ব্যাস তো প্রথমত ব্রহ্মদর্শী পুরুষ। সমস্ত ভূতবর্গের মধ্যে তিনি নিজেকে দেখতে পান এবং নিজের মধ্যে দেখতে পান সমস্ত জগৎকে। সুখ-দুঃখ, শীত-উষ্ণ, জয়-পরাজয় সব তাঁর কাছে সমান হয়ে গেছে। অদ্ভুত এক নির্বিকার অবস্থা যেখানে পরম আনন্দও উচ্ছ্বাসহীন গভীর সমুদ্রবৎ সমাধির মতো মনে হবার কথা। কী রকম?
মহাকবির হৃদয় এমনই মহাসমুদ্রের মতো গভীর, যেখানে উপরিতলের তরঙ্গগুলি সব সময় নব-নবোন্মেষের সূচনা দিতে থাকে। নতুন তরঙ্গের মধ্যে পুরাতন তরঙ্গ যখন হারিয়ে যায় — জলের এবং হৃদয়ের উচ্ছ্বাসটা তৈরি হয় তখনই। পুরাতনের হারিয়ে যাবার যন্ত্রণাটাও কিন্তু সেখানে নতুনের মধ্যে অনুস্যূত হয়। আমাদের দেশে কবিতা-রচনার ক্ষেত্রে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস বোধহয় সেই রকম এক আভ্যুদয়িক কবি, যিনি চতুর্বেদ বিভাগ করে, মহাভারতের মতো এক মহাকাব্য রচনা করার পরেও শান্তি পান না। তাঁকে আবার শ্রীমদ্ভাগবতের মতো এক কৃষ্ণজীবন লিখতে হয়। কিন্তু তবু তাঁর হৃদয় শান্ত হয় না। আর সত্যিই তো কবির হৃদয় যদি এত শান্ত হয়ে যায়, তা হলে এই জঙ্গম জগজ্জীবনের চলমান ছবি ভেসে উঠবে কোন হৃদয়ে? কবিই তো বলেছিলেন— শান্তকল্লোল তরঙ্গহীন সমুদ্রের মধ্যে স্নান করে আনন্দ পায় বর্বরেরা, আমি চাই তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ— বিপুল তরঙ্গ রে— সমুদ্রে শান্তকল্লোলে স্নাতুমিচ্ছন্তি বর্বরাঃ।
ব্যাস তো প্রথমত ব্রহ্মদর্শী পুরুষ। সমস্ত ভূতবর্গের মধ্যে তিনি নিজেকে দেখতে পান এবং নিজের মধ্যে দেখতে পান সমস্ত জগৎকে। সুখ-দুঃখ, শীত-উষ্ণ, জয়-পরাজয় সব তাঁর কাছে সমান হয়ে গেছে। অদ্ভুত এক নির্বিকার অবস্থা যেখানে পরম আনন্দও উচ্ছ্বাসহীন গভীর সমুদ্রবৎ সমাধির মতো মনে হবার কথা। ঠিক এই অবস্থায় তাঁর নিজের মানসলোকের বর্ণনাটা এই রকম হওয়া উচিত— সম্পূর্ণং জগদেব নন্দনবনম্— সম্পূর্ণ এই জগৎটাই তো নন্দনবনের মতো আনন্দময়, এখানে পৃথক কোনও স্থান নেই যেটা দেখলে বেশি আনন্দ হয়, অথবা যেখানে গেলে কম আনন্দ হয়। এ দুনিয়ায় যত বৃক্ষ আছে, সবই কল্পদ্রুম— তাদের কাছে যা চাওয়া যায়, তাই পাওয়া যায়।
যিনি দুনিয়ার সর্ববৃক্ষের মধ্যে কল্পদ্রুম দেখতে পান, তাঁর আসলে চাহিদাটাই বড় কম। দ্রুমপর্ণ আর গাছের বাকল পেলেই যাঁর পরিধান তৈরি হয়ে যায়, গাছ থেকে দু-একটি ফল পেলেই যাঁর ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়ে যায়, তাঁর কাছে বৃক্ষ মানেই কল্পবৃক্ষ। এ বারে বৃহৎ থেকে ক্ষুদ্রে এসে ব্রহ্মদর্শী ঋষির ভাষণ হল— যেখানে যতটুকু জল দেখি— দিঘি-নদী-পুষ্করিণী— যাই হোক, সব জলই আমার গঙ্গাজল; যেখানে থাকি, সেখানে বসি, সবই আমার বারাণসী— গাঙ্গং বারি সমস্ত-বারি-নিবহঃ… বারাণসী মেদিনী।
জগৎ এবং জীবন সম্বন্ধে এই যে একটা মনোভাব, এটা ব্রহ্মদর্শী ঋষির মনোভাব, শঙ্করাচার্যের মনোভাব, এমনকি ব্যাসও এই মনের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সর্বত্র এই আনন্দের মধ্যে একটা শান্তরসের ব্যঞ্জনা আছে, দ্বৈপায়ন ব্যাস কিন্তু এটাকেও অতিক্রম করেছেন বলেই তিনি মহাভারতের মতো এক মহাকাব্য লেখেন, ভাগবত পুরাণের মতো একটা কৃষ্ণজীবন লেখেন। মহাভারতের মধ্যেই এই কাহিনি আছে যে, ব্যাসদেবের ছেলে ব্রহ্মদর্শী শুকদেব তিনি ব্রহ্মানন্দে পাগলপারা উলঙ্গ হয়ে চলেছেন মানস-পুষ্করিণীর ধার বেয়ে। সেই পুষ্করিণীতে স্নান করছিল নবযুবতী অপ্সরারা। তাঁরা শুকদেবকে দেখে বুকের আঁচলটুকু পর্যন্ত এদিক-ওদিক করল না। শুকদেব যদি বা তাকিয়েও থাকেন তাঁদের দিকে, তবু যুবতী রমণীদের মনে হচ্ছিল, শুকদেব কিছুই দেখছেন না— শূন্যাকারং নিরাকারাঃ শুকং দৃষ্ট্বা বিবাসসঃ। অথচ ব্যাস যখন অপস্রিয়মাণ পুত্রকে খুঁজে পাবার জন্য তাঁর অনুগমন করার চেষ্টা করছেন, তখন সেই বয়স্ক ব্যাসকে দেখেও মন্দাকিনীর নির্ঝরে দাঁড়িয়ে থাকা অপ্সরা-রমণীরা কেউ গলা পর্যন্ত শরীর ডুবিয়ে দিল নদীর জলে, আবার কেউবা লুকিয়ে পড়ল গাছের আড়ালে— জলে নিলিল্যিরে কাশ্চিৎ কাশ্চিদ্ গুল্মান্ প্রপেদিরে।
ঠিক এইখানে ব্যাস দ্বৈপায়নের অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। তিনি পরম আনন্দ লাভ করলেন। ভাবলেন— তাঁর পুত্রের জীবন্মুক্তি ঘটেছে, তাই তাঁকে নগ্ন দেখেও কারও বিকার হয় না। বস্তুত স্বয়ং শুকদেবেরই জাগতিক বিষয়ে কোনও বিকার নেই বলেই তাঁকে দেখে নগ্না রমণীদেরও বিকার হয় না। অথচ স্বয়ং ব্যাসও কিন্তু অবশ্যই এক জীবন্মুক্ত মানুষ, অথচ তাঁকে দেখে অপ্সরা রমণীদের মনে যে একপ্রকার নঞর্থক আন্দোলন হল, এটা তা হলে কী? এমনকী পুত্রের প্রতিতুলনায় নিজের অবস্থা দেখে পুত্রের কারণে তিনি আনন্দ পেলেন এবং নিজেকে নিয়ে তিনি দুঃখিত হলেন— প্রীতো’ভূদ্ ব্রীড়িতশ্চ হ। আমরা শুধু ভাবি— ভাগ্যিস ব্যাসের মনে ওই বৈরাগ্যহীন বিকারটুকু ছিল! তা নইলে আমরা মহাভারতের মতো একখানা ‘ধর্ম-কামার্থ-মোক্ষদ’ গ্রন্থ পেতাম না; পেতাম না কৃষ্ণলীলার সরস্বতীকে ভাগবত পুরাণের মধ্যে।
আসলে জীবন্মুক্ত হবার পরেও যে মানুষ আবার স্বেচ্ছায় বন্ধন স্বীকার করেন, তাঁর মধ্যেই আছেন সেই আভ্যুদয়িক কবি— যিনি এই জগজ্জীবনের সাংসারিকতাকে অক্লিন্ন মধুরতায় বর্ণনা করতে পারেন। ব্যাসের মতো ওই হৃদয়টা নিয়েই রবীন্দ্রনাথ বলতে পেরেছিলেন— অসংখ্য-বন্ধন-মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ। বস্তুত মুক্তির এই আস্বাদনটাই কবি-মহাকবির মনের মধ্যে জীবন এবং জগতের ভূমাবোধ তৈরি করে। তৈরি করে সেই ‘বর্ণনীয়-তন্ময়ীভবন-যোগ্যতা’, অহেতুক যেখানে সর্বমুক্ত পুরুষও বন্ধনের মধ্যে উচ্ছ্বাস খুঁজে পান। ঠিক এই পরিপূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞানী মানুষের চেয়েও তাই একজন ভক্তের উচ্ছ্বাস অনেক বেশি, অনেক মধুর, রস-চমৎকারী তাঁর বাসনালোক। একটা উদাহরণ তো এখানে দিতেই পারি, এমনকী দিতে পারি দু’টিও। কিন্তু সে উদাহরণ দিতে গেলে আমি ধ্বনিকার আনন্দবর্ধনকে নিয়েই এমন মুখর হয়ে পড়ব যে, মহাকবি দ্বৈপায়ন ব্যাসের এক বিরাট ভুল যে এই ভারতবর্ষের মানুষকে কত বড় এক আনন্দলোকে পৌঁছে দিয়েছে, তা বলে বোঝাতে পারব না।
আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, মহাকবি যখন ভুল স্বীকার করেন, তখন তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কবিতার মাধুর্য। আসলে ব্যাস এখানে এক ব্রহ্মবাদীর ভূমা-দৃষ্টিকে সংকীর্ণতার মধ্যে নিয়ে এসে বিরাট পুরুষকে সাধারণের উপযোগী করে তুলছেন। কেননা সাধারণ মানুষকে এটা বলে কী-ই লাভ যে, যা কিছু দেখছ সবই তিনি। তিনি অগ্নিতে তিনি জলেতে/ তিনি তৃণতরুময় স্থলেতে। এই ভূমা দৃষ্টি তো সাধারণের থাকে না, আর ব্রহ্মজ্ঞানের এই পরিসরে রস-চমৎকার অনুভবের সুযোগ কোথায়? সাধারণ মানুষ এমন এক ভগবান চায়, যিনি ডাকলে পরে সাড়া দেন, যাঁকে স্পর্শ করা যায়, এমনকী এমন একটা জায়গাও তারা খুঁজে বার করতে চায়, যেখানে ঠাকুরের ঘরবাড়ি ছিল। যাজ্ঞবল্ক্য-জনকের নিরাকার-নির্বিশেষ— অথবা যাঁর কোনও শব্দ-স্পর্শ নেই অরূপ অথবা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এমন এক ঈশ্বর কখনও সাধারণ মানুষের বোধগম্যও নন, ভোগগম্য তো ননই। সাধারণ মানুষ ঈশ্বরকেও ভোগ করতে চায় বলেই কবি বলেন, ‘আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে।’ আমাদের এই জঙ্গম জগতে আমাদের অনন্ত ভোগবাসনার মধ্যে ঈশ্বরকেও আমরা ভোগ করতে চাই বলেই ভগবান মহাকবি আজ ভুল স্বীকার করছেন। (চলবে)