| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সাইফুর রহমান-এর ছোটগল্প ‘সংশপ্তক’

Reporter
সাইফুর রহমান / ৩১৪ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

ঝালের চোটে শিষ টানতে টানতে হেঁসেল থেকে বেরুতেই জুঁই দেখলো আবুল বাশার টেবিলে মাথা গুজে কি সব হিসেব নিকেশে ব্যস্ত।

ফুউউউ..। ওগো শুনছো। ফুউউউ…। উফ্ আমার দিকে তাকাও তো একটু। এতো সাত সকালে কি সব হিসেব টিসেব নিয়ে বসেছো। কাল ঈদ, তোমার তো একটু বাজারে যেতে হবে চট করে। বেশ কিছু জিনিসপত্র কেনা এখনো বাকি। কেনাকাটায় ফাইনাল টাচটা না হলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাব আমি।

টেবিলের উপর থেকে চোখ না সরিয়ে আবুল বাশার জুঁই কে বলল- কি এতো ফুউ.. ফুউ.. করছো। মরিচ টরিচ খেয়েছো নাকি গোটা কয়েক।

— কি সব অদ্ভুত কথা যে বলো মাঝে মধ্যে। গায়ে জ্বালা ধরে যায়। মরিচ খাব কেন শুধু শুধু। আগামিকালের জন্য গরুর মাংস কষাচ্ছিলাম। ভুলবশত মরিচ ঢেলে ফেলেছি বেশি। মাংস সেদ্ধ হয়েছে কিনা পরীক্ষা করতে গিয়েই মুখে যেন আগুন ধরে গেলো। আমারই যদি এ অবস্থা হয় ছেলেটা যে কিভাবে তরকারি মুখ তুলবে ভেবেই অস্থির হচ্ছি। কাগজপত্র, কলম এগুলো গুটিয়ে রেখে আবুল বাশার চেয়ারটা ঈষৎ ঘুরিয়ে জুঁইয়ের দিকে তাকালো। চোত-বোশেখের পাকা বাঙির মতো গায়ের রঙ জুঁইয়ের। গৌরবর্ণ শরীরের অনেকটাই ঘামে ভেজা। টিয়া রঙের জমিনের উপর লাল পেড়ে শাড়ীতে আজ বেশ মানিয়েছে তাকে। লাল পাড়ের সঙ্গে ম্যাচ করা লাল রঙের ব্লাউজটা জায়গায় জায়গায় ঘামে ভিজে লেগে আছে শরীরের সঙ্গে। ব্লাউজের আড়ালে বায়াস্য পাখির গায়ের রঙের অন্তর্বাসের ফিতে গুলো সেজন্য অনেকটাই স্পষ্ট। ঠোঁটের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম। ভ্রমরের পাখার মতো কুচকুচে কালো কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত অবাদ্ধ চুল গুলো খোপা করে তাদের আজ একেবারে কাবু করে রেখেছে জুঁই।

— কষামাংসের ঝাল কমানোর জন্য একটি উপায় আমি তোমায় বাতালে দিতে পারি কিন্তু। এই বলে আবুল বাশার চেয়ার ছেড়ে জুঁইকে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো।

— এই কি হচ্ছে এসব। ছাড়ো বলছি। ছেলেটি পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। এক্ষুনি চলে আসবে কিন্তু। বুড়ো বয়সে ভিমরতি।

— আচ্ছা ভীম বুড়ো বয়সে কার সঙ্গে রতি করেছিলো। বলতো। স্মিত হেসে বলল আবুল বাশার।

— আমি কি জানি। ভীম কারো সঙ্গে আদৌ রতি করেছিলো নাকি করেনি। এসব তো জানার কথা তোমার। রোজ রাত জেগে এতো এতো যে পড়ো।

