গতকাল ২ জানুয়ারি ছিলো ‘National Science Fiction Day’ অর্থাৎ জাতীয় ‘কল্পবিজ্ঞান দিবস’। কল্পবিজ্ঞান মানে কাল্পনিক বিজ্ঞান, এখন পর্যন্ত যা বিজ্ঞানে আবিষ্কার হয়নি, তা কল্পবিজ্ঞানের অংশ হতে পারে। কেউ কেউ একে আজগুবি নিছক বিনোদন ভাবেন। তবে এটা মোটেও ঠিক নয়। আজ থেকে কয়েকশত বছর আগে যা কল্পনা ছিল, তা আজ বাস্তবে সম্ভব। কল্পবিজ্ঞান তাই গল্প হয়েও বিজ্ঞানেরই অংশ। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীগুলি (সংক্ষিপ্ত করে SF বা sci-fi বলা হয়) সাধারণত উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মহাকাশ অনুসন্ধান, সময় ভ্রমণ, সমান্তরাল মহাবিশ্ব এবং বহির্জাগতিক জীবনের মতো কল্পনাপ্রসূত এবং ভবিষ্যত ধারণা নিয়ে কাজ করে।
যেমন ধরুন, মেরি শেলির “ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (Frankenstein)” (১৮১৮) প্রায়ই প্রথম দিকের বিজ্ঞান কল্পকাহিনী উপন্যাসগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়। জুলস ভার্নের “টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি (Twenty Thousand Leagues Under the Sea)” (১৮৭০) এবং এইচজি ওয়েলসের “দ্য টাইম মেশিন (The Time Machine)” (১৮৯৫) কে ক্লাসিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা এই ধারাটি প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল। আজ বরং কল্পবিজ্ঞানের অপ্রতিদ্বন্দী লেখক যাঁর লেখা আজও আবালবৃদ্ধবণিতাদের কল্পণাপ্রবণ মনকে বিজ্ঞানমনষ্ক করে তোলে, সেই ‘জুলস গ্যাব্রিয়েল ভার্ন’ (Jules Gabriel Verne) কে নিয়ে লিখি।
মানুষ চাঁদে পা দেওয়ার একশ বছর পূর্বে যে লেখক মানুষকে অতিকায় কামান দিয়ে গোলার ভিতর বসিয়ে চাঁদের চারপাশ দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, উড়োজাহাজ আবিষ্কারের অর্ধশতাব্দীর আগেই যিনি হেলিকপ্টারের কথা বলেছিলেন, রেডিও আবিষ্কারের বহু আগে যে ব্যক্তি টেলিভিশনের কথা কল্পনা করেছিলেন, সেই কল্পকাহিনীর লেখক জুল ভার্নও কোনো বিজ্ঞানী বা গবেষক ছিলেন না তবু তাঁর বিজ্ঞান নির্ভর কল্পনা বিজ্ঞানের গল্প এক নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছিলো।

আশ্চর্য এই মানুষটি জন্ম হয় ফ্রান্সের পশ্চিমে বিস্কে উপসাগরে এক ব্যস্ততম বন্দর নগর নান্তেস-এ ১৮২৮ সালে। বন্দরে নিত্যদিন জাহাজের আসা-যাওয়ার দৃশ্যই হয়তো তার ভ্রমণকল্পনা মনকে প্রসারিত করেছিল। ১২ বছর বয়সে জাহাজের কেবিনবয় হিসেবে কাজ নিয়ে বাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, এখন থেকে নিজের মনের মধ্যেই তিনি ঘুরে বেড়াবেন।
বাবা ছিলেন আইনজীবী। তার ইচ্ছে ছিল ছেলেও আইন ব্যবসা করে দু-পয়সা আয় করুক। আইননিয়ে পড়াশোনা করতে তাকে পাঠানো হয় প্যারিসে। সেই সময় সাহিত্যের পীঠস্থান ছিলো প্যারিস। এখানে এসেই ভার্ন সাহিত্য সাধনায় একান্ত নিমগ্ন হলেন। আইন পাস করলেও তাঁর আকর্ষণ থাকতো কল্পবিজ্ঞানকে কেন্দ্র করে পাতার পর পাতা লেখার।
ভার্ন তার সাহিত্য জীবনের প্রথম দিকে সহকর্মী ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমাস এবং ভিক্টর হুগোর সাথে বন্ধুত্ব করেছিলেন। ভার্ন ১৮৫৭ সালে অনরিন আন এবে দ্যু ফ্র্যাস্ন দ্য ভিয়ান নামে একজন বিধবাকে বিয়ে করেন এবং তাকে এবং তার দুই সন্তানের ভরণপোষণের জন্য স্টক ব্রোকার হিসেবে কাজ করতে থাকেন। যাইহোক, তার সহধর্মিণী সর্বদা লেখালেখিকে উৎসাহিত করতে থাকেন। দম্পতির একসঙ্গে একটি সন্তান ছিল।
যদিও সেই সময় তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন মোটেও ছিলো না। প্রথম গ্রন্থ “ফাইভ উইক্স ইন আ বেলুন”-এর পান্ডুলিপি নিয়ে শুরু হল প্রকাশকের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরাঘুরি কিন্তু কেউই তার উপর কাহিনী ছাপাতে চাইলেন না একে একে ১৫ জন প্রকাশক ফিরিয়ে দিলেন তার এই পান্ডুলিপি। এই ঘটনা প্রচন্ড অভিমানে পান্ডুলিপিতে পুড়িয়ে ফেলতে চাইলেন, ছুড়ে দিয়েছিলেন আগুনে কিন্তু রক্ষা করলেন তার স্ত্রী। স্বামীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন আর একজন প্রকাশকের কাছে যাবার।
