মদনমোহনের আর কথা বলার উপায় হল না। সনাতনেরর ঘুম ভেঙে গেল। তবে জেগে উঠে তিনি যে এতটুকুও অনুতপ্ত বোধ করলেন, তা নয়। যেমন প্রভু, তেমনই তাঁর ভক্ত। তবে এই কাহিনির বিশ্লেষণ যাঁরা করেন, তাঁরা বলেন— এই লবণের ব্যাপারে সনাতনের অনুৎসাহ যতখানি, তার চাইতে প্রভু মদনমোহনের উৎসাহ অনেক বেশি— তিনি তাঁর বিষয়-বিরাগী ভক্তকে অন্তত একটু স্বাদু চাপাটি খাওয়াতে চান। যে ভগবান ত্রিভুবনেশ্বর, যাঁর ভ্রুকুটিতে পৃথিবী আন্দোলিত হতে পারে, তিনিও কিন্তু এতটাই ভক্তপ্রেমের অধীন যে, অলৌকিক উপায়ে এক বস্তা লবণ এনে ফেলবেন সনাতনের পর্ণকুটিরে এমন সাহসও তাঁর নেই।
যাই হোক, রাত্রির স্বপ্নে সেই লাবণ্য-বিধুর ঘটনাটি পরের দিন একবার মাত্র সনাতনের মনে পড়ল দ্বিপ্রহরে বাটি-চাপাটি ভোগ নিবেদন করার সময়। প্রভু মদনমোহন হাসলেন মনে মনে। তার পর অপরাহ্নে একটা ঘটনা ঘটল চতুর-চূড়ামণি কৃষ্ণেরই কৌশলে। যমুনার স্রোতে চলতে চলতে কৃষ্ণদাস কাপুর, মতান্তরে রামদাস বণিকের জাহাজ আটকে গেল নদীর চড়ায়, ঠিক যেখানে টিলার ওপর এখনও মদনমোহন বিগ্রহের অবস্থান তার কাছাকাছি। এমনই আটকে গেল জাহাজ যে, সে আর কিছুতেই স্রোতে নামানো গেল না। মাঝিমাল্লাদের নিয়ে বণিক চেষ্টা করলেন, ব্রজবাসী যুবক রাখালেরাও অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু ছোট্ট জাহাজ, তাও যমুনার স্রোতে নিয়ে ফেলা গেল না। কৃষ্ণদাস কাপুর হতাশ হয়ে জানাল— তার বিপুল আর্থিক ক্ষতি হবে, যদি সময় মতো আগ্রায় গিয়ে তার জাহাজের মালপত্তর পৌঁছে না দিতে পারে। ব্রজবাসীরা বণিককে বলল— কোনও উপায় যখন নেই, তখন বৈরাগী সাধু সনাতনের কাছে কৃপা ভিক্ষে করো। ওই সাধুর কৃপায় অনেক কিছুই সম্ভব হতে পারে।
কৃষ্ণদাস কাপুর সনাতন গোসাইয়ের পায়ে গিয়ে পড়লেন। কিন্তু তাঁর মুখে বিষয়-আশয়, ধন-সম্পত্তির কথা শুনে খুব একটা কথা বলার রুচি বোধ করছিলেন না সনাতন। কিন্তু বণিক বার বার তার বিপদের কথা বলতে লাগল—জাহাজের মাল নিয়ে আগ্রা পৌঁছতে না পারলে তার সর্বনাশ হয়ে যাবে, সে ধনে-প্রাণে মারা যাবে। সনাতন অনেকক্ষণ বণিকের কথা শুনলেন, কিন্তু তবু ভজন-সাধন ছেড়ে, স্মরণ-বন্দন-অর্চন ইত্যাদি সাধন-মার্গের পথ ছেড়ে এই উটকো ঝামেলার মধ্যে তিনি যেতে চাইলেন না। সনাতন চুপ করে আছেন দেখে বণিক কৃষ্ণদাস হতাশ, হতোদ্যম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ফিরে যাবার পথ চেয়ে। বণিকের অবস্থা দেখে সনাতনের একটু মায়াই হল মনে। সামান্য একটা কৌতূহল থেকেই বণিককে একটা প্রশ্ন করে সনাতন বললেন— আচ্ছা বণিক! তুমি যে মালপত্তর আগ্রায় না পৌঁছালে ধনে-প্রাণে মরে যাবে বলছ, তা তোমার ওই জাহাজ-বোঝাই মালপত্তরটা কী? কী আছে তোমার জাহাজে?
