বাইশ.
আমি যখন এমএ পড়ছি, তখন ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী পাঠভবনের শিক্ষক বুবুদির বাসায় থাকতেন। বুবুদি তাঁর পুত্রবধূ। সুপ্রিয়-সুপূর্ণা বুবুদির পুত্রকন্যা। আগে লিখেছি, সুপূর্ণাকে ইন্দিরা দেবী ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ গাইয়ে করে তুলেছিলেন। আমি একবার প্রথম পর্ব এমএর বান্ধবীদের সঙ্গে ওঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘গান জানো?’ গান শোনাতে বললে বোকার মতো ধরেছিলাম অনেক চড়া সুরের গান ‘মেঘ বলেছে যাব যাব। খালি গলায় গাইতে গিয়ে গলা সুরে পৌঁছুল না। উনি বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন মনে হয়েছিল। ভয়ে আর কখনো তার ধারেপাশে যাইনি।
‘ধ্বনি থেকে কবিতা’ লিখবার সময়ে কানাই সামন্ত মশাই কত যে সহায়তা দিয়েছেন আমাকে, তা আগে বলেছি। তবে সব কি আর বলে শেষ করা যায়! রবীন্দ্রনাথ কখনো কখনো এক কবিতাকে বারবার বদল করে দেখতেন কোনটি সবচেয়ে ভালো হয়। সেসব পাঠান্তর নিয়ে নানা ভাবনাচিন্তা করা যেতে পারে, বলেছিলেন কানাইবাবু। ওঁর কথামতো পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করে নানা রকম বিবেচনা শেষে মত প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছিল।
একটি গানের পাঠ নিয়ে একবার বিভ্রাট হয়েছিল। গানটি দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন রেকর্ডে। পাঠ নিয়ে বাদানুবাদের কথাও সেই শিল্পীর কাছেই শুনেছিলাম। পুরোনো সংস্করণের গীতবিতান-এ ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’ গানের যে পাঠ ছিল, পরের সংস্করণে তা বদলে গিয়েছিল। ‘মম জীবন যৌবন মম সকল স্বপন/ তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনী — সম’ পাঠ ছিল আগের সংস্করণে; সেই পাঠ অনুযায়ী দেবব্রত গান রেকর্ড করেছিলেন। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড’ পরের সংস্করণের বই দেখে বলল, না, ‘সকল স্বপন’ হবে না, হবে ‘সফল স্বপন’। কর্তৃপক্ষ হিসেবে মিউজিক বোর্ডের কথাই ওপরে থাকল। কানাই সামন্ত মশাইকে বলে পাণ্ডুলিপি বার করে দেখলাম একাধিক পাণ্ডুলিপিতে ‘সকল’-এর ‘ক’-এর ওপরে ওভাররাইটিং রয়েছে। সব ‘সকল’ ‘সফল’ হয়ে গেছে। মন খুশি হলো না। কানাইবাবু বললেন, ‘ও তুমি যা-ই বলো ওটা ‘সফল’ বলেই চলে গেছে। মন বেজার করে বসে রইলাম। তখন বললেন, ‘তুমি শোভনলালকে জিজ্ঞেস করতে পারো গানটির ইংরেজি অনুবাদে কী আছে।’ গেলাম শোভনদার কাছে। উনি বিড়বিড় করে পাণ্ডুলিপির নম্বর উল্লেখ করে বললেন, ‘ওতে দ্যাখো তো!’ খুলে দেখি, ওতে আছে ‘all my dreams’। তবে তো ‘সকল স্বপনই হলো! কানাইবাবু মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘ও তুমি যা-ই বলো, ওটা ‘সফল স্বপন’ই চালু হয়ে গেছে!’ আমি ক্ষমাদির গীতবিতান-এ ‘সফল’ কেটে ‘সকল’ লিখে রাখা আছে দেখেছি। ইন্দিরা দেবী নাকি নিজ হাতে বইতে ভুল সংশোধন করে দিয়েছিলেন। ওটা যে সকলই হবে, তা নিয়ে আমার কিছুমাত্র সংশয় নেই।
কবিতার ধ্বনির হাত ধরে ব্যঞ্জনার উপলব্ধিতে পৌঁছানোর সুবিধার জন্যে কবিতাগুলো মুখস্থ করে নিয়ে সারাক্ষণ মনে মনে আবৃত্তি করে চলতাম। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ তো আগে থেকেই প্রায় মুখস্থ ছিল। সত্যেন দত্তের ‘চম্পা’র প্রথম দিকটা প্রায় মুখস্থ ছিল। বাকি অংশের ছন্দান্তর করতে গিয়ে মোটামুটি আয়ত্ত হয়ে গেল। মোটে পাঁচখানি কবিতা বিশ্লেষণ করার জন্যে নির্বাচন করেছিলাম। বাকি তিনটির একটি নজরুলের ‘সর্বহারা। বালিকা বয়স থেকেই সঞ্চিতা খুলে এ কবিতা কতবার যে পড়েছি তার ঠিক নেই। চতুর্থ কবিতা নিয়েছিলাম জীবনানন্দ দাশের ‘আমাকে একটি কথা দাও’। তত পরিচিত কবিতা নয়, কিন্তু উপসংহারে ‘পাখির প্রেমে, পাখিনীর ‘অন্তিম শরীরিনী মোমের মতন’ গলে যাবার কথায় নিঃশেষে সর্ব সমর্পণের ছবিতে মুগ্ধ হয়ে কবিতাটি বেছেছিলাম। এ কবিতা রীতিমতো মুখস্থ করতে হয়েছিল। ক্ষুদ্র অবয়ব বলে যাহোক করে মুখস্থ করে ফেলি। শেষ কবিতা শঙ্খ ঘোষের ‘ভিখিরির আবার পছন্দ’ পেয়েছিলাম প্রতিক্ষণ পত্রিকায়। উপর্যুপরি উষ্মধ্বনির ব্যবহার নিহিত ব্যঞ্জনাকে যেন অসহিষ্ণুতার ঝঙ্কারে উচ্ছ্বসিত করছিল। কবিতাটির ছত্রে ছত্রে অন্ত্যমিল না থাকলেও অন্যবিধ ধ্বনি সুষমা আর সাম্য সহজেই সেটিকে আয়ত্তে এনে দিল।
আশ্চর্যের বিষয়, কবিতাগুলো যখনই আবৃত্তি করা যায়, একের পর এক দল মেলে নতুন নতুন তাৎপর্য বিকশিত করে ওরা। মনে হতো কবিতাগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করতে করতে ভেতরে প্রবেশ করছি। এ কথা থেকে ধরা যাবে, ওই দিনগুলো আনন্দের ঘোরে কেটেছিল।
তেইশ.
শান্তিনিকেতনের সংগীতভবনে একটি লাল খাতা চেয়ে হাঁকডাক শোনা যেত প্রায়ই। সংগীতশিক্ষকেরা ক্লাসে গান শেখাতে গিয়ে স্বরলিপির কোনো সমস্যায় পড়লে বেয়ারাকে হাঁক দিতেন, ‘ওরে, লাল খাতাটা নিয়ে আয় তো!’ সে কী রকম খাতা জানতে খুব কৌতূহল হতো। একবার সময় পেয়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে লাল খাতা চেয়ে নিলাম কালীপদদার কাছ থেকে। কিসের লাল! ব্যবহারে জীর্ণ মলাটের লাল রং কবেই মাটি মাটি হয়ে গেছে!
ভেতরে দেখি গোটা গোটা হাতের লেখায় পরিষ্কার করে স্বরলিপি টুকে রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে কোন পত্রিকায় কত সালের কোন মাসে স্বরলিপিটি ছাপা হয়েছিল, তা-ও লেখা। খাতার শেষে নোট রয়েছে, স্বরলিপিগুলো টুকে রেখেছেন বীরেন পালিত মাস্টার মশাই। শান্তিনিকেতনে ইনিই কেবল নিজের ক্লাসঘরে একটি হারমোনিয়াম রাখতেন। আর সব ক্লাসে তানপুরা বেঁধে গান শেখানো চলত। বীরেনদা কঠিন কঠিন ধ্রুপদাঙ্গের রবীন্দ্রসংগীতগুলো শেখাতেন ছেলেমেয়েদের।
লাল খাতাতে আমাদের জাতীয় সংগীতের স্বরলিপি পেলাম। স্বরবিতানে ইন্দিরা দেবীর যে স্বরলিপি আছে, বীরেনদা পত্রিকা থেকে সেই স্বরলিপিই টুকেছেন। খেয়াল করে দেখি সেই স্বরলিপির মাথায় পেনসিল দিয়ে আর এক স্বরলিপি লেখা রয়েছে। বীরেনদা নোট লিখেছেন, পেনসিলের ওই লেখা ইন্দিরা দেবীর হাতের। সুচিত্রাদির রেকর্ডের যে সুরে আমরা ‘আমার সোনার বাংলা’ গাই, এটা সেই সুর! মনে পড়ল, সুচিত্রাদির এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম রেকর্ড করার সময়ে তিনি ইন্দিরা দেবীর কাছ থেকে সুরের অনুমোদন নিয়ে নিয়েছিলেন। স্বরবিতানের সুরলিপি দেখে আমরা বিভ্রান্ত হতাম, কোনটা তবে আসল সুর! ওই সুরটি এল কোথা থেকে, সেটা আমাদের কাছে রহস্যই থেকে গেল। লাল খাতায় ইন্দিরা দেবীর পেনসিলে লিখে রাখা স্বরলিপি দেখে শান্তি হলো যে সুচিত্রাদির রেকর্ডের সুরে গানটি গেয়ে আমরা কোনো ভুল করিনি। নতুন সংস্করণ স্বরবিতানের পরিশিষ্টে এখন সুচিত্রাদির গাওয়া সুরের লিপি মুদ্রিত হয়েছে। লেখা আছে রেকর্ডের সুর শুনে শান্তিদেব ঘোষ এই স্বরলিপি তৈরি করেছেন।
পরবর্তীকালে শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কাছে শুনেছি, আগুনে লাল খাতাটি নাকি পুড়ে গেছে। আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর-বিষয়ে লাল খাতার তথ্যটুকু লিখে রাখা দরকার মনে হলো। লাল খাতায় স্বরলিপি নকল করে রেখে বীরেনদা একটা বিরাট কাজ করেছিলেন বলতে হবে।
চব্বিশ.
পরিমল চন্দ কলকাতাতে তিন-চার দিনব্যাপী রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। একবার আমারও গান গাইবার আমন্ত্রণ ছিল। লেখাপড়ার ফাঁকে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা গিয়ে সারা দিন ধরে নানা জনের নানা স্বাদের গান শোনা। বেশ সুন্দর বিনোদন হয়েছিল। একদিন গীতবিতান-এর শিক্ষক গীতা সেনের এক গান শুনে চমকে গেলাম। গাইলেন ‘মনে যে আশা লয়ে এসেছি হল না হে’। প্রথম অন্তরার ‘বেদনা রহিল মনে মনে’র শেষ দুটি ‘মনের সঙ্গে প্রথম ছত্রের ‘মনে’ মিলে বাণীতে-সুরেতে, মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলের সঙ্গে গানটির মিল চমকে দিল। পরের অংশের ‘নিয়ে কম্পিত হৃদয়খানি’ পদ ‘মনে কী দ্বিধা’ গানটিকে আরও বেশি মনে করিয়ে দেয়।
গীতা সেনের সঙ্গে কথা বললাম। উনি তো ‘দ্যাশের মাইয়া’ বলে আমাকে কাছে টেনে কী সব খাবার-টাবার কিনে খাওয়ালেন!
শান্তিনিকেতনে ফিরে স্বরবিতান অষ্টম খণ্ড খুলে ‘মনে যে আশা লয়ে’ গানখানি তুলতে শুরু করলাম। গানের মাথায় রাগ নাম নির্দেশ করা রয়েছে ‘মেঘাবলী’। সংগীতভবনের ওয়াজেলওয়ার ওস্তাদজির বাড়ির কাছ দিয়েই রোজ রবীন্দ্রভবনে পড়তে যাই। আগেই কবে আলাপ হয়েছিল। একদিন ওঁর কাছে গেলাম। ‘মেঘাবলী’ রাগ নিয়ে জানতে চাইলাম। ওই নাম শুনে উনি তো অবাক। ‘এ রাগের নাম তো শুনিনি।’ ভাতখণ্ডে ঘাঁটলেন। আরও কী কী মারাঠি গানের বই খুলে খুলে খুঁজলেন। ‘না!’
শেষে বললেন, ‘গান তো গানখানি, শুনে দেখি!’। যা পারি গেয়ে শোনালাম। উনি বললেন, ‘এ তো ইম্নি বিলাবল। একে বেলাবলীও বলে।’
রবীন্দ্রভবনে রবীন্দ্রনাথের গানের সংকলন গানের বহি ও বাল্মীকি প্রতিভা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখি ওমা, এতে তো ‘মনে যে আশা লয়ে’ গানটি রয়েছে! মাথার ওপরে লেখা রয়েছে ‘বেলাবলী’। তবে তো ওয়াজেওয়ার ওস্তাদজি যা বলেছেন, তা-ই ঠিক! এর রাগ ‘বেলাবলী’ বা ‘ইম্নি বিলাবল।
স্বরবিতান অষ্টম খণ্ডে ‘মেঘাবলী’ নিশ্চয়ই ভুলবশত ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ মুদ্রণপ্রমাদ ঘটেছে! এ ভুল নিয়ে লেখালেখি করলেও বিশ্বভারতী সংশোধনের কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি, যথারীতি।
সংগীতভবনের উচ্চাঙ্গসংগীতের ধ্রুবতারা যোশীজি তখন অবসর নিয়েছিলেন। ইনিও ছিলেন সুজন। পূর্বপল্লীতে থাকতেন। তাঁর কাছেও গিয়ে এটা-ওটা প্রশ্ন করতাম। উনি কফি খাওয়াতেন। মোহরদির মামা সুজিত মুখোপাধ্যায়ের কন্যা রুচিরা যোশীজিকে দেখাশোনা করতেন। রুচিরাই সবাইকে কফি বানিয়ে খাওয়াতেন। যোশীজি বারীণ মজুমদারের কথা খুব জিজ্ঞেস করতেন। আগ্রা থেকে ওঁদের পরিচয় ছিল। এই স্নেহশীল ওস্তাদজি পরে বর্ধমানে গিয়ে বসবাস করতেন। একবার ঢাকায় এসে আমার খোঁজ করেছিলেন। আমি গিয়ে দেখা করেছিলাম। [ক্রমশ]