আট.
ইন্ডোলজির ডক্টর আশিস সেন সত্যেনদার দিদির ছেলে। সত্যেন সেন (আমাদের সত্যেনদা) শান্তিনিকেতনে দিদিদের বাসায় থাকতেন অনেক সময়ে। আমি এমএ পড়বার সময়ে ওখানে ছিলেন না বলে দুঃখ করতেন। তারপরের লেখাপড়ার সময়ে আমি সত্যেনদাকে পেয়েছি। বাড়তি পেয়েছি সেজদিকে। আমার জন্যে কেমন অপেক্ষা করে যে থাকতেন। দু-ভাই-বোনই। আশিস সেনও খুশি হতেন, অবিরল গান শোনাতাম বলে।
ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন সত্যেনদার কাকা। তাঁর কন্যা অমিতা সেনের বাড়িতে সত্যেনদার নেমন্তন্ন হলে আমারও নিমন্ত্রণ থাকত। সত্যেনদার চলনদার হবে কে? গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়ার পরে ক্ষীণদৃষ্টি মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আমার ছুটি। ভাইকে সেজদির কাছে বুঝিয়ে দিয়ে রতনকুঠিতে ফিরতাম গান গাইতে গাইতে আশ্রম জাগিয়ে। দিনের বেলাতে সত্যেনদা দিব্যি চলে আসতেন স্কলার্স ব্লকে গানটান শুনে খুশি হয়ে ফিরে যেতেন। গান শোনার সূত্রেই কানাই সামন্ত মশাইয়ের সঙ্গেও ভাব জমে গিয়েছিল তাঁর। তারপরে সকালের দিকে একা একা অ্যান্ড্রজ পল্লিতে ওঁর বাসাতেও চলে যেতেন। সত্যেনদার ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসগুলো পড়ে কানাই সামন্ত তো মহামুগ্ধ হয়ে ওঁর মহা ভক্ত হয়ে গেলেন।
ওই সময়ে সত্যেনদা আর এক কাণ্ড করতেন। হাঁটতে হাঁটতে যে কোনো বাড়িতে ঢুকে পড়তেন। বাড়ির লোকে ‘কী চাই’ প্রশ্ন করলে বলতেন, ‘কিছু চাই না। আলাপ করব।’ ঢাকার কামরুননেসা স্কুলের এককালের প্রধান শিক্ষক সুজাতা মিত্র তখন থাকতেন চারুপল্লিতে। তার সঙ্গেও ভাব হয়ে গিয়েছিল। ভাব হয়েছিল অশীতিপর মনোরঞ্জনবাবুর সঙ্গেও। ইনি আমার গলায় ‘চরণ ধ্বনি শুনি তব, নাথ’ গান শুনতে চাইতেন আর শুনতে শুনতে কাঁদতেন। এঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল বিনয়ভবনের সন্ধ্যা মৈত্রের বাসাতে। গান ভালোবাসতেন আর আমাকে দোলনচাঁপা ফুল পাঠিয়ে দিতেন। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে কানাই সামন্ত মশাইয়ের সঙ্গে আমার ঘরে চলে আসতেন গান শুনতে।
পথে-ঘাটে গান গাইবার অভ্যাসের সূত্রেই সন্ধ্যা মৈত্রের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সে-ও এক গানের পাগল। অ্যান্ড্রুজ পল্লি থেকে রতনকুঠি গিয়ে ক্যাসেট আর রেকর্ডার দিয়ে আসত সে আমাকে। যখনই গান গাইবে, রেকর্ড করে রাখবে — এই তার কথা। সকালে গলা সাধবার পরে কিছু গান তো গাইতাম, সেগুলো রেকর্ড করে রাখা শুরু হলো। অনেক ক্যাসেটে গান ভরে গিয়েছিল। আবার একই গান একাধিকবার রেকর্ড করা হয়েছিল। আর বারবার এক গান শুনতে সন্ধ্যার কোনো ক্লান্তি ছিল না।
উনিশ শ পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি টিকতে পারবে কি না সন্দেহ হয়েছিল। দেশ থেকে সরে গিয়ে শান্তিনিকেতনে নিরিবিলি গবেষণার কাজ করাই শ্রেয় মনে হলো। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে শান্তিনিকেতনে গেলাম।

ক্ষিতিমোহন সেন
মণি সিংহের আত্মীয় সুরজিৎ সিংহ তখন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। প্রবোধচন্দ্র সেন কাকাবাবুর কাছে সব কথা খোলামেলা বলেছিলাম। উনিও উপাচার্যকে সব খুলে বললেন। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ নিয়ে যে গবেষণা শুরু করেছিলাম, সে কাজই শুরু করতে চাইলাম। প্রশ্ন উঠল–রেজিস্ট্রেশন কোথায়? পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন সালে এমএ পরীক্ষার সময়ে যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল, সেটাই যে আমার জন্যে কার্যকর, সে কথা মাথায় এল না কোনো পক্ষেরই। উপাচার্য প্রশ্ন করলেন, অন্য রাষ্ট্র থেকে এসে ওখানে কাজ করব যে তার অনুমতি কোথায়? অল্প দিন আগে নাকি ওখানে সিআইএ-র এক গোপন ঘাঁটি আবিষ্কার হয়েছিল, কাজেই আমার সবকিছু নিয়মমাফিক হতে হবে। ফাঁপরে পড়লাম। মণি সিংহের আত্মীয়টি কড়া মনোভাব নিয়ে বসে রইলেন।
দিনের পর দিন একেকটা দরখাস্ত নিয়ে দেখা করতে যাই, ফল হয় না। শুনি বলেছেন, কে ওঁকে বলেছে যে সব ঠিক হয়ে যাবে?
শেষ পর্যন্ত ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের মধ্যস্থতায় দিল্লির সরকার থেকে একটি দীর্ঘ টেলিগ্রাম এল। কিছুই জানা ছিল না। কেমন দুর্ব্যবহার পাই ভাবতে ভাবতে সেদিন রেজিস্ট্রার্স অফিসে গিয়েছি। ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) হেসে বললেন, আপনার হয়ে গেছে। দিল্লি থেকে নাকি নির্দেশ এসে গেছে আমার বিষয়ে। তখন আবিষ্কার হলো বিশ্বভারতীর এমএ পরীক্ষা দেবার সময়ে আমার যে রেজিস্ট্রেশন ছিল, সেটাই কার্যকর রয়েছে। কেঁদে ফেলবার অবস্থা। সত্যি সত্যি ঘরে ফিরে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম সেদিন।
এর মাস নয়েক পরে যেদিন আমার পিএইচডি থিসিস জমা দিতে গিয়েছি, তখন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পীযূষবাবুর মূৰ্ছা যাবার অবস্থা। রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ নিয়ে আজীবন চর্চা আমার। ভাবনাচিন্তা গোছানো ছিল, কাজেই গবেষণাপত্র গুছিয়ে তুলতে সময় লাগেনি। পীযূষবাবু সেই সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে যে ধারণা পেয়েছিলেন, তাতে অমন ঝটপট পিএইচডি থিসিস জমা হতে পারে ভাবতেই পারেননি। সংগীত ভবনের এক বাংলাদেশি ছাত্র মুড়ি-চিড়ে ভাজা বিক্রেতা একটি মেয়ের সঙ্গে কী এক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছিল। আর, আরেক বাংলাদেশি নামী প্রফেসর কন্যা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের পিয়নের সঙ্গে যোগসাজশে পরীক্ষার নম্বর ঘষামজা করে বাড়িয়েছিল!
থিসিস জমা দিতে গেলে পীযূষবাবু অবাক হয়ে পিয়নকে বলেছিলেন আমাকে চা দিতে। সে চা স্পর্শ করবার অভিরুচি হয়নি আমার। রেজিস্ট্রেশন নিয়ে পীযূষবাবুর আপিসেই তো ঝকমারি হয়েছিল! এমনই ভাগ্য আমার! পদে পদে অযথা ঠোক্কর খেতে হয়েছে সারা জীবন।
থিসিস শেষ করা নিয়ে কিছু সুখস্মৃতি আছে আমার, এবার সেগুলো বলব। দেবীপদ ভট্টাচার্য ছিলেন কাকাবাবুর ছাত্র। আমাকে গুরুবোন বলতেন তাই। একদিন ভরদুপুরে রতনকুঠিতে ফোন করলেন আমাকে। উঠেছিলেন পূর্বপল্লী গেস্টহাউসে। বললেন কী লিখছ-টিখছ, তিনটের সময়ে চলে এসো নিয়ে আমার এখানে। শুনে দেখি। যেতে হলো। একটি প্রবন্ধ শুনে বলে উঠলেন, করছ কী টাইপ। করতে দিয়ে দাও, লেখার সঙ্গে সঙ্গে টাইপটা তো হয়ে যাবে। অর্থাৎ পছন্দ হয়েছে ওঁর। বললেন ভালো করেছ ব্যাদ’-এর থেকে শুরু করো নাই। এ রকম ছিমছামই হবে লেখা। খুশি হয়ে ফিরলাম। ড্যাম গ্ল্যাড বলে যাকে।
আরেক ঘটনা। সত্যেন রায় মশাইকে বলেছিলাম, আমি ছয় মাসের মধ্যে থিসিস লিখে ফেলব। উনি বললেন, পারবেন না। বললাম, চ্যালেঞ্জ! বললেন, ঠিক আছে, ছয় মাসে লিখতে পারলে আমি আপনাকে খাওয়াব। না পারলে আপনি আমাকে খাওয়াবেন। ওদিকে তো লিখতে লেগে গেল নয় মাস। শেষ হয়েছে শুনে উনি বললেন, নয় মাসে লেখাও যে সে কথা নয়! আমিই খাওয়াচ্ছি। আপনাকে, কবে খাবেন। আমার চেয়ে সুতপা ভট্টাচার্য বেশি খুশি। স্কলার্স ব্লকে আমার প্রতিবেশী বলে সে ও নেমন্তন্ন পাবে। বউদির দক্ষ হাতের সুস্বাদু রান্না খেয়ে তৃপ্ত হলাম। এমন আদরের তুলনা নেই কোনো। সত্যেন রায় মশাই যে কত উৎসাহ দিতেন আমাকে! এসব মানুষের জন্যে খাটাখাটুনির কাজের অসামান্য পুরস্কার পাওয়া যায়।
সৌমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও বাড়ি গিয়ে বড় প্রবন্ধ শুনিয়েছি। খুশি হয়ে বুদ্ধি, পরামর্শ দিতেন। তাতে আমার চিন্তাভাবনা অনেক সমৃদ্ধ হতো। শান্তিনিকেতনের জীবনে কাজ করবার আনন্দ অনেক বেড়ে যেত জ্ঞানী-গুণীদের সাহচর্য-সহযোগিতায়। [ক্রমশ]