চালু হয়ে গেলে প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষ যাত্রী এই মেট্রো পরিষেবা ব্যবহার করবে। অথচ সেই শিয়ালদহ মেট্রোর দরজা খুলতেই গত দেড় মাস ধরে কেন্দ্র টালবাহানা চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী গত মার্চের শেষ দিকেও যদি শিয়ালদহ মেট্রোর দরজা খুলতো তাহলেও এই বাজারে রেলের আয় অনেক বেড়ে যেত। রেলের হিসাব অনুযায়ী সেই হিসাব প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু শিয়ালদহ মেট্রো চালু না হওয়ায় স্বভাবিকভাবেই রেলের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
শহরের অন্য মেট্রোর তুলনায় এই মেট্রো তৈরিতে খরচ হয়েচে বেশি। কারণ, এই স্টেশনের সিভিল ওয়ার্ক হয়েছে মূলত মাটির নীচে। আর সেই কাজের জন্য খরচ হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা। রেল ট্র্যাক, বিদ্যুৎ সংযোগ, স্টেশন পরিকাঠামো গড়ে তুলতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া লিফট, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, এস্কালেটর, অগ্নিনির্বাপণ–সহ অন্যান্য পরিষেবার জন্য খরচ পড়েছে আরও ২৫ কোটি টাকা। অথচ সেই মেট্রো চালু করতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু- বারংবার বদল হচ্ছে। বিপুল টাকা ব্যায়ে যে যাত্রী পরিষেবা গড়ে উঠলো তা কেন্দ্রের তুঘলকি সিদ্ধান্তের কারনেই যাত্রীরা এখনও পর্যন্ত ব্রাত্যই রয়ে গিয়েছেন। শেষ মেষ কেন্দ্র রেল বোর্ডকে এখনই উদ্বোধন করা হবে না বলে জানিয়েছে।

প্রথমে ঠিক হয়েছিল শিয়ালদহ মেট্রোর উদ্ধোধন হবে ১১ এপ্রিল। কিন্তু সেই তারিখ অজানা কারণে বাতিল হয়। পরবর্তী সময়ে ঠিক হয় বাংলা নববর্ষের দিন উদ্ধোধন হবে শিয়ালদহ মেট্রো৷ কিন্তু সেই তারিখও বাতিল হয়। এর পরে জানা যায় কবিগুরুর জন্মদিনে শিয়ালদহ মেট্রোর চাকা গড়াবে। এইভাবে ডেটলাইন মিস হয়ে চলেছে। এর পাশাপাশি শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশনের উদ্বোধন ঘিরেও চলেছে নাটক। কে করবেন উদ্ধোধন? রেল সূত্রে খবর ছিল, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনের উদ্বোধন যাতে প্রধানমন্ত্রী করেন সেই আবেদন রাখা হয়েছিল। রেল মন্ত্রকের তরফে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল৷ পরবর্তীতে জানা গেল শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশন উদ্বোধন করবেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। কিন্তু এখন বোঝা গেল গোটা বিষয়টাই কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা–অনিচ্ছার উপর ঝুলে রয়েছে। ইতিমধ্যে মোদী সরকারের আট বছর পূর্তি অনুষ্ঠান, তার মানে সেই পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিয়ালদহ মেট্রোর উদ্বোধন হচ্ছে না। অর্থাৎ ১৪ জুনের আগে কিছু ঘটছে না। কিন্তু তখনও কি শিয়ালদহ মেট্রোর চাকা গড়াবে? আমজনতা কিন্তু আজ এই প্রশ্ন তুলেছেন।
উল্লেখ্য, শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশনের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে মার্চ মাসের মাঝামাঝি। তারপরেই কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটি এসে স্টেশন পরিদর্শনও করে গিয়েছেন। কমিশনার তাঁর রিপোর্টে বেশ কয়েকটি বিষয়ের বদলের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। সেই অনুযায়ী তা বদলও করা হয়। কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটি তার ভিত্তিতে যাত্রী পরিবহণের জন্য শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশন চালুর অনুমতিও দেণ। কিন্তু তারপরও কেন্দ্র শিয়ালদা মেট্রো স্টেশনের উদ্বোধন নিয়ে গড়িমসি করেই চলেছে। এখন পর্যন্ত শিয়ালদহ ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। কলকাতা মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ মনে করে, এই স্টেশন ধরেই লক্ষ লক্ষ যাত্রী মেট্রো ব্যবহার করবেন। তাছাড়া শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশন আর রেলের স্টেশন খুব কাছাকাছি গড়ে ওঠায় যাত্রীদের সুবিধার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার জন্যে স্টেশনে থাকছে ৯টি সিঁড়ি। থাকছে মোট ২৭টি টিকিট কাউন্টার। এর মধ্যে বেশ কিছু টিকিট কাউন্টার হবে যারা শারীরিক ভাবে সমস্যায় তাদের জন্যে বিশেষ ভাবে নীচু করা হয়েছে।এ ছাড়া যাতায়াতের সুবিধার জন্যে থাকছে মোট ৫টি লিফট। মোট ৩টি প্ল্যাটফর্ম থাকছে। কিন্তু প্রশ্ন সব ব্যবস্থা পাকা হওয়া স্বত্বেও কেন উদ্বোধনের ব্যাপারে টালবাহানা করা হচ্ছে?

এদিকে শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশনের নামের আগে অন্য নাম জুড়তে পারে বলেও জানা গিয়েছে। সেই নাম এক কর্পোরেট সংস্থার। তার মানে কর্তৃপক্ষ শিয়ালদহ মেট্রো স্টেশনের নামকরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক দিকটির কথা ভেবেছে। যা নিয়ে টেন্ডারও চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু নাম নয়, শিয়ালদহ নামের সঙ্গে ওই বাণিজ্যিক সংস্থার লোগো ব্যবহার করা হবে। যা দিয়ে ওই সংস্থা স্টেশনেতার প্রচার করতে পারবে। চুক্তি অনুযায়ী ওই বানিজ্যিক সংস্থা স্টেশন চত্বরে ১৫০০ বর্গফুট এলাকার মধ্যে বিপণনের সুযোগ পাবে। সংস্থা যাত্রীদের দেখার জন্য তাদের কিয়স্ক ও ডিসপ্লে আইটেমও রাখতে পারবে। পাশাপাশি দরজাতেও তাদের নাম ও লোগো থাকবে। এক বা একাধিক বাণিজ্যিক সংস্থা প্রচারের এতবড় সুযোগ নিশ্চয় হাতছাড়া করবে না। তাছাড়া মেট্রোও তাদের আয় বাড়াতে পারবে। জানা গিয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাঙ্ক, বিমা, হেলথ কেয়ার সংস্থাকেই এ বিষয়ে সত্বাধিকার দিতে আগ্রহী। কিন্তু সব বন্দোবস্থ যখন খুব আশাব্যাঞ্জক তখন কেন্দ্র টালবাহানা করছে কেন?