১৯৮১ সালের আগস্ট মাস, বাংলায় ১৩৮৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাস—বিজ্ঞানের পত্রপত্রিকার ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। মাসিক ‘বিজ্ঞানমেলা’ পত্রিকা প্রথম আত্মপ্রকাশ করল। ইতিপূর্বে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান পত্রিকা হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকা সগৌরবে চলছিল, যা ১৯৪৮ সাল থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নেতৃত্বে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম সম্পাদক ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র মিত্র। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছিল। এছাড়া ছিল পাভলভ ইনস্টিটিউটের ‘মানবমন’ পত্রিকা। ডাক্তার ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ১৯৬১ থেকে যার পথচলা শুরু হয়েছিল। ১৯৮০ সালে ‘মানুষ’ নামে আরেকটি বিজ্ঞান পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯৮১ সালে যেটির নাম পরিবর্তন হয়ে ‘উৎস মানুষ’ হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার ১৯৮১ সাল থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করল বাংলা পত্রপত্রিকার জগতে বিজ্ঞান-পত্রিকার নতুন জাতক ‘বিজ্ঞানমেলা’। তবে এটি ছিল অন্যদের থেকে আলাদা।

‘বিজ্ঞানমেলা’-র প্রথম সংখ্যাটির প্রচ্ছদেই ঘোষণা থাকে— “ছোটদের জন্য বাংলা ভাষায় প্রথম মাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা”। ছোটদের এই বিজ্ঞান পত্রিকা প্রতি ইংরেজি মাসের গোড়ায় প্রকাশ পাবে —এমন বার্তা দেওয়া হয়েছিল পত্রিকার মধ্যেই। পত্রিকা সাজানো হয়েছিল এইভাবে— চিত্রে কল্পকাহিনী, সায়েন্স ফিকশন, জ্ঞান বিজ্ঞান, বিজ্ঞানী প্রভৃতি বিভাগগুলি ছিল। পাশাপাশি রাখা হয় ছড়া, গল্প এবং নিয়মিত বিভাগ। নিয়মিত বিভাগে ছিল— বিজ্ঞানের খবর, জানো কি? শরীর স্বাস্থ্য, মনের জানালা, ছড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল, পড়ুয়ার দপ্তর, ধাঁধা প্রভৃতি। শুরুতে পত্রিকার বিনিময় মূল্য ছিল একটাকা। আর বার্ষিক সডাক গ্রাহক চাঁদা স্থির করা হয়েছিল ১২ টাকা। বিজ্ঞানমেলার প্রথম সম্পাদক (সাম্মানিক) ছিলেন অমিত চক্রবর্তী। সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন সুভাষ সান্যাল, কৃষ্ণা ঘোষাল এবং সুভাষ দাস। বিজ্ঞানমেলার শুরুর দিকে প্রকাশক হিসেবে মৃণালকান্তি সাহার (৮/৫, হিঙ্গন জমাদারলেন, কলকাতা ৭০০ ০৪৬) নাম মুদ্রিত থাকতে দেখা যায়। কয়েকটি সংখ্যা পরেই প্রকাশক হিসেবে অমল ঘোষের নাম দেখা যায়। সম্পাদকীয় দপ্তরেও পাল্টে হয় ২৯/২, বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান মেলায় অনেক পরিবর্তন আসে। পরের কয়েকটি সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে অমিত চক্রবর্তীর সঙ্গে সুভাষ সান্যালের নাম যুক্ত হয়। আরো কিছুটা পরে সম্পাদকের পরিবর্তে সম্পাদকমণ্ডলী হিসেবে একটি টিমের নাম পত্রিকায় মুদ্রিত হয় এবং সেখানে পূর্ববর্তী দুই সম্পাদকের সঙ্গে ডা: ভবানীপ্রসাদ সাহু, ড. নীরদ হাজরা এবং শঙ্কর মণ্ডলের নাম যুক্ত হয়। বিজ্ঞানমেলায় ছোটদের বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার জন্য কলম ধরেছিলেন— প্রেমেন্দ্র মিত্র, হীরেন চট্টোপাধ্যায়, মির্জা নৌশাদ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা ঘোষাল, বিমলেন্দু মিত্র, ঊষাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, গৌরীশংকর ভট্টাচার্য, জীবন ভৌমিক, বিশ্বজিৎ দাস, শংকর চক্রবর্তী প্রমুখরা। তাদের লেখায় বিজ্ঞানমেলার সংখ্যাগুলি সেজে উঠতো। পত্রিকাটি ছোটদের মতো করেই সাজানো হয়েছিল। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ ছিল সবুজ রঙের, সেখানে বড় করে পত্রিকার নাম লেখা এবং একটি বালক-বালিকার মুখমন্ডলের স্কেচ, পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত একটি ফ্লাস্ক এবং একটি ফড়িংয়ের ছবি দিয়ে অলংকরণ করা। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন শুভাপ্রসন্ন ও মনোজ বিশ্বাস। আর পত্রিকার অলংকরণে ছিলেন কল্যাণ চক্রবর্তী।

