আর ক্ষুন্নিবৃত্তি থেকে সুবর্ণজয়ন্তী-শাদাভাত/ দেখেছি বিষাদ-সিন্ধু নক্ষত্রের হলুদ জাত-পাত/ গিলে খাচ্ছে অন্ধযুগ — ত্রিতাপ ও অনন্তের ‘পর/ কৌস্তুভরতন তুমি চেয়েছিলে সন্ন্যাসীর ধ্যান/ দ্যাখো শুদ্ধ এ-পৃথিবী চতুর্দশ পঙ্ক্তির বাগান”/
কবি অরুণ বসু দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করেছেন ‘অজ্ঞাতবাস’ নামে একটি পত্রিকা। এই পত্রিকার প্রথম প্রকাশ ঘটে ছিল ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ। এই পত্রিকা প্রসঙ্গে দেবদাস আচার্যের কথা বলতেই হয় — “অজ্ঞাতবাস রীতিমত একটা টাটকা আর তেজী কাগজ হয়ে ওঠে।…আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে ‘মৃৎশকট’ পরে উনি বলেছিলেন ‘ঘরের জানালা খুলে বেঁচে দিয়েও এই দীর্ঘ কবিতা ছেপে আনন্দ পাওয়া যায়।’ এবং উনি ওই কবিতা অজ্ঞাতবাসে ছাপেন।সত্তরের দু-একজন প্রখ্যাত কবিকে আমি অজ্ঞাতবাস পত্রিকার দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি।” ষাটের অরুণেশ ঘোষ, নিত্য মালাকার, দেবারতি মিত্র, ভাস্কর চক্রবর্তী প্রায় নিয়মিত ‘অজ্ঞাতবাসে’ লিখতেন। সত্তরের কবি রণজিৎ দাশের কবিতা ‘অজ্ঞাতবাস’-এর পাতায় থাকতো। ‘ঋদ্ধ’ পত্রিকার সম্পাদক বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক শ্রদ্ধেয় সুব্রত পাল ‘নবদ্বীপের লিটল ম্যাগাজিন শীর্ষক’ দুটি পর্বে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধটির প্রথম পর্বেই শুরুতেই বিস্তারিতভাবে ‘অজ্ঞাতবাস’ পত্রিকাটি সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। এই প্রবন্ধে সুব্রত পাল লিখছেন — “নবদ্বীপের লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কিত আলোচনা অরুণ নামটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে,আজীবন প্রতিষ্ঠান প্রচারের বিপ্রতীপে থাকা এই কবির প্রয়াণ এখানকার সৃজনশীল সাহিত্যের জগতে বিরাট শূন্যতা তৈরি করেছে। অতি অল্প বয়সেই তিনি ‘লিটল ম্যাগাজিন’ ধারণাটিকে আত্মস্থ করেছিলেন। সারাজীবন তাকে আদর্শ হিসেবে নিজে যেমন বহন করে গিয়েছেন, তেমনি পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের তরুণ-তরুণীকে তাতে দীক্ষিত করেছেন। প্রথাবিরুদ্ধ, প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভাবনায় উজ্জীবিত করেছেন তাদের। কেবল নবদ্বীপ নয়, সারা বাংলার নবীন কবিদের প্রতি তাঁর আন্তরিক টান।”এই প্রবন্ধে ষাট সত্তরের দশকের সুপরিচিত কবি যাঁরা নিয়মিত লিখতেন ‘অজ্ঞাতবাস’ পত্রিকায়, তাঁদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সেই তালিকায় যাঁদের নাম উঠে আসে — দেবারতি মিত্র, অরুণেশ ঘোষ, দেবদাস আচার্য, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বীতশোক ভট্টাচার্য, বিজিতকুমার ভট্টাচার্য্, সুব্রত চক্রবর্তী, ভাস্কর চক্রবর্তী, অরুণ সাধুখাঁ, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধনা মুখোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, কালীকৃষ্ণ গুহ, শম্ভু রক্ষিত, দেবী রায়, অরণি বসু, নিত্য মালাকার, কমল চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল, একরাম আলী, শ্যামলকান্তি দাশ, তুষার চৌধুরি প্রমুখ। প্রতি সংখ্যাতেই সম্পাদক অরুণ বসুর একগুচ্ছ তাজা কবিতা থাকতো। ‘অজ্ঞাতবাস’-এর এই নিয়মিত কবিরা ছাড়াও বাংলা ও বাংলার বাইরের সেই সময়ের আরো অনেক কমবেশি পরিচিত কবি এই পত্রিকায় স্ব-উদ্যোগে কবিতা পাঠিয়েছেন। ১৯৭৪ পর্যন্ত (সংকলন-১৫) পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল নবদ্বীপ থেকে। তারপর কলকাতা থেকে ১৯৭৬-এর জানুয়ারি এবং আগস্টে সংকলন-১৬ এবং সংকলন-১৭ প্রকাশিত হবার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৩-র সেপ্টেম্বরে আবার নতুন করে এই পত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়, সংকলন-২১ অব্দি। ‘ঋদ্ধ’ পত্রিকার (প্রকাশ-৯, শীত ১৪০২) সম্পাদক সুব্রত পালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কবি অরুণ বসু জানিয়েছিলেন — “লিটিল ম্যাগ সম্পাদনার প্রথম শর্তই, তাঁকে সৎ মননশীল পাঠক হ’তে হবে। আর, সেইসব নবীনদের প্রশ্রয় দিতে হবে, যাঁদের ভিতরে আগুন এবং প্রতিশ্রুতি আছে। এর জন্যে লাগাতার অন্বেষণের দরকার। লেখাকেই বেশি মূল্য দিতে হবে, লেখককে সেভাবে নয়। সমস্ত লেখাই খুঁটিয়ে পড়া এবং সেইসঙ্গে মনে রাখতে হবে যাঁরা লেখা পাঠাচ্ছেন — সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন — সুবিবেচনার সূচিমুখ যেন তাঁদের প্রতিই থাকে। এবং সবচেয়ে জরুরি নতুন লিখতে আসা শক্তিমান ছেলেমেয়েদের উৎসাহিত করা — যাতে তাঁদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ়মূল হয়।” যদিও এখানে একটি কথা সংযোজন করা প্রয়োজন সেটি হল, ‘অজ্ঞাতবাস’ সম্পাদনা করবার আগে কবি অরুণ বসু নীলকান্ত রায়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে অত্যন্ত সিরিয়াস একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, পত্রিকাটির নাম ছিল ‘পালাবদল’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬১-তে।অরুণ বসু তখন দশম শ্রেণিতে পড়া এক কিশোর। এই পত্রিকার নিয়মিত লেখকদের মধ্যে ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তারাপদ রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী, মণিভূষণ ভট্টাচার্য রত্নেশ্বর হাজরা প্রমুখ। পালাবদলের প্রথম সংখ্যার প্রথম রচনাটি ছিল নবীন গল্পকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের। সুব্রত পালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অরুণ বসু জানিয়েছিলেন — “সেসময় নবদ্বীপের ফরওয়ার্ড লাইব্রেরির সঙ্গে কর্মী হিসেবে আমাকে যুক্ত করে দিয়েছিলেন — আমারই এক মাস্টারমশাই মোহিতবাবু। সাহিত্য- পাগল মানুষ। এই ফরোয়ার্ড লাইব্রেরিতেই নীলকান্ত রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। সময়টা সম্ভবত ১৯৬০। সেই পরিচয় এক-সময় ঘনিষ্ঠতা, ও বন্ধুত্বের ঊর্ধ্বে একাত্মতায় পৌঁছে গিয়েছিলো।এই নীলকান্তই আমার লেখালেখির অন্যতম বললেই বোধহয় অতিরঞ্জিত বলা হয় না। সে-সময় ও নবদ্বীপ বিদ্যাসাগর কলেজের প্রি-ভিউ-ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ভাবলে অবাক লাগে, যে-কোনো ক্লাসিক থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্য নখদর্পণে খেলা করতো।… এক আড্ডার দুপুরে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমরা দুজনে হঠাৎ-ই ঠিক করে ফেললাম একটা ছোট কাগজ বের করবো। তখন আমাদের ঠোঁটে ঠোঁটে ঘুরছে অমিয় চক্রবর্তীর ‘পালাবদল’। শেষ পর্যন্তই ‘পালাবদল’ নামটাই কাগজের নাম হ’য়ে গেলো। পালাবদলে সদ্য লিখতে-আসা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আসলে নীলকান্তরই আবিষ্কার।”

