বত্রিশ.
২০০১ সালে রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপির তথ্য নিয়ে কাজ করব বলে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম। রবীন্দ্রভবনে বসেই এসব কাজ করবার সুবিধে হয়। প্রথম কিছুদিন পূর্বপল্লী গেস্টহাউসে থেকে আমার ধ্বনি থেকে কবিতা বইয়ের দ্বিতীয় মুদ্রণের কাজ করলাম। তারপরে রবীন্দ্রভবন পাঠাগারে বসে কাজ শুরু করা গেল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক স্বপন মজুমদার তখন রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ। ভদ্রলোক কেন জানি না আমাকে তাঁর অধস্তন কর্মচারী ভেবে বসলেন। কথায় কথায় আমাকে ডেকে পাঠাতেন। কথাবার্তায় আক্রমণাত্মক ভাব থাকত। সেসব কথা ছেড়ে, তাঁর কথায় রবীন্দ্রভবনে যে বক্তৃতা করেছিলাম, সেই বিষয়ে লিখি।
অল্প দিনেই রবীন্দ্রগানের স্বরলিপি বিষয়ে অনেক খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। ‘সখী, ওই বুঝি বাঁশি বাজে’ গানটিতে রবীন্দ্রনাথের সায় পেয়েই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ থিয়েটারি ঢঙের চড়া সুর বসিয়েছিলেন। এ সুর নিজেই গেয়ে শোনাব ঠিক করলাম। দিলীপ রায় রবীন্দ্রনাথের ‘তোমার বীণা আমার মনোমাঝে’ গানে নিজে আরেকটি সুর দিয়ে তাঁর গীতিমঞ্জরী বইতে ছাপিয়েছিলেন, সেই সুরটি বললাম স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়কে গাইতে। সরলা দেবী ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’ গানটিতে কোথাও জোরে, কোথাও মৃদুকণ্ঠে গাইবার নির্দেশ দিয়ে যে স্বরলিপি করেছিলেন, সেখানাও সেইভাবে গেয়ে শোনাতে বললাম স্বস্তিকাকে। ইন্দিরা দেবী কাঙালিচরণ সেনের করা ‘মোরে বারে বারে ফিরালে’ গানটির স্বরলিপি বদল করে অন্তরা আর আভোগের পরে মুখ গাইবার সময়ে ‘মোরে’ উচ্চারণের ছন্দে গানটিকে রাগভঙ্গি করে তুলেছিলেন। আলপনা রায় চৌধুরীকে বলেছিলাম এই দুই স্বরলিপির ভেদ গেয়ে শোনাতে। প্রসঙ্গ ছিল আরও নানা, যাতে বক্তৃতা হলো দু-ঘণ্টাব্যাপী।
রবীন্দ্রনাথ কবিতার ছন্দের নয় মাত্রা রক্ষা করে গানও গাওয়া যাবে না কেন প্রশ্ন তুলেছিলেন। কবিতা বলবার সময়ে আমরা পঙক্তি শেষে কয়েক মাত্রা নীরব থেকে পাদপূরণ করে নিয়ে থাকি। যেমন, ‘যে কাঁ দ নে হি য়া কাঁ দি ছে।।’ গানটির স্বরলিপি করবার সময়ে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর গানেও ‘কাঁদিছে’র পরে ৩ মাত্রা সুর টেনে রেখেছেন। অর্থাৎ ৯ নয়, ১২ মাত্রায় এক ছত্র বাঁধা হয়েছে। আমি একবার ৯ মাত্রায়, একবার ১২ মাত্রায় গেয়ে কোন ছন্দ স্বাভাবিক তার আলোচনা করেছিলাম।
বক্তৃতা করবার দিনই আমার ছেলে আর ছেলের বউ পঞ্চবটীতে আমার কাছে এসেছিল। তাদের বললাম আমার কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিতে, এক দিন পরই আমি শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাব। রবীন্দ্রভবনের পরিবেশ এত দুঃসহ হয়েছিল যে গবেষণার ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে ওখান থেকে চলে এলাম কলকাতায়।
তেত্রিশ.
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই সম্মান লাভ করেছেন। ২০১২ সালে বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপাচার্য টেলিফোনে আমাকে জানালেন যে কেন্দ্রীয় সরকার ২০০৮ সালের দেশিকোত্তম উপাধি আমাকে দিতে চেয়েছিলেন। ২০০৭ সাল থেকে পাঁচ বছর বিশ্বভারতীর কোন সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি বলে ২০০৮ সালে আমিও ওই সম্মাননা পাইনি। দেশিকোত্তম হলো সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধি। এত বড় অর্জনের কোনো আশাই আমার ছিল না। বিস্ময় আর আনন্দে আপ্লুত হলাম। বাংলাদেশের মানুষ যেমন, তেমনি শান্তিনিকেতনের সকলেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলো। ঢাকা থেকে অনেকেই, বিশেষত ছায়ানটের সকলে সম্মাননা অনুষ্ঠানে যাবে বলে আমার সঙ্গ ধরল।
বিশ্বভারতীর উপাচার্য বাংলাদেশের উচ্ছ্বাস দেখে খুব খুশি হয়ে বললেন, আমার সঙ্গীদের প্লেন ভাড়া আর শান্তিনিকেতনের ব্যয় তারা বহন করবেন। আমাদের পক্ষ থেকে জানানো হলো থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলেই যথেষ্ট হবে, যাতায়াত ভাড়া আমরাই দেব। ঢাকা থেকে তিরিশজন মানুষ শান্তিনিকেতনে গিয়েছিল। শান্তিনিকেতন আর ঢাকার শখের ঝগড়া আমি শান্তিনিকেতনের না ঢাকার, তাই নিয়ে! আমার আহ্লাদের সীমা থাকল না। কলকাতা আর জামসেদপুর থেকেও কিছু বন্ধু হাওড়া স্টেশন থেকে চললেন আমার সঙ্গে। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও মনের আনন্দে সব কষ্ট পুষিয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সম্মাননা প্রদান করলেন। আর দ্বিপ্রহরিক আহারের জন্যে আমন্ত্রণ জানালেন। চলচ্চিত্রের জননন্দিত নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সমাবর্তনের আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন। আহারের সময়ে দেখা হলো। আমাকে রাখা হয়েছিল রতনকুঠিতে। সৌমিত্রও সেখানে ছিলেন বটে, তবে আলাপের অবকাশ হয়নি। হাওড়া থেকে বোলপুর পর্যন্ত ট্রেনে গান, রতনকুঠি পৌঁছে গান, আর সর্বদা শান্তিনিকেতনের প্রিয়জনদের আসা-যাওয়া। অবকাশ কোথায়?
রাজ্যপাল উপাচার্যকে দিয়ে অনুরোধ পাঠালেন, আমি যেন একখানা গান গেয়ে শোনাই। শুনে তো আমার আক্কেলগুড়ুম! গানের সঙ্গে বহুদিন কোনো যোগ নেই, এখন কী করব! সংগীতভবনের অধ্যক্ষ আর এক অধ্যাপিকা বসেছিলেন আমার টেবিলে, অনুরোধ করলাম, আমার স্কেলটা তো খুব নেমে গেছে, যদি ওঁরাও আমার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান! ভেতরে কাঁপতে কাঁপতে প্রিয় গান ‘পথে যেতে ডেকেছিলে মোরে’ ধরলাম। অবসর নেওয়া শিল্পীদের মনেও বোধ হয় একটা জেদ থাকে, গাইতে পারতে হবেই! ভোলা গলার আওয়াজে ডাইনিং হল ভরে গেল। গান শেষে রাজ্যপালের টেবিল থেকে হর্ষধ্বনি উঠল। সৌমিত্র উঠে এসে বলে গেলেন, ‘এই বয়সেও আপনি এমন গান গাইতে পারেন!’ মান রক্ষা হলো যা হোক।
শান্তিনিকেতনে ‘লিপিকা’ নামে একটা প্রেক্ষাগৃহ হয়েছে, দেখিনি আগে। সেখানে বাংলাদেশের শিল্পীদের গানের এক আয়োজন হলো। ইফফাত, মিতা, লিসা (ইফফাত আরা দেওয়ান, মিতা হক, লাইসা আহমদ লিসা) অনেকেই গিয়েছিল। আমার স্মৃতিচারণার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কখনো একক কণ্ঠে, কখনো সম্মেলক কণ্ঠে গান গাইল। বেশ লম্বা হয়ে গেল অনুষ্ঠান। দর্শক সারিতে শেষ পর্যন্ত মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায় আর আলপনা রায়কে দেখা গেল। উপাচার্য তো ছিলেনই, উচ্ছ্বসিত বক্তৃতা করলেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পেরে তৃপ্ত হলো।
শান্তিনিকেতনে যেখানেই আমার প্রবন্ধ পাঠ থাকত, তাতে নিত্য শ্ৰোতা থাকত মানস বন্দ্যোপাধ্যায়। বোলপুরের বাসিন্দা। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাকে ব্যক্তিগত নানা কাজে সাহায্য করত। মানস তার ‘চতুর্দশী’ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গীদের সংবর্ধনা দিয়েছিল। সুসজ্জিত পরিবেশে সুন্দর-পরিচ্ছন্ন আয়োজন। স্বর্ণচাঁপা ফুল সাজিয়ে নিজের হাতে বিশেষ পুস্পার্ঘ্য তৈরি করেছিল সে।
জীবনে আমরা যা চাই, তা সব সময়ে পাই না। মনের কোণে এক গোপন আক্ষেপ থেকেই যায়। কিন্তু এমন কিছু জিনিস আছে, যার আকস্মিক প্রাপ্তি জীবনের সমস্ত ক্ষোভকে শান্ত করে দিতে পারে। দেশিকোত্তম অর্জন আমার জীবনের সেই পরম প্রাপ্তি। ধন্য আমার জীবন, ধন্য এই জন্ম। আমার চেয়ে বেশি সুখী কি এ পৃথিবীতে আর কেউ হতে পেরেছে!
সমাপ্ত