এই যে সবই তিনি, অথচ কোনওটাই তিনি নন— এই অনির্বচনীয়তা, এই বিভ্রান্তি যখন আমাদের পাগল করে তোলে— একজন দার্শনিক কিন্তু সেখানে শান্ত দৃষ্টিতে সত্যটা বোঝাতে পারেন, এমনকী একজন পদার্থবিদ্যাবিদ ফিজিসিস্ট আবার সেখানে দার্শনিক হয়ে ওঠেন। পদার্থবিদ্যার অন্যতম গুরু যাদবপুরের দীপক ঘোষ আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেছিলেন— দ্যাখো, অর্জুনের অবস্থাটা বলে দিয়েছেন Pascal. তিনি বলেছেন— Man is incapable of seeing the ‘nothingness’ from which he emerges and the ‘infinity’ in which he is engulfed.
হয়তো এই শূন্য-দর্শন অথবা সর্বব্যাপ্তির এই শূন্যতা অর্জুন সহ্য করতে পারেননি বলেই তিনি পরিচিত স্বরূপে ছোটর মধ্যে বড়কে দেখতে চেয়েছেন। বিশ্বরূপী ভগবানকে তিনি বলেছেন— না হয় তোমার ওই চতুর্ভুজ মূর্তিটাই আমাকে দেখাও। বেদ-উপনিষদ পড়ে-শুনে ওই রূপটি আমার চেনা। এই সহস্রবাহু শশী-সূর্য-নেত্র চেহারাটা আমি বুঝি না— তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন / সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে। কৃষ্ণ আর দেরি করেননি, তিনি তখনই আপন সখ্যমূর্তিতে সৌম্য-সুন্দর হয়ে দাঁড়ালেন অর্জুনের সামনে— ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা।
ব্যাস মহাকবির নিজের হাতে লেখা মহাভারতের মধ্যে ভগবদ্গীতার অংশে অর্জুনের এই উদাহরণ মনে ছিল বলেই তিনি নিজে রূপবিবর্জিত নিরাকারের পূর্ণ প্রতিভাসে পরম ঈশ্বরের মূর্তি কল্পনা করলেন। তিনি জানেন— ধরাধাম থেকে কৃষ্ণ, অর্জুন, যুধিষ্ঠিরেরা চলে গেলে তাঁদের আকার, চরিত্র, রূপ, গুণ মনে রাখতে পারবে না কেউ। আর মানুষের এমন সাধ্যও নেই যে, কৃষ্ণ, রামচন্দ্র, কিংবা চৈতন্যদেব যখন ধরাধামে থাকবেন, তখনই তাঁদের সমকালে সকলেই জন্ম নেবেন। ব্যাস তাই পরম ঈশ্বরের মূর্তি কল্পনা করে বললেন— এই বিগ্রহের মধ্যেই তিনি আছেন।
এখানে নিশ্চয়ই অনেকেই হাঁ-হাঁ করে চেপে ধরবেন আমাকে। বলবেন— এই সেই পৌত্তলিকতা অর্থাৎ পুতুল-পুজোর প্রশস্তি আরম্ভ করলেন আপনারা। আমি এখানে এতটুকুও বিবাদে যাব না, তর্কও করব না একফোঁটা। কেননা তর্কযুক্তি দুই পক্ষেই আছে, কিন্তু এখানে যাঁরা তাঁকে নিরাকার, নির্বিশেষ, পরম জ্যোতি হিসেবে অনুভব করেন, তাঁরা অভিজাত দার্শনিক হয়ে থাকুন, তাঁদের চরণে আমার প্রণাম। কেননা তাঁদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করলে আমি প্রথমেই বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করে পঞ্চাশ পা পিছিয়ে যাব। তার পরেই বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে ভগবান ব্যাসের গুণ গেয়ে বলব— রূপবিবর্জিত মহাজ্যোতির তুমি একটিমাত্র রূপ দেখিয়েই ক্ষান্ত হওনি, তুমি একই কৃষ্ণের দুই রূপ দেখিয়েছ। এক তাঁর ঐশ্বরিক রূপ, আর একটা তাঁর মাধুর্যময় রস-রূপ। মানুষের মন এই রূপ দেখে পরম ঈশ্বরকে মনুষ্যদেহের সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে।
এ কথা তো ঠিকই যে, মানুষই ঈশ্বরের রূপ দেয়, সে যে ভাবে ঈশ্বরের সজ্জা-অলঙ্করণ তৈরি করে সেটাই ঈশ্বরের সজ্জা হয়ে ওঠে, এমনকী খাদ্য-পানীয় মানুষ যে ভাবে যেটা পছন্দ করে ঈশ্বরকেও তাই খাওয়ায়— মানুষের অভীষ্ট পান-ভোজনই ঈশ্বরেরও পান-ভোজন হয়ে ওঠে। আমার মনে পড়ে আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে আমি আমার পিতাঠাকুর এবং আরও কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে নবদ্বীপের হরিবোল কুটিরে গেছি মুকুন্দদাস বাবাজির আশ্রমে। মুকুন্দদাসজি ছিলেন বহু বৈষ্ণবগ্রন্থপ্রণেতা বিখ্যাত হরিদাস দাসজির ছোট ভাই। আমরা আশ্রমে গিয়ে দেখলাম— বাবাজি কুটিরে নেই, তিনি ভিক্ষা করতে বেরিয়েছেন। বাবাজিমশায় স্বধর্মে কঠোর সাধক ছিলেন। রোগা-পাতলা চেহারা, কিন্তু ভীষণ পরিশ্রমী, সন্ন্যাসীর ধর্মেও ততটাই স্থিত যে, প্রতি দিন ভিক্ষান্নেই তাঁর ঠাকুর সেবা চলত। রান্নাও করতেন নিজেই।
আমরা সকাল দশটা নাগাদ ওঁর আশ্রমে উপস্থিত হবার পর কুটির-দুয়ার বন্ধ দেখে সামনে উঠোনেই বসে রইলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবাজিমশায় ফিরলেন ভিক্ষা সেরে। কুশল-বিনিময়, প্রণাম-বিনিময় শেষ হবার পর বাবাজির মধ্যে খানিক অস্থিরতা লক্ষ্য করলাম এবং আমরা সকলে আছি দেখেই তিনি ঠাকুর-ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বললেন— আপনারা আরও একটু বসুন, দুপুরে মধ্যাহ্ন করে তার পর যাবেন। আমি একটু আসছি। খুব বেশি দেরি হল না অবশ্য। মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যেই ফিরে এলেন মুকুন্দদাসজি। আমরা বুঝলাম— তিনি অতিথি-সমাগম দেখে দ্বিতীয়বার ভিক্ষায় বেরিয়েছিলেন। বাবাজি-মশায়ের ভোগরান্না আরম্ভ হল। তিনি রান্নাও করছেন, আবার মাঝে মাঝে এসে আমাদের সঙ্গে কথাও বলছেন এবং বিভিন্ন ভাগবত-প্রসঙ্গও আলোচিত হচ্ছিল কথা-প্রসঙ্গে।
ভোগরান্না শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। ঠাকুর-ঘর বন্ধ করে খানিক ভোগারতির কীর্তন শুরু হল— ভজ পতিতোদ্ধারণ শ্রীগৌরহরি…। ভোগান্তে, প্রণামান্তে আমরা খেতে বসলাম এক তমাল-তরুর তলে। মুকুন্দদাসজির আশ্রম-প্রাঙ্গণে বিশালছায়া তমাল-তরুটিকে আমি আজও ভুলিনি। মুকুন্দদাসজি আমাদের প্রথম পাতে পরিবেশন করলেন— তিন চামচ করে বাড়িতে তৈরি-করা সুগন্ধী ঘি। বললেন— এক ভক্ত মহাপ্রভুর সেবার জন্য এই ঘি দিয়ে গেছে, আজ আপনাদের মতো ভক্তদের সেবায় এই ঘি লাগল বলে আমি আজ কৃতার্থ। তা না হলে কী করতাম আমি এই দেবভোগ্য বস্তুটা নিয়ে। আমরা বললাম— আপনার এই অমৃত-মধুর বস্তুটি জলে গেল। বরঞ্চ প্রতি দিন একটু একটু করে মহাপ্রভুর সেবায় লাগাতেন, সেই তো ভালো ছিল।
মুকুন্দদাসজি বললেন— আমার প্রভু ভক্তপ্রাণধন। তিনি সদাই অপেক্ষা করেন কবে তাঁর মনোমতো ভক্তরা আসবে, আজ আমাকে সেই সুযোগ দিলেন প্রভু। নইলে আমার তো এই রোগা-পাতলা শরীর, কুত্তার পেটে ঘি সহ্য হয় না। ভক্তের দেওয়া ঘি, ভক্তদের সেবায় লেগে গেল। বাবাজি-মশায় দ্বিতীয় পাতে একটা দশ-মিশেলি ডাল পরিবেশন করলেন। ভিক্ষার ডাল একেক বাড়ি থেকে এক-এক রকম দিয়েছে— খেসারি ডাল থেকে মুগ, ছোলা, মাষ, মটর কিছুই বাদ নেই, এমনকী ঘুগনি কলাইও গোটা-গোটা মুখে পড়ল ডাল-ভাত খাবার সময়। এ বার তৃতীয় পাতে কালচে-সবুজ একটা বস্তু দিলেন বাবাজি-মশায়; সে অল্পখানিক দিয়েই অনেকটা ভাত মাখা যায়, সঙ্গে একটি করে কাঁচা লঙ্কা। কালো জিরে ফোরন দেওয়া সেই বস্তুটি দেখে মনে হল— কিছু একটা বেটে সেটা সামান্য ভেজে দেওয়া হয়েছে।
সেই ঘন-শ্যাম বস্তুটি দিয়ে ভাত মাখাতে আরম্ভ করলেই বাবাজি-মশায় বললেন— আমি আরও একটু ভাত দিই, পুরোটাই এটা দিয়ে মাখিয়ে নিন, আমার আর কিছু নেই আপনাদের পাতে দেবার মতো। আজ্ঞা পালন করে খেতে আরম্ভ করলাম এবং দেখলাম বস্তুটি চমৎকার খেতে। ওই রকম বিশেষ এবং বিচিত্র আস্বাদনের একটা খাদ্যবস্তু লাভ করে আমাদের জিজ্ঞাসা তৈরি হল— কী খাচ্ছি আমরা? প্রশ্ন শুনে মুকুন্দদাসজি বললেন— এই যে তমাল-গাছের ছায়ায় আপনারা বসে আছেন, এই গাছের বেশ কিছু পাতা তুলে আমি নিফাস করে বেটেছি। আজ আমার প্রভুর ইচ্ছে হল তমাল-পাতা-বাটা খাবেন, তাই আজও তাঁর সেবায় লাগালাম। তাঁর ভক্তরা আজ প্রসাদ পেলেন, এই আমার আনন্দ।
বাবাজির কথা শুনে সবাই হরিধ্বনি দিল বটে, কিন্তু আমার মতো দুষ্ট-প্রকৃতি মানুষের কিছু প্রশ্ন থেকেই গেল। প্রসঙ্গত বলি, মুকুন্দদাসজির সঙ্গে আমার যখন দেখা হয়েছে, তখন আমি সদ্য স্নাতক স্তরে পড়তে ঢুকেছি। তিনি বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন এবং হয়তো সেই কারণেই আমার সঙ্গে তাঁর একটা বিষম সখ্যতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বাবাজিমশায়ের বড় ভাই বিখ্যাত হরিদাস দাসের গ্রন্থগুলিতে আমার প্রগাঢ় কৌতূহল দেখে এই সংস্কৃত-পড়া বাচাল যুবকের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল মাত্রাছাড়া। এমন অনেক কথাই তাঁকে আমি বলতাম, যা অন্যেরা তাঁকে বলার সামান্য সাহসও করত না। তাঁর প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধাটাও তিনি অনুভব করতেন। (চলবে)