— তুমি অবশ্য ঠিকই বলেছ। মহাভারত তো আমি পড়েছি। কিন্তু সত্যি সত্যি মনে পড়ছে না যে ভীম বুড়ো বয়সে কার সঙ্গে এসব করেছিলো। আচ্ছা তুমি আমাকে বুড়ো বললে কেন। এইতো গত বছর আমি সবে মাত্র তিপান্ন অতিক্রম করলাম। পঞ্চাশ অতিক্রম করলেই কি মানুষ বুড়ো হয়ে যায়? আর শোন বার্ধক্যকে আমি কখনো ভয় পাই না। দেশের যা অবস্থা তাতে করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মরে যাওয়াই ভালো। তাহলে আর এসব গুম, খুন-হত্যা, রাহাজানি, ব্যাভিচার সেই সঙ্গে বিবিধ অনাচার স্বচক্ষে দেখতে হয় না। তবে কি জানো যৌবনের মতো বার্ধক্যও জীবনের আর একটি অধ্যায়। বার্ধক্যে জীবনকে উপভোগ করতে হয় ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে। তখন অনিবার্য ভাবেই দৃষ্টি হয় সুদূর প্রসারিত। যৌবনে মানুষ যেমন সৃষ্টি, সম্ভোগ ও অতৃপ্তি নিয়ে ব্যপৃত থাকে। পড়ন্ত বেলায় এসে মানুষের আচরণও হয় ঠিক একেবারে উল্টো। তখন সে হয় ধিরস্থির শান্ত ও নির্লিপ্ত। মানুষ বুঝতে পারে অন্তিম শয়নে পৃথিবী থেকে আসলে কিছুই নিয়ে যেতে পারবেনা সে। বরং রেখে যায় তার কৃতকর্মের ফল।

— আজকালকার সব বিত্ত ও শক্তিশালী পৌঢ় মানুষজন দেখে কি তোমার আসলে তাই মনে হয় যে, তারা ধিরস্থির, শান্ত, নির্লিপ্ত ও তৃপ্ত। পরিহাসের স্পষ্ট আভাস জুঁইয়ের কণ্ঠে।

— আমি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষদের উপলক্ষ করে এ কথা বলছি না। আমার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিশ্বজনীন।

— আচ্ছা তুমি এই যে এতো এতো বই পড়ো। একেবারে যাকে বলে জ্ঞানের আঁধার। বিদ্যার ঢেঁকি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তো এতো ভালো রেজাল্ট করলে। কিন্তু লাভটা হলো কি। জীবনে তো কিছুই করতে পারলে না। তোমার এতো পড়াশুনা জীবনে কি কাজে লাগলো বলতো। একটি দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করলে কিছুদিন। মালিকপক্ষের সঙ্গে মনমালিন্য করে অবশেষে সেটাও একদিন ছেড়ে দিলে দুমকরে। তোমার মতো ব্যর্থ জ্ঞানী কি সমাজে আর আছে দুটি?

— আবুল বাশার মনে মনে ভাবে। সত্যি কথাই তো বলেছে জুঁই। তার চেয়ে খারাপ রেজাল্ট করে তার সতীর্থ বন্ধুরা আজ বাস করে প্রাসাদতূল্য বাড়িতে। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে দাবড়ে বেড়ায় সর্বত্র। কিন্তু সবাইকে দিয়ে তো আর সবকিছু হয় না। জুঁই সেটা কিছুতেই মানতে চায় না। আবুল বাশারের মাঝে মাঝে মনে হয় জুঁই কেন যে তাকে ভালোবাসলো। কিংবা বিয়ে করে ঘর বাঁধলো। এর কারণ কি এটাই যে, ক্লাসে সে ছিলো সেরা ছাত্র। নাকি আবুল বাশার ভালো কবিতা আবৃত্তি করতো এবং মাঝে মধ্যে পত্রিকা টত্রিকা গুলোতে তার কবিতা বেরুতো। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলো বলে জুঁই হয়তো ধরেই নিয়েছিলো যে তার ভবিষ্যৎ হবে নিশ্চিত ও সমৃদ্ধ। কিন্তু বিধিবাম। জীবনে কিছুই হলো না তার। ভাগ্য ভালো যে ছাত্রী হিসেবে জুঁইও ছিলো অসাধারণ। তাইতো লেখাপড়া শেষ করেই ভালো বেতনে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরী জুটিয়ে নিয়েছে ও। ওর বেতন দিয়েই তো আজকাল সংসারটা অন্তত চলছে। আবুল বাশার নিজে যৎসামান্য যা করে সেটাকে অবশ্য কাজ বলা চলে না। অন্য কারো দৃষ্টিতে নয় এটি স্বয়ং আবুল বাশারের-ই অভিমত। আর সেজন্য সে তার কাজের কথা কাউকে বলতেও সাহস করে না।