‘ঋদ্ধ’ পত্রিকায় কবি অরুণ বসুকে নিয়ে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংখ্যাটি বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর লেখায় লিখেছিলেন, “আমার দেখা মানুষজনের ভেতর যাঁদের গা থেকে আলো বের হয়, অরুণ বসু তাঁদের একজন।” সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল — “প্রাচীন সন্ত্ কবির মতো, দূরে দাঁড়িয়ে তিনি উদাসীন উপভোগ করেন জন্ম ও মৃত্যুর সৌন্দর্যমন্ডিত রূপ। মানুষ হিশেবে, জগতের কাছে, জীবন্ময় জেগে থাকার অতিরিক্ত, দাবি নেই তাঁর। কবি হিশেবে তো নয়-ই। মিলনের মুগ্ধ মোহময় রাত্রিকেও ফুৎকারে নিভিয়ে অনায়াস নেমে যেতে পারেন সত্যসন্ধানী প্রব্রজ্যায়। যে-রকম গিয়েছিলেন একদা, যৌবনের সমস্ত রচনা আগুনে পুড়িয়ে, কবিতার তোলপাড় দিন-রাত্রি থেকে হঠাৎ আড়ালে, স্বকীয় অন্ধকারের ভেতর। ঝড়ের রাত্রিশেষে, নিঃস্ব-রিক্ত পিতার মতো বেদনাময় কিন্তু স্থিত, তাঁর ব্যক্তিত্বে তখনও দেখেছি আমরা, এক আশ্চর্য পরাবাস্তবতার ছোঁয়া।নিথর কুয়াশার ভেতর অস্পষ্ট বোঝা যায় শুধু, অবিচল জেগে থাকাটুকু।…. কবি অরুণ বসু সর্বদায় সম্মুখগামী,পশ্চাতের পদচ্ছাপকে খেয়াল রাখেন না। তাঁর কবিতা মন্ত্রের মতো শব্দবিন্যাস ও অলংকারে সজ্জিত। তার ভেতরেই তিনি সঞ্চারিত করে দেন জীবনের গাঢ় রস, দার্শনিক অভিজ্ঞান-সমূহ।ধ্রুপদী আঙ্গিকের হয়েও তাঁর কবিতা-কাঠামো তাই বৈচিত্র্যময়।” ‘ঋদ্ধ’ পত্রিকার এই সংখ্যা আমাদের ঋদ্ধ করে। এই সংখ্যাতেই সংকলিত হয় ব্যতিক্রমী ঘরানার কবির এগারোটি সাম্প্রতিক কবিতা, যা বাংলা কবিতার সম্পদ।কবি, সম্পাদক প্রণব চক্রবর্তী ছিলেন অরুণ বসুর ঘনিষ্ঠ। ‘ঋদ্ধ’ পত্রিকার এই সংখ্যাতেই তিনি লিখেছিলেন ‘শ্যেনচক্ষুু, তুমি জানো, অমৃতের স্বাদ’ শীর্ষক একটি অসামান্য লেখা। একটুখানি উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করছে — “রং প্রচ্ছদের আড়াল থেকে যদি বেরিয়ে আসে একাকী মানুষ স্তব্ধতার গ্রানাইট দিয়ে বেজে যায় জুতোর শব্দ আর নিজে এই ভাসমান বস্তির দেশ — হেঁটে যেতে যেতে দেখে ফেলে অন্তিম ভাস্কর্যে লীন হয়ে আছে ঠা-ঠা সব রক্তাক্ত চাতাল,জরা নেই,বিরোধ নেই নক্ষত্র নিয়ে, ওতপ্রোত শিকড় প্রান্তিকতায় ছড়িয়ে শুধু খেলা শুধু কোলাহল জল-স্থল-আকাশের মায়াসিদ্ধ বিভক্ত মেরুতে, তবে তার উচ্চারণ হয়ে ওঠে অরুণ বসুর কবিতা।”
শেষ করি ভালোবাসার কথা বলে, প্রেমের কথা বলে। কবি অরুণ বসুর কাছে “আমাদের দেশের জল মাটি আলো-হাওয়া-ই তো প্রেম — এতো নরম। আর, শিশিরের মতন আরও বিনম্র আমাদের বাংলা ভাষা। এই ভাষাই তো আমাদের প্রণোদিত করে প্রেমের কবিতা রচনায়।….পরিশীলিত স্নিগ্ধতা ও ধারাবাহিক মুগ্ধতা ছাড়া ভালোবাসা কখনোই মূর্ত হয়ে ওঠে না।”
(লেখাটি ‘কবিতা আশ্রম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল)