এখানে উপনিষদের মহাবাক্য হল— ভগবানকেও যদি নিজেকে আস্বাদন করতে হয়, তা হলে তাঁরও একজন দ্বিতীয় লাগে। উপনিষদের কথায় পরে আসি, আগে মহাজনের অনুভূতির কথা বলে নিই। চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রিয় পার্ষদ রূপ গোস্বামীর নাম শুনেছেন সকলেই। তিনি ললিত-মাধব নামে একখানি নাটক লিখেছিলেন। সেখানে রাধা-বিরহিত কৃষ্ণ এক স্থানে স্বচ্ছ মণিভিত্তির মধ্যে নিজেকে দেখতে পেলেন। তার পরেই চমকে উঠে বললেন— আরে মণিভিত্তিতে কার প্রতিফলন দেখছি! আরে, এ তো আমিই আমাকে দেখছি! কৃষ্ণ বললেন— আমি যে এত সুন্দর তা তো আমি জানতাম না। আমি নিজেকে তো নিজে এমন করে দেখিনি কখনও; আমার মনে হচ্ছে— আমাকে দেখে আমার রাধা যে ভাবে আমাকে উপভোগ করে, আমি নিজেকে সেই রাধার মতো আস্বাদন করতে চাই— অয়মহমপি হন্ত প্রেক্ষ্য যং লুব্ধচেতাঃ / সরভসমুপভোক্তুং কাময়ে রাধিকেব।
সত্যি কিন্তু এটা যন্ত্রণা, আমাদের প্রাণীদেহের অঙ্গ-সংস্থান এমনই যে, আমরা কেউ নিজেকে দেখতে পাই না। দেখতে হলে একটা প্রতিভাসী মুকুর লাগে, আর সে মুকুর যদি মানব-মুকুর হয়, তবে শুধু শরীরের প্রতিচ্ছায়া নয়, মানুষের মতো একটা আয়না পেলে তাতে কায়-মধুর ভগবানের কায়-মনোবুদ্ধি এবং ভাব সবটুকু ধরা পড়ে। ঠিক এই কারণেই কৃষ্ণ রাধা হয়ে কৃষ্ণকে ভোগ করতে চেয়েছেন। আর রাধা হয়ে কৃষ্ণকে উপভোগ করলে রাধার কেমন লাগে, তার উদাহরণ হয়ে আছেন চৈতন্য মহাপ্রভু—
রাধা-ভাব-কান্তি দুই অঙ্গীকার করি।
জনমিলা নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ শ্রীহরি।।
ভাব কথাটাই সব। ওই যে একটু আগে বলছিলাম— আস্বাদনের জন্য একজন দ্বিতীয়কে প্রয়োজন হয় এবং সেই প্রয়োজনেই আপন-আপন রুচি অনুসারে মানুষ আপন স্বরূপেই দেবতাকে দেখেছে, তার রূপ কল্পনা করেছে, দেবতার বাসভূমি রচনা করেছে এমনকী সেই সব কর্মও তাঁকে দিয়ে করিয়েছে, যা সে মনে করেছে দেবতারই করা উচিত। এই অদ্ভুত আস্বাদনের মানুষগুলি কিন্তু মুক্তি চায় না, কেননা মুক্ত হলে সে তার প্রিয়তম প্রভুকে আস্বাদন করতে পারবে না— জলের সঙ্গে জল মিশে যাবে, চিনির সঙ্গে চিনি। ভগবান যদি এঁদের জাগতিক দুঃখ-কষ্ট, সংসার-বন্ধন থেকে মুক্তি দিতেও চান, তবু তাঁরা মুক্তি নিতে চান না। তাঁরা বলেন— ভোগ-দুর্ভোগ যাই আসুক এই জীবনে, আমরা তার মধ্যে থেকেই ভগবানের সেবা করব। বরং তিনি দুর্ভোগ দিন আমাকে, তবু মুক্তি চাই না। ভাগবত পুরাণ বলেছে— এই মানুষগুলি এই রকমই পাগল, ওরা আমার সেবা করতে চায়, মুক্তি দিলেও এরা নেবে না— দীয়মানং ন গৃহ্নন্তি বিনা সৎসেবনং জনাঃ।
কাশ্মীরের এক আলঙ্কারিক মম্মটাচার্য তিনি রসশাস্ত্রের বিচার করতে করতে এক শিবভক্তের উদাহরণ দিয়েছেন। ভগবান শিব তাঁর সেবা-উপাসনা-তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ভাবলেন— সবাই তো মুক্তি পেলে চরম সুখী হয়, অতএব একে মুক্তিই দিয়ে দিই। তিনি শিবভক্তের মুখে কোনও কথা না শুনেই আগে তাঁকে মুক্তিলাভের বর দিয়ে দিলেন। এই মুক্তি-বর লাভ করার পর সেই শিবভক্ত কেঁদে-কেঁদে তাঁর সমস্ত অভিমান শিবের ওপরেই উগরে দিয়ে বললেন— এত কাল কত ছাই-ভস্ম মেখেছি গায়ে, আমার প্রভু শিবের অঙ্গরাগ, আমি ভস্ম মাখলে তিনি খুশি হবেন, তাই ভস্ম মেখেছি এত কাল, কিন্তু আজ থেকে আর মাখতে হবে না, অতএব এই ভস্মাঙ্গরাগ! তুমি ভালো থেকো। তোমারও মঙ্গল হোক। হে রুদ্রাক্ষের মালা, আর ধারণ করতে হবে না তোমাকে! সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে এই শিবমন্দিরে ওঠার সোপানগুলির জন্য— এই সিঁড়িগুলিই তো প্রতি দিন আমাকে এবং আর সমস্ত শিবভক্তদের পৌঁছে দিত আমার গিরিনন্দিনীর প্রিয়তম স্বামী মহেশ্বর শিবের মূর্তির সামনে। এই সিঁড়িগুলি আমি প্রতি দিন ধুয়ে-মুছে রাখতাম, আজ থেকে সে সব আর কিছুই করতে হবে না আমাকে, হায়! হা সোপান-পরম্পরা-গিরিসুতা-কান্তালয়ালংকৃতিম্!
শিবভক্ত এ বার সাভিমানে বলছেন— এত কাল আমি যে আমার প্রভুর সেবা-পরিচর্যা নিয়ে থাকতাম, প্রতি দিন শিব-শিবাণীর শিঙার, মন্দার-কর্ণিকার পুষ্পে তাঁদের মূর্তি ভক্তদের সামনে উজ্জ্বল করে রাখা, ভোগ-নৈবেদ্যের আয়োজন— এই সমস্ত সেবা-সপর্য্যার সুখ, আমার আরাধনায় তুষ্ট হয়ে আমার প্রভু আজ আমাকে সেই মুক্তি দিয়েছেন, সে মুক্তি আমার কাছে এক অন্ধকার মহামোহের মতো লাগছে, কেননা শিব-শিবাণীর সেবা-আরাধনা করে আমি যে পরম সুখ পেতাম, সেই সুখ থেকে আমাকে ছিন্ন করে নিয়ে এ কেমন এক তমসাচ্ছন্ন মুক্তির মধ্যে স্থাপন করলে তুমি— যুস্মৎ-সপর্য্যা-সুখাৎ / লোকচ্ছেদিনি মোক্ষনামনি মহামোহে নিধীয়ামহে।
এই শিবভক্তের মূর্তিসেবার আর্তি-কথা শুনে এ বার যদি সেই মহামতি ব্যাসের ‘বৈদগ্ধ্য-ভঙ্গি-ভনিতি’টুকু খেয়াল করি, তা হলে বুঝবেন যে, এই শিবভক্ত যে কারণে মুক্তির মতো এক সাধ্য বস্তুকে হেলায় প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, তার মূলে আছে ব্যাসের সেই দোষ— ব্যাস এক রূপবিবর্জিত অরূপের রূপ নির্ধারণ করেছেন— শুধু একটি মাত্র রূপ নয়— কৃষ্ণ, কালী, রাম, নৃসিংহ, বামন কত রূপ— রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব। ব্যাস দু’পক্ষের ইচ্ছে রেখেই এই রূপ সৃষ্টি করেছেন। বৃহদারণ্যকের ঋষি দেখেছিলেন যে, রসস্বরূপ পরম পুরুষ কিছুতেই আনন্দ পাচ্ছিলেন না। কেননা একাকী আনন্দ পাওয়া যায় না— স বৈ নৈব রেমে। তস্মাৎ একাকী ন রমতে। তিনি দ্বিতীয় একজনকে চাইলেন। তিনি নিজেকে দুই ভাগে ভাগ করলেন— তিনি পতি হলেন এবং পত্নী হলেন। তাঁরই উৎস থেকে পৃথিবীর যত মানুষ।
তিনি এক এবং অদ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে আস্বাদন করার জন্যই যেমন তিনি দ্বিতীয় হলেন, তেমনই সেই দ্বিতীয় যে মানুষ, সে-ও তাঁর কল্পনায় নিজেরই প্রতিভাসে সৃষ্টি করল ঈশ্বরের রূপ— আর অপূর্ব-নির্মাণ-নিপুণ সেই কবি দ্বৈপায়ন ব্যাস সেই রূপের মধ্যে সৌন্দর্য-মাধুর্য ঢেলে দিলেন শব্দ-বর্ণের যোজনায়। তার পর বললেন— আমার এই দোষটা তুমি ক্ষমা করে দিও প্রভু— আমি অরূপকে রূপময় করেছি। বিশ্বাস করুন, এটা শুধু ব্যাসের দোষ নয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যিক ক্রান্তদর্শীরা সর্বত্র এই কাজ করেছেন। তবু তো সেই দ্বীপজন্মা মহাকবি বেঁচে গেছেন— আমাদের দেশের অতিবুদ্ধি দার্শনিকদের অদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ, অচিন্ত্যভেদাভেদবাদের তর্কচক্রে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, পরম ব্রহ্মের কোনও আকার-প্রকার না থাকলেও ভক্তদের প্রয়োজনেই তাঁর রূপকল্পনা করা হয়— ‘উপাসকানাং কার্য্যার্থং ব্রহ্মণো রূপকল্পনা’। কিন্তু নির্বিশেষ ব্রহ্মবাদীরা এ সব ভক্ত-টক্তের ভাবনা মানবেন কেন! কবি তবু ঝগড়া করেন না। তিনি বলেন— ভুল হয়ে গেছে প্রভু ক্ষমা চাই।
তবু তো ব্যাস বেত্রাঘাত হজম করেননি। মহাকবি হোমারের ইলিয়াড-ওডিসিতে মানুষের সঙ্গে দেবতাদের মাখামাখি দেখে জেনোফেনিসের বছর পঞ্চাশেক পরেই হেরাক্লিটাস (Heraclitus) নামে এক গ্রিক দার্শনিক বললেন— এই হোমার লোকটা— গ্রিকদের মধ্যে জ্ঞানীতম মানুষ হতে পারেন বটে, কিন্তু এই লোকটাকে বিদ্যা-অবিদ্যার সমস্ত দার্শনিক চেষ্টার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আচ্ছা করে চাবুক মারা দরকার। আর চাবকানো দরকার ওই আর্চিলোকাস (Archilocus) নামের লোকটাকেও— হোমারের জুড়ি— Homer should be thrown out of contests and whipped— and Archilocus along with them. আমরা জানি বিখ্যাত Theogony-র লেখক Hesiod-কেও তিনি চাবুক মারতেই চাইতেন, কিন্তু আমাদের ধারণা হোমারের বহুল জনপ্রিয়তার বিপ্রতীপে হেসিয়ড-কে তিনি বেশি পাত্তা দিতে চাননি। কিন্তু গ্রিক দেব-দেবীর মূর্তি কল্পনায় হেসিয়ড-ও একটা বড় নাম। কিন্তু হোমারের তুলনায় হেসিয়ডকে কোনও গণ্যের মধ্যেই ধরেননি হেরাক্লিটাস। তিনি বলেছেন— হেসিয়ড লোকটা অনেক লোককে অনেক কিছু শেখায়, কিন্তু লোকটার দিন-রাত্রির জ্ঞান নেই। দিন আর রাত যে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, সেটা ও জানে না। ও ভাবে দিন আলাদা, রাত আলাদা।
আসলে হেসিয়ডের দোষ হয়েছিল— তিনি দিন আর রাতের ব্যাপারটাকে একটু কাব্য করে বলেছিলেন— রাতের অন্ধকার হল সেই রকম এক শক্তি যা দিনের আলোকে স্তব্ধ করে দেয়, নষ্ট করে দেয় মানুষের দৃষ্টি, ঠিক যেমন মৃত্যু শেষ করে দেয় জীবনকে। হেরাক্লিটাস এ সব কাব্য-কথা সইবেন না, তাই বলেছেন— হেসিয়ড লোকটার পড়াশুনো আছে, কিন্তু বুদ্ধি! বুদ্ধি থাকলে কিছু শিখত, কিছু বোধ করত অন্তত। আসলে হেরাক্লিটাসের রাগের কারণ অন্য জায়গায়— হোমার এবং হেসিয়ড দেবতাদের মনুষ্যোচিত ব্যবহারে বর্ণনা করেছেন, তাঁদের রূপকল্প তৈরি করেছেন, তাঁদের সুখ, দুঃখ, ক্রোধ, করুণা— এই সব মানবগুণ আরোপ করেছেন দেবতাদের আচারে। অন্তরীক্ষ-লোকের এক পরম শক্তিপুঞ্জকে এই রকম মানব ব্যবহারে আকারিত করার দোষেই হেরাক্লিটাস হোমার, আর্চিলোকাস অথবা হেসিয়ডকে চাবকাতে চেয়েছেন। অথচ গ্রিক ঐতিহাসিকতার জনক হেরোডোটাস তাঁর মহাকাব্যিক পূর্বসূরি হোমার আর হেসিয়ডের ওই দোষগুলিকেই মহাকবির গুণের কথায় আবর্তিত করে লিখেছেন— It is they – Hesiod and Homer – who created the Greek theogony, who gave the gods their epithets, distributed honours and aptitudes among them, and gave substance to their figures. (চলবে)