শহর কলকাতার ব্যস্তসমস্ত এই অঞ্চলটিকে শিয়ালদহ, শিয়ালদা, শ্যালদা, অনেক নামেই ডাকা হয়।
পাটলিপুত্রের বৌদ্ধ পরিব্রাজক কবিরাম তাঁর ‘দিগ্বিজয় প্রকাশ’ গ্রন্থে যে শৃগালদহর কথা উল্লেখ করেছিলেন, তা থেকেই আজকের শিয়ালদহ এসেছে কিনা, তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই৷ অনেকে বলেন, কবিরাম উল্লিখিত ‘কিলকিলা’ প্রদেশটিই কাল্পনিক৷ এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই৷
ইংরেজ মানচিত্রকর এ আপজন ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার যে ম্যাপ তৈরি করেন, তাতে দেখা যাচ্ছে—মির্জাপুরের পূর্বে, ডিহি শুঁড়ার দক্ষিণে ও ডিহি ইন্টালির উত্তরে অবস্থিত ডিহি শিয়ালদহ৷ শিয়ালদহ তথা শিয়ালদা যথেষ্ট প্রাচীন অঞ্চল৷ সুকুমার সেনের মতে, বটতলা সাহিত্য গরানহাটা, বটতলা, চিৎপুর, শাঁখারিটোলার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে এই শিয়ালদহেও শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছিল৷ শিয়ালদহের ‘শিয়াল’ এল কোথা থেকে? এ কি সেই ধূর্ত চারপেয়ে জন্তু, রাত্রির শেষের প্রহরের হুক্কাহুয়া বিশারদ যামঘোষ?
নাকি এই ‘শিয়াল’-এর অন্য অর্থ আছে?
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাংলা অভিধানে ‘শিয়াল’ শব্দের আর একটি অর্থ আছে — ‘মস্তক মাটিতে ঠেকিয়ে ঠাকুরদেবতা বা গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা৷’ অনেকটা সাষ্টাঙ্গে প্রণামের মতো৷ শিয়ালদহে হ্রদ তথা দহ থাকার সম্ভবনা খুবই প্রবল৷ বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে উঠে আসা ভূখণ্ড কলকাতা, এর সর্বাঙ্গে ছিল নদী-দহ-পুষ্করিণী-খাল-বিলের চিহ্ণ৷ চাঁদপাল ঘাটের কাছ থেকে যে খালটি হেস্টিংস রোড হয়ে, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট হয়ে, ওয়েলিংটন স্কোয়ার ও ডিঙাভাঙা হয়ে বেলেঘাটার দিকে চলে যেত এবং শেষমেশ ধাপায় উপনীত হত — তার নাম ধাপাধারা৷ এটিই অপভ্রংশে ধাপধাড়া৷ ক্রিক রো তথা ডিঙাভাঙা একেবারে মৌলালি তথা শিয়ালদার গায়ে৷ ওখানেই ফুলেফেঁপে ওঠা খাল তথা নদীতে জাহাজ বা নৌকাডুবির ইতিহাস আছে৷ সেখানে অতীতে হ্রদ তথা দহ থাকার সম্ভাবনা খুবই প্রবল ছিল৷ ওই দহে ঠাকুরদেবতা বিসর্জনের পর গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণামের রীতি ছিল হয়তো৷ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘শৃগাল’ শব্দের একটি অর্থ শ্রীকৃষ্ণ বা শ্যামরায়৷ কেষ্টঠাকুর জলে দেওয়ার চল কি ছিল তখন? কালীয়দমনের সময় শ্রীকৃষ্ণ যমুনাসংলগ্ন যে হ্রদে কালীয় সর্পকে দমন করেছিলেন তার নাম ছিল কালীদহ৷ শিয়ালদহ তথা শৃগালদহ কি কালীদহের স্মৃতি উসকে দেয়?

তবে ইতিহাস-ভূগোল মিলিয়ে সবচেয়ে জুতসই ব্যাখ্যা একটা পাওয়া যাচ্ছে পরবর্তী ঘটনা পরম্পরায়৷ বহু আগে থেকেই শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস ছিল এখানে৷ বড়োসড়ো তাজিয়া বার হত অতীতে৷ এখনও হয়৷ তাজিয়ার ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে হাসান-হোসেনের কবরের প্রতিনির্মাণগুলি এই দহে নিক্ষেপ করা হত৷ সেই থেকেই ‘শিয়ারদহ’ তথা শিয়ালদহ কথাটি এসেছে কিনা, গবেষকদের ভেবে দেখতে হবে৷ কেন-না পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী শহর শিয়ালকোট-এর নামের ব্যুৎপত্তিতে শিয়া সম্প্রদায় নির্মিত কোট বা দুর্গের কথা বলা হয়৷ আর-একটি মতে পাণ্ডবদের খুল্লতাত শল্য কর্তৃক স্থাপিত হওয়ার জন্য এর নাম হয়েছিল শিয়ালকোট৷ শিয়ালদহ নামের ক্ষেত্রেও তাই শিয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত ডিহি বা দহ বলেই শিয়ালদহ নামটির উৎপত্তি হয়েছিল, একথা অনুমান করাই যায়৷ শিয়ারদহ থেকে অপভ্রংশ হয়ে পরে শিয়ালদহ নামটি আসতেই পারে। প্রসঙ্গত শিয়ালদহ স্টেশনের উত্তরে ১৮৪০-এ শিয়া মুসলিম বু (বো) আলি কর্তৃক নির্মিত হস্টেল, মসজিদ ও মাদ্রাসা আজও বিদ্যমান, যদিও হস্টেল এখন মেসে রূপান্তরিত এবং প্রতিষ্ঠানটি ওয়াকফ এস্টেটের অধীন৷ শিয়ালদহের উত্তরে ডিহি শুঁড়া কি সুন্নি সম্প্রদায়ের স্মৃতি উসকে দেয়? মোগলআমলের শেষ দশায় শিয়াসম্প্রদায়ের তাজিয়া-স্মৃতি মনে পড়িয়ে দেয় আজকের শিয়ালদহ৷ মির্জাপুর, রাজাবাজার, মৌলালি, এন্টালির মধ্যস্থলে শিয়ারদহ তথা শিয়ালদহ আক্ষরিক অর্থেই গমগম করছে৷ ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোরেলের বিশাল স্টেশন হয়েছে এখন শিয়ালদহে।
গবেষক ড. সুকুমার সেনের মতে শ্যাওলাদহ থেকেই নাকি এসেছে শিয়ালদহ! বুঝ লোক যে জান সন্ধান।
শিয়া সম্প্রদায়গত ব্যাখ্যাটি খুবই সম্ভাবনাময়। আবার সুকুমার সেন মশাইয়ের অনুমানটিও বেশ সম্ভাব্য। গোটা আলোচনাটিই ভালো লাগল।
অনেক ধন্যবাদ, দাদা। আপনার সুচিন্তিত মতামত পেয়ে ঋদ্ধ হলাম।