স্যার আইজ্যাক নিউটন, বিজ্ঞান জগতে এক অবিনশ্বর নাম। নিউটন ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রাকৃতিক দার্শনিক এবং ঐতিহাসিক। বিজ্ঞানের জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বহু অবদান তিনি রেখে গেছেন।
বিস্ময়কর মেধার অধিকারী বিজ্ঞানীটির অসম্ভব ঝোঁক ছিল ইতিহাসের প্রতি। অথচ ইতিহাস নিয়ে তার নেশা ও গবেষণার কথা মানুষ জানতে পেরেছে নিউটনের মৃত্যুর প্রায় এক বছর পরে।
তাঁর লেখা ‘দি ক্রোনোলজি অফ এনসিয়েন্ট কিংডমস অ্যামেনন্ডেড’ (The Chronology of Ancient Kingdoms Amended) এক ঐতিহাসিক কালপঞ্জির একটি কাজ, যা ১৭২৮ সালে অর্থাৎ তার মৃত্যুর এক বছর পরে প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে এটি পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। কাজটি প্রায় ৮৭,০০০ শব্দ, কালানুক্রমের বিষয়ে নিউটনের একটি প্রয়াসের প্রতিনিধিত্ব করে, যা পুরাকাল জুড়ে বিভিন্ন প্রাচীন রাজ্যের উত্থান এবং ইতিহাসের বিবরণ দেয়।
এই বই প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর খুব অল্প সংখ্যায় ছাপা হয় পরে পেপার ব্যাক বই হিসেবে এটির অনেক সংখ্যা ছাপানো হয়।
গ্রন্থটি আটটি প্রাথমিক বিভাগ নিয়ে গঠিত। বইটিতে প্রথমে নিউটনের ভাইঝির স্বামী জন কনডুইট এমপির দ্বারা ইংল্যান্ডের রানী অ্যানসবাকের ক্যারোলিনের কাছে একটি পরিচিতিমূলক চিঠি, তারপরে একটি ছোট বিজ্ঞাপন। এর পরে “একটি সংক্ষিপ্ত ক্রনিকল” শিরোনামের একটি বিভাগ পাওয়া যায়, যা কালানুক্রমিক ক্রমে তালিকাভুক্ত ঘটনাগুলির একটি সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক তালিকা হিসাবে কাজ করে। এখানে ১১২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রথম তালিকাভুক্ত তারিখ থেকে শুরু করে ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার কালানুক্রমিক তালিকা রয়েছে। গ্রন্থটির বেশিরভাগ অংশ অবশ্য ছয়টি অধ্যায়ের আকারে রয়েছে যা নির্দিষ্ট সভ্যতার ইতিহাস অন্বেষণ করে। এই অধ্যায়ের শিরোনাম:

চ্যাপ. I. গ্রীকদের প্রথম যুগের কালপঞ্জি।
চ্যাপ. II. মিশর সাম্রাজ্যের ইতিহাস।
চ্যাপ. III. অ্যাসিরিয়ান সাম্রাজ্যের প্রসঙ্গ ।
চ্যাপ. IV ব্যাবিলনীয় এবং মেডিসের দুটি সমসাময়িক সাম্রাজ্যের মধ্যের ঘটনা ।
চ্যাপ. V. সলোমনের মন্দিরের বর্ণনা ।
চ্যাপ. VI. পারস্য সাম্রাজ্যের বিবরণ ।
জন কনডুইটের পরিচিতি পত্র অনুসারে, ‘দ্য ক্রোনোলজি অফ অ্যানসিয়েন্ট কিংডম অ্যামেন্ডেড’ ছিল আইজ্যাক নিউটনের মৃত্যুর আগে ব্যক্তিগতভাবে সংশোধিত সর্বশেষ কাজ যা আসলে অনেক আগে লেখা হয়েছিল। এর কিছু বিষয়বস্তু এবং বিষয়বস্তু অনেক লোককে এই কাজটিকে আইজ্যাক নিউটনের জাদুবিদ্যার বা রহস্যপূর্ণ অতীত প্রাকৃতিক বিষয়ে উৎসাহের উদাহরণ হিসাবে একটি অধ্যয়ন হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করতে পরিচালিত করেছে। বইটির প্রকাশক হলেন জে. টনসন, জে. অসবর্ন এবং টি. লংম্যান।
বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ, পৌরাণিক গ্রন্থ, প্রাচীন ঐতিহাসিক পুঁথি ও তথ্য এবং তার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গণনা সমন্বয়ে তৈরি নিউটনেরই অভিনব ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও কালানুক্রম বিশিষ্ট ঘটনাগুলি অনেক ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানীরা মেনে নিতে পারেননি। শুরু হয়েছিলো প্রবল সমালোচনা। ইতিহাসে যে ঘটনার বিবরণের সময় বলা আছে খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর, নিউটনের হিসাব অনুযায়ী তার সমকাল হবে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ বছর অর্থাৎ মিশরীয় সভ্যতার সময়কালকে নিউটন এগিয়ে এনেছেন প্রায় হাজার বছর।
বইয়ের চ্যাপ. V. এ সলোমনের মন্দিরের বর্ণনা পড়তে গিয়ে বোঝা যায়, সলোমনের মন্দিরের ব্যাপারে নিউটনের আলাদা কৌতূহল এবং এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এই মন্দির নিয়ে পড়াশোনা এবং গবেষণার কাজ কর্ম চালান।
বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাজা সলোমন ছিলেন বায়ুর শাসক অর্থাৎ তিনি কিনা বায়ু কন্ট্রোল করতে পারতেন। বাতাসের মাধ্যমে তিনি নিজের সিংহাসন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারতেন।
শোনা যায়, একদিন রাতে যখন রাজা সলোমন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন তিনি এক স্বপ্ন দেখেন। যেখানে স্বয়ং স্রষ্টা তাকে একটি মন্দির বা উপাসনালয় বানাতে নির্দেশ দেন। এমনকি মন্দিরটি ঠিক কেমন দেখতে সেই বিষয়েও ধারনা দেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে চিন্তিত রাজা বিষন্ন চেহারা নিয়ে বিশ্বস্ত সেবক এবং রাজ্যের প্রধান আর্কিটেক্ট হিরাম আবিফের কাছে যান। রাজা তাকে স্বপ্নের কথা খুলে বলেন এবং জিজ্ঞেস করেন এমন কিছু আদৌ বানানো সম্ভব কিনা?
স্বপ্নের মত দেখতে মন্দিরে নকশা যে খুব জটিল তাও নয়, তবে সেটি ভাবার জন্য হিরাম প্রতিদিন উপাসনালায় বসে প্রার্থনা করতে থাকেন। একদিন তিনি চোখের সামনে মন্দিরে দালান দেখতে পান কোথাও যেন স্রষ্টা তাকে গোপন নকশাটি এঁকে দিয়ে যান। ডিজাইন দেখে সালমান ভাবেন আরে এ তো সেই মন্দির যা তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন। ঠিক হলো, মন্দিরের ডিজাইন সকলের থেকে লুকিয়ে স্রষ্টার ইচ্ছা পূরণ করতে হিরাম ও সলোমন একসাথে কাজ করবেন।
কাজ শুরু হলো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানান মুল্যবান নির্মান সামগ্রী নিয়ে এসে মন্দিরের মুল কাঠামো তৈরি করা শুরু হলো।একটা দেখার মত জিনিষ হতে লাগলো। কিন্তু কিছু মানুষের কুদৃষ্টি পড়লো হিরামের উপরে।মন্দিরের ডিজাইনের হাতানোর লোভে দু তিনজন সহকারী অসাধু শ্রমিক পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে হিরামকে খুন করে দেয় কিন্তু এত কষ্ট সহ্য করেও তিনি রাজার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।

যদিও গল্পে নানা টুইস্ট শোনা যায়। তবে নিউটন বিশ্বাস করতেন রাজা সলোমান এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মন্দিরের নকশা তৈরি করেছিলেন। তিনি মনে করেতেন মন্দিরের এমন ডিজাইন শুধুমাত্র জ্যামিতিক গণিতের নকশার মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। এই মন্দিরের হিব্রু ইতিহাসের কালানুক্রম থাকার কথা ও নিউটন লিখেছেন। তার মৃত্যুর পরে সলোমানের এই মন্দির নিয়ে লেখা একটি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে সেই পান্ডুলিপিতে তিনি মন্দিরের কথা এবং সেখানকার আচার অনুষ্ঠানে বিষয় আলোচনা করার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের পুনঃনির্মাণের স্থাপত্য পরিকল্পনারও এক সনদ পেশ করেন।
তাঁর অধ্যয়ন ১৬৭০-এর দশকের শেষভাগে শুরু হয়েছিল এবং ১৭২৭ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। রোমান তাত্ত্বিক ভিট্রুভিয়াস দ্বারা নির্ধারিত স্থাপত্য এবং স্থাপত্যের নিয়ম সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট জ্ঞান ছিল। তিনি বাইবেলের উৎস থেকে, পান্ডুলিপি Babson Ms 434-এ মন্দির পুনর্নির্মাণ করেন, প্রধানত ইজেকিয়েল বইয়ের পাঠ্য, গণিত, প্রাচীন উৎস, মন্দিরের সমসাময়িক পুনর্গঠন এবং স্থাপত্য তত্ত্ব ব্যবহার করে তার পুনর্গঠনের ন্যায্যতা প্রমাণ করেন। মন্দিরের বর্ণনার সঙ্গে ছয়টি নকশাও আছে।
নিউটন পান্ডুলিপির নামকরণ করেছিলেন ‘ধর্ম ও প্রবক্তাদের অভিধানের মুখবন্ধ’ এবং দ্বিতীয় খন্ডের নাম দিয়েছিলেন ‘ইহুদি মন্দির ব্যাবসন এমএস ০৪২৪ এর বাহ্যরূপের সম্বন্ধে।’
তার এই কাজ সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দী স্থাপত্যবিদ্যার পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে প্রশংসাও কুড়িয়েছিলো এবং প্রযুক্তিবিদদেরও বিস্মিত করেছিলো। বিশ্ব বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর ইতিহাসের প্রতি এমন আবেগ ও ঐতিহাসিক সত্য অনুসন্ধানে নিরলস প্রচেষ্টা সকল ইতিহাস প্রেমীদের কাছে ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন। বিজ্ঞানের অগুন্তি আবিষ্কারের পাশাপাশি ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ও নেশার ফলাফল ও সমাজের প্রতি তার এই অবদান পৃথিবীর ইতিহাসে অতি বিরল ঘটনা। গতকাল ছিল তার প্রয়াণ দিবস (৩১ মার্চ)।
বিজ্ঞানী নিউটনকে তো আমরা সবাই জানি, আজ জানলাম ঐতিহাসিক নিউটন ও তাঁর অবদানের কথা।
আমি একটি নতুন তথ্যের সন্ধান পেলাম। খুব সুন্দর লেগেছে। ধন্যবাদ জানাই এই তথ্য পরিবেশন করার জন্য।
খুব খুশি হলাম মতামত পেয়ে।
খুব সুন্দর প্রতিবেদন,,,, ধন্যবাদ জানাই লেখিকাকে????????????????????????