অবশেষে স্ত্রীর পরামর্শেই কাজে লাগল। বইটি ছাপাতে রাজি হলেন ষোড়শতম প্রকাশক পিয়েরে-জুলেস হেটজেলের (pierre jules hetzel)। আর প্রকাশনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো অবিশ্বাস্য রকমের ঘটনা, বছরের বেস্ট সেলার হলো বই। শুরু হল সেটির অন্য ভাষায় অনুবাদ। পুরোনো সবকিছু ছেড়ে শুরু করলেন একান্ত মনে সাহিত্য সাধনা। টাকাও আসতে লাগল অঢেল, কেটে গেল আর্থিক অনটন।
জুল ভার্ন-এর হাতে তখন অনেক টাকা। এবার তিনি চলে গেলেন প্যারিস থেকে আমেরিকায়। সেখানে এসে তৈরি করলেন সুন্দর এবং মজার ডিজাইনের একটি বাড়ি। প্রকাণ্ড সেই বাড়িটিতে ছিল একটি টাওয়ার, সেটি দেখতে অনেকটা নাবিকদের কেবিনের মতো। চিলেকোঠার সেই ঘরটিতে জীবনের শেষ চল্লিশটা বছর কাটিয়েছিলেন লিখে ও পড়ে।
জুল ভার্নের জীবনে সবচাইতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ছিলো ‘আরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন এইটটি ডেজ’। এই লেখাটি তখন প্যারিসের ‘লা টেম্পস্’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকতো। এবং সেই সময় সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বইটির প্রধান চরিত্র বাজি ধরে সত্যি সত্যি আশি দিনে পৃথিবী ঘুরে আসতে পারবে কিনা তা নিয়ে বহু পাঠক ও বাজি ধরেছিল। জুল ভার্ন পাঠকদের এই প্রচণ্ড আগ্রহ ও উত্তেজনা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। নায়ক হাজার বিপদ অতিক্রম করে আশিদিনের মাত্র ৫ মিনিট বাকি থাকতে গন্তব্য স্থলে পৌঁছে যায়।

এরপর মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড, দ্যা মাস্টার অব দ্যা ওয়ার্ল্ড, দ্যা গ্রীণ ফ্ল্যাস, ইটারনাল আড্ম, ক্লীপার ফ্রম দ্যা ক্লাউড্স – এরকম আরোও অসংখ্য কল্পবিজ্ঞানের বিখ্যাত উপন্যাসের পাশাপাশি বেশ কিছু ছোটগল্পও লিখেছেন।
সাবমেরিন আবিষ্কারের ত্রিশ বছর আগেই জুল ভার্নের “টুইন্টি থাউজ্যান্ড লীগ আন্ডার দ্য সী” প্রকাশিত হয় ১৮৭০ সালে। নটিলাস নামের বিদ্যুৎচালিত সাবমেরিনে লেখক পাঠকদের ক্যাপ্টেন নিমোর সাথে সমুদ্রের তলদেশের অপরূপ সুন্দর পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। জুল ভার্নের কল্পনার নটিলাস থেকে অনুপ্রানিত হয়ে সিমন লেক ১৮৯৮ সালে প্রথম সাবমেরিন আবিষ্কার করেন।
জুল ভার্নের শেষ জীবনটা খুব সুখের ছিলনা কারণ বুদ্ধিজীবীরা তাকে অবজ্ঞা করতেন। অথচ তিনি ছিলেন সেই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। সেই সময়ে তাকে ফ্রেঞ্চ একাডেমীর সদস্যও মনোনীত হতে দেননি তারা। তাঁর লেখা ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি’ অপ্রকাশিত অবস্থায় বাক্স বন্দী হয়েই থেকে যায়, তাঁর মৃত্যুর প্রায় একশো বছর পর প্রকাশিত হয় এই উপন্যাস। কাহিনির মজা হল টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরিতে প্যারিসে কি কি হতে পারে তার একটা কল্পনা। সেই সময় লেখাগুলি অবিশ্বাস্য লাগলেও আজকের দিনে সেগুলির বাস্তবের সঙ্গে প্রচুর মিল দেখা যায়।
যদিও ফ্রান্স সাহিত্য অ্যাকাডেমি তাকে “অর্ডার অব মেরিট” সম্মানে ভূষিত করেন। জুল ভার্ন ইংল্যান্ড রয়াল অ্যাকাডেমির সম্মানসূচক সদস্যপদ লাভ করেন।
১৯০৫ সালে বিশ্বের বিস্ময়কর পুরুষ জুল ভার্নের মৃত্যু হয়, আজও তার জনপ্রিয়তায় এতোটুকু ভাঁটা পড়েনি এখনো পর্যন্ত তিনি বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় লেখকদের অন্যতম। আজও তাঁকে “বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর জনক” হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
ছোটবেলায় জুল ভার্ন পড়েই সময় কেটে যেত। এত আনন্দ পেতাম যে কি বলবো। সত্যিই মহান লেখক।
অনেক তথ্য আজ জানলাম। ভালো লেখা। ধন্যবাদ।
খুব খুশি হলাম এত সুন্দর একটা কমেন্ট পেয়ে। থ্যাঙ্ক ইউ।