ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের সংবিধানের অন্যতম ভিত্তি। আদিত্য যোগীর মতো একজন মুখ্যমন্ত্রী, যিনি সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীপদে বসেছেন, তিনি জোর গলায় বলছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যই নাকি পিছিয়ে পড়ছে আমাদের দেশ। বলছেন, ভারতের এই ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবই দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য আর হিন্দু ধর্মের সমৃদ্ধিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে বার বার বাধা দিয়েছে। বলেছেন এবং তার পরেও তিনি মুখ্যমন্ত্রী আছেন। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে ডেকে বলেনি বা বলতে সাহস পায়নি যে এই ধরনের মন্তব্য সংবিধান বিরোধী। গত ৭ মার্চ রামায়ণের গ্লোবাল এনসাইক্লোপেডিয়ার তথ্যকোষ উদ্বোধন করতে এসে সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে তাঁর মনের কথাগুলি প্রকাশ্যে বলেন তিনি। অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগেও বহু ক্ষেত্রে বিজেপি নেতাদের দেখা গিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে আক্রমণ করতে। কারণ এই দলটা ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটিতে’ তে নয়, বিশ্বাস করে ‘ইউনিফর্মিটি ইন ডাইভার্সিটিতে’। তাদের স্লোগান হল, বিবিধের মাঝে না-থাক মিলন মহান…।
বাবা সাহেব আম্বেদকর এই মানসিকতা সম্পর্কেই দেশবাসীকে সাবধান করে দিয়েছিলেন কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে আলোচনার শেষ দিনে। বলেছিলেন, যখন কোনও রাজনৈতিক দল সংবিধানের আদর্শের উপরে স্থান দেবে নিজেদের দলের কথা এবং দলের আদর্শকে, সেদিন ভারতীয় গণতন্ত্রের খুব ভয়ের সময়।
বিশ্বের দরবারে যখন ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তখন বিজেপির শীর্ষনেতা যোগী আদিত্যনাথ এই ধরনের মন্তব্য করে প্রমাণ করলেন, আরও অনুদার আরও আরও অমানবিক, আরও সঙ্কীর্ণ পথেই আধুনিক ভারতকে নিয়ে যেতে চায় বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শ।
এই প্রসঙ্গেই বলব ঘজালা ওয়াহেব কথা। ঘজালা ওয়াহেব তখন ছোট ছিলেন। ১৯৯০ সালে যখন এল কে আদবাণীর রথযাত্রা হয়েছিল, সেই সময় দাঙ্গাকারীরা আগ্রায় তাঁদের বাড়ি আক্রমণ করেছিল। যেখানে ঘজালা ওয়াহেব দেখেছিলেন, সেই হামলাকারীদের মধ্যে তাঁর প্রতিদিনের পরিচিত কয়েকটি মুখকেও। সেই ঘজালা ওয়াহেব তাঁর আত্মজীবনীমূলক এবং গবেষণাধর্মী একটি বই লিখেছেন, নাম, ‘বর্ন আ মুসলিম, সাম ট্রুথস অ্যাবাউট ইসলাম ইন ইন্ডিয়া’। সম্প্রতি ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, কী ভাবে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে মুসলিমদের জন্য, মুসলিমদের চিন্তা-ভাবনায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, ভয়ের পরিস্থিতির কারণে ভারতের মুসলিমরা দল বেঁধে ঘেটোতে থাকেন এবং এর ফলে স্থানীয় স্তরে ভাল প্রাধমিক স্কুলের অভাব দেখা দেয়, যার পরিণতিতে উঁচু মানের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাঁদের সন্তানদের একটা বড় অংশ। কী ভাবে মুসলিম যুবক-যুবতীরা বঞ্চিত হচ্ছেন চাকরির ক্ষেত্রে, কী ভাবে গরিব মুসলিমরা ভয়ে হিন্দু নাম নিয়ে কাজ করছেন বিভিন্ন শহরে ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা এবং তথ্য এক জায়গায় করেছেব ঘজালা ওয়াহেব তাঁর এই সদ্য প্রকাশিত বইয়ে।
এই বই এমন সময় প্রকাশিত হল, যখন দেশে দেশে গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করে যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রিডম হাউস’, তাদের রেটিং-এ ভারত এখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে পার্টলি ডেমোক্র্যাটিক কান্ট্রি তে অবনমিত হয়েছে। যখন সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রের হাল-হকিকত যে সুডিশ সংস্থা খতিয়ে দেখে সেই ‘ভ্যারাইটিস অফ ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউট’ তাদের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে বলছে, নরেন্দ্র মোদির শাসনে ভারত একটি ‘নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক’ দেশ। এই সব রিপোর্ট এমন সময় প্রকাশিত হচ্ছে যখন, দিল্লির দাঙ্গার এক বছর পার হয়ে গেলেও, প্রকৃত দোষীরা ধরা পড়ল না। দাঙ্গায় নিহতদের ৯৯ শতাংশ যদিও মুসলিম, কিন্তু গ্রেফতারের সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে মুসলিমরাই বেশি। আরএসএসের মুখপত্রে লেখা হচ্ছে, দিল্লির দাঙ্গা ছিল একটি হিন্দু বিরোধী দাঙ্গা। দিল্লির দাঙ্গার আগে সংবাদ মাধ্যমে যেসব বিজেপি নেতাদের দেখা গিয়েছিল প্রকাশ্যে দেখে নেব, গুলি মারো ইত্যাদি বলতে, গত এক বছরে তাদের ডেকে জেরা পর্যন্ত করেনি পুলিশ।
Majoritarian State, How Hindu Nationalism is Changing India. Edited by Angana P. Chatterjee, Thomas Blom Hansen, Christophe Jaffrelot, নামের এই বইয়ে তথ্য দিয়ে লেখকরা দেখিয়েছেন,
জনসংখ্যার বিচারে মুসলিমরা ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ, কিন্তু কারাগারে মোট বিচারাধীন বন্দিদের ২১ শতাংশ মুসলিম। জনসংখ্যার শতকরা হিসেবের তুলনায় এই সংখ্যাটা যথেষ্ট বেশি। তাহলে কি মুসলিমদের বেশি গ্রেফতার করা হয়? কারণ যখন বিচার হচ্ছে তখন দেখা যাচ্ছে, সারা দেশে যত অপরাধীকে আদালত শাস্তি দিচ্ছে তার ১৫ শতাংশ মুসলিম। এই সংখ্যাটা কিন্তু মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশের কাছাকাছি। এর থেকে একটা কথা বলাই যায়, ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় মুসলিমরা সুবিচার পাচ্ছেন। কিন্তু সম্ভবত প্রশাসনের কাছে নয়।
তারই একটি জলজ্যান্ত প্রমাণ পাওয়া গেল গত ৭ মার্চ। সময়টা ২০০১ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিক। তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ১২৭ জনকে জঙ্গি-যোগের অভিযোগে সুরাত থেকে গ্রেফতার করেছিল নরেন্দ্র মোদীর পুলিশ। তার ২০ বছর পর এই মার্চ মাসে ওঁরা যখন নির্দোষ প্রমাণীত হলেন, তত দিনে সেই নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাটিয়ে দিয়েছেন প্রায় সাত বছর!
সুরাতের অঠওয়া-লাইনসের পুলিশ ইউএপিএ-তে সরগমপুরায় নভসরি বাজারের কাছে রাজশ্রী হলের একটি সভা থেকে এই ১২৭ জনকে গ্রফতার করেছিল। এর কিছুদিন আগেই কেন্দ্রের তৎকালীন বিজেপি সরকার সিমিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। গুজরাট পুলিশ তখন দাবি করেছিল গ্রেফতার হওয়া ওই ১২৭ জনই নিষিদ্ধ সিমি সংগঠনের সদস্য। প্রায় ৯ মাস জেলে কাটানোর পর ধৃতেরা জামিন পেলেও ইউএপিএর বিভিন্ন ধারায় তাদের বিচার চলছিল এত দিন। অবশেষে ২০ বছর বাদে ধৃত প্রত্যেককে নির্দোষ বলে মেনে নিয়ে গত ৭ মার্চ তাদের সবাইকে মুক্ত ঘোষণা করেছে সুরাটের মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট এ এন দাভের আদালত। সিমি নয়, আসলে ধৃতেরা সবাই ওই সময় সারা ভারত সংখ্যালঘু শিক্ষা বোর্ড নামে একটি সংগঠনের ডাকা সভায় যোগ দিতে জড়ো হয়েছিলেন। গ্রেফতারির সময় এঁদের অনেকেরই বয়স ছিল কুড়ির কোঠায়। তাঁদেরই একজন আমদাবাদের আসিফ শেখ। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন ‘‘আমি কলেজের ফার্স্ট হতাম। স্বপ্ন ছিল, কলেজ পাশ করে বেরিয়ে সাংবাদিক হব। আজ আমি মশলা বিক্রি করে সংসার চালাই! কেন মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে এত দিন ধরে আমাদের জীবন শেষ করে দেওয়া হল, তার জবাব দেওয়ার কেউ নেই,’’ রায় ঘোষণার পরে কেঁদে ফেললেন তিনি। একই অবস্থা প্রায় সকলেরই। এক দিকে মামলা চালানোর খরচ, অন্য দিকে জঙ্গি-যোগের তকমা মোছার আপ্রাণ লড়াই চালাতে হয়েছে এত দিন। এঁদের মধ্যে বেশ কয়েক জন অধ্যাপক ছিলেন। গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। অনেকে বিয়ে করতে পারেননি জঙ্গি তকমা থাকায়। এখন বিয়ের বয়স পার হয়ে গিয়েছে। সমাজে তাদের এত বছর সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? যে নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে এই ঘটনা ঘটেছিল, তিনি এর এর জন্য দুঃখিত? এর উত্তর আমাদের জানা নেই।