‘কী হলো কিসমত, এক্কেবারে চিরজনমের মতো দাঁড়ায় গেলে মনে হয়?’ অসহিষ্ণু রাশেদ ড্রাইভারকে উদ্দেশ করে খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠে।
অসহায় ও তটস্থ কিসমত জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে একবার ট্রাফিকের লালবাতি দেখে, আরেকবার গাড়ির লম্বা লাইন সামনে কত দূর পর্যন্ত গেছে তা অনুমান করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে না পেরে আমতা আমতা করে বলে,
—সক্কালবেলায় শাহবাগে এই রকমের জ্যাম হইতে পারে ভাবি নাই স্যার, মনে আছিল না সামনে বিরাট এক মঞ্চ বানাইয়া পোলাপাইনে সব জড়ো হইছে। মাইক লাগাইয়া দিন-রাইত রাজাকারের ফাঁসি চাইয়া চিক্কুর পারতাছে। অহন কী যে করি স্যার…
তুমি তো রোজ বাসা থেকে বের হয়ে পান্থপথ-বাংলামোটর-মিন্টো রোড হয়ে অফিসে যাও, আজ তোমার কী হলো যে সায়েন্স ল্যাবরেটরির এই পথ ধরলা?
—স্যার, মনে হইলো এই পথে তাড়াতাড়ি হইবে…
—আজই মনে হলো এই পথে তাড়াতাড়ি হবে? আজ আমার অফিসের শেষ দিন, অবসরে যাব, কত কাজ পড়ে আছে জান? একগাদা ফাইলে সই করতে হবে, ফেয়ারওয়েলে যেতে হবে, আর আজই কি না তুমি দেরি করিয়ে দিলে? তোমাকে না আমার মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
ড্রাইভারের দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে রাশেদ। তার চোখের দিকে তাকাতে সাহস করে না কিসমত, বরং কী করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সাহেবকে অফিসে পৌঁছে দেবে তার উপায় খুঁজতে থাকে, কিন্তু সমস্যার সমাধান ঠিক তার হাতে আছে বলে বিশ্বাস করতে পারে না। বিরক্ত রাশেদ জানালা খুলে নিজেই দেখার চেষ্টা করে সামনে জ্যামের কী অবস্থা। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ঘিরে বিক্ষুব্ধ জনতার স্লোগান তার কানে ভেসে আসে। একজন যুদ্ধাপরাধীর মামলার ঘোষিত রায় প্রত্যাশানুযায়ী না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ তরুণসমাজ এই প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তুলেছে। একে কেউ বলছে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, কেউ বলছে আদালত অবমাননা, আবার কেউ বলছে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা। তবে যা-ই হোক, এভাবে দিন-রাত অবস্থান নিয়ে তারা যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং তার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের একটি বারতা সর্বত্র পৌঁছে গেছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর দেশ-বিদেশের শিল্পী-সাহিত্যিক-রাজনীতিকসহ অনেক খ্যাতিমান মানুষের একাত্মতা বিষয়টিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে রাশেদের ভাবার সময় নেই, রেগে সে যেন আস্ত একটা বোমা হয়ে উঠেছে, এখনই দুম করে ফেটে যাবে। আজিজ সুপার মার্কেট থেকে পিজি হাসপাতাল পর্যন্ত তিন মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ পেরোনোর জন্য প্রায় ৩০ মিনিট আটকে আছে সে। কিন্তু হঠাৎ করেই ভাগ্যবিধাতা নাকি ট্রাফিক তার ওপর প্রসন্ন হলো ঠিক বোঝা গেল না, কিসমত এক টানে গাড়িটা বের করে বারডেম হাসপাতালের কাছে নিয়ে এলো। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ডান দিকে তাকাল রাশেদ, শুনল একজন মাইকে বলছে, ‘কলকাতার শিল্পী অভিজিৎ বসু আমাদের এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে একটি গান পাঠিয়েছেন, আমরা এখন তা আপনাদের বাজিয়ে শোনাচ্ছি :
সালাম, সালাম ভাই, সালাম সালাম
শাহবাগে লড়ছে যারা আমার বাপ-ভাইজান
তোমাদের তরে মোরা জানাই সালাম
একুশ আর শাহবাগ একই রক্তঘাম
তোমাদের তরে আমরা জানাই সালাম…
গানটা কানে আসে কী আসে না রাশেদের তা বোঝা যায় না, তবে সে আপন মনেই গজগজ করতে থাকে, ‘যুদ্ধ দেখেনি যেসব পোলাপান তারাই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চেয়ে রাস্তাঘাট আটকে রেখে স্বদেশ প্রেম দেখাচ্ছে, যত্তসব।’ শিশু পার্ক পার হতেই তার সেলফোন বেজে উঠল। কিছুক্ষণ নিচু স্বরে হুঁ-হাঁ করে ‘তুমি সব রেডি করো, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছাচ্ছি’ বলে ফোনটা কেটে দেয় সে।
অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের স্তূপের দিকে ইশারা করে পাশে দাঁড়ানো অফিস সহকারী বেলালের কাছে জানতে চায় রাশেদ,
—’এত ফাইল কেন?’
—’স্যার, অতিরিক্ত কোনো ফাইল নেই, যেগুলো থাকার কথা সেগুলোই আছে।’ তার কথা ও মৃদু হাসির মধ্যে আশ্বস্ত করার মতো একটি বিষয় আছে। রাশেদ তা বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ায় না। প্রথম ফাইলটা হাতে নিয়ে সই করতে করতে জানতে চায়,
—ফেয়ারওয়েলের সময় কখন?
—স্যার, লাঞ্চ আওয়ারে, সবার জন্য সোনারগাঁও হোটেলে প্যাকেট লাঞ্চের অর্ডার দেওয়া হয়েছে।
—তা তো বুঝলাম, তোমার ভাবি যা বলেছিল তার কী করেছ?
—স্যার, কর্মকর্তাদেরটার কথা ডিএস স্যার জানেন, আর কর্মচারীদেরটা শোরুম থেকে সরাসরি বাসায় পৌঁছে যাবে।
—গুড।
এই পর্যায়ে রাশেদকে খানিকটা খুশি খুশি মনে হয়। দ্বিতীয় ফাইলটা হাতে নিয়ে সই করতে গিয়ে থেমে যায়, মুখ তুলে সরাসরি বেলালের দিকে তাকিয়ে বলে,
—গতবার ওরা কথা রাখেনি। প্লেজার ট্রিপ দেওয়ার কথা ছিল থাইল্যান্ডে, কিন্তু যেতে হলো নেপাল। এবার কথা রাখবে তো? না হলে আমি আজ ফাইলে সই করব না, নোট দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়ে যাব। রি-টেন্ডারের ব্যবস্থা করব।
—না স্যার, এবার যাতে আর ঝামেলা না হয় সে জন্য আমি আগেই প্নেনের টিকিট, হোটেল রুম বুকিং এবং আর সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছি।
—তাহলে সই করব বলছ?
—জি স্যার।
—বেশ, দিলাম সই করে।
***
হঠাৎই দরজার বাইরে হইচই শোনা যায়। কী হয়েছে দেখার জন্য বেলাল এগিয়ে যাচ্ছিল, আর ঠিক তখনই দড়াম করে দরজাটা খুলে গেল। দেখা গেল প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত সুশ্রী এক মহিলা দরজার বাইরে দাঁড়ানো পিওনকে আঙুল উঁচিয়ে মুখ ঝামটা মেরে মেরে যাচ্ছেতাই বলছে আর মাঝেমধ্যেই দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। খোলা দরজা দিয়ে রাশেদ সেদিকে তাকাল। পিওন বেচারা বসের ধমক খাওয়ার ভয়ে অসহায় ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
—’স্যার, আমি ওনারে অনেক কইছি যে আপনি ব্যস্ত আছেন, কিন্তু উনি জোর করে ঢুকে পড়লেন।’
হাত ইশারায় রাশেদ তাকে সরে যেতে বলল। তারপর মহিলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বসতে বলল। কিন্তু মহিলা ঝনঝন করেই চলল,
—’আমি কি আপনার অফিসে নতুন আসছি রাশেদ ভাই? ওরা তো আমাকে চেনে, এর পরও আমাকে আটকায়! এত বড় সাহস! আমি মন্ত্রীকে বিষয়টা জানাব।’ প্রচণ্ড রেগে যাওয়ায় ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল। সেদিকে রঞ্জনরশ্মি মাখানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দুই জোড়া চোখ। সে চাহনি পোশাক ভেদ করুক বা না করুক, মনের পর্দায় যে ছায়া পড়ে তাতে বিশেষ পুলক অনুভূত হয়। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থেকে রাশেদ বলল,
—আহ্, ওদের কথা ছাড়ো তো। তোমাকে তো বলেছি ফোন করে আসতে। আজ আমার শেষ ওয়ার্কিং ডে, বোঝই তো ব্যস্ত, কিন্তু তোমার জন্য তো সময় থাকতেই হবে, তাই না? মৃদু হাসে সে। মহিলা সে হাসিতে যোগ দেয় না। বেলাল বাইরে বেরিয়ে যায়।
—আমার ফাইলটা কি সই হয়েছে?
