ব্যাস লিখছেন— এই জীবনে আমি তিন-তিনটে বড় ভুল করে ফেলেছি, প্রভু! আমি দোষ স্বীকার করছি, তুমি আমায় ক্ষমা দাও, হে জগদীশ্বর— ভুলটা আমারই বিকলতাবশে হয়ে গেছে, কেন যে আমি অমন বিকল ব্যাকুল হয়ে পড়লাম বুঝিনি। তাই একটা নয়, দুটো নয়, তিন-তিনটে দোষ করেছি আমি, তুমি ক্ষমা করো, প্রভু— ক্ষন্তব্যং জগদীশ তদ্-বিকলতা-দোষত্রয়ং মংকৃতম্। সত্যিই ব্যাস যা করেছেন তা এক ধরনের বিকলতাই বটে। মানুষ যদি ঘন তমিস্রার মধ্যে আলোর ঝলক দেখতে পায়, তবে সে আকুল হবে না? মহাকবি যদি নিশ্চিহ্ন অরূপের মধ্যে রূপ দেখতে পান, নিশ্ছিদ্র শূন্যতার মধ্যে তিনি যদি আকার দেখতে পান, তা হলে কি বিকল হয়ে উঠবে না তার মন? স্বয়ং ভগবান পর্যন্ত কেমন বিকল হয়ে পড়েন, তার একটা জনমুখী বর্ণনা আছে সপ্তম শতাব্দীর কবি মাঘের শিশুপালবধ কাব্যে।
এখানে কৃষ্ণ ভগবান মনুষ্যলীলায় মানুষভাবেই এক দিন বসেছিলেন বসুদেবের ঘরে— জগন্নিবাস বসুদেবসদ্মনি। কবি কিন্তু কৃষ্ণের বর্ণনায় প্রথমেই এখানে এক বিরাট ব্যাপ্ত ভগবৎস্বরূপের কথা বলছেন, যাঁর মধ্যে চরাচর বিশ্ব ব্যাপ্ত হয়ে থাকে— যিনি ‘জগন্নিবাস’, তিনি পিতা বসুদেবের ঘরের দাওয়ায় বসেছিলেন এক দিন। সেখানে বসেই তিনি দেখতে পেলেন— যেহেতু নরলীলায় থাকলেও মাঝে মাঝে ভগবত্তার আবেশটুকু থেকে যায়— তাই তিনি দেখতে পেলেন— সুদূর আকাশ থেকে সোনার বরণ একজন মুনি যেন নেমে আসছেন। কোন মুনি— এটা কিন্তু তিনি বুঝলেন না, কেননা তিনি মানুষের শরীরে লীলায়িত। কবি পরের শ্লোকেই বুঝিয়ে দিলেন— ভগবান বলে একটু ছাড় দিয়েছেন প্রথম শ্লোকে, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি আকাশের মধ্যে এই রকম একটা সোনা-ঝরানো চেহারা দেখত, তা হলে সেই আকস্মিকতা তাদেরও বিহ্বলতা দিত, বিকলতা দিত।
কবি লিখছেন— সাধারণ মানুষ আকাশ-মাঝে এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে ভাবল— এটা সূর্যদেব অন্য একটা চেহারায় নীচে নেমে আসছে, নাকি আগুনের শিখা পুঞ্জীভূত হয়ে নেমে আসছে আকাশ থেকে। একটা অদ্ভুত তেজঃপুঞ্জ চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে আকাশ থেকে পড়ছে যেন। এমন দৃশ্য দেখে সাধারণ লোকের মন যেন আকুল হয়ে উঠল, তারা শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে রইল আকাশস্থ সেই তেজঃপুঞ্জের দিকে— শুধু ভাবতে লাগল— কী হতে পারে এটা— পতত্যধো ধাম বিসারি সর্বতঃ / কিমেতদিত্যাকুলমীক্ষিতং জনৈঃ।
আমরা মহাকবি ব্যাসের কথা বলছিলাম। অদ্ভুত কিছু করতে গিয়ে তাঁর মন বিকল হয়ে উঠেছে এবং সেই বিকলতার জন্য তিনি দোষ স্বীকার করছেন তাঁর আত্মারাম প্রভুর কাছে। আমরা এখানে মহাকবির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর বিকলতা-দোষের বহুমানন করে বলছি— এমনটা হতেই পারে— নিরাকার শূন্যের মধ্যে আকার দেখতে পেলে যে বিস্ময় তৈরি হয় সেটাই তো অদ্ভুত-রসের সার, মহাকবির ব্যঞ্জনায় সেটা বিকলতার মতো একটা দোষ।
বসুদেব-গৃহে বসে থাকা সেই ভগবৎপ্রতিম মানুষটিও কম অবাক হচ্ছেন না। তিনি দেখলেন— একটা জ্যোতিঃপুঞ্জ যেন আকাশ থেকে নেমে আসছে ভুঁয়ে— চয়স্ত্বিযাম্ ইত্যবধারিতং পুরঃ। তার পর দেখলেন— এই জ্যোতিঃপুঞ্জের একটা আকার আছে, একটা শরীর আছে; তার পর দেখলেন— সে শরীরী মানুষটি একটি পুরুষ। আস্তে আস্তে যিনি তাঁর সম্মুখে স্পষ্ট-প্রকট হয়ে দাঁড়ালেন, তাঁকে দেখে কৃষ্ণ বললেন— আরে! এ যে আমাদের নারদ মুনি! দেবর্ষি নারদ! ক্রমাদমুং নারদ ইত্যবোধি সঃ।
সম্পূর্ণ এক নিরাকার জ্যোতিঃপুঞ্জ মধ্য থেকে এক স্পষ্ট সাকার রূপ আবিষ্কার করার পর বিস্ময়াকুল যে ভাবটা ভগবানের মধ্যেও আসে, মহাকবি ব্যাস সেই বিস্ময়টাকেই রসশাস্ত্রীয় প্রশ্রয়ে ব্যাখ্যা করে বলেছেন— আমি মহাব্যাকুল হয়ে যে তিনটে দোষ করে ফেলেছি, সেই দোষগুলি আমায় ক্ষমা করে দিয়ো তুমি— দোষত্রয়ং মৎকৃতম্। কী দোষ করেছেন কবি? ব্যাস দ্বৈপায়ন প্রথম দোষ স্বীকার করে বলেছেন— বার বার এই কথা শুনেছি প্রভু। শুনেছি— তোমার কোনও রূপ নেই, শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ নেই— অশব্দম্ অস্পর্শম্ অরূপম্ অব্যয়ম্— তুমি অথচ নিত্য আছ সর্বকালে সর্বদেশ জুড়ে— তোমার আদি-অন্ত-মধ্যহীন এই রূপ অবধারণ করা তো মুনি-ঋষি-যোগীদের পক্ষে সম্ভব— যোগিভির্ধ্যানগম্যম্— সেই বিরাট অরূপকে আমরা অবধারণ করব কী করে?
ব্যাসের এই জিজ্ঞাসার উত্তর ব্যাস জানেন নিজেই— বস্তুত সেই অরূপের স্বরূপ তাঁর ভালোই জানা আছে। যিনি চতুর্বেদ বিভাগ করার পর বেদান্তদর্শন ব্রহ্মসূত্র রচনা করেছেন— সেই ব্রহ্মসূত্রের ওপরেই তো শঙ্করাচার্য-রামানুজদের যত খেলা, সেই পরব্রহ্মের স্বরূপ ব্যাস-বাদরায়ন জানবেন না, এটা তো হতে পারে না। তিনি সব জানেন এবং জানেন বলেই আজ বলেছেন— আমি আবারও ধ্যানে বসেছিলাম, প্রভু! সেই ধ্যানের মধ্যে তোমার অরূপের মধ্যে রূপ দেখতে পেয়েছি, সেই মনোহরণ রূপ দেখে আমি মুগ্ধ-বিহ্বল হয়ে গেছি, প্রভু। আমার এই বিকলতা তুমি ক্ষমা কোরো। ব্যাস যে রূপ দেখতে পেয়েছিলেন, সেই রূপের ব্যাখ্যান হল মহাভারত, ভাগবত পুরাণ।
