‘লোকটা যদি পাগল হতো, বাতিল করা যেতো
পাগলও নয় ছাগলও নয় অভিসন্ধিমূলক
সে দোষে দোষী নয়, বরং পরের উপকারী
স্বেচ্ছাচারী স্বাধীনচেতা, মদ্যপায়ী, ভেতো’
(‘সংসারে সন্ন্যাসী লোকটা’/‘যেতে পারি কিন্তু কেনো যাবো’, ১৯৮২)
স্বেচ্ছাচার, স্বাধীনচেতনা ও মদ্যপান বলতে বাঙালী কাব্য পাঠকের কাছে যার মুখ সবার আগে ভেসে ওঠে তিনি রাতের কলকাতার স্বেচ্ছাচারী সম্রাট তথা পঞ্চাশের দশকের কিংবদন্তী কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।যাকে উদ্দেশ্য করে কবিতাটি রচিত তিনি কবির দাদামশাই, যার বোহেমিয়ান দীক্ষাকে পাথেয় করেই শুরু হয়েছিল কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পথচলা। ভবঘুরে জীবনদর্শন, কবিতায় ভাষার সহজ ঔদ্ধত্য, ছন্দের দখল ও প্রেম-প্রকৃতির সৌরভ তাকে আদ্যোপান্ত রোম্যান্টিক কবি হিসেবে আমাদের চিনিয়ে দেয়। জীবনের দুঃখ-মুদ্রা হাতে নিয়ে কবি পৌঁছতে চেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার কাছে যাকে তিনি ভীষণভাবে চান, যার জন্য সমস্ত কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারেন, কিন্তু সেই অপ্রাপ্তি যখন না-পাওয়ার বেদনায় পরিণত হয় তখন তিনি বেদনাহত কণ্ঠেই বলে ওঠেন—
“আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’”
(‘অবনী বাড়ি আছো’/ ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’, ১৩৭২)
তাঁর যে সমস্ত কবিতা অমরতা পেয়েছে সেগুলির অধিকাংশই রোম্যান্টিক কবিতা, মন্ত্রের মতো কবিতাগুলি কবিতাপ্রিয় বাঙালীর মনে গেঁথে রয়েছে। তাই স্বভাবতই পাঠকদের কাছে একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে শক্তির কবিতায় বাস্তবতার বড় বেশি অভাব, অর্থাৎ সময় বা সমকালীন সমাজ, রুঢ় বাস্তব কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব তার কবিতায় নেই। তার কবিতা কোন বিশেষ কালের মিলিত জনস্রোতের কলরব হয়ে উঠতে পারেনি, তাই তিনি বাস্তবতাবিমুখ কবি।বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার যে উল্লিখিত অভিযোগগুলি কতটা সত্য অথবা মিথ্যে।
শুধুমাত্র শক্তি চট্টোপাধ্যায় নন রবীন্দ্রনাথ কিংবা ওয়ার্ডওয়ার্থ প্রমুখ রোম্যান্টিক কবিরা বারবার বাস্তববিমুখ এই অভিযোগের স্বীকার হয়েছেন। মোটা অর্থে পাঠকরা বাস্তব বলতে সমাজচেতনার দিকে ইঙ্গিত করেন। বাস্তবিক বা জাগতিক ঘটনার অভিঘাতই কবি-কল্পনায় কবিতার আকার লাভ করে, জীবনানুভব ও শিল্পদৃষ্টিই হয়ে ওঠে কবির প্রেরণা আর সেই ঘটনা বা দৃশ্যটিই তো বাস্তব। প্রিয়কবির সমাজ ও সমকালচেতনাকে জানবার কৌতুহল একদমই অন্যায় নয় বরং প্রশ্রয়যোগ্য। “Art for art’s sake”—এই নীতিতে যারা বিশ্বাস করেন তাদের মতে মানুষের মনে