—এখনই হবে। যাওয়ার আগে ছেড়ে দিয়ে যাব, ভেবো না। আগে এর থেকেও বড় বড় কাজ করে দিইনি?
—হ্যাঁ, দিয়েছেন, তবে এমনি তো আর দেননি। উফ যা গরম, এসি চলছে না? মহিলা ঘাড়ের কাছ থেকে কাপড়টা একটু সরিয়ে সামনে থাকা খবরের কাগজ হাতে নিয়ে হাতপাখার মতো হাওয়া করতে থাকে। চওড়া গলার ব্লাউজের পাশ ঘেঁষে অন্তর্বাসের সাদা ফিতা ফর্সা ঘাড়ের থলথলে চর্বির ভেতরে সেঁধিয়ে আছে দেখা যায়। সেদিকে তার খেয়াল নেই, নাকি ইচ্ছে করেই বেখেয়ালে আছে তা বোঝা না গেলেও রাশেদ বিষয়টা খেয়াল করে।
—আজকাল ফ্রি বলে কিছু নেই ডার্লিং। এক হাতে দাও, আরেক হাতে নাও।
—’দেওয়ার তুলনায় বোধহয় আপনি বেশিই নিয়েছেন।’ যথেষ্ট ঝাঁজাল শোনায় মহিলার গলা। তার গলা শুনে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রাশেদ। ভেতরে ভেতরে রাগ হচ্ছিল, মন্ত্রীর প্রশ্রয়ধন্য না হলে কবে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত। উপায় নেই দেখে তেমনি নরম গলায় বলে,
—লাভক্ষতির হিসাবটা না হয় একটু কম করলে।
—আপনি কি কম করেছেন?
কথা বাড়ানোর ইচ্ছা ছিল না রাশেদের। কারণ তার অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে। কলিং বেল চাপলে বেলাল ভেতরে প্রবেশ করল। তাকে ইঙ্গিত করতে স্তূপ করা ফাইলের নিচে থেকে একটা ফাইল টেনে বের করে সামনে ধরল। কোনো রকমে চোখ বুলিয়ে তাতে সই করে দিল রাশেদ। বলল,
—বসে থেকে অর্ডারটা নিয়ে যেও। আর যদি অন্য কাজ থাকে চলে যাও। একটু পরে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে নিও।
—ধন্যবাদ, আচ্ছা আসি তাহলে।
—যোগাযোগ রেখো। আমার কাছে তো আর কোনো কাজ নেই, তাই বলে ভুলে যেও না।
—সেকি রাশেদ ভাই, আপনাকে কি ভোলা যায়। আপনি আমার কত উপকার করেছেন। কথাটা বলে সে চট করে দাঁড়িয়ে থাকা অফিস সহকারীর দিকে তাকায়, তার মুখেও মৃদু হাসি। রাশেদেরও তা চোখ এড়ায় না। হাসির কত রকমের অর্থ থাকে। আর সব সময় সব হাসিতে সবার সঙ্গে যোগ দেওয়াও উচিত নয়। কারণ কেরানি, ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও বাড়ির ঝি-চাকরদের হাসি নানা কারণেই অন্য রকম হয়ে থাকে। মহিলা বেরিয়ে যাওয়ার পর বেলাল বলল,
—স্যার, আপনার গ্রামের মাদ্রাসার অনুমোদনটা হয়ে গেছে। গতকাল বিকেলে মন্ত্রী সই করেছেন। মন্ত্রণালয় থেকে এইমাত্র ফোন করেছিল।
—তাই নাকি, দারুণ খবর। অনেক দিন ধরে বিষয়টা ঝুলে ছিল।
—স্যার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি? বেলাল হাত কচলাতে থাকে।
—করো।
—আমাদের প্রায় সব স্যারেরাই যাওয়ার আগে নিজের গ্রামে মাদ্রাসা করার অনুমতি বের করে নিয়ে যান। খুব কম স্যারেরা স্কুলের অনুমতি চান। স্যার, সবাই স্কুল না করে মাদ্রাসা করে কেন?
—আরে মিয়া, আখেরাত বলে একটা কথা আছে না? কত কামাই তো করলাম, সেখানকার কামাই কিছু করতে হবে না?
—স্যার, আপনি আখেরাতও মানেন?
—কও কী মিয়া! মুসলমানের ছেলে হয়ে আখেরাত বিশ্বাস করব না? বকবক ছাড় তো।
—স্যার, আর একটা কথা।
—কী, বলো।
—আপনার কী মনে হয় চান্দে মানুষের মুখ দেখা যাওয়া সম্ভব?
—আহ্! বেলাল, ছাড় তো ওসব। কাজের কথায় আসো। আচ্ছা, বিদেশি এক কম্পানির ইপিজেড নির্মাণের পরিবেশ ছাড়পত্রের যে ফাইলটা গত সপ্তাহে সই করালে সেটার খবর কী?
—স্যার, যেভাবে বলেছিলেন…ম্যাডামের অ্যাকাউন্টে…
—আচ্ছা, আচ্ছা।
***
টেবিলের ওপর রাখা সেলফোনে ভাইব্রেশন হতে লাগল। একবার, দুবার, তিনবার, চারবার…একসময় থেমে গিয়ে আবার শুরু হলো। বিরক্ত রাশেদ ফোনটা হাতে নিয়ে কলার আইডি দেখে বেলালকে ইশারা করতে সে বেরিয়ে যায়। ফোনটা রিসিভ করে বলে,
—হ্যালো, সরি রফিক, জানই তো আজ আমার শেষ কর্মদিবস। ব্যস্ত আছি খুব, বলো কী খবর? … না দেখিনি তো, কোন কাগজে… লিখুক লিখুক, লিখে কী করবে, এই তো প্রথম নয়, আগেও লিখেছে, কী হয়েছে? … কিচ্ছু হবে না। শোন, আজকাল কাগজের যেমন ছড়াছড়ি, সাংবাদিকও অগুনতি! ছোটখাটো ওই সব পত্রিকার রিপোর্টিংকে আমরা আমল দিই না। স্টেটমেন্ট চাইলেও দিই না। আর বড় কোনো কাগজে কিছু লিখলে ম্যানেজ করে ফেলি…এই ধরো বড় হোটেলে একটু আপ্যায়ন, একটা লম্বা খাম… ব্যস, আর ফলোআপ বের হয় না।… নৈতিকতা, হা হা হা, ভাই আমি পরিপূর্ণ আধুনিক মানুষ! আর জানই তো, আধুনিক মানুষের নৈতিকতাবোধ দুর্বল… ধন্যবাদ বন্ধু খরবটা দেওয়ার জন্য। রাতে তোমার সঙ্গে কথা বলব, এখন ছাড়ি।
ফোনটা ছেড়ে দিয়ে কলিং বেল চাপে রাশেদ। বেলাল ঢোকে। সামনে আরেকটা ফাইল ধরতে ধরতে বলে,
—স্যার, আপনার গ্রাম থেকে একজন ভদ্রলোক এসেছেন। নবীর হোসেন নাম। দেখা করতে চান। আমি বলেছিলাম আজ হবে না। স্যার অনেক ব্যস্ত। কিন্তু কোনোমতেই শুনছেন না। খুব অনুনয়-বিনয় করছেন দেখে কেমন মায়া লাগছে, স্যার। আসতে বলি?
