রাজ্য রাজনীতিতে বেশ কিছুদিন এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাবে – সিপিএমের নতুন রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম কি বিমান বসুর বিকল্প হতে পারবেন? সোজা কথায় এর উত্তর হল – না। কারণ দুজনের মানসিক কাঠামো, রাজনীতি করার ধরণ, আদর্শের প্রতি আনুগত্য, অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা এক নয়। ব্যাক্তিগত ভাবমূর্তির প্রশ্নে বিমান বসুর সঙ্গে মহম্মদ সেলিমের কোন তুলনাই চলে না। বামপন্থী নেতাদের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ‘ইমোশনাল কানেক্ট’ একটা বড় ব্যাপার। এব্যাপারে বিমান বসুর সঙ্গে এই মুহূর্তে শুধু সেলিম কেন, ক্রমশই আঞ্চলিক হয়ে ওঠা সিপিএম নামক দলটিতে যারা রয়েছেন তাদের কারোরই কোন তুলনা চলে না। কাজের স্টাইল, রাজনীতি করার ধরণ ইত্যাদি প্রশ্নে সেলিম বরং বুদ্ধবাবুর রাজনৈতিক ঘরানার অনেক কাছাকাছি। পার্টি ব্যুরোক্র্যাট হিসেবে তিনি মানিয়ে যান কিন্তু কোন গণআন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠার যোগ্যতা তার নেই। এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত।
বয়স হলে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে নতুনদের। একথা যেমন সত্যি ঠিক তেমনই সত্যি হল, দল কোন ব্যায়াম সমিতি নয়, শরীর, বয়স এসব শর্তগুলি সেখানে যান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া যায়না। প্রয়োজন, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, সবাইকে নিয়ে চলার ক্ষমতা এক্ষেত্রে একটা বড় ব্যাপার। এইসব গুণগুলি আছে বলেই বিমানবাবু রাজ্যের বামপন্থী রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন। এই কপিটা লেখার সময় অবধি বিমানবাবু দলের প্রতিটি কর্মসূচি ও নিয়মিত কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, দলের উঁচু ও নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ। কাজেই তার বিরুদ্ধে শারীরিক সক্ষমতার অভাব কথাটা ধোপে টিকবে না। পদ থেকে সরে যাওয়ার পরও তিনি পার্টি ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
অনেকে বলছেন, সেলিম এলে মুসলমানদের মধ্যে পার্টি বাড়বে, তারা বেশি করে পার্টিতে আসবেন। কোন কমিউনিস্ট দল ধর্মকে ধরে বাড়ে কিনা জানা নেই। তবুও দলেরই কিছু সদস্য, সমর্থক একথা বলছেন। এ এক বিচিত্র মার্কসবাদ! অবাক লাগে এসব কি কমিউনিস্ট পার্টির কথা! সংখ্যালঘু ভোট টানা, সংখ্যালঘুদের মধ্যে সমর্থন বাড়ানোর জন্য সেই সম্প্রদায়ের একজন নেতাকে রাজ্যে দলের সর্বোচ্চ পদে বসানোর কথা কি কমিউনিস্টরা বলেন! তাহলে মোদি-যোগীদের সঙ্গে আলিমুদ্দিনের কি তফাৎ রইলো? আর এসব কাজ বিমানবাবুর চেয়ে সেলিম ভাল পারবেন এটা কবে, কোথায় কীভাবে প্রমাণিত হল!
কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, এসব কথা উঠছে কেন? বিমানবাবু তো নিজেই সরে যেতে চেয়েছিলেন। মানলাম, কিন্তু সরতে চেয়েছেন বলেই কি তাকে সরাতে হবে? আসলে সিপিএম নামক দলটাকে যারা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা সবজান্তা পার্টি ব্যুরোক্র্যাটদের আখড়া বানাতে চান এটা তাদেরই মত। আসলে দীর্ঘদিন ধরেই বিমানবাবুকে সরানোর জন্য লবিবাজি ও যাবতীয় কূটকচালি চলছে। সেলিমের নিয়োগে সেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হল। রাজ্য সিপিএমের খোঁজখবর যারা রাখেন তাদের মতে সেলিমের মত রাজনীতিবিদরা আদতে কারাট-ইয়েচুরিদের মত কেন্দ্রীয় নেতাদের নিকৃষ্ট বঙ্গীয় সংস্করণ। সমস্যা কাটিয়ে ওঠার বদলে এতে দলের বিপর্যয়ের পথ আরও প্রশস্ত হবে।
সংখ্যালঘু মুখের অভাবের কারণে নয়, সিপিএম এগোতে পারছে না মানুষকে সঙ্গে নিয়ে উপযুক্ত ইস্যুতে লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যর্থতার জন্যই। কোন সংখ্যালঘু মুখ এনে নয়, এই মুহূর্তে জনবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে লাগাতার প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেই দলকে সঠিক দিশা দেখানো সম্ভব। সংখ্যালঘু মুখ আনার তত্ত্ব তো একধরণের ধর্মীয় পোলারাইজেশন। এর সঙ্গে আর যারই হোক মার্কসবাদের কোন যোগাযোগ নেই, বামপন্থারও কোন যোগাযোগ নেই। এমনকি জনস্বার্থ ও উন্নয়নেরও কোন যোগাযোগ নেই। সত্যি বলতে কি, সেলিমকে নতুন রাজ্য সম্পাদক করার কোন সাংগঠনিক বা আদর্শগত ভিত্তি নেই। আসলে সিপিএম নামক দলটা আদর্শ ও সংগঠনের দুর্বলতা ঢাকতে বরাবরই সস্তা চমক এবং মেকি বিরোধিতার পথে হাঁটে। সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের জন্য যদি সংখ্যালঘু মুখ আনতে হয়, তাহলে সিপিএমের মত একটি পুরনো দলের হাতে পেন্সিলটুকু ছাড়া আর কিছুই থাকেনা।