রাগ, দ্বেষ, দুঃখ, আনন্দ, প্রেম, যৌনতা,সৌন্দর্য্যবোধ সমস্তই বাস্তব অনুভূতি তাই এদের শিল্পরূপও বাস্তব। রবীন্দ্রনাথ এ প্রসঙ্গে জানান, ‘কবি যদি একটি বেদনাময় চৈতন্য লইয়া জন্মিয়া থাকেন, যদি তিনি নিজের প্রকৃতি দিয়াই বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতির সহিত আত্মীয়তা করিয়া থাকেন, যদি শিক্ষা অভ্যাস প্রথা শাস্ত্র প্রভৃতি জড় আবরণের ভিতর দিয়া কেবলমাত্র দশের নিয়মে তিনি বিশ্বের সাথে ব্যবহার করেননা, তবে তিনি নিখিলের সংস্রবে যাহা অনুভব করিবেন তাহার একান্ত বাস্তবতা সম্বন্ধে তাহার মনে কোন সন্দেহ থাকিবেনা।’[১] রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য থেকে একথা স্পষ্টই যে কবি যে বিশ্বপ্রকৃতিকে দেখেন তা বাস্তব আর তার সাথে কল্পনা মিশিয়ে যে কাব্যই সৃষ্টি হোক না কেন তা কবির কাছে একান্ত বাস্তব।
রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার চল্লিশের দশক ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। সামাজিক অস্থিরতা,আগস্ট আন্দোলন, কালোবাজারিদের তাণ্ডব ভারতবর্ষকে উত্তাল করে তুলেছিল, ফলত সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, অরুন মিত্ররা কলম ধরেছিলেন কবিতায় সাম্যবাদী রাজনৈতিক ভাবনার জোয়ার বইয়ে দিতে, কিন্তু পঞ্চাশের দশকের প্রেক্ষিত ছিল একটু অন্যরকম। স্বাধীনতা পেলেও কংগ্রেসী শাসনের অরাজকতা, খাদ্যসঙ্কট, হাংরি আন্দোলন মানুষের আশাভঙ্গের কারন হয়ে দাড়িয়েছিল। এক অসম বিষন্নতাবোধ বা অজানা অসুখ পঞ্চাশের কবিতাকে আত্মমুখী বা স্বীকারোক্তিমূলক করে তুলেছিল তাই এই দশকের কবিতায় আমরা জীবনমুখী স্লোগান বা বক্তব্যমূলক কবিতা কিংবা মিছিলে হাঁটবার কবিতা পেলাম না। যুগগত বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রাখলেই শক্তির রচনায় উদ্দেশ্যমূলক কবিতার অভাবের প্রকৃত কারন অনুমান করাই যায়।
ভাববাদী বা বস্তুবাদী কবি দুজনের পক্ষেই সমকালকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। সমকালীন সময়ের অভিঘাত প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সাহিত্যকে প্রেরণা জোগায়। স্বাভাবিক নিয়মেই কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও কালের হাত থেকে রেহাই পেলেননা সময়, সমাজ, রাজনীতি, বাস্তবতা তার কবিতায় কখন প্রত্যক্ষভাবে কখনো প্রেরণা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শক্তির কবিতায় ৩ প্রকারের বাস্তব উপাদানের সাক্ষাত পাই প্রথমত রাজনৈতিক, দ্বিতীয়ত সামাজিক ও তৃতীয়ত মানুষ। কবিতা-জীবনের প্রারম্ভেই তিনি মুখোমুখি হন ১৯৫৯ এর খাদ্য আন্দোলনের দূর্বিষহ সময়ের। তার অন্নহীন স্বদেশ ঈশ্বরভাবনাকে নাড়িয়ে দেয় যখন তিনি দেখেন—