—’এ আবার এখন কেন এসেছে…আজ কত কাজ, তার মধ্যে এসব উটকো ঝামেলা! ঠিক আছে, আসতে বলো।’ বিরক্ত রাশেদ বলে।
বেলাল দরজা খুলে দিলে যে মানুষটি ভেতরে প্রবেশ করলেন তার বয়স ৬৫-৬৬ কিংবা তার কিছু বেশিও হতে পারে। ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে ঠিক অনুমান করা যায় না। সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে বসতে বলার অপেক্ষায় থাকেন। রাশেদ ইশারা করলে সামনের চেয়ারটায় বসেন। কিন্তু হাতলের ওপর এমনভাবে কনুইয়ের ভরটা রাখেন যে পিঠটা ঠিক পেছনে ঠেকে না। আর তা অস্বস্তি, সম্ভ্রম নাকি এমন গদিওয়ালা চেয়ারে বসার অনভ্যস্ততা তা বোঝা যায় না। রাশেদ ফাইল দেখতে থাকে। বেলালকে এটা-ওটা জিজ্ঞাসা করে আর তারপর খসখস সই দিতে থাকে। কথা শুরুর অনুমতির অপেক্ষায় নবীর হোসেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একপর্যায়ে তার মুখের দিকে না তাকিয়েই রাশেদ বলে,
—নবীর ভাই, বলেন, আজ আমি খুব ব্যস্ত। কাজ করতে করতেই শুনতে হবে।
তার সম্মতি বা অনুমতি যেটাই হোক, পেয়ে নবীর হোসেন বলেন,
—মানে বিষয়টা তুমি তো জান, তবে ঠিক মনে আছে কি না…
এ কথায় রাশেদ তার দিকে সরাসরি তাকায়। কিন্তু তা বিষয়টি মনে না থাকা, নাকি তাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করার কারণে ঠিক বোঝা যায় না। তবে নবীর হোসেন কিছু একটা বুঝতে পারেন। বয়সের জ্যেষ্ঠতা পদমর্যাদার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয় মনে করেই শুধরে নেওয়ার ঢঙে বলেন,
—মুক্তিযোদ্ধার সর্বশেষ তালিকায় আমার নাম না থাকায় আমি মাসিক ভাতাটা পাচ্ছি না। আগের সব তালিকায় আমার নাম ছিল। কিন্তু সংশোধিত তালিকায় নাম নেই। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডারের কাছে গেলে সে আমাকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে বলেছিল। আমি সব কাগজপত্র আপনার কাছে দিয়েছিলাম, যাতে আমার নামটা গেজেটে ওঠে। কিন্তু…
—ও, এটা তো আমার মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। সেই কাগজপত্র তো আমি তখনই মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি বলে মনে পড়ে। এত দিনে তো কাজটা হয়ে যাওয়ার কথা। বেলাল, ওগুলো পাঠিয়েছিলে না? পরে বোধ হয় আর খোঁজ করা হয়নি। নবীর ভাই, লেগে থাকতে হয়। ওরা তো আর একটা কাজ নিয়ে পড়ে থাকে না। আপনার কাছে কি ওই সব কাগজপত্রের ফটোকপি আছে? আরেক সেট দিতে পারেন?
