইয়ের মুখে। লাল ফ্রেমের চশমাটি বার করে নাকের ওপর পরেন। চিরকুট মেলে নেন মাদুরের ওপর। সুর করে আয়াতটি পড়তে শুরু করেন। একবার, দুবার তিনবার। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মাঝবয়সী মুখখানা। পড়া শেষ হলে বলেন, এ তো সুরা আননিসা…।
দরজায় দাঁড়ানো সাবিকুন মাথার ওড়নাটি ভালো করে জড়িয়ে নেয়। সোলেমান ভাইয়ের জানার পরিধি দেখে ভালো লাগে। বলে, কিন্তু বাংলায় এর মানে! সেটুকু জানতেই আপনার কাছে আসা।
খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকান সোলেমান ভাই। সন্ধের মুখে বৃষ্টির দমক একটু কমেছে। হাটতলায় যাতায়াত শুরু হয়েছে দু-একটি লোকের। নব পালের মুদি দোকানে বাতি ধরানো চলছে। সেদিকে ঠায় চেয়ে থাকেন তিনি। নিচু আর ধীর গলায় বলেন, কোরানের আবার বাংলা!
চশমাটি খুলে ফেলেন সোলেমান ভাই। আনন্দের রেশটুক মিলিয়ে যায় মুখ থেকে। তাকে হতাশ লাগে এবার। পরিচিত মেয়েটির সামনে কী বলবেন খুঁজে বেড়ান যেন। উঠে দাঁড়িয়ে তাকের এক জায়গায় চোখ বোলান। সরু একটি বই বার করে বলেন, সহজ নমাজ শিক্ষা বইখানা রয়েছে, নিতে পারেন। এ ছাড়া বাংলায় কিছু নেই।
তখনও গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে সাবিকুন। সোলেমান ভাইয়ের দেওয়া কাগজটি হাত বাড়িয়ে ফেরত নেয়। শেষবারের মতো গলায় একই রকম আকুতি। বলে, আপনার তো অনেক বই দেখার সুযোগ। না হয় আর একদিন আসব। দয়া করে যদি মানেটা জেনে রাখেন।
আবার দরজার বাইরে তাকান সোলেমান সাহেব। তার মুখ থেকে হতাশা সরে যায়। সেখানে তখন অন্য রকম ভাব। স্থির গলায় বাইরে তাকিয়ে বলেন, তেমন মতিভ্রম হলে দোজখের আগুন যেন এই ঘরেই পুড়িয়ে মারে আমাকে। ….আবার বৃষ্টি আসতে পারে। আপনি আজ আসুন।
আধো-অন্ধকার দোকানটি থেকে বেরিয়ে আসে সাবিকুন নাহার। বৃষ্টির অল্প বিরতিতে হাট আবার নড়েচড়ে নিচ্ছে। ছাতা মাথায় চলাচল শুরু করেছে লোকজন। ঝুড়ি মাথায় চাষিরা তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যাচ্ছে। সে বেরোতেই সোলেমান ভাই তালা লাগিয়ে দেন দোকানে।
সন্ধের মুখে ঘরে ফিরে আসে সাবিকুন। ঘোষদের পুকুর আর শিরীষতলা পার হয়ে মাটির দাওয়া, বেড়ার বাড়িখানা। শটি গাছে ঘেরা ছোট্ট উঠোন, অল্প দূরে বাঁশবন, মরিয়ম বিবির হাঁস-ছাগলের সংসার। মায়ের সঙ্গে সাবিকুনের অল্প কিছু কথা দেওয়া-নেওয়া হয়। দাওয়ায় উঠে সে টুকটাক ঘরের কাজেও হাত লাগায়।
বাঁশবনের আঁধারে খানিক সময় পরপর একটি পাখি ডাকে। দূরের ওই বাঁশবনে ক’মাস আগে শোয়ানো হয়েছে আব্বাজান সরম আলিকে। কেয়ামতের জন্য অপেক্ষা করা মানুষ কি গোরে শুয়ে রাতচরা পাখির ডাক শুনতে পায়! কিংবা কষ্ট পায় একলা হয়ে যাওয়া মেয়ের জন্য! বাপের ইচ্ছাতেই সাবিকুনের একদিন আরবির পথে যাত্রা। সেই পথ ধরে কোরান পড়তে শেখা, হাদিসের পাতা ওল্টানো। সাবিকুনের কোরান পড়া যারা শোনে সবাই মুগ্ধ। কিন্তু আজ এই সন্ধেয় সমস্ত শেখাকেই তার কেমন অর্থহীন লাগে। মনে হয় এক উদ্দেশ্যহীন পথেই ঘুরে বেড়াল এতকাল। চলার পথ কখনও তার চেনা মনে হয়নি।
অন্ধকার বাড়লে বাঁশবনের আড়ালে পাখির ডাক থেমে যায়। হয়তো কাছাকাছি অন্য কোথাও উড়ে যায় পাখিরা। শেখপাড়ার মসজিদে মগরিবের আজান শুরু হয়। এতদিন পর এই আজানকেও সাবিকুনের অচেনা ধ্বনির মতো মনে হয়।
অথচ সেই রাতেও কাজ সারা হলে সে কোরান নিয়ে বসে। রেহেল্-এর ওপর বই রেখে আনমনে পাতা ওল্টায়। যেন এই বোবা অন্বেষণের পরও তার আর কিছু নিয়ে বসার নেই। চারপাশের গ্রাম-ঘরে আরও অনেকের মতো এই বুঝতে না-পারা কেতাবই ভবিষ্যৎ তার। কোরান শরিফের পাতায় হাত রেখে এই প্রথম সাবিকুন নাহারের দুই চোখ জলে ভরে যায়। ঝাপসা হয়ে ওঠে সূরা-আয়াতের নিথর দেওয়াল। দেওয়ালের ওপর টপটপ করে গাঢ় চোখের পানি গড়িয়ে যায়।
ডান দিক থেকে বাঁয়ে ওল্টানোর পরিবর্তে সাবিকুন সেদিন উল্টো দিক থেকে কেতাবের পাতা উল্টে ফেলে।