প্রকৃতিতে অনবরত চলছে কাব্যপাঠের আসর। ঋতুরঙ্গ কাব্য। ‘বর্ষাকণ্ড’ শেষ করে প্রকৃতিদেবী সবেমাত্র ‘শরৎখণ্ড’-এর মলাটখানি খুলে ধরেছেন। এখনও তার শ্লোক পাঠ বাকি। এখনও কাশের বনে বনে শুরু হয়নি শ্বেতচামরের ব্যজনারতি, শুরু হয়নি আনকো আলোয় শিউলির ঘুম ভাঙার রেওয়াজ, বন্যার্ত গ্রামগুলিতে ‘ভোরাই’-এর সুরও শোনা যাচ্ছে না তেমন। তবু ভোরের বাতাসে লেগেছে পুলকের স্পন্দন। শুধু আকাশের নীল দর্পণের স্বচ্ছতা, পাখিদের শিষে উল্লাসের তীক্ষ্ণতা। প্রকৃতিদেবী অনন্তকাল ধরে একই কাব্য আবৃত্তি করে চলেছেন। শেষ লাইনের পরেই আবার প্রথম লাইন। তবু সেই কাব্য পুরনো হয়ে যায়নি, পুরনো হয়ে যায় না। অনন্তকালের মানুষের কাছে বয়ে নিয়ে আসে আশার বাণী, প্রত্যাশার স্বপ্ন, উৎসাহের সুর। করোনার করাল গ্রাস কাটিয়ে সেই উৎসাহেরই জোয়ার লেগেছে বাংলায়। এতো প্রতীক্ষার উৎসাহ — ‘মা দুর্গা আসছেন! আসছেন বাপের বাড়ি। কৈলাস থেকে মর্ত্যলোকে।’ এ কথা গল্পকথা নয়, বাংলার অন্তরের সত্য বিশ্বাসের কথা। বৎসরান্তে দুর্গা মাতৃরূপের আর কন্যারূপের সমন্বয় সাধন করে নেমে আসেন মা-মাটির কোলে। এসে সুখ-দুঃখের কথা কন, বিদায়কালে চোখের জল ফেলেন — এ কথা কি অবিশ্বাসের? দেবতার সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন পাতিয়ে, দেবতাকে ঘরের লোক করে নিয়েই তো বাঙালির ঘরকন্না। তাই আজও তারা শিবের বিয়ে দেয়, ইতু-মনসার ‘সাধ’ দেয়, ভাদুকে সোহাগ করে আর পার্বতীকে পতিগৃহে পাঠাতে চোখের জলে বুক ভাসায়। আর সবাই তবু দেব-দেবী, কিন্তু উমা যে একেবারেই ঘরের মেয়ে! মহিমায় তার সহস্র নাম থাক, আসল যে উমা নামটি। শরৎ পড়তেই বাউল, বৈষ্ণবরা সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায় খঞ্জনীর তালে তালে — “আয় মা উমাশশী, নিরখি মুখশশী, দিবানিশি আছি আসার আশায়”।

এই আশা বুকে নিয়েই গ্রাম বাংলার মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে দুর্গোৎসব। কোথাও কোথাও দু’শো, আড়াইশো বা তারও বেশি বছর ধরে এই উৎসব মানুষের জীবনের মলিনতাকে কাটিয়ে তাঁর চলার পথকে আলোকিত করছে। কোথাও বা বংশপরম্পরা বজায় রাখার তাগিদে অর্থকষ্টকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে উৎসবের আয়োজন হচ্ছে আন্তরিকতার সঙ্গে। আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করবো এমনই কিছু বহু পুরনো দুর্গাপুজোর, যার বয়স শতাধিক বছর পার করেছে।

ঝাড়গ্রামের কনকদুর্গা
শহরের কোলাহল থেকে বহুদূরে শাল-পিয়ালের ছায়াতে ঘেরা পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম। সেখান থেকে আরও ১৫ কিলোমিটার গেলে যাওয়া যাবে চিল্কিগড়ে। ডুলুং নদীর তীরে এই চিল্কিগড়ে বিরাজ করছে গা-ছমছমে গভীর জঙ্গল। ভেষজ গাছের গন্ধ চারিদিকে ম-ম করছে। আর তারই মাঝখানে মাথা তুলে আছে কনকদুর্গা মন্দির। দুর্গা এখানে আশ্বারোহী চতুর্ভুজা। মন্দির ঘিরে হাজার গল্প আদিবাসীদের বিশ্বাসে মিশে আছে। সালটা ১৩৪০ বঙ্গাব্দ। জাম্বলীর রাজা জগদীশচন্দ্র দেওধন এটি তৈরি করেন। রাজার স্ত্রী-র হাতের কাঁকন দিয়ে তৈরি হয় সোনার দুর্গা। শিল্পী ছিলেন জগেন্দ্রনাথ কামেলা। রামচন্দ্র সারেঙ্গি ছিলেন প্রধান পুরোহিত। পরবর্তী সময়ে আর এক সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিঙ্গি এই মন্দিরের সংস্কার করান।