‘মন্দিরে ঐ নীল চূড়াটির অল্প নীচে তিনি থাকেন
একমুঠি আতপের জন্যে ভিক্ষাপাত্র বাড়িয়ে রাখেন
দিন ভিখারী’
(‘মন্দিরে ঐ, নীলচূড়া’/‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোষ্টম্যান’, ১৯৬৮)
১৯৫৯ সালের জনগণ খাদ্য আন্দোলনে সামিল হয়েছিল মানুষের অধিকারের দাবিতে, দূরদর্শী কোন সিংহাসন বদলের সংকল্প তাদের ছিলনা, লড়াইটা ছিল শুধুমাত্র ভাতের। তাহলে প্রশ্ন এখানে কবিতার ঈশ্বর কি তবে সমকালীন সময়ে দেখা ক্ষুধার্ত মানুষ নয়? খাদ্য আন্দোলন ধীরে ধীরে গণ-আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে, এবং তারই করাল গ্রাসে নারী-শিশু নির্বিশেষে ৮১ জন নিহত হয়। এই ক্ষুৎকাতর সময় পর্বেই বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশনের উত্থান। শক্তি চট্টোপাধ্যায় হাংরিয়ালিস্টদের সাথে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে বেরিয়ে আসেন। যেহেতু মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী প্রমুখদের হাংরি তত্ত্ব সাহিত্যকে যতটা প্রভাবিত করেছিল জনমানসে পৌঁছে গণ আন্দোলনের রূপ নিতে পারেনি তাই হাংরির সাথে খাদ্য আন্দোলনের যোগাযোগ প্রবল ছিলনা এবং শক্তির কবিতাতেও হাংরি প্রভাব বড় বেশি দেখা যায়না। খাদ্য আন্দোলন ১৯৫৯ সালেই শেষ হয়ে যায়নি, ১৯৬৬ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের ভুল খাদ্যনীতি, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মন্বন্তরের জের খাদ্য আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল— ‘ইন্দিরা সরকার তখনও খাদ্যশস্যের আমদানির উপর নির্ভর করে আছে। রেশন নেই, চাল নেই। উধাও হয়ে গেল চিনি কেরোসিনও। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন নিদান দিলেন-চাল নেই তো কি হয়েছে-কাঁচকলা খাও। রুটির বদলে কেকের দাওয়াই-যা ফরাসী রানি দিয়েছিলেন তার চেয়ে সুলভ ছিল এ দাওয়াই নিঃসন্দেহে। কিন্তু পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল। দিন বদলেছে।নাকের বদলে নরুন পেলে মানুষ যে ছেড়ে কথা বলবেনা তা জানিয়ে দিল বিক্ষুব্ধ মানুষ’।[২] বসিরহাট থেকে স্বরূপগঞ্জ, হাওড়া-বাদুড়িয়া, ব্যারাকপুর, যাদবপুর, গড়িয়া সর্বত্র উত্তাল হয়ে উঠল, কবি সেই সময়কে ভাষা দিলেন—
‘আগুন যথেষ্ট আছে
কাঠ আছে
কর্তব্য রয়েছে
একমুঠি ভাত নেই,ভাতের গন্ধও নেই’
(২৯ সংখ্যক/‘ছিন্ন বিচ্ছিন্ন’, ১৯৭৫)
শুধু ভাত নয় ভাতের গন্ধ যে কি অত্যাশ্চর্য বস্তু তা আমরা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা মহাশ্বেতা দেবীর রচনায় উপলব্ধি করেছি, তাদের মত শক্তির কবিতায় ভাত বিষয় হিসেবে মুখ্য ভুমিকা গ্রহন করেনি কিন্তু অন্নহীনতার যন্ত্রণাকে প্রত্যক্ষ করেছেন অনুভব করেছেন ফ্যানের চমৎকার গন্ধ—