—তা পারব।
—তাহলে পাশের রুমে গিয়ে আরেক সেট কাগজ একে বুঝিয়ে দিয়ে যান, দেখি কী করা যায়। আজ আবার আমার অবসরে যাওয়ার দিন। অনেক ব্যস্ত।
—তাহলে আমার কাজটা হবে কী করে? অসহায়ের মতো বলেন নবীর হোসেন।
—আমি বলে দিয়ে যাব। আপনি কাগজগুলো বুঝিয়ে দিয়ে যান।
কোলের ওপর রাখা ছোট কাপড়ের ব্যাগটা এমনভাবে তুলে কাঁধে ঝোলান নবীর হোসেন, যেন ওটা খুব ভারী। জীবনের সব ভারই বোধ হয় ওই ছোট ঝোলাটার মধ্যে ভরে নিয়েছেন। পায়ে পায়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে পাশের ঘরে ঢোকেন। একজন লোক কম্পিউটারের মনিটরে মুখ ডুবিয়ে বসে ডান হাতে মাউসটা নাড়াচাড়া করছে। নবীর হোসেন নিঃশব্দে গিয়ে তার সামনে রাখা একটা চেয়ারে বসেন। লোকটির গাম্ভীর্য দেখে চট করে কিছু বলতে সাহস হয় না। একদিন প্রাণের মায়া অগ্রাহ্য করে যুদ্ধের মাঠে যাঁরা প্রচণ্ড সাহস দেখিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন, আজ একজন কেরানির সামনে নিজের বেমানান অসহায়ত্বে নিজেই সংকুচিত হয়ে পড়েন তিনি। চুপচাপ ঝোলাটা থেকে কিছু কাগজপত্র বের করে টেবিলে রেখে একটা একটা করে সাজাতে থাকেন তিনি। স্ট্যাপলার চাইতে চরম বিরক্তি নিয়ে লোকটি তাঁর দিকে তাকায়, তারপর নিঃশব্দে স্ট্যাপলারটা ঠেলে দেয়। নবীর হোসেন কিছু কাগজপত্র স্ট্যাপল করে বেলালকে খুঁজতে থাকেন। অনেকক্ষণ পরও বেলাল আসছে না দেখে কম্পিউটারে ব্যস্ত লোকটাকে জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়, ‘আজ স্যারের ফেয়ারওয়েল, ওদিক দিয়ে ওপরে গেছে মনে হয়।’ কথা কয়টা বলে সে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাহলে তো ঘণ্টা দুয়েকের আগে আর আসার সম্ভাবনা নেই। হতাশ ভঙ্গিতে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দেন নবীর হোসেন। নানা কথা ভাবতে থাকেন। এই দেশ, এর পরিচিতি, উন্নতি-এসব কিছুতে কি তাদের কোনো অবদান আছে? জাতি কি সত্যিই তাদের মূল্যায়ন করবে? নাকি একদিন সবই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে? বসে ভাবতে ভাবতে একসময় ঝিমুতে থাকেন তিনি। কতক্ষণ এভাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন খেয়াল নেই। হঠাৎই টেবিলের ওপর ধুপধাপ কিছু রাখার শব্দে তিনি চমকে উঠলেন। তাৎক্ষণিক তন্দ্রা ছুটে গেল। তাকিয়ে দেখেন পাঁজা পাঁজা ফুলের তোড়া, বাঁধানো মানপত্র, ছবি আরো এটা-ওটা উপঢৌকন ঢিপ করে টেবিলের ওপর রাখা হচ্ছে। বেলালের সঙ্গে আরো দুই-তিনজন লোক সেগুলো জড়ো করে নিয়ে এসেছে। চেয়ারে বসে বেলাল বলে,
—চাচা, কাগজপত্র রেডি করছেন?
উত্তরে নিঃশব্দে মাথা নাড়েন নবীর হোসেন।
—কই, দেখি তো।
গোল করে পাকানো কয়েকটি কাগজ তিনি বেলালের হাতে তুলে দেওয়ার পর সে মনোযোগ দিয়ে তা দেখতে থাকে। তারপর কিসমতকে উদ্দেশ করে বলে,
—কিসমত এই কাগজ কয়খানা ওপরে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে দিয়া আয় তো। রহমত ভাইকে দিয়ে স্যারের কথা কইস।
কাগজের রোলটা হাতে নিয়ে কিসমত কৌতূহল ভরে জানতে চায়,
—কিয়ের কাগজ বেলাল ভাই।
—এই চাচা স্যারের গ্রামের লোক, মুক্তিযোদ্ধা, তালিকা থেকে ওনার নাম বাদ পড়ছে। নামডা যেন গেজেটে ওঠে সে জন্য কাগজ জমা দিতে আইছেন। তুই দিয়া আয়, পরে আমি কথা বলব।
কাগজ কয়খানা হাতে নিয়ে কিসমত উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে, তারপর হাসতে হাসতে বলে,
—আইজ স্যারের ভাষণ শুইন্যা দারুণ মজা পাইছি বুঝলেন বেলাল ভাই। আপনার মনে আছেনি, আগে একদিন এইহানেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে স্যারে কত আফসোস কইরা কইলো, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ আমি মুক্তিযুদ্ধে যাইতে পারি নাই, আর আইজ সেইহানেই খারাইয়া স্যারে কইলো, এই সরকারে মুক্তিযোদ্ধাদের চাকুরির বয়স বাড়াইছিল বইল্যা আরো দুই বছর বেশি চাকরি করতে পারলাম। ক্যামনে সম্ভব হইল? মাজেজাডা কী কন তো বেলাল ভাই।’
তার কথা শুনে বেলাল জোরে এক ধমক লাগায়, ‘তোর মাজেজা বুঝে কাজ নেই। যা কই তাই কর, যা।’ তারপর নবীর হোসেনের দিকে ফিরে বলে, ‘আপনি চলে যান চাচা। আপনার কাজ হয়ে যাবে। তয় কিছু খরচপাতি করতে হইতে পারে। আমি জানাব আপনারে। মোবাইল নাম্বার আছে কোনো? এই কাগজটায় লিখে দিয়ে যান।’
সামনে বাড়িয়ে দেওয়া কাগজে কাঁপা কাঁপা হাতে নবীর হোসেন একটা নম্বর লিখে দেন, তারপর চশমার ভেতর দিয়ে বেলালের দিকে তাকান। কিছু না বলে নিঃশব্দে উঠে আসেন। লিফটে চড়ে নিচে নেমে সচিবালয়ের ফটক দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে রাস্তায় আসেন। আনমনে হেঁটে এগোতে থাকেন। রাশেদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুই বছর বেশি চাকরি করছে? কিন্তু ও তো যুদ্ধে যায়নি। তাহলে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেল কিভাবে? হঠাৎ একা একাই হেসে ওঠেন তিনি। কী বোকা সে। যেভাবে তার নাম তালিকা থেকে বাদ যায় সেভাবেই রাশেদ বা অন্য কারো নাম তালিকায় ঢুকে পড়ে। এ তো সহজ ব্যাপার। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সে শাহবাগের মোড়ে এসে পড়েছে টের পায়নি। স্লোগানে স্লোগানে চারপাশটা ফেটে পড়ছে যেন। কিছুক্ষণ আগেই একজন যুদ্ধাপরাধীর চূড়ান্ত ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হয়েছে। সেই বিজয়ই উদ্যাপন করছে তারা। তরুণ-তরুণীদের অদ্ভুত উল্লাস তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় চার দশক আগের এক ডিসেম্বর মাসে, যেদিন এমনি করে মানুষের বাঁধভাঙা আনন্দে ভেসে গিয়েছিল বাংলাদেশ নামের সদ্য স্বাধীন হওয়া এই দেশটি। আজও তেমনি মনে হচ্ছে, কিন্তু সেদিনের সেই উচ্ছ্বাসে তার যে প্রাণের যোগটি ছিল, আজ কি তার একটু হলেও ঘাটতি মনে হচ্ছে? তার পাশেই একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদক একজনকে প্রশ্ন করছে,
—এই রায়কে আপনি কিভাবে দেখেন?
উত্তরে সেই ভদ্রলোক অনেক কথা বললেও বারবার শুধু একটি কথার ওপরই জোর দিয়ে চলেছেন, ‘জাতি আজ কলঙ্কমুক্ত হলো। ৪২ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো কলঙ্ক থেকে আজ আমরা মুক্তি পেলাম।’
এরপর প্রতিবেদক হঠাৎ নবীর হোসেনের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘চাচা, আপনি কিছু বলবেন?’ নবীর হোসেন কিছুক্ষণ তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে ঘাড় নাড়তে নাড়তে সরে গেলেন, তার সেই হাসির মধ্যে কতটা কলঙ্কমোচনের তৃপ্তি আর কতটা নিভৃত-কলঙ্কের নতুন দাগ লাগার বেদনা রয়েছে, বোঝা গেল না।
সূত্র : কালের কণ্ঠ, বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২।