মহাভারতে কী আছে? ব্যাস বলেছেন— এখানে এই মহাভারতের আদিতেও অবস্থান করছেন বাসুদেব কৃষ্ণ, মধ্যেও কৃষ্ণ এবং অন্তভাগেও সেই কৃষ্ণ— আদাবন্তে চ মধ্যে চ বাসুদেবো’ত্র কীর্ত্যতে। এটা ভীষণ রকমের সত্যি কথা। মহাভারতের অনুভবী পাঠক-মাত্রেই এটা জানেন যে, মহাভারত যতই পাণ্ডব-কৌরবের বিসংবাদের কথা হোক, এই মহাকাব্যের ‘সেন্ট্রাল ফিগার’ হলেন কৃষ্ণ। মহাভারতের কাহিনি আরম্ভ হওয়া থেকে শেষ পর্যন্ত আপ্রবন্ধ স্থায়িভাবের মতো কৃষ্ণ আছেন সর্বত্র, কোনও না কোনও ভাবে। সম্পূর্ণ মহাভারত-কাহিনি লেখার পর ব্যাস বিস্ময়-মুকুলিত-নেত্রে অনুভব করেছেন— এমনই বুঝি হওয়া উচিত সেই রূপবিবর্জিত জ্যোতিস্বরূপের রূপকল্পনা। ধ্যানগম্য সেই অনির্বচনীয়-স্বরূপের রূপকল্প যে এটাই, সেটা মহাভারতের মধ্যে ভগবদ্গীতার বিশ্বরূপ উপন্যস্ত করে নিজেরই একান্ত অনুভূতি ব্যাস প্রকাশ করেছেন অর্জুনের মধ্যে দিয়ে।
ভগবদ্গীতায় কর্মযোগের শেষে জ্ঞানযোগে সেই অরূপ-অশব্দ পরব্রহ্মের সমস্ত লক্ষণ নিঃশেষে বলার পর কৃষ্ণ বিশ্বরূপ ধারণ করেছেন অর্জুনের সামনে। অর্জুন সেই বিশ্বরূপের মধ্যে সব দেখতে পাচ্ছেন। সৃষ্টিকর্তা ভগবান ব্রহ্মা থেকে মুনি-ঋষি, দেব-মনুষ্য, পশু-পক্ষী, কীট-পতঙ্গ সব দেখতে পাচ্ছেন। অর্জুন বুঝতে পারছেন—এর আদি নেই, অন্ত নেই, মধ্যদেশ বলেও কিছু নেই— নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং / পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ। অর্জুন হঠাৎই এই রূপ দেখে এক দিকে যেমন আকস্মিকতার বিভ্রান্তি অনুভব করছেন— বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে— তেমনি তিনি ভয়ও পাচ্ছেন সমান ভাবে। তিনি বলছেন— তোমার এমন সর্বগ্রাহী বিরাট রূপ তো কোনও দিন দেখিনি, তাতে একটা আনন্দ হচ্ছে বইকী? কিন্তু আমি ভয়ে কষ্ট পাচ্ছি অনেক বেশি— ভয়েন চ প্রব্যথিতং মনো মে। দেবতার দেবতা আমার! তোমার এই রূপ আর দেখতে চাই না। তুমি সেই রূপ দেখাও যেরূপে আমি তোমায় চিনতাম— তদেব মে দর্শয় দেব রূপম্।
বস্তুত অর্জুন যে এত কিছু দেখছেন একই জায়গায়— এই ব্যাপ্তি মানেই এক ধরনের শূন্যতা অরূপ এবং নির্গুণ নিরাকারের আসল ঠিকানা সেখানেই। অর্জুন একবার বলেও ফেলেছেন— আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, কোনও কিছুই এখানে মাপা যায় না, তুমি অপ্রমেয়, যা দেখছি তা অনেকটা আগুন আর সূর্যের মিলিত জ্যোতির মতো দুর্নিরীক্ষ্য, আমি তেমনই দেখছি। অথচ এই বিশ্বের তুমি আশ্রয়— পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষ্যং সমন্তাদ্ / দীপ্তানলার্ক-দ্যুতিমপ্রমেয়ম্। সত্যি বলতে কী, উপনিষদগুলি একদিকে যেমন পরম ব্রহ্মকে নিরাকার, নির্বিশেষ, নিরুপাধি বলছে, তেমনই অন্য দিকে বলছে— এই আত্মা ব্রহ্ম, তিনি আকাশের মতো নির্মল। এই সমস্ত তাঁরই কর্ম, সমস্ত কামনা তাঁরই কামনা, সমস্ত গন্ধই তাঁর গন্ধ, সমস্ত রসই তিনি, সমস্ত জগতে যিনি পরিব্যাপ্ত— আকাশাত্মা সর্বকর্মা সর্বকামঃ সর্বগন্ধঃ সর্বরসঃ সর্বমিদমভাত্তঃ। (চলবে)