‘ভালো নাটক ভালো করে করবো’— এর মতো একটা সরল বাক্য আশ্রয় করে এক জটিল শৈল্পিক কর্মযজ্ঞ বছরের পর বছর ধরে চলেছে। এই উদ্যোগের পুরো ভাগে যিনি ছিলেন, তিনি ‘বহুরূপী’ নাট্যদলের পুরোধা, অবিসংবাদী শম্ভু মিত্র। তাঁর পরিচালনা এবং অভিনয়গুণে সমৃদ্ধ হয়ে ‘বহুরূপী’ নাট্যদলের একের পর এক প্রযোজনা যে উচ্চতার শিখর ছুঁয়েছে, তা আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে বিরলতম দৃষ্টান্ত।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে এক প্রবন্ধে শম্ভু মিত্র লেখেন- ‘বাংলা কবিতায় গল্প-উপন্যাসে চিত্রকলায় নৃত্য গানে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের যে বহুমাত্রিক স্রোত চলমান দেখা গেছে, বাংলা রঙ্গমঞ্চ কিন্তু তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিশিরকুমার আধুনিকত্বের আবহাওয়া অনেকটা তৈরি করতে পেরেছিলেন, কিন্তু ক্রমশ ‘ফিউডাল ছায়াচ্ছন্ন রোম্যান্টিক মধ্যবিত্ত পরিবেশেই তিনি কিছুটা বাঁধা পড়ে গেলেন’।
আমরা জানি, গণনাট্য সংঘের ছত্রছায়ায় জড়ো হয়েছিলেন সে সময়ের প্রায় সব প্রধান শিল্পী। ১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্য রচিত শম্ভু মিত্র এবং বিজনবাবুর যুগ্ম পরিচালনায় ‘নবান্ন’ মঞ্চস্থ হয়। এই প্রযোজনা গোটা আধুনিক ভারতীয় সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছিল। সে যুগের লেখক কিংবা ফিল্ম নির্মাতাও এই নাট্যের প্রভাব এড়াতে পারেননি। কিন্তু আইপিটিএ-র ছায়াতলে পি সি যোশীর ডাকে যত দ্রুত সকলে জোট বেঁধেছিলেন, ঠিক ততটাই দ্রুত এই জোট ভাঙলো। পি সি যোশিকেও কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করতে হলো।

কলকাতার ১১—এ নাসিরুদ্দিন রোডে শম্ভু মিত্র-তৃপ্তি মিত্রের ছোট্ট বাড়িতে এক নতুন উত্থান শুরু হলো। শম্ভু মিত্রকে কেন্দ্র করেই বিজন ভট্টাচার্য, গঙ্গাপদ বসু, কলিন শরাফী- এঁরা সকলেই জড়ো হলেন। আর ছিলেন অভিভাবকস্থানীয় মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। ‘সীতা’ নাটকে বাল্মীকি করার সুবাদে তিনি মহর্ষি নামে পরিচিত হন।
কলিন শরাফীর সঙ্গে এলেন অশোক মজুমদার, অমর গঙ্গোপাধ্যায়, মোহাম্মদ জাকারিয়া। স্থির হলো নবান্ন প্রযোজনা ফের হবে। সেই সূত্রে এলেন সত্যজীবন ভট্টাচার্য, জলদ চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিককুমার ঘটক, ললিতা বিশ্বাস, রবিন মজুমদার, শোভেন মজুমদার প্রমুখ। নবান্ন এবার ততটা সফল না হওয়ায় তুলসী লাহিড়ীর ‘পথিক’ নাটকটি বাছা হলো। এই সময় দলে এসেছেন স্মৃতি ও গীতা ভাদুড়ি, সবিতাব্রত দত্ত, কুমার রায় প্রমুখ। প্রথমে কথাকলির মুখোশ লোগো হলো। পরে খালেদ চৌধুরী সেটা কিছুটা বদলালেন। বহুরূপীর বক্তব্য— ভালো নাটক ভালো করে করা।
থিয়েটারের ঘাড়ে আগে থেকেই সমাজ বদলানোর দায় চাপাতে চান না তাঁরা। ক্রমশ ‘উলুখাগড়া’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘বিভাব’, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘চার অধ্যায়’ অবলম্বনে শম্ভুবাবুর প্রযোজনা ‘চার অধ্যায়’, ইবসেনের নাটক অবলম্বনে ‘দশচক্র’, ‘এই তো দুনিয়া’ প্রভৃতি মঞ্চস্থ হয়েছে। লক্ষ্য করার বিষয়, দশচক্র ও চার অধ্যায় সে সময় সামান্য সাফল্য পেয়েছিল। অথচ পরবর্তীকালে ইতিহাস সৃষ্টি করে।
‘রবীন্দ্রনাথ অভিনেয় নন’— এই ধারণাকে সে সময় চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন শম্ভু মিত্র। ১৯৫৪-৫৫ সালে শম্ভুবাবুর পরিচালনায় বহুরূপী মঞ্চস্থ করলো ‘রক্তকরবী’। এর কাছাকাছি সময়েই মুক্তি পেলো সত্যজিৎ রায়র ‘পথের পাঁচালী’। ‘রক্তকরবী’ এবং ‘পথের পাঁচালী’- এই দুটিই কিন্তু আধুনিক ভারতের সংস্কৃতিচর্চাকে আমূল বদলে দিলো। এর পরবর্তীকালে বহুরূপীর ‘ডাকঘর’, ‘পুতুল খেলা’, ‘রাজা অয়দিপাউস’, ফের রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’, ‘চার অধ্যায়’ সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সমসাময়িক নাটক রচয়িতাদের প্রতিও গভীর অভিনিবেশ দেখিয়েছেন শম্ভু মিত্র। বাদল সরকার, বিজয় তেন্ডুলকর কিংবা ইউজিন আয়ানেস্কোর ‘গণ্ডার’ বহুরূপীর প্রযোজনায় মানুষ দেখেছেন। এই সব প্রযোজনা দেখতে মানুষ ভেঙে পড়েছে নিউ এম্পায়ারে, অ্যাকাডেমিতে, এমনকি ইডেন গার্ডেনসেও।
পরবর্তীকালে বহুরূপীর থেকে সরে গেলেও ফ্রিৎস বেনেভিৎস-এর পরিচালনায় শম্ভু মিত্র অভিনীত ব্রেখট-এর নাটক ‘গ্যালিলিওর জীবন’ দেখতে মানুষ রবীন্দ্র সদনে টিকিট বিক্রির নির্ধারিত দিনের আগের রাতেই লাইন দিয়েছেন।
অন্য দিকে বহুরূপী দলে অমর গঙ্গোপাধ্যায়, কুমার রায়, দেবেশ রায়চৌধুরী প্রমুখ নাটক পরিচালনা করেছেন। এবারও ১ মে থেকে নাট্যোৎসব আয়োজন করেছে বহুরূপী।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ৪ মে ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত