আমিই তমাল-পাতা-বাটা চতুর্মুখে খেয়ে বাবাজিমশায়কে বললাম— আজই আপনার মহাপ্রভুর তমাল-পাতা-বাটা খাবার ইচ্ছে হল, তাই না? আচ্ছা প্রভু! এ বার আপনি বলুন তো— আমাদের দেখেই তো আপনি তড়িঘড়ি দ্বিতীয় বার ভিক্ষায় বেরোলেন। কিন্তু সে ভাবে আপনি ভিক্ষা আর পেলেন না, মানে আপনার মহাপ্রভু আর জোটালেন না বেশি কিছু। ফলে তরি-তরকারি দিয়ে আপনি যে, এক কড়াই লাবড়া রাঁধবেন, সেটা আর হল না। ভাগ্যিস সেই বেগুন-মুলো, আলু-পটল আপনি পাননি, যার জন্য আজ অগত্যা আপনাকে তমাল-পাতা বাটতে হল, যেটা আপনি মহাপ্রভুর খাবার ইচ্ছে বলে চালাচ্ছেন। তবে হ্যাঁ, এটা প্রভুর ইচ্ছাই বটে, তা নইলে এমন অপূর্ব এই খাদ্য থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম। আপনার কাছে প্রার্থনা— আমরা কাল-পরশু আবার আসব এবং আপনার মহাপ্রভুর যেন আবার এই তমাল-পাতা-বাটা খেতে ইচ্ছে হয়।
বাবাজিমশায় ধরা পড়ে গেছেন বলে আমার কথার খুব প্রতিবাদ করলেন না। শুধু বললেন— পরের দিন আমার প্রভুর কী খেতে ইচ্ছে হবে, সে কথা কি আগে থেকে বলা যায়! ওই যে এক ভক্ত গাওয়া ঘি দিয়ে গেল, তেমনই একদিন হয়তো এক সের ছানাও নিয়ে আসতে পারে সে, তো সে দিন আমি প্রভুকে ছানার রসা খাওয়াব। আমি ফুট কেটে বললাম— তা হলে এটা স্বীকার করুন আগে যে, আপনার যে দিন ছানা জুটছে, সে দিন আপনি প্রভুকে ছানার রসা খাওয়াচ্ছেন, আর যে দিন সেটা জুটল না, সে দিন আপনি প্রভুকে তমাল-পাতা-বাটা খাওয়াচ্ছেন, আর তার পর বলছেন— আজ আপনার মহাপ্রভুর তমালপাতা খাবার ইচ্ছে হয়েছে, তাই আপনি সেই ব্যবস্থা করছেন।
আমার মুখ-ঝামটা শুনে মুকুন্দদাসজি কেমন থতমত খেয়ে গেলেন। তার পর বেশ একটু রাগতস্বরেই আমাকে খানিক কটু ভাষাতেই কথা বলা আরম্ভ করলেন। কিন্তু আমি তাঁকে কথা বলার কোনও সুযোগ না দিয়েই বললাম— শুনুন বাবাজিমশায়! আমি সব বুঝি। আমরা এতগুলি লোক সকাল দশটায় আপনার আশ্রমে এসেছি; আপনার প্রভুর প্রসাদ জল-বাতাসাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু না আপনি আমাদের মাধ্যাহ্নিক প্রসাদ না খাইয়ে ছাড়বেন না। তার জন্য আপনি দ্বিতীয়বার ভিক্ষায় বেরোলেন। কিন্তু কাঁড়া-নাকাঁড়া ভিক্ষের চাল তো কিছু আপনার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ছিল খানিক। কিন্তু তবু আপনি এই হাড়-জিরজিরে শরীর নিয়ে ভিক্ষা করতে বেরোলেন। তরি-তরকারি কিছু পেলেনও না, পেলেন একখানা মিষ্টি কুমড়ো। কিন্তু সেটা খানিক কাঁচা রয়েছে বলে অখাদ্য-বোধে আপনি রসুই করলেন না। আপনি বসে বসে কষ্ট করে এতখানি তমাল-পাতা বাটলেন। আপনি কী ভাবেন, আপনার এই পরিশ্রমটা আমাদের সহ্য হল! আবার এই পরিশ্রম করার পর আপনি বলছেন— আপনার মহাপ্রভুর আজ তমাল-পাতা-বাটা খাবার ইচ্ছে হয়েছে। খাওয়া এবং খাওয়ানোর ব্যাপারে আমাদের নিজের ইচ্ছেগুলি কত দিন আর মহাপ্রভুর ওপর চাপাবেন?
