বিগত দুই আর্থিক বছরে বিপুল অঙ্কের আর্থিক কেলেঙ্কারি নজরে এসেছে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির। ভুয়ো আমদানী দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি জেনেছে, আমদানী রফতানীর সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি সংস্থা এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত। গত দুটি আর্থিক বছর ধরে এই ভুয়ো লেনদেন চলেছে। এই ভুয়ো লেনদেনের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি দেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে। যেমনটা হাওলায় হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি জানতে পেরেছে ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ আর্থিক বছরে অন্তত ২.৬ লক্ষ কোটি টাকা এইভাবে বিদেশে পাচার করেছে আমদানী-রফতানী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি দেশীয় সংস্থা। দুই বছর ধরে এই বিশাল অঙ্কের টাকা সবার নজর এড়িয়ে বিদেশে পাচার হল কীভাবে তা ভাবিয়ে তুলেছে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে।
সর্বভারতীয় ইংরাজি দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়ার খবরে প্রকাশ, ২ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকা আমদানীর ভুয়ো তথ্য দেখিয়ে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে। কোনওরকম পণ্য আমদানী ছাড়াই বিভিন্ন ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বিদেশী মুদ্রায় অগ্রিম বাবদ এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বিদেশে গিয়েছে। এই ভুয়ো লেনদেন সবচেয়ে বেশি হয়েছে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রকাশিত খবর অনুযায়ী যে সমস্ত পণ্য আমদানী দেখিয়ে অগ্রিম অর্থ পাঠানো হয়েছে আদতে সেই পণ্যগুলি আমদানী করাই হয়নি। গোটা লেনদেনটাই ভুয়ো।
বিদেশে পাচার হওয়া ২.৬ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে ১.৭৯ লক্ষ কোটি টাকা গিয়েছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার মাধ্যমে। এই অর্থ পাঠাতে ৬৫৪ বার লেনদেন করা হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যায় ব্যাঙ্কিং ট্রানজাকশন হলো আর তা কারুর নজরে পড়লো না? না-কি ইচ্ছে করেই বিষয়টি থেকে নজর সরিয়ে রাখা হয়েছিল? ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে বিদেশী লেনদেনের ওপর নজরদারি করে থাকে রিজার্ভব্যাঙ্ক। এই ক্ষেত্রে বিষয়টি কিভাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নজর এড়িয়ে গেল সেই প্রশ্নই উঠছে। স্টেট ব্যাঙ্ক ছাড়াও আরও ৮৫টি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে এই টাকার বাকি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। এই গোটা লেনদেন দুটি আর্থিক বছর ধরে চলেছে অথচ তা কারুর নজরে আসে নি। এই বিষয়টি তদন্তকারী সংস্থাকে ভাবিয়ে তুলেছে। অবশেষে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের সংস্থা সেন্ট্রাল ইকনমিক ইনটেলিজেন্স ব্যুরো, ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইনটেলিজেন্স, এনফরসমেন্ট ডিরেক্টরেট, ইনকাম ট্যাক্স ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একযোগে তদন্তে নেমে জানতে পেরেছে অগ্রিম দেখিয়ে অর্থ ইরান, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে পাঠানো হয়েছে। এই তালিকায় ইরানের নাম থাকায় তদন্তকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পরেছে। কারণ আর্থিক কেলেঙ্কারি ও সন্ত্রাসবাদের ব্যবহৃত অর্থের লেনদেন প্রতিরোধে যে বিশ্বসংস্থা কাজ করে সেই ফাইনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের সন্দেহভুক্তদের তালিকায় ইরানের নাম রয়েছে। তাই সন্ত্রাসবাদী কাজে ব্যবহারের জন্য এই আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা।
দেশের ৩০,০০০ আমদানী কারী সংস্থার নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা যে বেআইনি আর্থিক লেনদেন নজরে এসেছে তা হিমশৈলীর চূড়ামাত্র। সঠিক তদন্ত হলে এই আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, অর্থমন্ত্রক ও ব্যাঙ্কগুলির কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলে সব দোষ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। যদিও একথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার এই বেআইনি অর্থ পাচারের পেছনে এক বড়সড় চক্রের যোগ রয়েছে। সম্প্রতি নীরব মোদি, মেহুল চোক্সিরা এইভাবেই বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। প্রশ্ন উঠছে এবার কাদের নাম সামনে আসবে। তারা ধরা পড়বে, নাকি নীরব মোদিদের মতো আইনের হাত এড়িয়ে বিদেশে পালিয়ে যাবে? এখন প্রশ্ন সেটাই।