‘বিজ্ঞানমেলা’ পত্রিকার পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে, সেই থেকে অনেক দুর্গম পথ অতিক্রম করে আজও নিরলস ভাবে বিজ্ঞানমেলা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এই পত্রিকার ৪২তম বর্ষ চলছে। শিশুদের বিজ্ঞান পত্রিকা হিসেবেই বিজ্ঞানমেলার পথ চলা শুরু হয়েছিল, যা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চাকে অন্য মেজাজ দেয়। আলাদা করে সকলের নজর কাড়ে এই পত্রিকা। তবে সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানমেলার চরিত্র অনেকটাই পাল্টেছে। বর্তমানে বিজ্ঞানমেলা দুই মাস অন্তর বার হয়। এটি এখন আর শুধু ছোটদের পত্রিকা নয়, এখানে বিজ্ঞানের বহুবিধ খবর, নতুন আবিষ্কার, পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদন, বিজ্ঞানের নিবন্ধ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানমেলার প্রচ্ছদে লেখাই হয়— ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞান-জনবিজ্ঞান মুখপত্র’। বরিষ্ঠ বিজ্ঞান প্রচারক দীপককুমার দাঁ বর্তমানে দ্বিমাসিক ‘বিজ্ঞানমেলা’ পত্রিকার সম্পাদক। সদ্য প্রকাশিত হল বিজ্ঞানমেলার বিশেষ নতুন সংখ্যাটি। এটি ‘বিজ্ঞানমেলা’-র ৪২তম বর্ষের ৭ম-১০ম বিশেষ সংখ্যা (জুলাই-অক্টোবর ২০২২)। বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা এবারের সংখ্যায় রয়েছে। দ্বিতীয় প্রচ্ছদে রয়েছে প্লাস্টিক সম্পর্কে সচেতনতার বার্তা এবং তৃতীয় প্রচ্ছদে রয়েছে কৃষ্ণনগরের গ্রেস কটেজের পরিবেশমেলার কথা। সোনালী ফসল মুগা রেশম, জোহনারিজম বা বাকচাতুরি— থেকে শুরু করে লুই পাস্তুরের গবেষণা, হীরা কিভাবে তৈরি হয়? বস্তুর চেতনা সঞ্চার, সংকটাপন্ন ভারতের গবেষণা ব্যবস্থা, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান প্রচারে কর্মশালা— এসব কিছুই পাওয়া যাবে জনপ্রিয় বাংলা বিজ্ঞান পত্রিকা ‘বিজ্ঞানমেলা’-র নতুন সংখ্যায়। বিজ্ঞানমেলা বর্তমানে প্রকাশ পাচ্ছে মুক্ত স্বরস্বত জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র গোবরডাঙা গবেষণা পরিষৎ (খাঁটুরা, উত্তর ২৪ পরগনা) থেকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেঘনাদ পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞান সংগঠন ‘দ্য সায়েন্স এসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল’ হল বিজ্ঞানমেলা পত্রিকার প্রকাশক। আর সহযোগিতায় রয়েছে ‘মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি’। বর্তমানে বিজ্ঞানমেলার ৪২তম বর্ষ প্রায় সমাপ্তির পথে— আর সাতটি বছর অতিক্রম করলেই এর সুবর্ণজয়ন্তী। পাঠক লেখকদের সাহচর্যে এভাবেই এগিয়ে চলুক ‘বিজ্ঞানমেলা’।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, বিজ্ঞানমেলা।
ধন্যবাদ।
সকলে পড়ে জানাবেন কেমন লাগলো।
Khub valo laglo pore….onek kichu janlam….
তাই! ভালো লাগলো।
Aii pottrika aj o oneke poren. Kintu er history oneker kacheii ojana chilo Amar kacheo… Dhonnobad ato sundor lekha lekhar jonno.. ????????
ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য।
আমি মাঝেমধ্যেই পত্রিকাটির সঙ্গে একটু চর্চা রাখি। স্যার আপনার লেখাটি খুব ভালো হয়েছে। পড়ে খুব ভালো লাগলো। ????????
অনেক ধন্যবাদ প্রদীপ্ত।