দ্বিশত জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধার্ঘ
আনুমানিক ১৮২৪ সালে কলকাতায় শশীচন্দ্র দত্তের জন্ম। সুবিখ্যাত রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র। শশীচন্দ্র ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র। মধুসূদনের মতো ক্যাপ্টেন ডি এল রিচার্ডসনের গভীর প্রভাব পড়েছিল তাঁর জীবনে। ইংরেজি ভাষায় প্রগাঢ় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। সে দক্ষতা প্রকাশ পেত তাঁর নানা নিবন্ধে। ‘Reminisences of a Kerani’s Life’, ‘Shunkur : a Tale of the Indian Mutiny of 1857’, ‘The Street Music of Calcutta’ — প্রভৃতি তার প্রমাণ।
ইংরেজ রাজ্যাধিকারের সেই প্রথম যুগে, পরাধীনতার প্রথম প্রহরে, শশীচন্দ্রের স্বাভিমান, সাহস, স্বাধীনতার চেতনা আমাদের অবাক করে দেয়। বেদনার বিষয় এই যে এই রকম এক মানুষের জীবন ও কর্মের বিস্তৃত আলোচনা আমাদের বাংলায় নেই। নটিংহ্যাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির অ্যালেক্স টিকেল বিদেশি হয়েও যেভাবে শশীচন্দ্রের রচনা সংকলন করেছেন, আমরা তা পারি নি, চেষ্টাও করা হয় নি।
শশীচন্দ্রের ‘জো-হুকুম’ মানসিকতা ছিল না। খালি পায়ে তিনি ইংরেজ ‘হুজুর’দের কাছে যেতেন না। বিদ্যাসাগরের স্বাধীনতাচেতনার সঙ্গে এইখানে তাঁর মিল। ইংরেজদের জাতিগত বৈষম্য তাঁকে শুধু পীড়া দিত না, তিনি সক্রিয়ভাবে তার প্রতিবাদও করতেন। বিচার বিভাগে এই বৈষম্য প্রকট ছিল। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন কেন একজন অত্যাচারী নীলকারকে মফস্বলের ইংরেজ বিচারক ছাড় দেবেন? দেশীয় জুরি নিযুক্ত করা হত; কিন্তু তাঁদের যোগ্যতা ও মেরুদণ্ড ছিল না বলে শশীচন্দ্র আক্ষেপ করেছেন।
সিপাহী বিদ্রোহ সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য ইংরেজ শাসকদের খুশি করতে পারে নি। সিপাহি বিদ্রোহের অকথিত যে সব কাহিনি শশীচন্দ্র তুলে ধরেছেন তাঁর ‘আ টেল অব দ্য ইণ্ডিয়ান মিউটিনি’তে, তাতে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন স্যার আরস্কিন পেরি ও স্যার অ্যাশলি এডেন। শশীচন্দ্র বলেছেন ইংরেজরা শুধু সিপাহীদের উপর নির্যাতন করে নি, তাদের সোনা-রুপোর অলঙ্কার ও অন্যান্য আসবাব লুঠ করে সেগুলো বিক্রি করত। সেই লুঠের মালের মধ্যে মেয়েদের নাকছাবি দেখে ক্ষুব্ধ শশীচন্দ্র বলেছেন যে সিপাহি বিদ্রোহ দমনের নামে ইংরেজরা দেশীয় নর-নারীদের উপর নির্বিচার অত্যাচার করে গিয়েছে।
শশীচন্দ্রের আর একটি দিক বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এ দেশের মানুষের সামরিক প্রশিক্ষণের দরকার বলে তিনি মনে করতেন। শশীচন্দ্র বলেছেন, ‘The occasion may arise when it will be of inestimable value to them’. তবে কি শশীচন্দ্র পরাধীনতার নাগপাশমুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখতেন? দেশকে স্বাধীন করার জন্য, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দরকার প্রশিক্ষিত সেনাদলের। তাঁর সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল অনেক পরে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠনের ফলে। সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে, ‘দিল্লি চলো’ আহ্বান দিয়ে যে দেশপ্রেমিক সেনাদল প্রকম্পিত করে তুলেছিল ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কর্তাদের।