বণিক শুকনো মুখে বলল— সাধুবাবা! আমার জাহাজ-ভর্তি লবণ আছে। শুধুই লবণ, যা আমাকে আগ্রায় বাদশাহের ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। সনাতন এ বার মনে মনে হেসে তাঁর বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে বললেন— ওরে রাখাল! এই তোর খেলা! লবণ দিয়েই বাটি-চাপাটি খাবি তুই! সনাতন এ বার কৃষ্ণদাস বণিকের দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে বললেন— এ বারে আমি বুঝেছি— কী করে তোমার এই বড় নৌকোখানি চড়া ছেড়ে ভেসে যাবে যমুনার স্রোতে। বণিক খুশিতে ডগমগ হয়ে আবার নুয়ে পড়ল সনাতনের পদতলে। মুখে বলল— কী বুঝেছেন? কেমন করে নামবে আমার ছোট্ট জাহাজখানি? সনাতন বললেন—তোমার আর কিছু করতে হবে না, সন্ধ্যা নামলে— আমার প্রভু মদন-মোহনের রাত্রিভোগ দিতে হবে। তুমি দু-চিমটি লবণ নিয়ে এসো। আমার প্রভুর ইচ্ছে হয়েছে— তিনি লবণ-মেশানো বাটি-চাপাটি খাবেন।
বণিক অবাক চোখে পরম লজ্জায় খানিক নুন এনে সনাতনের হাতে দিলেন। সনাতন এ বার আটায় নুন মিশিয়ে যমুনার জল দিয়ে আটা মাখলেন, তার পর বাটি-চাপাটি তৈরি করে ভোগ দিলেন মদনমোহনের। বণিক চাপাটি প্রসাদ পেয়ে জাহাজ ঠেলালেন মাঝিমাল্লাদের দিয়ে। সামান্য আয়াসেই লবণ-ভর্তি জাহাজ বয়ে চলল আগ্রার পথে। বাণিজ্য শেষ করে কৃষ্ণদাস কাপুর ফিরে এলেন সনাতনের কাছে। তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করে মদনমোহনের মন্দির নির্মাণ করালেন, যে মন্দির এখনও বৃন্দাবনে বিরাজমান।
আর সনাতনের কথাই ঠিক হল— তাঁর প্রভু মদনমোহন যতদিন সনাতনের পর্ণকুটিরে ছিলেন, ততদিন তাঁর বাটি-চাপাটিতে লবণও জোটেনি। সনাতন মুখে যতই তিরস্কার করুন ঠাকুরকে, নন্দ-যশোমতীর প্রাণারাম রাধারানির প্রাণসমান মদনমোহনের ভিক্ষাজীবীর জীবন সনাতন মনে মনে সইতে পারতেন না। তাই অযাচিত অর্থব্যয়ে যখন মদনমোহনের মন্দির নির্মাণ হল, তখন মদনমোহন লবণ ছেড়ে ঘি, ঘি ছেড়ে রাবড়ি খাওয়া ধরেছেন। আমরা সে প্রসাদ পাই, যেদিন বৃন্দাবনে ‘মুড়িয়া পুনোঁ’-র উৎসব হয়। বৃন্দাবনের ব্রজবাসীরা মুণ্ডিত-মস্তক সনাতন গোস্বামীকে আদর করে ‘মুড়িয়া’ অর্থাৎ ন্যাড়া সাধু বলে ডাকত। গুরুপূর্ণিমার দিন সনাতন গোস্বামীর তিরোভাব-তিথি। এইদিন সনাতন গোস্বামীর স্মরণে ‘মুড়িয়া’-র (মুণ্ডিত) মেলা হয় এখনও, এখনও সেদিন প্রভু মদনমোহনের আঙিনায় তাঁর প্রেমী ভক্ত সনাতনের স্মরণ-মনন-উৎসব চলে।
আমি শ্রীরূপের গোবিন্দজির কথা বলতে-বলতে তাঁর দাদা সনাতনের কথাটা তুললাম এইজন্য যে, ভক্তই ভগবানকে তাঁর মতো করে রূপ দেন, তাঁর ইচ্ছেতেই তাঁর অন্নপানের ব্যবস্থা নগণ্য থেকে রাজকীয় হয়ে ওঠে। আমার বিশ্বাস, রূপ গোস্বামীর গোবিন্দজির সেবা-পূজাও সনাতনের মতোই দারিদ্রে ভরা ছিল, এবং তিনি বেঁচে থাকতে গোবিন্দজির শ্রীবৃদ্ধি হয়নি তেমন। রঘুনাথ ভট্টের এক শিষ্যের কল্যাণে গোবিন্দজির গলায় হার ওঠে, একটা সোনার বাঁশি জোটে ‘কুঞ্চিতাধরপুটে’, কানে ওঠে মকরকুণ্ডল। তার পর সেই ‘ধন্য রাজা মানসিংহ/বিষ্ণুপদাম্ভোজ-ভৃঙ্গ’— শ্রীরূপের দরিদ্র গোবিন্দজি অম্বরাধিপতি মানসিংহের নজরে পড়লেন। শ্রীরূপের সঙ্গে থাকা গোবিন্দজির সহস্থায়ী জীবন দরিদ্র হলে কী হবে, শ্রীরূপের সেবায় উজ্জ্বল গোবিন্দজির কৃপা হল মানসিংহের ওপর। ১৫৯০ সালে মানসিংহ বৃন্দাবনেই সেই গোমা টিলার ওপর— যেখানে শ্রীরূপ মাটির তলা থেকে উদ্ধার করে তাঁর ভাব-বিগ্রহকে প্রকট করে তুলেছিলেন— সেই গোমা টিলার ওপরেই লাল পাথর দিয়ে এমন অপূর্ব কারুকার্যখচিত একখানি মন্দির নির্মাণ করলেন মানসিংহ যে, ১৮৭৩ সালে সেই মন্দিরের নষ্ট-গরিমা দেখেও মথুরার তদানীন্তন কালেক্টর F. A. Growse মন্তব্য করেন— The temple of Govinda Dev is not only the finest of this particular seies, but is the most impressive religious edifice that Hindu art has ever produced, at least in upper India. (আগামীকাল শেষ)