— এই চুপ করে কি এতো ভাবছো বলতো। জুঁই আবুল বাশারের শরীরে আলতো স্পর্শ করে জানতে চায়।

— অন্যমনস্কতা কেটে গিয়ে সম্বিত ফিরে পায় আবুল বাশার। না মানে এমনি কিছু একটা ভাবছিলাম। সে তোমার না জানলেও চলবে। কই দাওনা বাজারের ব্যাগটা এনে। বাজারটা সেরে আসি ঝটপট। আচ্ছা সিসিম কি ঘুমাচ্ছে নাকি এখনো।

— ঘুমাবে না আবার। ঈদ উপলক্ষ্যে কলেজ তো বন্ধ। আজ তো আর কলেজে যাওয়ার তাড়া নেই। সেজন্যই বোধহয় আয়েস করে ঘুমাচ্ছে।

শরীরে ইস্ত্রি করা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী গলিয়ে নিউমার্কেটের দিকে রওনা হলেন আবুল বাশার। রিক্সা যোগে নিউমার্কেটের দিকে যেতে যেতে তিনি লক্ষ্য করলেন ঈদ উপলক্ষ্যে সমস্ত শহর ব্যস্ততায় যেন একেবারে নুয়ে পড়েছে। সকালে যদিও আকাশে ঈষৎ মেঘের আভাস ছিলো বটে। কিন্তু বেলা গড়াতেই সেই মেঘ কেটে গিয়ে রোদে ঝলমল করছে চারদিক। সেই সঙ্গে গরমও পড়েছে ভয়ানক। অসহ্য উত্তাপে কুলকুল করে ঘামছিলেন তিনি। নীলক্ষেতের সামনে আসতেই দেখা গেল ফুটপাতের পাশে রাস্তার প্রান্তে দুটি সারমেয় পশ্চাদদিক থেকে যুগলবন্দি হয়ে কুঁইকুঁই করছে। ওরেব্বাস! ভাদ্র মাস আসতে না আসতেই এ অবস্থা! আবুল বাশারের অজান্তেই ঠোঁট ফসকে কথাগুলো বেরিয়ে আসে। ফুটপাতের ওপাশের হোটেল থেকে কেউ একজন এক গামলা হাড়মাংস সুদ্ধ এঁটেকুটো রাস্তার উপর ফেলতেই মাদি কুকুরটি ওর সঙ্গিকে টেনে নিয়ে ধাবমান হয় রাস্তার উপরে পতিত এঁটেকুটো গুলোর দিকে। আর তখনই কুকুর দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় একটি অপরটি থেকে। চারদিক ভিড়ে ভিড়াক্কার হলেও নীলক্ষেতের সেকেন্ড হ্যান্ড বই দোকানিদের অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। সেখানে তেমন ভিড় নেই। ঈদ উপলক্ষ্যে হয়তো বই কেনা বা পড়ার প্রয়োজনীয়তা নেই বেশীরভাগ ঈদুরেদের। বরঞ্চ ভিড় উপচে পড়েছে রিক্সাভ্যানে বিক্রিত শার্ট, প্যান্ট, জাঙ্গিয়া, গেঞ্জি কিংবা সস্তা দামের প্লাষ্টিকের সেন্ডেল এসবের উপর। প্রচন্ড গরমের কারণে ডাব বিক্রেতাদেরও পয়মন্ত অবস্থা। ডাব বিক্রি হচ্ছে ধুমিয়ে। আবুল বাশারও বেশ তৃষ্ণার্থ। একবার ভাবলেন রিক্সা থামিয়ে একটু ডাবের পানি খেয়ে নিলে ভালো হয়। তৃষ্ণাটা অন্তত নিবারণ করা যায়। কিন্তু রিক্সাওয়ালার ভাবগতিক খুব একটা সুবিধের মনে হলো না। ঈদ উপলক্ষ্যে সবাই ব্যস্ত। যত বেশী খেপ তত বেশী আয়। আবুল বাশার সরাসরি চলে এলেন নিউমার্কেটে। প্রথমেই তাকে সারতে হবে কিছু টুকটাক কেনাকাটা। তারপর কাঁচা বাজারে গিয়ে সেখান থেকে করতে হবে বাদবাকি সদাই।

নিউমার্কেটের দোকান গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে যখন এসব সাত পাঁচ ভাবছিলেন। ঠিক তখনই লক্ষ্য করলেন একটু দূরে জুতার দোকানের সামনে হট্টগোল ও বেশকিছু মানুষের জটলা। মা গো… বাবা গো… আমারে ছাইড়া দেন আমি আর করুমনা। এসব বলে কেউ একজন আহাজারি করছে। কচি কণ্ঠনিঃসৃত আত্মচিৎকারের নিনাদে মুর্ছিত হচ্ছে আশপাশ একটু ধাতস্ত হতেই আবুল বাশার বুঝতে পারলেন জনাবিশেক লোক একটি কিশোর ছেলের উপর ভয়ানক প্রহারে লিপ্ত। কেউ লাঠি হাতে, কেউ আবার শুধু হাত ব্যবহারের মাধ্যমেই তাদের শরীরের শক্তিমত্তা প্রকাশে ব্যস্ত — কিল, ঘুষি, চড়থাপ্পর কিছুই বাদ যাচ্ছে না। একটু কাছে এগুতেই দেখা গেল ছেলেটির মুখেরকষ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। গায়ের জীর্ণ মলিন শার্টটি ছিঁড়ে ছত্রখান। পঁচিশ-ত্রিশজনের মতো লোক ছেলেটাকে ঘিরে রাখলেও আসলে মারপিটে লিপ্ত আছে চার-পাঁচ জনের মতো। বাকি লোক গুলো নামাজে দাঁড়ানোর মতো করে বুকের কাছে হাত দুটো বেঁধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। আবুল বাশার বুঝবার চেষ্টা করলেন আসলে হচ্ছেটা কি? পাশের দোকানের জনৈক এক কর্মচারি (মালিকও হতে পারে) শ্লেষ মিশেল কণ্ঠে বললেন- “আর বইলেন না, জুতা চুর। ঈদের আগে এইসব চুর গুলার কামই হইলো দোকানে দোকানে চুরিদারি করা। এইবার চুর বুঝতেছে কত চাউলে কত ধান। আরে কথায় আছে না- চুরের দশদিন আর দোকানীর একদিন। এখন সেই একদিনের হিসাব লওয়া হইতেছে।”

— ভাই থামান না, ছোট একটি ছেলে। মরে টরে যেতে পারে। আবুল বাশারের বুকটা হুহু করে ওঠে।

— কি যে বলেন। চুরের শরীল হইলো বিলাইয়ের শরীল। যতই মারেন-পিটেন একটু পরেই দেখবেন ঝাড়া দিয়া উইঠা দৌড় দিব। তখন সে দিব্যি সুস্থ মানুষ।

— আবুল বাশারের কানে লোকটির কথাগুলো বিষবৎ শোনায়। তিনি একাই এগিয়ে যান জটলার দিকে। এই যে ভাই, ছেলেটিকে আর কত মারবেন। দয়া করে থামেন এবার। মুখের চোয়াল শক্ত করে কথাগুলো বলল আবুল বাশার।

— ভিড়ের মধ্যেথেকে কেউ একজন বলল- আপনি কে ভাই। জুতা কি আপনার দোকান থেকে চুরি করছে। আপনার এতো দরদ উতলাইতেছে ক্যান, বুঝলাম না তো।

— আবুল বাশার বিপন্নের মতো বলল- দেখেন ভাই একজোড়া জুতার জন্য তো ছেলেটির প্রাণটাই যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। ওকে মাফ করে দিন এবার। জুতা জোড়ার দাম না হয় আমিই দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে হাজার দুয়েকের মতো টাকা মুঠো ভরে বের করে আনলেন আবুল বাশার।

