“পড়ে বিজ্ঞান শেখা যায় না।” — বিজ্ঞান শিক্ষা সম্পর্কে এমন মন্তব্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মতো একজন সংবেদনশীল শিক্ষকের কাছেই আশা করা যায়। সত্যিই তো বিজ্ঞান কখনও বই পড়ে শেখা যায় না। তাকে চাক্ষুষ করতে হয়। নির্ভর করতে হয় প্রমাণের উপর। হতে হয় যুক্তিগ্রাহ্য। বিজ্ঞান শিক্ষার উপযুক্ত স্থান তাই ল্যাবরেটরি। শিক্ষক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর পছন্দের ঘর। সাধনার মন্দির। তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান পড়াতেন ক্লাস রুমে নয় ল্যাবরেটরীতে। একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের চিন্তাচেতনা যে কতটা আধুনিক ও উন্নত ছিল তা সহজেই বোঝা যায়।
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী শুধুমাত্র দায়সারা শিক্ষক ছিলেন না। ছিলেন ছাত্র দরদী। তার শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। তাই তিনি বরাবরই বাস্তবের মাটি থেকে উদাহরণ সংগ্রহ করতেন। সহজ সরলভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করতেন। যেমন ল্যামার্কের বিবর্তন তত্ত্বটি কত সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। — “হাতুড়ি পিটিয়া কামারের লাঙ্গল ও লাঙ্গল ধরিয়া চাষার হাতের পেশিগুলা মোটা ও ও শক্ত হয় এবং কামারের ছেলে। ও চাষার ছেলে এই পেশির সবলতা উত্তরাধিকার সূত্রেই প্রাপ্ত হয়।” (মৃত্যু : প্রকৃতি)
আবার, বুধ গ্রহের এপি সাইকেল বোঝাতে গিয়ে তিনি বলছেন — “একখানা বড় চাকা পৃথিবীকে কেন্দ্রে রাখিয়া, তিনশো পঁয়ষট্টি দিনে ঘুরিতেছে। আর একখানা ছোট চাকা এই বড় চাকারই পরিধিস্থিত একটি বিন্দুকে কেন্দ্রগত করিয়া স্বতন্ত্রভাবে আটাশি দিনে অপেক্ষাকৃত দ্রুত বেগে ঘুরিতেছে।” (প্রাচীন জ্যোতিষ : প্রকৃতি)।
কত অভিনব ছিল তার বিজ্ঞান শেখানোর পদ্ধতি। নব নব পন্থা আবিষ্কার করে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেন। দূর করার চেষ্টা করতেন বিজ্ঞানের প্রতি অহেতুক ভীতি। বিজ্ঞান সাধনার মধ্যে একটা আনন্দ রয়েছে। যুক্তি দিয়ে বিষয়টিকে বুঝবার পর মন এক আশ্চর্য মাদকতায় ভরে ওঠে। এ প্রসঙ্গে তার একটি মন্তব্য বিশেষভাবে স্মতব্য — “রামেন্দ্রসুন্দরের নিজের কথায়, “মাদক দ্রব্যের একটা সাধারণ লক্ষণ এই যে, অপরকে না বিলাইলে আনন্দের পূর্ণতা হয় না। বিজ্ঞানামোদীও অপরকে আপনার আনন্দের ভাগ দিতে চান”। (জগদানন্দ রায়ের ‘প্রকৃতি পরিচয়” বইয়ের ভূমিকা)
বিজ্ঞানের এই মাদকতা তখনই সার্থক হবে যখন মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শেখানো হবে। এই বিষয়টি তিনি অনুধাবন করেছিলেন। তাই তিনি বরাবরই মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শেখানোর পক্ষপাতী ছিলেন।
তিনি ক্লাসে বাংলাতে বিজ্ঞান পড়তেন। স্বাভাবিকভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা আলাদা তৈরি হয়। “অল্পদিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র রামেন্দ্রসুন্দর যশস্বী অধ্যাপক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেন। তাঁর অধ্যাপনার খ্যাতি ছাত্রদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানের প্রতি ছাত্রদের কৌতূহল উদ্রিক্ত করতেন তিনি।” (পথিকৃৎ রামেন্দ্রসুন্দর : ড. বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পৃঃ ১৪-১৫)
মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা এবং বক্তৃতার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তার একটা বিষয়ে মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল। তখনকার দিনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে বক্তব্য করতে হত। কিন্তু তিনি বাংলাতেই বক্তৃতা দেবেন। তাকে বহুবার অনুরোধ করা হয়েছিল কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ। তাকে বাংলাতে বক্তৃতা দেবার জন্য অনুমতি প্রদান করা হল।
রামেন্দ্রসুন্দর আজীবন যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। যে কোনো বিষয়ে তিনি যুক্তির আতস কাঁচে রেখে তবেই তা বিশ্বাস করতেন। ছাত্র-ছাত্রীদেরও তিনি ওই একই কথা শেখাতেন। ধর্ম সম্বন্ধেও তার ওই একই ভাবনা ছিল।
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সাহিত্য সাধক চরিতমালা’ গ্রন্থে বলেছেন — “ধর্মসম্বন্ধে রামেন্দ্রসুন্দর অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী ছিলেন না। ধর্ম্মের প্রমাণ বা সিদ্ধান্তগুলিকে তিনি কখন বিনা বিচারে গ্রহণ করিতেন না। তাঁহার বিচারশক্তি পক্ষপাতদুষ্টু ছিল না, তাঁহার সৃষ্ট সাহিত্য তাহার যথেষ্ট পরিচয় দেয়।”
বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় সমস্যা হল পরিভাষা। রাজশেখর বসু তার ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ নামক প্রবন্ধে এই সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর চিন্তাভাবনা ছিল একটু আলাদা। তিনি চেয়েছিলেন প্রত্যেকটি শব্দকে একটি নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করতে হবে। কারণ শব্দটির যদি দ্বিতীয় অর্থ থেকে থাকে তবে তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। অন্য অর্থে প্রযুক্ত হতে পারে। তাই তিনি এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছেন — “প্রত্যেকটি শব্দ একটি নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করিবে। সেই শব্দটি আর দ্বিতীয় অর্থে প্রয়োগ করিবে না। (বৈজ্ঞানিক পরিভাষা শব্দ কথা)
বাল্যকাল থেকেই রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর ইতিহাসের উপর একটা ঝোঁক ছিল। তিনি আজীবন বিজ্ঞানের ইতিহাসের উপর কাজ করে গেছেন। সৌরজগতের ইতিহাস বিবর্তন, পৃথিবীর বয়স তত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, গ্রহ-নক্ষত্র নক্ষত্রের গতি, উপগ্রহ, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
একটা অভিযোগ প্রায় শোনা যায়, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের ভাষা জটিল ও নীরস হয়ে থাকে। কিন্তু রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রবন্ধ এই দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি হালকা রসের সঞ্চারে অনেক জটিলতত্ত্বকে পাঠকের সামনে সহজভাবে পরিবেশন করেছেন। হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের স্থূলমর্ম’ বইটি সম্পাদনা প্রসঙ্গে ত্রিবেদী যদিও বলেছিলেন, “বাঙ্গালা ভাষা এখনও বিজ্ঞান প্রচারের উপযোগী হয় নাই। বিজ্ঞানের বাঙ্গালা এখনও গড়িয়া তুলিতে হইবে। ভাষার অভাবে এখনও বিজ্ঞানের গ্রন্থ লিখিতে কেহ সাহস করে না। লিখিলেই রচনা অপাঠ্য অবোধ্য হইয়া উঠে।”
মানুষ প্রকৃতির কাছে ঋণী। অথচ সেই মানুষই কিভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। সামরিক সুখের জন্য বৃহত্তর বিপদকে আহ্বান করছে। এ বিষয়ে তিনি ‘প্রকৃতি পূজা’ প্রবন্ধে বলেছেন —
“মানুষ মানুষের সহিত যুঝিয়া আসিতেছে ও মানুষ প্রকৃতির সহিত বুঝিয়া আসিতেছে। অতি পুরাকাল হইতে এই সংগ্রামের আরম্ভ হইয়াছে; অদ্যাপি এই সংগ্রামের পর্যবসান হয় নাই। এই সংগ্রামের পর্যবসান হইবে, তাহা বলা যায় না।” (প্রকৃাত-পূজা)
আসলে রামেন্দ্রসুন্দরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানকে সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। অযথা পাণ্ডিত্য বা জ্ঞানের ভান না করে কত সহজে সকলের মনে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় — এটাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। আর বিজ্ঞান শিক্ষক হিসাবে তিনি বরাবরই এই কাজ করে গেছেন। এ বিষয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যতটা সম্ভব সহজে বিজ্ঞানকে ব্যক্ত করা যায় তিনি সেই চেষ্টায় করে গেছেন আজীবন। সাহিত্যিকরা যেমন জীবন থেকে রস আস্বাদন করেন রামেন্দ্রসুন্দর তেমনি বিজ্ঞান থেকে রস আহরণ করেছেন এবং বিলিয়ে দিতে চেয়েছেন সর্বসাধারণের মধ্যে। তাঁর সম্পর্কে বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মন্তব্য দিয়ে শেষ করা যাক — “খুব কম প্রবন্ধ পড়ি যাতে গভীর সংস্কার মুক্ত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মৌলিক চিন্তার সাক্ষ্য দেয়।” (আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী জ্ঞান ও বিজ্ঞান আগস্ট ১৯৪৬)
ঋণ স্বীকার :
১. সাহিত্য সাধক চরিতমালা- ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,
২. আচার্য্য রামেন্দ্রসুন্দর : নলিনীরঞ্জন পণ্ডিত (সম্পাদিত),
৩. পথিকৃৎ রামেন্দ্রসুন্দর- ডঃ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
৪. রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রবন্ধসমূহ
৫ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাহিত্য ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীঃ শতবর্ষ পরে ফিরে দেখা : গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়।
৬. আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী জ্ঞান ও বিজ্ঞান আগস্ট ১৯৪৬) : বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু
শৌনক ঠাকুর, সহশিক্ষক ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।