বাবাজিমশায় কিন্তু এ বার আর রাগ করলেন না। বরঞ্চ খুব বিজ্ঞানসম্মত ভাবে বললেন স্মিত হেসে। বললেন— এটা তুমি খুব বড় কথা বলেছ ভাই। আমরা নিজেরা যখন যা খেতে চাই, সেটাই আমরা ঠাকুরের ওপর চাপাই। এখানে অনেকটাই আমাদের বৈষ্ণবীয় শিষ্টাচার কাজ করে। এই ভাবেই আমাদের বলা অভ্যেস। খুব সুখাদ্য বস্তু যদি পাই, তখনও তো এটাই বলি যে, আজ প্রভুর সরভাজা খেতে ইচ্ছে হয়েছে, তাই তো অমুক ভক্ত এটা দিয়ে গেল। আমরা ভিখারি মানুষ, ভিক্ষায় জীবন চলে সেখানে সুখাদ্য পেলে যেমন মহাপ্রভুর দোহাই দিই, তেমনই বিপদে পড়লে তমাল-পাতা-বাটার ব্যবস্থা করে বলি যে, প্রভুর আজ এটাই খাবার ইচ্ছে হয়েছে। আমি আজ কুমড়ো সেদ্ধ ভাতে দিতে পারতাম, কিন্তু ওই যে পাতা-বাটার পরিশ্রমটুকু করলাম— ওই চেষ্টাটুকুই আমার দিক থেকে আতিথেয়তার মর্যাদা পায়, প্রভু সেই আর্তি, চেষ্টাটুকু দেখতে পান বলেই আমরা বলতে পারি— আজ আমার প্রভুর তমাল-পাতা-বাটা খাবার ইচ্ছে হয়েছে।
আমি বললাম— তা হলে এটা স্বীকার করলেন তো যে, ঠাকুর খেতে চান না, আমরা যা খেতে চাই, সেটা আমরা মহাপ্রভুর নামে চালাই। মুকুন্দদাসজি এ বার আর মামুলি কথায় গেলেন না। এ বার তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল সেই দার্শনিক শব্দরাশি, যা আমাদের দ্বৈতবাদী দেবতার দার্শনিক প্রতিষ্ঠা তৈরি করে। মুকুন্দবাবাজিমশায় কৃপাসুন্দর চক্ষে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন— এটা খুব সত্যি যে, আমরাই ঠাকুরকে খাওয়াই এবং আমাদের যেটা খেতে ভালো লাগে, সেটাই আমরা দেবতাকে খাওয়াই। যার বাড়িতে যেমন আছে, যেমনটা যে যতটুকু দিতে পারে, দেবতার খাদ্যও সেটাই। দেবতার কোনও বাঁধা খাবার থাকতে পারে না, কেননা মানুষ এক রকম নয়, তাতে আবার ভক্তের বিত্ত, ধন, ইচ্ছা, উন্মাদনাও পৃথক, দেবতার খাদ্যও তাই পৃথক। মানুষের বৃত্তি, বৃত্ত এবং ক্ষমতা যার যে রকম, দেবতার খাদ্যও সেই রকম এবং এ কথাটা বলেছেন স্বয়ং রামচন্দ্র। বাল্মীকির রামায়ণেই কথাটা আছে।
একজন অনুভবী বৈষ্ণবাচার্যের মুখে এই কথা শুনে আমরা উদগ্রীব হলাম মুকুন্দদাসজির মুখোদ্গীর্ণ শাস্ত্রকথা শোনার জন্য। তিনি বললেন— আমি কী বলব, মুখ্যু মানুষ! এ কথা শুনেছিলাম আমার দাদা হরিদাস দাসজির কাছে। তিনি বলেছিলেন— ভরত-শত্রুঘ্নরা বনবাসী রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন তাঁকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু সেই প্রস্তাব রাখার আগেই ভরত যখন রামকে পিতার মৃত্যুসংবাদ দিলেন, তখন বনবাসে থাকলেও রামচন্দ্রের প্রথম কৃত্য দাঁড়াল— পিতার উদ্দেশে জলতর্পণ করা এবং তাঁর আহার হিসেবে একটা পিণ্ড দান করা। কিন্তু বিজন বনের মধ্যে কী পাবেন রামচন্দ্র। কিন্তু ওই যে লৌকিক ভাবনা— অলৌকিক দেবতার প্রিয়সাধন করার জন্য মানুষ যা পারে সেটাই দেয় তাঁকে— এই ভাবনা থেকেই রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে বললেন, ভাই— এই বনের মধ্যে যা পাওয়া যায়, তুমি ইঙ্গুদি-ফল তুলে আনো কতগুলি। সেগুলিই খানিক পাথরে ছেঁচে ‘পিণ্যাক’ তৈরি করে পিতার পারলৌকিক পিণ্ড দান করব। তুমি তার সঙ্গে একটা গাছের নতুন বাকলের ব্যবস্থাও কর— আনয়েঙ্গুদি-পিণ্যাকং চীরমাহর চোত্তরম্।
লক্ষ্মণ ইঙ্গুদি-পিণ্যাকের ব্যবস্থা করলে রামচন্দ্র কুশগাছির ওপর যেমনটা আমরা এখনও করি— সেগুলি সাজিয়ে ফেললেন। তার পর পিণ্ডাকৃতি তৈরি করে তার মধ্যে রামচন্দ্র বন্য পাকা কুলও চটকে দিলেন খানিক— ঐঙ্গুদং বদরৈর্মিশ্রং পিণ্যাকং দর্ভসংস্তরে। এ বার পিতার উদ্দেশে সেই কুল-মাখা পিষ্ট ইঙ্গুদি-পিণ্যাক নিবেদন করে রামচন্দ্র পিতা দশরথের উদ্দেশে বললেন— মহারাজ! আপনি নিজগুণে প্রীত হয়ে আমার দেওয়া এই খাদ্যবস্তু গ্রহণ করুন। আমরা যা খাই, তাই আপনাকে দিলাম— ইদং ভুঙ্ক্ষ মহারাজ প্রীতো যদশনা বয়ম্। ঠিক এর পরেই রামচন্দ্র যেটা বললেন, সেটাই কিন্তু দেবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় আত্মবোধ। রামচন্দ্র বলেছেন— আমরা যা খাই, সেটাই তোমাকে দিতে পারছি এই জন্যই যে, আসলে মানুষ যা নিজে খায়, সেটাই দেবতাকে খেতে দেয় এবং দেবতাও সেই খাদ্যই খান— যদন্নঃ পুরুষো ভবতি তদন্নাস্তস্য দেবতাঃ।
মুকুন্দদাস বাবাজিমশায়ের কথাটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় এক সমাহিত তর্ক ছিল, যা সবচেয়ে বড় বাস্তবও বটে এবং তা ভারতবর্ষের মানুষের সঙ্গে অলৌকিক দেবতার সবচেয়ে মধুর সম্পর্কসেতু। স্বয়ং রামচন্দ্র, যিনি নরলীলায় এই বাস্তবটুকু বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ দেবতার ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে ঠাকুর-ভোগ রান্না করে খাওয়ায় না; বরঞ্চ মানুষ নিজে যা খায় বা খেতে চায়, সেটাই সে ঠাকুরকে খাওয়ায় এবং ঠিক এইখানেই পিতৃদেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত রামচন্দ্রের ইঙ্গুদি-বদরী, আর মহাপ্রভুর ইচ্ছে হওয়া মুকুন্দদাসজির তমাল-পাতা-বাটা একাকার তত্ত্ববস্তু হয়ে ওঠে। (চলবে)