— ভিড়ের মধ্যেথেকে আরেকজন বলল- জুতা চুরি করছে এই ছ্যামড়া। আর টাকা দিতে চাইতাছেন আপনি। ব্যাপারটা তো বুজগতিক মনে হইতেছে না।

একজন বলল — আরে এই ব্যাটাই হইলো এই পেতি চোরের ওস্তাদ। দূরে দাঁড়াইয়া থ্যাইকা এই ছ্যামড়ারে দিয়া চুরি করাইতেছিলো। এখন আসছে ভুজুং ভাজুং দিয়া শিষ্যরে ছাড়াইয়া নিতে। এই সবাই ব্যাটারে ধর। এই বলে ভিড়ের একাংশ এবার ঝাঁপিয়ে পড়লো আবুল বাশারের উপর। আবুল বাশারের হাতের টাকা গুলো সব পত্র মর্মরের মতো শব্দ না করেই শুকনো পাতার মতো উড়ে গেল দিক বিদিক। আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো মারের বর্ষণ শুরু হলো আবুল বাশারের শরীরে।

কোন এক ভালো মানুষের ছেলে হয়তো মারামারি শুরুর সঙ্গেঁ সঙ্গেঁ খবরটি সন্তোর্পনে পৌঁছে দিয়েছিলো পুলিশের কাছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দু’জনকে পাকড়াও করে নিয়ে গেল লালবাজার থানায়। তারপর তাদের নিক্ষেপ করলো গারদে। ওসি খোদাবক্স আবুল বাশারকে জিজ্ঞেস করলো- কি মিয়া এসব কামধামে আছো কতদিন। ওস্তাদ সাগরেদ মিলে ভালই তো চালাচ্ছো মনে হয়। মাল কড়ি যা জমিয়েছো সেখান থেকে এখন ছাড়ো কিছু আমাদের জন্য। আবুল বাশার প্রতিউত্তরে বলল — আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না। জুতা তো আমি চুরি করিনি। চুরি করেছে এই ছোট ছেলেটা। আমি তো ওকে মারের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম মাত্র।

খোদাবক্স বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল — প্রথম প্রথম সবাই এ কথাই বলে। পশ্চাদদেশে গো-বেড়েন পড়লেই মুখদিয়ে ফরফর করে সব বেরিয়ে আসবে। চিন্তা করোনা চান্দু। তা কি করো তুমি? আবুল বাশার বলল — এখন কিছু করি না। দৈনিক কালান্তর পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতাম এক সময়। বছর খানেক আগে ছেড়ে দিয়েছি চাকরি। এখন সম্পূর্ণ বেকার। খোদাবক্স ঝাঝালো কণ্ঠে বলল- ভূয়া সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে আসলে তো করো চুরি, তাই না। এসব আমাদের কিছুই অজানা নয়। টাকা পয়সা জমিয়েছ কেমন? আমার সাফ কথা, এখান থেকে ছাড়া পেতে পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে। তোমার লোকজনদের খবর দাও। টাকা নিয়ে আসতে বলো। তা না হলে মারের চোটে শরীরের হাড্ডি মাংস আলাদা হবে।

গারদখানার ছোট এই প্রোকষ্টের ভিতর ভয়ানক গরম। গলগল করে ঘাম ঝরছে আবুল বাশারের তামাটে শরীর থেকে। ঘামে ভিজে সাদা পাঞ্জাবীটার যে অংশটুকু লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে সে অংশটুকু কচি তালের শাঁসের মতো দেখাচ্ছে। কক্ষের এক কোনে হাঁটু ভেঙ্গে বসে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আবুল বাশার মোহ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল — তোর নামটাই তো জানা হলো না এখনো। কি নাম রে তোর? থাকিস কোথায়? চুরিদারির মতো এমন বাজে কাজ করতে গিয়েছিলি কেন। তোর যে শরীর-স্বাস্থ্য তাতে তো যে কোন একটা বয়-বেয়াড়ার কাজ জুটিয়ে নেয়া এমন কোন কঠিন কিছু নয়।

ছেলেটি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল — আমার নাম সনু। আমরা থাকি কেরানীগঞ্জ বস্তিতে। বাপজানের একজোড়া জুতা দরকার। এই জন্য চুরি করতে গেছিলাম। এ পর্যন্ত বলে অঝরে কাঁদতে শুরু করে সনু। তিন-চার দিন কামলা দিয়া পাঁচশ টাকাও তো গুছাইতে পারলাম না। কি করুম।

তোর বাবার জুতার প্রয়োজন? কিন্তু কেন? আবুল বাশার ঈষৎ কৌতুহলী হয়ে জানতে চায় সনুর কাছে। বাপজান মাছ, মুরগী, তরিতরকারি এগুলি ফেরি করে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রাস্তায় মেলা পানি জমছে। ড্রেনের পচা পানিতে হাইটা হাইটা বাপজানের পায়ে হাজা হইছে। সেন্ডেল জোড়াও একেবারে নষ্ট হইয়া গেছে। বাপজান পায়ের ব্যাথায় হাঁটতে পারে না। আমার আরো তিনডা বোইন আছে ছোড ছোড। মা, বোইনসহ পরিবারে পাঁচ-ছয়জন মানুষ। বাবায় কামে যাইতে পারে না বইলা দুই-তিন দিন ঘরে খাওন নাই। বাপজান কইলো একজোড়া জুতা থাকলে কষ্ট কইরা হইলেও কামে যাওন যাইতো। আমি দোকানের সামনে দিয়া যাইতেছিলাম। দেখলাম দোকানের সামনে অনেক জুতা সাজাইয়া রাখছে। ভাবলাম একজোড়া জুতা হইলেই তো বোইন গুলার মুখে খাওন জুটবো। এই জন্য..। কথা আর এগোয় না সনুর মুখ দিয়ে। আবুল বাশার মনে মনে ভাবে সরকার রাতদিন উন্নয়নের মহা ফিরিস্তি দিয়ে মুখে ফেনা তুললেও দেশের মানুষ যে কত কষ্টে আছে সেটা এই সনুকে দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। উন্নয়ন না ভাওতাবাজি বরং এই সনুই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।

এ এস পি মনিরুল জিপ থেকে নেমে সিঁড়ির পাশে গারদখানার সামনে দিয়ে উঠে যাচ্ছিলেন দোতালায়। আবুল বাশারের কালো মোটা ফ্রেমের চশমার স্বচ্ছ গ্লাস ভেদ করে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে মনিরুলের উপর। তিনি মনিরুল কে উদ্দেশ্য করে বললেন — এক্সকিউজমি, এক গেলাস পানি পাওয়া যাবে। মনিরুল লোহার গারদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অবশ্যই পাওয়া যাবে। কিছুটা স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কি রাজনীতি-টাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আবুল বাশার বললেন — না। তাহলে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ কি। জুতা চুরির অভিযোগে এই যুবকটির সঙ্গে আমাকেও ধরে আনা হয়েছে এখানে। আসলে আমি গিয়েছিলাম মারের হাত থেকে ছেলেটিকে উদ্ধার করতে। কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে আবুল বাশার। মনিরুল ইসলাম সাগ্রহে জানতে চায়, আপনি কি করেন। মানে আপনার পেশা জানতে চাইছি। আপাতত এখন কিছু করি না। বছর খানেক আগে কাজ করতাম একটা পত্রিকায়। ও আপনি তাহলে সাংবাদিক। বলতে পারেন একরকম — আবুল বাশার নির্লিপ্ত ভাবে বলে কথাগুলো। আচ্ছা আপনি অপেক্ষা করুন। দেখছি আপনার জন্য কি করা যায়।

এ এস পি মনিরুল আবুল বাশারকে ডেকে পাঠালেন তার নিজের খাস কামড়ায়। আবুল বাশারের দিকে ইশারা করে বললেন — বসুন চেয়ারটায়। ওসি খোদাবক্সকেও ডেকে আনা হয়েছে রুমে। তিনিও দাঁড়িয়ে আছেন টেবিলের একপাশে। মনিরুল ইসলাম ওসির দিকে তাকিয়ে বললেন- সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও তুমি ওনাকে কেন গারদে ঢোকালে। ওসি আমতা আমতা করে বলল- আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম ওনার ওই পত্রিকা তো এক বছর আগেই উঠে গেছে। সে জন্য ভাবলাম উনি হয়তো মিথ্যে পরিচয় দিয়ে আমাদের ধাপ্পা দিচ্ছে। এ এস পি মনিরুলের পাল্টা প্রশ্ন — উনাকে দেখতে কি জুতা চোর মনে হয়? ভাগো এখান থেকে — ওসির প্রতি ধমক লাগালেন মনিরুল। আবুল বাশারকে উদ্দেশ্য করে বললেন — আচ্ছা আপনার নাম তো আবুল বাশার তাই না। আপনার নামেই আরেকজন উপন্যাসিক আছেন চেনেন নাকি তাকে। কি যে অসাধারণ তার লিখনি। আমি তার একনিষ্ঠ গুণমুগ্ধ বলতে পারেন। ভাবছিলাম ঠিকানা পেলে একসময় যেয়ে দেখা করে আসব তার সঙ্গে। আবুল বাশার মনিরুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে ভাবলেসহীন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন — ওনার কোন কোন উপন্যাস পড়েছেন আপনি। মনিরুলের চটপট উত্তর — উজানভাটি, চোরাবালি, একটি নক্ষত্রের পত্তন প্রভৃতি উপন্যাস গুলো পড়া আছে। একটু নড়েচড়ে বসে আবুল বাশার বলল — আপনার মনে ধরেছে বলেই বলছি। ওগুলো আমারই লেখা উপন্যাস। আমিই সেই অখ্যাত লেখক, আবুল বাশার। কি বলছেন আপনি? মনিরুল ইসলামের চোখে মুখে বিস্ময়ের বিচ্ছুরণ।

এ এস পি মনিরুল ইসলাম চেয়ার ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে ভাবমুগ্ধ কণ্ঠে বললেন — কি সৌভাগ্য আমার! আমি তো আমার চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার অতি প্রিয় উপন্যাসিক আজ আমারই সামনে বসে! মনিরুল কপাট অভিমানী গলায় বললেন — তখন যে বললেন — কিছুই করেন না আপনি। এটা কেন বললেন? অন্য উপন্যাস গুলোর কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। শুধুমাত্র আপনার উজানভাটি উপন্যাসখানাই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে শতশত বছর। হ্যাঁ, এই তো সপ্তাখানেক আগেও একটি মিটিং-এ আমাদের আইজি মহোদয় আপনার উজানভাটি উপন্যাসটির ভূঁয়সি প্রশংসা করলেন। আবুল বাশার লজ্জায় রক্তিম হয়ে বললেন — দেখুন, আপনাদের মতো কিছু বিদ্বান মানুষের কাছে আমার দু’একটি উপন্যাস হয়তো প্রীত হয়েছে ঠিকই কিন্তু উপন্যাস গুলোর ভাগ্যে খ্যাতি জুটেনি এতোটুকুও। আমার প্রকাশক মহাশয় উপন্যাসখানা ছাপিয়েছিলেন এক হাজার কপির মতো। কিন্তু তিনশ কপিও তো বিক্রি হলোনা। তাহলে কি করে বলি যে আমি একজন লিখিয়ে, লিখালিখি আমার পেশা। মনিরুল ইসলাম উল্লোসিত গলায় বললেন — এই কথা, জানেন তো শেক্সপিয়রের লেখা জনপ্রিয় হতে দু’শ বছর লেগেছিলো। এসব ইতিহাস কি আর আমি আগে জানতাম। বি সি এস পরীক্ষা দিতে গিয়ে পড়তে হয়েছিলো এসব। রাজসিক আদর আপ্যায়ন শেষে মনিরুল ইসলাম বিদায় জানালেন তার প্রিয় লেখককে।

আবুল বাশার বাড়ি ফিরে এলেন খালি হাতে। তার হাতে বাজারের ব্যাগ না দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে জুঁই। তুমি কেমন মানুষ গো? কাল ঈদ। অথচ তুমি ফিরে এলে খালি হাতে। আর তোমার একি অবস্থা! ছিনতাইকারি-টিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলে নাকি। আবুল বাশার জুঁইকে সমস্ত কিছু খুলে বললো। সব শুনে জুঁই নির্বাক ও নিস্তব্ধ। এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় স্বামীকে কি-ই বা আর বলা যায়। বাড়ির সকলের ঈদ কাটল নিরানন্দ ও নিরাসক্ততায়। আবুল বাশারের সঙ্গে যা যা ঘটেছে সেগুলো নিয়ে তিনি এতটুকুও উচ্চবাচ্য করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন সবকিছু ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখতে। কিন্তু তিনি যা চাইবেন সবকিছু সেরকমই হবে তেমন তো কথা নয়। জুঁই স্বয়ং নিজে ফোন করে আবুল বাশারের সতীর্থ বন্ধুদের সবকিছু জানালেন। ঈদের একদিন পর কয়েকটি সংবাদপত্র ফলাও করে সবিস্তারে সংবাদটি ছাপলো। দু’দিন পরের ঘটনা। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা খুলতেই আবুল বাশার দেখলেন সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে ওসি খোদাবক্সকে। খবরটি পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল আবুল বাশারের। সমস্তদিন ঘরের ভেতর পায়চারি করলেন একা একা। আর ভাবতে লাগলেন কি করা যায়।

আই জি বদরুল আলম খন্দকার অফিসকক্ষে বসে উর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। এমন সময়ে বেয়ারা এসে বদরুল সাহেবকে জানালেন — জনৈক এক সাংবাদিক সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে অপেক্ষা করছে বাইরে। বদরুল আলম বেয়ারাকে ইশারা করে তাকে ভিতরে নিয়ে আসতে বললেন। রুমে ঢুকেই হাতখানা বাড়িয়ে আই জি সাহেবের সঙ্গে করমর্দন করতে করতে নিজের পরিচয় দিলেন আবুল বাশার। তারপর বললেন — পেশায় আমি সাংবাদিক হলেও একটু আধটু লিখালিখিও করি। আই জি সাহেব চোখে মুখে প্রসন্নতা এনে বললেন — আরে বসুন বসুন। আপনার উপন্যাস আমি পড়েছি কয়েকটা। দুর্দান্ত ও অনবদ্য সৃষ্টি। আপনার মতো গুণি মানুষের সঙ্গে যা হয়েছে সত্যি সেটা দুঃখজনক। ওই ওসিকে কিন্তু সাময়িক ভাবে সাসপেন্ডও করা হয়েছে ইতোমধ্যে। আপনি এখন সন্তুষ্ট নিশ্চয়ই। আবুল বাশার বললেন — আসলে আমি একারণেই এসেছি আপনার কাছে। সাসপেন্ড অর্ডারটি বাতিল করতে হবে।

কি বলছেন? কিন্তু কেন? আবুল বাশার মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধিত করে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন — আমি কারো পেটে লাথি মারতে চাই না। এরকম আরো শতশত খোদাবক্স সমস্ত দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। একজনকে ছাঁটাই করে কি করবেন। তাতে কি সমস্ত অনাচার বন্ধ হয়ে যাবে। জানি হবে না। যদি সম্ভব হয় দেশের এই পুলিশ ডিপার্টমেন্টটাকে একটি ইনস্টিটিউশনে রূপান্তরিত করুন। পারবেন। বদরুল আলম বললেন — সেটা কি আর আমাদের হাতে সাহিত্যিক সাহেব। চাইলে সেটা পারেন আমাদের উপরওয়ালারা। যা হোক, আপনার এই সিদ্ধান্তে আমি মুগ্ধ হলাম। সত্যি আপনি একজন আলোকিত মানুষ। উপবিষ্ট জনৈক এক পুলিশ কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে বদরুল আলম বললেন — দেখুন ডি আই জি সাহেব, ভালো করে দেখুন। সমাজে এঁরাই হলো সত্যিকারের সংশপ্তক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এঁরা লড়ে যায় সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে। শরীরের শেষ বিন্দু রক্তও উৎসর্গ করতে এঁরা প্রস্তুত থাকেন দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “সাইফুর রহমান-এর ছোটগল্প ‘সংশপ্তক’”

  1. Pijush Kanti Das says:

    মন ছুঁয়ে গেল।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev