“আসলে কবিতা তো প্রথম দানা বাঁধে বুকে — বুকে খুব গভীরে।মনীষা বা মস্তিষ্ক এসে তাকে মুক্ত করে। বাল্মিকী যেভাবে সম্পূর্ণ অজান্তেই, গভীর অন্তস্থল থেকে বলে উঠেছিলেন অমোঘ দুটি শ্লোক; সেভাবেই একজন কবির বুকের খুব গভীর থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসে প্রথম-তিনটি পঙ্ক্তি।”
এই কথাগুলি ষাটের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি অরুণ বসুর। অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে যখন তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের পাতা ওল্টাচ্ছি, তখন আশ্চর্য এক নীরবতা আমাকে আচ্ছন্ন করছে। শব্দের মায়াময় জগতে ডুবে যাচ্ছি আমি, পুতুলনগরীতে বসে নির্মিত হতে দেখছি কবিতার ভাস্কর্য। খাঁচার দরোজা খুলে আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে পাখি।দেখি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের পর পাখির নীড়ের সাথে মিশে যায় পৃথিবীতে মানুষের ঘর। শুনতে পাই উপনিষদের গল্প। কবিতা পড়তে পড়তে প্রার্থনা করি ‘আলোয় ভরে যাবে মানুষ কোনোদিন’। জানি সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু ‘স্বপ্ননীলিমার নিচে খুব নরম রোদ্দুরে,/ শান্তবীথি সৌম্যপত্রবাহকের সরলতা প’ড়ে থাকবে,/ — মুখ থুবড়ে/ ভুবনের অনেক ভিতরে সুপ্ত আরো এক অমর ভুবনে। ‘এক হাজার কোটি বছরের বুড়ি পৃথিবীর ভিতরে দেখি, শত পুষ্প হয়ে দূরে, ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে আনন্দভৈরবী।’কবিতার আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’ হয়়ে উঠি, উচ্চারণ করি —
“আমি যে-কোনো রমণীর মৃতদেহের কাছে
গোলাপ ফুল হাতে ছুটে যেতে চাই
আমি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রমশ পুঁতে দিতে চাই
রজনীগন্ধার প্রতিটি পাপড়ি
ঘুমের মতো খুব ক্লান্ত-স্নায়ুতে
নারী ও ভালোবাসায এলে
আমি হাত তুলে জানাতে চাই
আমি ভালো আছি
শীতল-সাপকে আমি আগুনের পাশে
নিয়ে গিয়ে
চুম্বন ও সঙ্গমের মতো
সুখ ও উত্তাপ দিতে চাই
আমি চাই না ধানক্ষেতের মধ্যে অলৌকিক ও সুন্দর দিগন্ত
মানুষ ও পৃথিবীর গোপন-দুঃখের ভিতরে
খুব হাসাহাসি করুক
আমি চাই না তিনটা লাল-পিঁপড়ের বুকে
ত্রিগুণ ও ধৃতি-রূপ চোখ মেলে
ঈর্ষা করুক মানুষকে”
কবি অরুণ বসু, এক সন্ধ্যার পবিত্র পৃথিবীর কথা ভাবেন। যিনি নিবিড়-অবসরের তরল -শিশুদের গীতিনাচ দেখতে-দেখতে ঝরনার ভিতরে এক সময় সুদূর ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। যিনি চেয়েছিলেন সুন্দরী ও মৃতরমণীদের জন্য সঙ্ঘবদ্ধ হোক পৃথিবীর অনাবিল সুখ ও মাংসের ভিতরে বিশাল ম্যমির মতো কোনো ঝুলন্ত গোলাপবাগান, যেখানে প্রতিটি ধ্বংস এবং মৃত্যুর জন্য প্রতিদিন শুধু প্রতিদিন অপেক্ষা করবে মন্দারপুষ্পের মতো দুটি নির্লিপ্ত চোখ ও প্রার্থনা…
এ কবিই লিখেছিলেন ‘আঃ, কী সুন্দর এই বেঁচে- থাকা’। মানুষের জন্য যে গান গাইবেন ভেবেছিলেন সেই গান গাওয়া হয়নি, নদীর তরঙ্গে যে-সুর ভাসিয়ে দেবার কথা ভেবেছিলেন তাও ভাসানো হয়নি, পাহাড়ের বুকে আঁচড় কেটে যে-ভাষা ব্যবহার করবেন ভেবেছিলেন সে ভাষাও শেখা হয়নি, সমুদ্রের বিশাল কলরোলের বুকে যে-তর্পণ করবেন ভেবেছিলেন তাও করা হয়নি, নারীর পায়ের কাছে নতজানু বসে চেয়েছিলেন ছন্দের ভেতর থেকে জন্ম নিক মানুষের প্রিয় অহংকার, যে অহংকার ঈশ্বরের অলৌকিক কণ্ঠের আগুনে জ্বলে উঠবে চোখের আলোয়, কেঁপে উঠবে সপ্তসিন্ধু। স্বর্গের খুব পুব ও দক্ষিণ দিকের হা-হা খোলা জানালা দিয়ে ঝ’রে পড়বে ঠান্ডায় বরফকুচির মতো আনন্দ — “প্রতিটি মানুষের জন্য প্রতিটি মানুষের ভালোবাসা/ প্রতিটি নদীর জন্য প্রতিটি নদীর ভালোবাসা/প্রতিটি স্বপ্নের জন্য প্রতিটি স্বপ্নের ভালোবাসা/প্রতিটি নিঃশ্বাসের জন্য প্রতিটি নিঃশ্বাসের ভালোবাসা/নদী চলকে উঠবে বুকে/ পর্বত হাতছানি দিয়ে ডেকে উঠবে হৃদয়কে — / হৃদয় স্পর্শ করবে ‘শাশ্বত’, আর/ মানুষ গেয়ে উঠবে শাশ্বত দিনের গান :
আঃ! এই বেঁচে-থাকা,
কী সুন্দর এই বেঁচে-থাকা!”