‘তার আগে শস্যক্ষেতে গন্ধ উঠেছিলো
সম্পুর্ণ শস্যের গন্ধ,ভাতের, ফ্যানের
যদিও স্বর্গীয় নয়, চমৎকার লাগে’
(১০৬ সংখ্যক/‘ছিন্ন বিচ্ছিন্ন’, ১৯৭৫)
অন্নহীন সর্বহারার বিপরীতে যারা আছে অর্থাৎ শোষক শ্রেণী যারা সভ্যতা সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু, রাষ্ট্রের ভঙ্গুর দশার জন্য তারাই দায়ী। তাই ক্ষমতালোভী, মুনাফালোভী মুখোশধারী দেশবন্ধুদের বিদ্রুপ করতেও কবি পিছুপা হননি—
‘সভায় যে কাঁদে সে সংসদে
মানুষের শুভ পণ্য বিক্রি করে দেশবন্ধু সাজে
বন্যার আখুটে বালি সভ্যতা গঠনে লাগে কাজে
এই বলে যে ভাষায়,
সে কখনো ঈশ্বর দ্যাখেনি’
(‘কার জন্যে এসেছেন?’/‘ঈশ্বর থাকেন জলে’, ১৯৭৫)
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রূর অভিসন্ধিমূলক রাজনৈতিক নেতাদের মুখ বদল হয় ঠিকই কিন্তু ভাষা-ভঙ্গী, চরিত্র বদল হবার নয়, তাই তারা কোনমতেই ঈশ্বর দর্শনের যোগ্য নয়।নিজস্বার্থে তারা মানুষের ধর্ম, ভাষা কিংবা মৌলিক অধিকারেও হস্তক্ষেপ করে। এদের কোন ভৌগলিক সীমা হয়না তাই হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আব্দুল বরকতদের রক্তে স্নান করতে হয় বাংলা ভাষাকে (২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২)। পাকিস্থানের অন্যায় আগ্রাসন এবং ভাষা আন্দোলনের রোষ বর্তমান বাংলাদেশে অবশ্যম্ভাবী মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) ডেকে এনেছিল। বসন্তহীন সেই রক্তাক্ত বাংলাদেশকে কবি যেভাবে দেখালেন—
‘এই বাংলাদেশে ওড়ে রক্তমাখা নিউজপেপার
বসন্তের দিনে
বসন্তের দিনে করে বসবাস নেপথ্য ও স্টেজ
হিন্দু ও অহিন্দু করে কোলাকুলি, হত্যা, মুষ্ঠ্যাঘাত!’
(‘এই বাংলাদেশে ওড়ে রক্তমাখা নিউজপেপার বসন্তের দিনে’/‘সুখে আছি’, ১৯৭৪)
ওপার বাংলার মুক্তিযুদ্ধের মত সত্তরের দশকে এপার বাংলার ইতিহাসেও চলছিল এক কুখ্যাত পর্ব যা আমরা নকশাল আন্দোলন নামে চিনি। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ীকে কেন্দ্র করে চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন কৃষক-জনতা সরকারের খাস জমি বন্টনের সমস্যাকে কেন্দ্র করে জোতদারদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহত হয়। পরবর্তীতে এই আন্দোলন গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রথা ও অচলায়তন ভাঙার লক্ষে বহু ছাত্র-যুব এতে সামিল হয়। প্রতিষ্ঠান বিরোধী কার্যকলাপ সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তাই তারা আন্দোলন দমনে অবাধ হত্যালীলায় মেতে ওঠে। তাজা প্রাণের বলি কবিকেও ভাবিত করে—
‘কেন এই নিদারুণ হত্যা? কেন মায়াহীন ক্রোধ!
এই বাল্যকালে ওই আমার সন্তান কি করেছে?
কোন অপরাধে এক প্রাণবন্ত জীবন আঁধারে?
ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, ও শুধু বিপ্লব দোষী’
(‘রক্তের দাগ’/‘ঈশ্বর থাকেন জলে’, ১৯৭৫)
সরকার নকশাল আন্দোলন দমনে সফল হয়েছিল, কিন্তু নকশাল আজও একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়। শক্তির কবিতায় রাজনৈতিক মতামত একটু ভিন্ন, কিন্তু মতামতহীন নয়, তাই হয়তো বিপ্লব তার কবিতার খাতাকেও স্পর্শ করেছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা বলতে গিয়ে জানান—“আমার লেখায় প্রত্যক্ষ কিছুর প্রায় নিমন্ত্রণ নেই বললেই চলে। এমনকী যখন ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি এলেজি’ কিংবা ‘স্মরণিকাঃ দিলীপকুমার সেন’ কিংবা দাঙ্গার উপর লেখা ‘এই বাংলাদেশে ওড়ে রক্তমাখা নিউজপেপার বসন্তের দিনে’—প্রভৃতি লেখার ভেতরটা দেখি, তখন সেগুলি নামমাত্রে প্রাসঙ্গিক হলেও, আবেশ-আবেষ্টনীতে প্রসঙ্গ ত্যাগ করেও অন্যত্র, ব্যক্তিগত ও সমাজগত দুঃখে পাঠককে সন্নিবেশিত করে। পরোক্ষ কিছু টানটোনের মাধ্যমে আমি প্রত্যক্ষ ত্যাগ করতেই ভালোবাসি।তেমনি রাজনীতি স্পষ্ট ও সোচ্চার নয় আমার লেখায়; আমি অমন উচ্চারণময় উচ্চকণ্ঠ লেখা, মনে মনে এড়িয়ে যেতে ভালোবাসি”।[৩]
রাজনৈতিক হোক সামাজিক হোক তিনি মানুষকে অস্বীকার করতে পারেননা দুঃখের চাবিকাঠি দিয়েই তিনি হৃদয়ের অন্তঃপুরে প্রবেশ করেন। তিনি সমাজ সচেতন বলেই হয়তো খুব কাছ থেকেই বাঙালী নারীদের চিরন্তন ট্র্যাজিক জীবনযন্ত্রণাকে দেখেছিলেন। আর আমাদের দেখালেন এক অসহায় দরিদ্র নারীকে, যে গ্রাম্য কুসংস্কারবসত সুদর্শনপোকার কাছে করুণ প্রার্থনা জানাচ্ছে—
‘শুভ খবর কাছে আনাও, দাবার চালে দোলা বানাও
হা পিত্যেশ নোলা বানাও সুদর্শন পোকা
আঙুলে চেলে গণ্ডী করি সুদর্শন পোকা
নিখাকি হাতে গড় করেছি সুদর্শন পোকা
ধুলোর ঘর ভাঙো তুখোড় সুদর্শন পোকা’
(‘সুদর্শন পোকা’/‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’, ১৯৮২)
খাদ্য-আশ্রয় আর ছোট্ট স্বপ্ন এর বাইরে কিই বা চাওয়ার থাকতে পারে, মেয়েটি শুধু সুদর্শন পোকার কাছে তার যন্ত্রণাময় জীবনই ব্যক্ত করেনি শুভ খবর পাওয়ার জন্য সে ব্যাকুল। এই সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে শক্তির এই কবিতাটি তার তীক্ষ্ণ সমাজদৃষ্টির প্রমাণ দেয়। কবিতার মেয়েটি আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুর্গা’ (‘পথের পাঁচালী’) কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়েটির’ কথা মনে করিয়ে দেয়।
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় রাজনৈতিক হিংসা, সামাজিক ব্যাধি এসবের জন্য মানুষকেই দায়ী করেন।সমকালীন বাস্তব পরিবেশ ও জটিল জীবন সংঘাতই মানুষকে পীড়িত করে এবং যন্ত্রণা দেয়।তাই কবি কখনো মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান কখনো রাগে অভিমানে মানুষের সঙ্গত্যাগ করতে চান। যেমন—
‘মানুষের সব গিয়ে এখন রয়েছে হিংসা বুকে
প্রেম পরিণয় গিয়ে এখন সে রক্ত অসুখে
মোহ্যমান, প্রাণ নিতে পারে
নিশ্চিত কোথাও কোন ভুল থেকে গেছে
ব্যবহারে।
মানুষের সঙ্গে আর মেলামেশা সঙ্গত নয়-
মনে হয়,এর চেয়ে কুকুরের শ্লেষ্মাও মধুর’
(‘ভুল থেকে গেছে’/‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’, ১৯৭২)
কিংবা,
‘একটি মানুষ হঠাৎ কেন শব্দ করে
তালি বাজায়?
পাথর দেখে ভয় পেয়েছে।
মানুষটাকি পাথর নিজেই?
পরস্পরের আলিঙ্গনে জ্বলবে আগুন?
ভয় পেয়েছে।
একটি মানুষ মানুষ দেখে ভয় পেয়েছে।’
(‘মানুষ দেখে ভয় পেয়েছে’/‘ভাত নেই পাথর রয়েছে’, ১৯৭৯)
কবি ১ম কবিতাটিতে জানিয়েছেন যে মানুষ প্রাণ নিতে পারে তার সাথে মেশার ইছে কবির নেই তাদের ভাষণ কুকুরের শ্লেষ্মার থেকেও অধম, সভ্যতার কাছে এ যেন কবির রূঢ় বাস্তবের বিদ্রুপ। অন্যদিকে ২য় কবিতায় তিনি জানান মানুষের হৃদয় পাথর নয় যে ঘর্ষনে আগুন জ্বালাবে ভালোবাসার স্পর্শেই তাকে সজীব করে তুলতে হবে, কারন মানুষ আজ মানুষকেই সবথেকে বেশি ভয় পায়।
একথা সত্য যে কবি শক্তির কবিতা জুড়ে রয়েছে মানুষ। সময় যত এগোচ্ছে মানুষ তত যান্ত্রিক প্রযুক্তির নাগপাশে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছে, ফলে দূরত্ব বাড়ছে, একাকিত্ব, বিষন্নতা, নিঃসঙ্গতার মত ব্যাধি সমাজকে কাবু করে ফেলছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়কে, সমকালী যুগযন্ত্রণাবোধ আসলের কবির জীবন সঞ্জাত বাস্তব, তিনি চেয়েছিলেন সমাজ ও মানুষের আলগা শিকড়ে ভালোবাসার মাটি পৌঁছে দিতে, তাই তিনি মানুষকেই ভালোবেসেছেন। সুতরাং রাজনীতি, সমাজ ও সময় প্রভৃতি বাস্তব উপাদানই শক্তির কবিতায় রয়েছে তাই তার কবিতাকে বাস্তবতাহীন এই তকমা আঁটা যায়না। এ কবিতা মানুষের, জীবনের তাই এ কবিতা অবাস্তব হতে পারেনা। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় আসলে সম্পূর্ণ সময় ও সমাজ সচেতন একজন কবি যিনি মানুষের কান্নার শরীক হতে জানেন আবার মৃত্যুর পরেও স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়াতে পারেন হেমন্তের অরণ্যে।
তথ্যসূত্র
১। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ‘বাস্তব’, ‘সাহিত্যের পথে’, বিশ্বভারতী, পুনর্মুদ্রণ-অগ্রহায়ণ ১৪২৬, পৃঃ২৪।
২। ফটিকচাঁদ ঘোষ; ‘পূর্বসূত্র’, ‘নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কবিতা’, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, পরিবর্ধিত সংস্করণ-২০১৬, পৃঃ২৮।
৩। অমরেন্দ্র চক্রবর্তী (সম্পাদক); ‘কবির উত্তর’, ‘কবিতা পরিচয়’, স্বর্ণাক্ষর প্রকাশনী প্রাইভেট লিমিটেড, দ্বিতীয় মুদ্রণ- জানুয়ারি ২০১৫, পৃঃ৩০১।
i) শাওন নন্দী ; ‘পঞ্চাশঃ কবিতার নয়াচর’, ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা’, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, প্রথম প্রকাশ-মে ২০১২,
ii) দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (সম্পাদক) ; ‘আধুনিক কবিতার ইতিহাস’, দে’জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ- ডিসেম্বর ২০১৬,
iii) শক্তি চট্টোপাধ্যায়; ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, দে’জ পাবলিশিং, পুনর্মুদ্রণ-জানুয়ারি ২০১৬।
iv) দীপ্তি ত্রিপাঠী; ‘বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যপরিচয়’, দে’জ পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪।