আসলে এটাকে তত্ত্ববস্তু বলছি এই কারণে যে, মানুষই তার দেবতার ভোগ নিরূপণ করে। এ কথা খাদ্যবস্তুর সম্বন্ধে যেমন সত্য, তেমনই তাঁর রূপ, তাঁর সাজ-সজ্জা, এমনকী তাঁর বিশেষ বিশেষ কর্ম সম্বন্ধেও সত্য। এই যে নিরাকার, নির্বিশেষ সম্পূর্ণ রূপবিবর্জিত এক পরম জ্যোতিকে বিশেষ বিশেষ নাম-রূপের মধ্যে বেঁধে ফেলা— এটাই সেই মহান চিত্রকর মহাকবির কাজ। তিনি যদি ভগবান কৃষ্ণের ‘কুঞ্চিতাধর-পুটে’ মধুর মুরলীটি না দিতেন, তা হলে কেমন হত আমাদের বহুনিন্দিত এই পৌত্তলিকতার পরম আস্বাদন। তিনি যদি বাগীশ্বরী সরস্বতীর হাতে একটি বীণা না দিতেন, তা হলে কেমন করে স্ফুরিত হত সঙ্গীত এবং সাহিত্য একত্তর ব্যঞ্জনায়, তিনি যদি লম্বোদর গণেশের শনির দৃষ্টিপাত না ঘটাতেন, তা হলে কোথায় পেতেন সেই গজমুখ, যেটা এক চিত্রকরের মানসলোক আধুনিকতায় আলোকিত করে দিয়েছে আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে।
মহামতি ব্যাস তির্যক ব্যঞ্জনায় যে দোষ স্বীকার করে বললেন— আমাকে ক্ষমা করো প্রভু! আমি তোমার রূপ-বিবর্জিত জ্যোতি-স্বরূপের রূপ সৃষ্টি করেছি— আমরা বলি— ভাগ্যিস! তোমার মতো এক মহাকবি ছিল ভারতবর্ষে! তুমি নইলে ভারতবর্ষের সমস্ত মানুষের মনের কথা এমন করে কে বুঝত। ঈশ্বরের যে মধুর রূপ তুমি সৃষ্টি করেছ, সেটা তো সর্বসাধারণ মানুষের ইচ্ছের রূপ। যে মহাকবি বলেছিলেন ‘ইচ্ছে হয়ে ছিলি মনের মাঝারে’— দেবতার রূপ সেই শত শত মানুষের ইচ্ছের রূপ। মানুষই তাঁকে গড়েছে আপন অন্তর দিয়ে। গ্রিক দার্শনিক জেনোফেনিস লিখেছিলেন— গরু, কিংবা ঘোড়া, অথবা সিংহের যদি হাত থাকত, কিংবা এমনও যদি হত যে, তাদের হাত নেই, শুধু পা দিয়েও তারা ছবি আঁকতে পারত, তা হলে মানুষ যা পারে, তারাও সেই কাজই করত; অর্থাৎ গরু যদি দেবতার ছবি আঁকত, তা হলে সে দেবতার চেহারা হত গরুর মতোই; ঘোড়া যদি তার দেবতার ছবি আঁকত, তা হলে সে দেবতার চেহারা হত ঘোড়ার মতোই; আর সিংহ যদি আঁকত তার দেবতাকে, তা হলে সে দেবতার রূপও হত সিংহের মতোই; মানুষ নিজের আদলেই তার দেবতার চেহারা বানিয়েছে— They would make the god’s bodies the same shape as their own… men create the gods in their own image.
পণ্ডিতেরা বলেছেন— জেনোফেনিস একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন বলেই এমন তির্যক মন্তব্য করেছেন। আমরা বলি— ভারতবর্ষের দার্শনিকেরা এই সব একেশ্বরবাদীদের পিতা হতে পারেন। মহামতি ব্যাস; যিনি ব্রহ্মসূত্র রচনা করে একেশ্বরবাদ, অদ্বৈতবাদ নিঃশেষ পান করে ফেলেছিলেন, তিনিই কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখলেন— তত্ত্ববিদ মানুষেরা অদ্বয় জ্ঞানের তত্ত্বটাকে তিনি ভাবে সন্বোধন করেন— ঔপনিষদিক জ্ঞানী মানুষেরা তাঁকে বলেন এক এবং অদ্বয় ব্রহ্ম, সাংখ্য যোগীরা তাঁকে বলেন পরমাত্মা, আর ভক্তেরা তাঁকে বলেন ভগবান—
বদন্তি তৎ তত্ত্ববিদস্তত্ত্বং যজ্জ্ঞানমদ্বয়ম্।
ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দ্যতে।।
এই যে ভক্তের ভগবান— এইখানেই তো নিরাকার নির্বিশেষ ব্রহ্ম-ভাবনার ক্লান্তি থেকে ‘অখিল-রসামৃত-মূর্তি’-ভাবনার উল্লাস সৃষ্টি হয়; শান্ত সমুদ্রের নিশ্চেষ্ট বিশ্রান্তি থেকে তরঙ্গিত সমুদ্রের নব-নবায়মান রূপবৈচিত্র্যের আস্বাদন তৈরি হয়— আমার হৃদয় হইতে তোমার হৃদয়ে। অদ্বৈতবাদ, একেশ্বরবাদের অবশেষ তৈরি হয় আমি-আমি করে— আমিই ব্রহ্ম— সো’হম্; আমিই তিনি— অহং ব্রহ্মাস্মি; অথবা তুমিই সেই ব্রহ্ম। গুরু বলবেন— তিনিই তুমি— তত্ত্বমসি। তোমার মুক্তি হয়ে গেল, তুমি মিশে গেলে সেই বিরাটের মহিমার মধ্যে, জীবাত্মা পরমাত্মায় মিশে গেল, ছোট আমি বিলীন হয়ে গেল বড় আমির মধ্যে। এত আমি-আমি, তিনিই তুমি শুনে ভাগীরথীর তীরে বসে সাধক রামপ্রসাদ কেঁদে বললেন— মাগো! নির্বাণে কী আছে ফল? (ও তো) জলেতে মিশায় জল, চিনি হওয়া ভালো নয় মন, চিনি খেতে ভালোবাসি।
ভক্তের রাজ্য এই রকমই। ভক্ত ভগবানের মধ্যে মিশে গিয়ে মুক্তি চায় না, সে তার প্রভুকে আস্বাদন করতে চায়। এক ভাবে এটাও কিন্তু অদ্বৈতবাদ। ‘স্বাদ’ কথাটার মানেই তো জানেন না অনেকে। ‘স্ব’ মানে নিজে স্বয়ং। আর ‘অদ্’ ধাতুর অর্থ খাওয়া— ‘স্বম্ অত্তি’— আমরা যখন নিজেকেই খাই তখনই স্বাদ পাই। কিন্তু নিজেকে আস্বাদন করতে একটা দ্বিতীয় মানুষ লাগে। খুব সাধারণ উদাহরণ হল আয়না। আমি নিজে কতটা সুন্দর, আমি নিজে কতটা ভালো, আমার মুখের মধ্যে কতটা ‘ইনোসেন্স’ আছে, কিংবা আমি এই ভাবে হাসলে আমাকে কেমন লাগে, এমনকী আমি মুখে ভেংচি কাটলেই বা কেমন লাগে, এ সব কিন্তু আয়নায় দেখেই আমরা নিজেকেই খাই, আস্বাদন করি। কিন্তু সমস্যা হল— আয়নায় দেখে যে আত্মরতি তৈরি হয়, তাতে আস্বাদনের চমৎকারিতা থাকে না, আস্বাদন তাতে পূর্ণ হয় না। চরিতামৃতের কবি লিখেছেন—
দর্পণাদ্যে দেখি যদি আপন মাধুরী।
আস্বাদিতে সাধ হয় আস্বাদিতে নারি।।
আসলে নিজেকে প্রাণহীন আয়নার মধ্যে দেখে নিজের সম্বন্ধে যে আস্বাদন হয়, সেটা অনেকটাই নিজের মুখে নিজের ঢাক পেটানোর মতো। তাতে এক প্রকারের স্বমেহনী আত্মতৃপ্তি হতে পারে, কিন্তু চরম সুখের কোনও আস্বাদন হয় না। এই কথাটা ভীষণ তির্যক ভাবে বলেছিলেন এক অসামান্য কবি। তিনি বলেছিলেন— নিজের গুণ নিজে বর্ণনা করার মধ্যে কোনও সুখও নেই, তাতে কোনও সৌভাগ্যেরও উদয় হয় না। তাই স্বমুখে স্বয়ং স্বগুণবর্ণনা করার ব্যাপারটা অনেকটাই সেই কুলরমণীর বদভ্যাসের মতো— যিনি ঘরে বসে নিজেই নিজের স্তনমর্দন করে সুখ পান— যথৈব চ কুলস্ত্রীণাং স্বয়ং স্বকুচমর্দনে।
অতএব আস্বাদনের জন্য দ্বিতীয় একজন প্রাণবন্ত মানুষই চাই, যার ‘বিশদীভূত মনোমুকুরে’ যখন তোমার ছায়া পড়ে, তাতে যখন তাঁর প্রাণ-মন-বাক্য উচ্ছ্বসিত, উদ্ভাসিত হয়, বস্তুত তখনই সেই উচ্ছ্বাস, সেই উদ্ভাস তুমি উপভোগ কর, তখনই তুমি নিজেকে খাও, নিজেকেই আস্বাদন কর— সেই রকম এক চরম আস্বাদনের প্রয়োজনেই মহাভক্ত মহাকবি গেয়ে ওঠেন— এবার কালী তোমায় খাব। এই রকম এক ‘অনাস্বাদিত-পূর্ব’ আস্বাদনের জন্যই বিদর্ভ দেশে বসে বৈদর্ভী রুক্মিণী দ্বারকার কৃষ্ণের উদ্দেশে পত্র লেখেন— তিন ভুবনের সেরা সুন্দর আমার! রুক্মিণী তখনও কৃষ্ণকে দেখেনইনি, তবু লেখেন— তিন ভুবনের সেরা সুন্দর আমার! তোমার অপার গুণরাশির কথা শুনতে শুনতে আমার শরীরের তাপ-জ্বালা জুড়িয়ে যায়। আর চক্ষুষ্মান ব্যক্তি, যাঁরা তোমার রূপ দেখে ‘সব পেয়েছি’ বলে ভেবেছে, তোমার সেই রূপের কথা শুনে আমার মতো কুলরমণীর সমস্ত লজ্জা চলে গেছে, আমার মন আবিষ্ট হয়ে গেছে তোমার মধ্যে— ত্বয়্যচ্যুতাবিশতি চিত্তম্ অপত্রপং মে।
দ্বিতীয় একজনের মধ্যে নিজেকে আবিষ্ট করেই কিন্তু রুক্মিণী নিজেকে আস্বাদন করছেন এবং সেই আস্বাদনের তীব্রতা এমনই যে, স্ত্রী-স্বভাবা রুক্মিণী তাঁর রমণীসুলভ লজ্জাটুকুও ধরে রাখতে পারছেন না। এখানে এই লজ্জা-বিসর্জনের মধ্যে যেমন ভক্তভাব আছে, তেমনই সেই ভক্তভাবের মধ্যেই আছে তাঁর অন্যতে বিলীন হওয়া— সেই পৌরুষেয় দর্পণ, যেখানে রমণী রুক্মিণী নিজের রমণীয়তা আস্বাদন করেন। এখানে সমস্যা একটাই— ভক্ত না হয় নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে নিজের ভক্তিরস আস্বাদন করল, সেখানে ভগবান কী করেন? তাঁরও কি ইচ্ছা হয় নিজেকে আস্বাদন করার? বিশেষত স্বয়ং ভগবান— তিনি তো সর্বশক্তিমান আত্মারাম পুরুষ, নিজের মধ্যেই তিনি সমস্ত আনন্দলাভ করতে পারেন। এক এবং অদ্বৈতের কোনও অপেক্ষা নেই দ্বিতীয়ের জন্য। (চলবে)