১৯৯৭ সালে অফবিট পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছিল কবি অরুণ বসুর ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৬২-১৯৯৬)। গ্রন্থের ব্লার্বে লেখা হয়েছিল — “অরুণ বসু ষাট দশকের শুরু থেকে অদ্যাবধি নিজস্ব একটা ধ্রুবকে,মনোধর্মকে স্থির রেখে কবিতা লিখে গেছেন। তাঁর কবিতায় তিনটি চিহ্ন স্পষ্ট : ১. বিষয়গতভাবে আত্মবীক্ষণধর্মিতা ২. কবিতার ভাস্কর্য-রূপ ৩. ছন্দ-শব্দের মিশ্রণে গড়া নিজস্ব ধরনের ভাষা। তাঁর কবিতায় সামগ্রিকভাবে একটি বিশিষ্ট ভাবনা-জগৎ আছে, যা এত স্বতন্ত্র যে তাকে সাধারণ কোনো দশক-চিহ্নে চিহ্নিত করার প্রয়াস অবান্তর। একটা নিজস্ব রহস্যলোক থেকে নিপুণ শিল্পীর দক্ষতায় তিনি উদ্ধার করেন অনুভূতির তরঙ্গ-টুকরো। তার চকিত দ্যুতিই অরুণ বসুর কবিতা- কাঠামোকে একটি ভাস্কর্য-রূপ দিয়ে যায়। অরুণ বসু জৈব-ধর্মের কবি।তাঁর জৈবতা ঘন, সংহত-রূপ পেয়ে একরকম জৈব-আলো বিচ্ছুরণ করে। অপর একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতায় কখনো কখনো স্পষ্ট হয়, তা হ’লো প্রকৃতি বা দৃশ্য-জগৎ।পাথর, বন, নদী — এইসব অ-জৈব বস্তুও তাঁর কবিতায় অভিনব জৈবতা পেয়ে যায়।”
এই গ্রন্থের ‘কূটাভাস’ অংশে অরুণ বসু নিজে লিখছেন —
“আমার প্রথম এবং একমাত্র কবিতার বই ‘অনুশাসন ব্যতীত আজ’ বেরিয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ৪৫-টি খুব লিকপিকে এবং এলোমেলো রুগ্ন-কবিতা নিয়ে। কালানুক্রমকে অস্বীকার করা অন্যায় হবে ভেবেই ওই অনিচ্ছা-প্রকাশিত, অস্বীকৃত গ্রন্থ থেকে ৯-টি কবিতা কিছু পরিমার্জনাসহ বর্তমান গ্রন্থ সন্নিবেশিত হ’লো।রচনাকাল ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৭। একই কারণে আরও একটু পিছিয়ে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত সময়কালের আরও ৯-টি প্রকাশিত কিন্তু অগ্রন্থিত কবিতা — ‘মেঘ ও মৃত্যুর শব্দ’ — এই পুস্তিকা নামসহ যুক্ত হ’লো — মূলতঃ আমার লেখালিখি শুরুর পর্বটিকে বোঝার সহায়ক হিশেবে। এ-ছাড়া, গ্রন্থভুক্ত বাকী সব কবিতার রচনাকাল ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৬। মাঝখানের সময়টুকু অর্থাৎ ১৯৭৭-এর পর থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত আমার নিশ্ছিদ্র নিদ্রা ও জাগরণের মধ্যবর্তী শূন্যতা।
উল্লেখ্য, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৬-এ লেখা কবিতাগুলিকে মোট তিনটি অংশে, তিনটি ভিন্ন -ভিন্ন গ্রন্থ নামসহ বিভাজিত করা হ’লো। একটি অংশের নামকরণ ‘ভুবন ও কামপোকা’। বাকী দুটি অংশে একটি ‘চতুর্দশপদী’ ও অন্যটি ‘ষড়ৈশ্বর্য’ নামে চিহ্নিত।”
তাঁর নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থে যেভাবে কবিতাগুলি সজ্জিত আছে —
অনুশাসন ব্যতীত আজ রচনা — ১৯৬৫-১৯৭৭/প্রকাশ ১৯৭৯
মেঘ ও মৃত্যুর শব্দ — রচনা ১৯৬২-১৯৬৯
ভুবন ও কামপোকা — রচনা১৯৮৩-১৯৯৬
চতুর্দশপদী — রচনা ১৯৮৩-১৯৯৬
ষড়ৈশ্বর্য — রচনা ১৯৮৩-১৯৯৬
কবি অরুণ বসুকে নিয়ে বিশিষ্ট কবি দেবদাস আচার্য আমার সম্পাদিত পত্রিকা ‘জীবনকুচি’তে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। শিরোনাম ছিল — ‘ষড়ৈশ্বর্যময় ভুবন’। এই প্রবন্ধে দেবদাস লিখছেন — “কবি মাত্রেই বোধহয় আত্মগতভাবে স্বৈরাচারী।বিশেষত অরুণ বসুর কবিতা পড়ার সময় এমন মনে হয়। অরুণ বসু ষাট দশক থেকে কবিতা লিখছেন। অর্থাৎ ষাট ও সত্তর দশকের কাব্যচর্চার যে পটভূমি ছিল, ঐতিহাসিক পটভূমি, তিনি তাঁর সময়ে সেই পটভূমির ভিতর দিয়েই গড়ে উঠেছেন। অথচ এতটাই স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পেরেছেন যে ঐ দশক দুটির সাধারণ কাব্যচর্চার ধর্ম তাঁকে খুব বেশি প্রভাবিত করেনি।নিজস্ব একটা ধ্রুবকে মনোধর্মকে স্থির রেখে তিনি কবিতা লিখে গেছেন। তাঁর কবিতাগুলি যা আমার হাতে এসেছে,পড়ার পর তাঁর কবিতার বিশিষ্ট তিনটি লক্ষণ আমার নজরে এসেছে। লক্ষণ তিনটিকে এভাবে আমি চিহ্নিত করেছি — ১. বিষয়গতভাবে তাঁর কবিতা মননধর্মী, আত্ম বিক্ষণধর্মী, ২. কবিতার ভাস্কর্যরূপ, ৩. ছন্দ-শব্দের অসাধারণ মিশ্রণে গড়া নিজস্ব ঘরানার ভাষা।… অরুণ বসুর কাব্যভুবনের হদিস পাওয়া বেশ কঠিন। তাঁর প্রতিটি কবিতা গঠন-নিপুণতায় এমন পরিমার্জিত এবং প্রতিটি কবিতায় এমন অন্তর্মুখী যে বাইরে প্রায় কিছুই ভেসে থাকে না। তাঁর ‘ষড়ৈশ্বর্য’ শীর্ষক কবিতাগুলি ছাড়া এমন কোনো একটি দীর্ঘস্থায়ী চেতনাপ্রবাহ থেকে তিনি বেশ কিছু কবিতা তুলে নেন না, যাতে বিষয়গত বা মর্মগতভাবে তাঁর কবিতার ভাবধারাটিকে সহজভাবে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ কবি হিসেবে তিনি কোনো একটি ভাব- প্রবাহে স্থির নন কিন্তু একসঙ্গে অনেক কবিতা পড়ার পর তাঁর কবিতার যে সামগ্রিকভাবে একটি বিশিষ্ট ভাবনা জগৎ আছে সেটা স্পষ্ট হয়। এই ভাবনাজগৎ যে, তাঁকে কোনো সাধারণ দর্শক-লক্ষণে চিহ্নিত করা যায় না। গত চার দশকের কবিতায় অরুণ বসু এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।”কবি দেবদাস আচার্যের মতো আমারও খুব প্রিয় একটি কবিতা ‘টোটোপাড়া, সন ১৩৯৪ বঙ্গাব্দ’ —
“তিনটি আশ্চর্য নদী; কয়েকশো মানুষ-ফুল ছুঁয়ে ওইখানে প্রকৃতির যা-কিছু সৌন্দর্য পড়ে নুয়ে
ভুটানি কমলালেবু, বাঁশফুল, সুপুরিবাগান
যেন জ্ঞানবৃক্ষে মুগ্ধ সন্ন্যাসী ভেঙেছে তার ধ্যান
এই দৃশ্যে শ্বাস নেয় মনুষ্যত্ব, প্রাণী ও প্রণাম
এখানে ছবির মতো, খুব ছোটো, টোটোদের গ্রাম”
(চলবে)
কবির কবিতা পড়ার আগ্রহ বেড়ে গেল।।