মধুর আলস্যে ভেঙে ভেঙে লেখা হয় মানুষের গান, মানুষ জানে না কেন মানুষীর গর্ভের ভিতরে রক্ত-ফুল ফোটে — বেড়ে ওঠে আমাদের প্রকৃত সন্তান। কবি বিশ্বাস করেন যীশু জন্মাবেন, খুকিকে বলেন, “আয় খুকি তাড়াতাড়ি — আমরাও/ পর্বতশিখরে গিয়ে গান গেয়ে উঠি।”তাই বোধহয় বিষণ্ণতার সঙ্গে কোনোদিন বেড়াতে যাবেন না তিনি। তিনি জানেন শব্দ এই পৃথিবীর প্রকৃত পরমহংস, শব্দ এই পৃথিবীর রক্ত,মাংস,হাড়। ‘শব্দ: ২’কবিতায় কবি লেখেন —
“তুমি শব্দ, ঝরনা তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি —
তুমি
নাভির সুঘ্রাণ, তুমি নারী
তুমি চির-অন্তঃসত্ত্বা — পৃথিবীতে তোমার ঘুম নেই”
এই কবিই কৃষ্ণনগর জেল থেকে মা-কে লেখেন,”স্বপ্নে আমার দু’চোখ যেন মুড়িয়ে দিও না।”
“অরুণ বসুর ষড়ৈশ্বর্য পর্যায়ের কবিতাগুলি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি অবদান। অভিনব সংযোজন। ষড়ৈশ্বর্য-পর্যায়ের কবিতাগুলির রূপগত ও ভাবগত সম্পদ আমাদের পরম-প্রাপ্তি। ষড়ৈশ্বর্য শব্দের অর্থ — প্রভুত্ব,পরাক্রম, যশ, সম্পদ, জ্ঞান, বৈরাগ্য।এই কবিতাগুলির ভাবগত ঐশ্বর্য চমৎকৃত করে। আঙ্গিকের বাঁধনে অনুভূতি ও ভাবের প্রকাশকে নিশ্ছিদ্র, অতি পরিমিত, প্রগাঢ় করেছে। আঙ্গিকটি অভিনব কারণ — কারণ এ-রকম অঙ্গ-রূপ বাংলা কবিতায় আগে দেখা যায়নি। দুটি পংক্তিতে একটি স্তবক তিনটি স্তবক এর কবিতার একটি স্তবক এবং এমন ছ’টি পর্ব বা অংশে একেকটি ষড়ৈশ্বর্য। প্রতি পর্বে ভিন্ন নাম।যেন ছ’টি টুকরো কবিতা দিয়ে গাঁথা একটি ষড়ৈশ্বর্য কবিতা। ষড়ৈশ্বর্যের জন্যই কবি বাংলা কবিতার আগ্রহী পাঠকের কাছে স্মরণীয় হ’য়ে থাকবেন। এই কবিতাগুলিতে ছন্দের পরিমিতির সঙ্গে শব্দের আভিজাত্য ও ঔরস,ধ্যান ও মনন এক অনুকরণীয় ভঙ্গিমায় মিশ্রিত হ’য়ে এক একটি স্থাপত্য নির্মাণ করেছে। অরুণ বসু কাম, মোহ ও বৈরাগ্যের কবি। তন্ত্রের প্রভাব তাঁর কবিতায় কখনো কখনো নতুন মাত্রা এনে দেয়।” — এই কথাগুলি লেখা ছিল কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’র চতুর্থ কভারের ব্লার্বে। এই পর্যায়ের একটি কবিতা সম্পূর্ণ তুলে ধরলাম —

সংঘট্ট (ষষ্ঠ উল্লাস)
১. বিশ্বরূপ, ভুবনমোহিনী
মায়ায়, প্রজ্ঞানে, মন্ত্রে জন্মভূমি আমার স্বদেশ/ পটের আলেখ্য যেন ছুঁয়ে আছে শিল্প ও সংশ্লেষ
এ-ভাবে সংশ্লেষে আসে, আঁশে মিশে আছে এ- মাটির ছাঁদ/
মানুষ অবাক-চোখে দ্যাখে এমনই নিখাদ
ধরিত্রী-উজাড়-করা বিশ্বরূপ, ভুবনমোহিনী/
এত মায়া,প্রজ্ঞা,শিল্প আমি পূর্বে কখনো দেখিনি
২. অয়ি অগ্নি
অথবা ছুঁয়েছি অগ্নি, অয়ি অগ্নি, পূর্বআরোপিতা/ তুমি দূর করো সব দুরত্যয়, উন্মার্গগামিতা
জানি রূপকথা নও, কল্পনার লবণ, জলধি/
ছুঁয়েছে রত্নের সপ্ত সমুদ্রের মধ্যে তেরো নদী
দীর্ঘ, কিন্তু তত দীর্ঘ না-হ’লেও পূর্ণ-মহিমায়/ সঙ্গমে স্নানার্থী হ’য়ে ফিরে গেছো সাগর বেলায়
৩. অন্ধকারে, অশ্বত্থের ডালে
আর ক্ষীণ করোতোয়া খরজল, রৌদ্র তার মাতা/ ওই রৌদ্রে সৌরছায়া, ওই জলে আছেন বিধাতা
ধ্যানী শুধু ব’সে থাকে, অন্ধকারে, অশ্বত্থের ডালে/ সূর্য তাকে দীপ্তি দ্যায়, চন্দ্র তাঁর খেলা করে ভালে
এ-ভাবে ঋজুতা-নম্র,দ্বিজত্বের অলৌকিক লোভ/ যেমন কেতনে আছে চেতনার একটি সংক্ষোভ
৪. স্বাদুগন্ধ, জাদুকরী-জল
সংক্ষোভে; ত্রিকাল ঝুলে ঝুলে আছো, ভূলোকে অয়ি ভূ/
আমিও তোমাকে জানি, বা না-জেনে ছুঁয়েছি চিবুক/
চিবুকে স্বর্গীয় আভা, স্বর্ণশীর্ষ উন্মাদের ছোটো/ খুব মিষ্টি গাথা, গান আর প্রাণভোমরার কোটো/
উড়ে যায় অনির্দেশ যাত্রার ভিতরে শতদল/
আমি পান করি তাঁর স্বাদুগন্ধ, জাদুকরী জল/
৫. মহাকাল শঙ্খধ্বনি
অনেক জাতীয় পক্ষী, ছিলে ধন্দে,বিষধর তনু/ দেখেছি সংহিতা থেকে ঝ’রে পড়ে ন্যূনতম মনু
শূন্যে, স্মৃতি-প্রলয়ের সচকিত পিপাসার দূর/
উড়ে যায় বেলাভূমি, অরণ্যের সমস্ত ময়ূর
মনু ও ময়ূর আর সুমধুর মানুষের মন/
মহাকাল শঙ্খধ্বনি, বেজে ওঠে ওরা তিনজন
৬. মধুবৃষ্টি, ঝড়
যেন ওরা তিনজন ত্রিভুবন জ’য় করে সবে/ পৃথিবীর ভরকেন্দ্রে জেগে উঠে সহসা নীরবে
দেখেছে মূর্তির নিচে অজস্র বিমুর্ত কাঠ-খড়/ অলৌকিকতার মেঘে ঝ’রে পড়ে মধুবৃষ্টি, ঝড়
সেই ঝড়ে, মনে পড়ে, আমাদেরও রয়েছে সম্মতি/ এ-শরীর বড়ো প্রিয়, এই দেহে জাগে পঞ্চসতী।
“যে কথাটি অকপটে জানাতে চাই তা হ’লো বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা তেমন না-থাকলেও, সত্য এই: যে কোনো নিস্তরঙ্গ প্রবহমান ঢেউ নদীমুখকে জীবন্ত ও প্রোজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে — যাতে ম’জে, শুকিয়ে নদীমুখ বন্ধ হ’য়ে না যায়, নদীতে না চর জেগে ওঠে। তাই, অনন্ত প্রবহমানতার মধ্যে তেমন একটি অতি সামান্য, নিস্তরঙ্গ ঢেউ নদীর কাছে আমিও রেখে গেলাম এই কারণে, যাতে ভবিষ্যৎ-প্রজন্মের ভরা কোটাল বাধাপ্রাপ্ত না-হয়। সহজেই তোলপাড় ক’রে মোহনায় পৌঁছে যেতে পারে।
এ-বিষয়ে, আমি, বলাবাহুল্য, একশো ভাগই আশাবাদী।”
যে শব্দ-তরঙ্গ তিনি আমাদের মনের ভিতর বইয়ে দিয়েছিলেন, সেই তরঙ্গে আজও আমরা ভেসে চলেছি। ব্যক্তিগতভাবে মানুষটিকে দেখেছি, কথা বলেছি। শান্ত-সৌম্য এক কবিতার ভাস্কর্য তিনি। তাঁর মতো আমিও তো আজ “পৃথিবীর চিররূপ চিরন্তনতার/ কাছে গিয়ে দেখি আলো ও আঁধার/ ফুটে আছে রমণীর শরীর, পল্লব/ ফুটেছে কিংশুক, ….” দেখতে পাই পাখি সব করে রব, যেরকম গোপন বাগানে নিদ্রামগ্ন এ-পৃথিবী,পদ্মপত্রে ধ্যানে। গৌতম মন্ডল সম্পাদিত ‘আদম’ পত্রিকার জুলাই ২০০৯ সংখ্যায় অরুণ বসুর তিনটি কবিতা ছিল। ‘আনন্দ ভৈরবী’, ‘কাক ও সুষুম্নাগ্রন্থি’, ‘বিমূর্ত মাদল’। কবিতাগুলির ভাষা, ছন্দ যেন এক স্থাপত্যশিল্প, শব্দের অপূর্ব বুনন। ইতিহাস, পুরাণ, তন্ত্রসাধনা তাঁর কবিতায় মিলেমিশে একাকার। বাংলা কবিতায় অরুণ বসু যেসব শব্দ ব্যবহার করেন তা আমাদেরকে বারবার দাঁড় করায় এক ‘নৈসর্গিক রেণুর ভিতরে’।
‘আদম’ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সংখ্যায় অরুণ বসুর একগুচ্ছ কবিতা দাগ কাটে হৃদয়ে। ‘সঙ্গম ও চন্দ্রধ্বনি বিষয়ক নীলিমা’, ‘বন্দেমাতরম’, ‘সিঁড়ি’, ‘শুধু সাদা বক’, ‘প্রজ্ঞান’, ‘মায়ের আকাশ’ প্রভৃতি কবিতা তরুণ প্রজন্মকে আবহমান বাংলা কবিতার পথে নিয়ে চলে।

“স্বর্গ,নিসর্গের ঠিক মাঝখানে স্নেহচ্ছায়া — মায়ের আকাশ
খন্ডদৃশ্যে যেরকম মাটি জল মৃগশিশু, ভেসে যাচ্ছে বিমূর্ত বাতাস
মা যেন আমূলছবি, এই পৃথিবীর — –
দৃশ্যান্তরে জন্মান্তর, ঘাস।”
(মায়ের আকাশ)
আবার ২০১১ সালের নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত চারটি কবিতার শিরোনাম ছিল — ‘রাবণ’, ‘শিল্পী’, মোহিনী-মার্জার, ‘ধারা শ্রাবণের বেদনা’। রাবণকে নিয়ে একেবারেই অন্যরকমের ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘রাবণ’ কবিতায় —
“পাখির মতন ওই শাদামেঘ ভেসে যাচ্ছে দূরে
গরুড় কি জেনেছিল —
বিরচিত মহাকাব্যে তোমাকেই প্রয়োজন খুব
সমূহ বিনাশ এত দ্রুত ও কৌলিন্য ভেসে যায়!
বাল্মীকির অনুধ্যানে রত্নাকরও এভাবে সুদূরপরাহত
স্বর্গের সিঁড়ি জানি রচিত হয়নি, তবু
ভিখারি রাঘবে নয়,
বীরগাথা তোমাকেই শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে।”
‘আদম’ পত্রিকার অন্য একটি সংখ্যায় (অক্টোবর ২০১৩) তিনটি কবিতা লিখেছিলেন অরুণ বসু — ‘মীরা’, ‘অপরূপ দেবীমুখ’, ‘গমের আদল ভাঙা আদিম শিকড়’। সেসব কবিতা কবির এক মগ্ন উচ্চারণ — আচ্ছন্ন করে আমাদের।
“স্মৃতির, বনবীথির মতো মাংসে, হতচকিত নভোমণ্ডলে
হ্রেষাধ্বনির মধ্যে রণরনির মদিরা —
এই তনু-মন গানে ভুবন ছুঁয়ে রয়েছেন মীরা।”
‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের পরে আরেকটি কাব্যপুস্তিকা প্রকাশিত হয় ‘চ্যুত চতুর্দশী’ নামে। এতে মোট কুড়িটি চতুর্দশপদী কবিতা আছে। এই কাব্যপুস্তিকা ছাড়াও ‘চ্যূত চতুর্দশী’ নামে আরো অনেকগুলি কবিতা বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে তিনি লেখেন। আসলে ৫৫টি চতুর্দশপদী কবিতার একটা সিরিজ লেখার মধ্যে দিয়ে চতুর্দশপদী কবিতায় দীর্ঘ সময় তিনি মগ্ন ছিলেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থের একটি অংশে ‘চতুর্দশপদী’ শিরোনামে তাঁর অনেকগুলি কবিতা অন্তর্ভুক্ত আছে। ‘শীত সন্ধ্যার সনেট’, ‘ন হন্যতে’, ‘মেঘপত্রলিপি’, ‘বোধ’, ‘প্রত্নগাথা’ প্রকৃতি কবিতায় সনেটের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য যেমন চোখে পড়ে, তেমনি কবি অরুণ বসুর সনেট অনেক বেশি মুক্ত। কবি দেবদাস বলেছিলেন ‘সাম্প্রতিককালের (ষাট দশকের) মুষ্টিমেয় একজন সার্থক চতুর্দশপদী রচয়িতার একজন।” ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের ‘চতুর্দশপদী’ অংশের ভূমিকায় ব্যবহৃত কবিতাটি চতুর্দশপদী কবিতা সম্পর্কে তাঁর মনোভাবকেই আমাদের সামনে তুলে ধরে —
“দ্যাখো কী সুন্দর এই চতুর্দশ পঙ্ ক্তির বাগান/
এ-পৃথিবী, আমি ছন্দে তার তিন ভুবনের বিভা/ ছুঁতে চাই ও-অশ্বমেধের ঘোড়া, আরশি-নগরে/ জানি ছিলে চরাচরে রূপকথার অলঙ্কারও ম্লান/ মগ্ন-গৃহযুদ্ধে মুগ্ধ রত্নাকরই দস্যুর প্রতিভা/
অমল-ঐশ্বর্য তার রয়েছে সাজানো থরে-থরে/ উপনিষদের সাত ঋষির নৈঃশব্দ্যসম দূর/
মুক্তফোঁটাবৃষ্টিবিন্দু, সে দস্যুতা করেছে মধুর/
দস্যুতা মধুর, তাই শস্যস্নাত বিবাহবাসর/
(আগামীকাল সমাপ্ত)