শরতে বন্যপ্রকৃতির আদিমতায় আরাধিতা হন কনকদুর্গা। নাম না জানা বুনো ফুলে পূজিতা হন দেবী। ষষ্ঠীর দিনে ডুলুং নদী থেকে ঘটে করে জল আনেন আদিবাসীরা। মন্দির সংলগ্ন চাতালে বেল গাছের তলায় সারা রাত সেই ঘট রাখা থাকে। সপ্তমির সকালে সাত কলসি জলে সেই ঘট শুদ্ধ করা হয়। অষ্টমীর রাতে মন্দিরের পাশে জঙ্গলে “নিশাপূজা”-তে অংশ নিতে পারে শুধুমাত্র রাজপরিবারের সদস্যরা। নবমীতে বলি হয়। স্থানীয় বয়স্করা বলেন আগে নরবলি হতো এখানে। এখন হয় পাঁঠা বলি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, নবমীর রাতে ভোগ রান্না করেন স্বয়ং দুর্গা। দশমীতে রাবণকে কলাগাছ রূপে পুজো করা হয়। সন্ধেবেলা মশাল জ্বালিয়ে কলাগাছে তির মারার প্রতিযোগিতা চলে ডুলুং নদীর তীরে। প্রতিযোগিতা চলে সিধো-কানহো-চাঁদ-ভৈরব-এর পরবর্তী প্রজন্ম। ধামসা-মাদলের তালে নেচে ওঠে আদিবাসী রমণী তথা পুরো আদিবাসী গ্রাম। আসে দূরদুরান্ত থেকে পর্যটকরা। রাত গভীর হয়। মশালের আলো ঝিমিয়ে আসে। মন মাতে মহুয়ায়। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে দুস্কৃতী আক্রমণে দু’বার এই মন্দিরের মূর্তিচুরি হয়েছিল। তারপরেই তৈরি হয়েছে আজকের এই অষ্টধাতুর মূর্তি। পুরনো মন্দিরটিকে অক্ষুন্ন রেখেই তার পাশে তৈরি হয়েছে আর একটি নতুন মন্দির।
বুড়িমার দুর্গা
আজকের বর্ধমান জেলার দামোদর নদের তীরে খাজা আনোয়ারের বেড় অবস্থিত। প্রায় ২৫০ বছর আগে জঙ্গলে ও হিংস্র জন্তু-জানোয়ারে ভরা ছিল জায়গাটি। গহন বনের মাঝেই ছিল ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। সেখানেই বাস ছিল বুড়িমার। নিজের মতো করে জঙ্গলের ফলমুল দিয়ে বুড়িমা চাইছিলেন কেউ দায়িত্ব নিক দেবীর পুজোর।

দেড়’শো বছর আগের কথা। তৎকালীন রাজা খাজা আনোয়ারের বেড়ে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য উদ্যোগী হলেন। তার জন্য ডেকে আনছিলেন বড় ব্যবসায়ী ও বর্ধিষ্ণু পরিবারকে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে বন কেটে বসতি গড়ে উঠতে লালগ। বাড়তে থাকল রাজার অধীনস্থ জমিদারি। পাশে দামোদর থাকায় জলপথের সুবিধা ছিল। স্বাভাবিক কারণেই লোক-লশকর নিয়ে ঘন বসতি গড়ে উঠছিল সময়ের সঙ্গে। কলকাতার ব্যবসায়ী বিহারীলাল প্রামাণিক ছিলেন এমনই একজন, যিনি আনোয়ারের বেড়ে বসতি স্থাপন করেন। ওই পরিবারের বংশধরের দাবি, বিহারীলালকে নাকি স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন বুড়িমার দ্বারা পূজিত দেবী দুর্গা। সেই স্বপ্নাদেশেই সদর ঘাটে ভিড়েছিল বিহারিলালের বজরা। আর কালবিলম্ব করেননি বিহারিলাল। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আনোয়ারের বেড়েতে জমি কিনেছিলেন তিনি। সেই জমির মধ্যেই পড়েছিল বুড়িমার কুটির ও তাঁর দেবীর আবাস। সেখানেই তৈরি হয়েছিল দুর্গাদালান। শাল কাঠ ও লোহা দিয়ে পোক্ত করা হয়িছিল সেটি। আজও বর্ধমানে বুড়িমার নামে পরিচিত এই স্থানে দুর্গাপুজো হয়। যদিও আজকের দুর্গাদালান কালের প্রকোপে অনেকটাই জীর্ণ। দালানের একটু দুরেই নহবতখানা। এখন আর সানাইয়ের সুর শোনা যায় না। পায়রা বাসা বেঁধেছে ঘুলঘুলিতে। সারাক্ষণের বকবকম ডাক তীব্র করে তুলছে নির্জনতাকে। তবে রীতি মেনে আজও শালকাঠ ও লোহার পাটাতনের উপর তৈরি হয় প্রতিমা। আর্থিক অভাবে প্রাচুর্য না থাকলেও ভক্তি অটুট। এক সময় পুজোর চারটি দিনে যাত্রাপালা হতো। এখন হয় না। তবে তার জন্য আনন্দের কোনও খামতি নেই। ষষ্ঠীর ভোর চারটে থেকে মঙ্গলারতির মাধ্যমে দেবীর আরাধনা শুরু হয়। বেজে ওঠে ঢাক। শঙ্খধ্বনি জানান দেয় বুড়িমার দুর্গা আজও ২৫০ বছর পর পূজিত হচ্ছেন। প্রাচীন মন্ত্র গায়ে মেখে প্রামাণিক বাড়িতে বুড়িমা নতুন হন প্রতিবছর।