আমি ‘শেষ প্রশ্ন’ লিখলে লোকে আমার প্রতিভায় অবাক হ’য়ে যেত। কারণ, তাহ’লে ‘শেষ প্রশ্ন’র বিচারই লোকে করত, লেখকের পূর্বতন সাহিত্যসৃষ্টির সঙ্গে বইখানার সর্বাঙ্গীন অমিলটা অপরাধ ব’লে গণ্য করত না।
বাস্তবিক, ‘শেষ প্রশ্ন’ সম্বন্ধে যেখানে যত বিরুদ্ধ সমালোচনা পড়েছি এবং শুনেছি তার মধ্যে এই অভিযোগটাই প্রধান হ’য়ে উঠেছে যে, শরৎবাবু এ বই লিখলেন কেন? ‘শেষ প্রশ্ন’র অভিনবত্বে এঁদের বিস্ময় নেই, বইখানায় পরিচিত শরৎচন্দ্রকে খুঁজে না পেয়ে এঁরা ক্ষুব্ধ। বড় লেখকদের এই এক মুস্কিল। তাঁদের লেখার মধ্যে যে জিনিষগুলি constant অর্থাৎ লিখনভঙ্গী, চরিত্রচিত্রণ পদ্ধতি, রস পরিবেশরীতি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য, এগুলি পাঠকের মনে স্থায়ীভাবে মুদ্রিত হ’য়ে যায়। ‘শেষ প্রশ্ন’ পড়তে বসার আগে আমরা ভাবি, ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’র শরৎচন্দ্রের লেখা পড়তে বসলাম। ‘শেষ প্রশ্ন’ পড়বার সময় আমরা মনে রাখি, ‘শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ছি।’ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় এ ধারণা আহত হ’তে থাকলে বইখানার বিরুদ্ধে অভিযোগের আমাদের অন্ত থাকে না। অথচ, সারাজীবন একইভাবে বই লিখে এসে, স্টাইল, টকেনিক্ সমস্ত বদলে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের ভাল বই লেখা বড় প্রতিভারই পরিচয়। ভারতবর্ষে টুকরো টুকরো ‘শেষ প্রশ্ন’ প’ড়ে ব্যাপারটা আমারও ভাল বোধগম্য হয়নি। তারপর একসঙ্গে সমগ্র বইখানা পড়লাম। সবিস্ময়ে ভাবলাম এত নাম ও প্রতিষ্ঠার বোঝা বয়ে নতুন লেখক হবার সাহস শরৎচন্দ্র পেলেন কোথায়?
ভাবনাটা মাঠে মারা গেল না। নতুন লেখকের ভাল বইয়ের মত ‘শেষ প্রশ্ন’ও অযথা নিন্দিত হ’ল।
কবিতার মত ছবি এঁকে রবীন্দ্রনাথ পেলেন প্রশংসা, আর একেবারে নতুন কিছু ক’রে শরৎচন্দ্র হলেন অপরাধী।
কথা উঠবে নতুনত্বই সব নয়। কিন্তু নতুনত্ব শুধু চটক অথবা গুণ সেটা বিচার সাপেক্ষ। চমক-দেওয়া অনেক কিছু মানুষকে ঠকিয়েছে ব’লেই অভিনবত্ব মেকী নয়।
‘শেষ প্রশ্ন’র রস-সংযম থেকে রস সংগ্রহ করা সকলের পক্ষে সহজ নয়। যে বই কাঁদিয়ে ছাড়ে তার করুণ রসের অসংযম প্রত্যেক অশ্রুবিন্দুতে প্রমাণিত হ’য়ে যায়। শরৎবাবুর অনেক বইতে দেখা যায় তাঁর দরদ মানুষের প্রতি; বিশেষ ক’রে এই বাংলা দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা আর্টকে ছাপিয়ে উঠেছে। কিন্তু তিনি যে দারিদ্রসর্বস্ব লেখক নন, আর্টের মর্যাদাও যে তিনি বোঝেন, ‘শেষ প্রশ্ন’ তা নিঃসংশয়রূপে প্রমাণ করেছে।
‘শেষ প্রশ্ন’র রসদৃষ্টি সম্পূর্ণ কলাসম্মত ও গভীর। উপন্যাসের চরিত্র পাঠকের ইচ্ছা ও ভাললাগাকেই সমীহ ক’রে পরিণতির দিকে চলবে না, তার গতির মধ্যে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে, এমনকি লেখকের ব্যক্তিত্বের প্রভাব পর্যন্ত এড়িয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলবে। হামসুনের Growth of the Soil ভিন্ন আর কোন বইয়ে এ নিয়ম যথাযথ পালিত হ’তে দেখিনি। বাংলাসাহিত্যে এ গুণ যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কোন বই-এ থাকে সে-বই ‘শেষ প্রশ্ন’। এদিক দিয়ে ‘শেষ প্রশ্ন’র শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করবার উপায় নেই।
এই গুণের জন্য কমল গোরার নারীসংস্করণ নয়। সে নিজের ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণ করেছে, সেজন্য পাঠক, লেখক, উপন্যাস রচনার প্রথা কোন কিছুরই মুখ চেয়ে থাকে নি। তার জীবনের ঘটনাস্রোত, তার সঞ্চিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সংস্কার প্রভৃতি যেখানে তাকে ঠেলে এনেছে সেইখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে সে ঘোষণা করেছে, সে স্থান তার পক্ষে বিপজ্জনক কিনা সে হিসেব ক’রে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাবার চেষ্টা করেনি।
কমলের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায়, সে নাকি একটি bundle of speeches, ‘শেষ প্রশ্ন’ নাকি এদেশের সঙ্গে ও দেশের যুদ্ধের মহাভারত, কমল ওদেশের হ’য়ে একাই যুদ্ধ করেছে। মতের লড়াই ‘শেষ প্রশ্ন’-এ নেই এমন নয়, কিন্তু সেটা প্রধান নয়। তর্ক করা কমল চরিত্রের একটা প্রধান দিক, এদেশ-ওদেশ সমস্যা তার তর্কের বিষয়বস্তু মাত্র। আধুনিক মানুষের মনের দুয়ারে আজ সমস্যার ভিড়, মানুষকে আজ অত্যন্ত মাথা ঘামাতে হয়, মস্তিষ্কের পরিচয় না দিলে আজকের মানুষের অর্ধেক পরিচয়ের বেশী দেওয়া যায় না। কমল যা বলে তা সত্য কি মিথ্যা সেটা তাই বড় কথা নয়। অত কথা সে কেন বলে এ প্রশ্নও অচল। তার বলার মধ্যে তার চরিত্রের যতখানি মস্তিষ্কের অধিকার ততখানি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে কিনা সেইটুকুই বিচার্য।
অর্থাৎ তর্ক বড় নয়, বড় কমল নিজে। এই কারণেই ‘শেষ প্রশ্ন’-এ কমলের উপযুক্ত প্রতিপক্ষ নেই, যে অক্ষয়ের মত শুধু লাফালাফি না ক’রে সমানভাবে তর্ক চালাতে পারে। এই কারণেই কমল হবিষ্য করে, তার কথা ও কাজে যে অসামঞ্জস্য বহু সমালোচককে বিচলিত করেছে। নইলে কমলের মত সংস্কারবর্জিতা রূপসীর দারিদ্র্যে আমিও বিশ্বাস করতাম না।
কিন্তু কমলের হৃদয়কে শরৎচন্দ্র ভুলে থাকেন নি; ‘শেষ প্রশ্ন’র অন্যান্য নরনারীর মত কমলের মর্মকোষের পরিচয় যথারীতি অভিব্যক্তি লাভ করেছে। না হ’লে ‘শেষ প্রশ্ন’-এ রসাভাব ঘটত। কিন্তু পূর্বেই বলেছি ‘শেষ প্রশ্ন’র রস-সংযম অসাধারণ, ফেনিল উচ্ছ্বাসের মধ্যে সে রসসৃষ্টি নিজেকে সস্তা করেনি। আপনার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে অজিত আর কমল যখন কাছাকাছি এসে পড়েছে, আপনারা তখন তাদের লক্ষ্য করেছেন?
টেকনিক বলুন, লেখকের রসবোধের গভীরতা বলুন, আর অবস্থা, চরিত্র ও প্রকাশভঙ্গীর উপর লেখকের সহজ কর্তৃত্বই বলুন এইগুলি higher literature-এর লক্ষণ ও ধর্ম। ‘শেষ প্রশ্ন’-এ এ সমস্তের সমাবেশ যদি আবিষ্কৃত ও প্রশংসিত না হয়, যদি অর্থহীন নিন্দা ও যুক্তিহীন প্রশংসার মধ্যে ‘শেষ প্রশ্ন’র সমালোচনা সীমাবদ্ধ থাকে, বাংলার সাহিত্যরসিকের পক্ষে সে বড় লজ্জার কথা হবে। নির্মম বিশ্লেষণ ও নিরপেক্ষ বিচার সহ্য করবার ক্ষমতা ‘শেষ প্রশ্ন’র আছে।
‘শেষ প্রশ্ন’ সম্বন্ধে আমার যা বলার ছিল তার কিছুই বলা হ’ল না, উপরন্তু সংক্ষেপে বলার অপরাধ হ’ল। কিন্তু ‘শেষ প্রশ্ন’র বিশদ আলোচনা ভবিষ্যতে করা চলবে। ‘শেষ প্রশ্ন’ যে ভাল বই, অসাধারণ ভাল বই, শরৎবন্দনার উপলক্ষে এই কথা ব’লে নেবার সুযোগ আমি ছাড়তে পারলাম না।
শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় শতবার্ষিকী সংকলন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।