একদিকে জয়নগর মজিলপুর আর অন্যদিকে বারুইপুর সোনারপুর। মাঝে দক্ষিণ বারাসত আর বহুড়া। পাদপ্রদিপের আলোয় না থাকা দুটি গ্রামীণ জনপদ। অথচ আজও এখানে চলে আসছে শতাব্দী প্রাচীন বেশ কয়েকটি পারিবারিক দুর্গাপুজো। সরকম একটা নিয়েই আজকের কাহিনী।
আনুমানিক চারশো বছর আগের দক্ষিণ বঙ্গ। জয়নগর সহ আশেপাশের এলাকা তখন ঘন জঙ্গল৷ বাকসিদ্ধ তান্ত্রিক বামাচরণ ভট্টাচার্য জঙ্গল কেটে জয়নগরের কাছে দক্ষিণ বারাসতে গড়ে তোলেন বসত ভিটে। সেই সময় বারুইপুর থেকে জয়নগর হয়ে দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মহাশ্মশান পর্যন্ত আদি গঙ্গার প্রবাহ ছিল। তার কয়েকটি খন্ড অংশ এখনও বিভিন্ন পরিবারের নামে বেঁচে রয়েছে।

আদি গঙ্গাই ছিল তখন এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির লাইফ-লাইন। ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য এই আদি গঙ্গার জলপথকে ব্যবহার করত ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে জমিদাররা। কালের নিয়মে সেই আদিগঙ্গা এখন বিলীন হয়ে গিয়েছে। জানা যাচ্ছে পারিবারিক সমৃদ্ধির উৎসে রয়েছে এই অলৌকিক উপাখ্যান। সেই সময়ে একদিন এলাকার এক জমিদার বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে খাজনা জমা দেওয়ার জন্য নদীপথে রওনা দিয়েছিলেন৷ দক্ষিণ বারাসতের এই জায়গাতে এসে জমিদারের সেই স্বর্ণমুদ্রা ডাকাতদের হাতে লুট হয়ে যায়। এরপর সেই জমিদার ঘুরতে ঘুরতে তান্ত্রিক বামাচরণ ভট্টাচার্যের কাছে এসে পৌঁছন। তৎকালীন সময়ে তন্ত্রসাধনা করে এলাকায় নাম ডাক করেছিলেন বামাচরণ।
জমিদার নিজের অসহায় অবস্থার কথা জানালে বামাচরণ একটি গাছের কথা উল্লেখ করে জমিদারকে বলেন, “ওই গাছের তলায় রয়েছে তোমার স্বর্ণমুদ্রা।”জমিদার সেই কথা শুনে গাছের কাছে গিয়ে দেখেন লুট হয়ে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রার সবটাই সেই গাছের তলায় রয়েছে। এরপর তিনি সেই স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে যথাস্থানে জমা দিয়ে নিজের জমিদারিত্ব রক্ষা করেন৷ প্রণামীস্বরূপ বামাচরণ ভট্টাচার্যকে তিনি তাঁর জমিদারের অংশ থেকে বেশ কিছু জমি দান করেন৷ এরপর বামাচরণ দক্ষিণ বারাসতে এই ভট্টাচার্য বাড়ির সুবিশাল দালান বাড়ি গড়ে তোলেন।লোকশ্রুতি তিনি নিজের হাতে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে পুজো শুরু করেছিলেন। তান্ত্রিক হওয়ার জন্য তন্ত্র মতে দেবীর আরাধনা করতেন৷ সেই থেকে এখনও এখানে তন্ত্র মতেই পুজো হয়।

তৎকালীন সময়ে বামাচরণ ভট্টাচার্য যে নিয়মকানুন এবং মন্ত্র পুঁথিতে লিখে রেখেছিলেন সেই মন্ত্রোচ্চারণেই এখনও পুজো হয়৷ জানালেন বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা।এই পরিবারের সদস্য আশুতোষ ভট্টাচার্য কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন৷ তাঁর পান্ডিত্য ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। শাস্ত্রী উপাধিতে ভূষিত হন তিনি৷ সেই থেকে ভট্টাচার্য বাড়ির নাম হয় শাস্ত্রী বাড়ি। এই বাড়ির পুজোও পরিচিত হয়ে ওঠে শাস্ত্রী বাড়ির পুজো হিসেবে। তবে পরিবারের বর্তমান সদস্যরা জানালেন আশুতোষ শাস্ত্রীর সময়েই পুজোর রমরমা বাড়ে।
১৯২৪ এ মহামহোপাধ্যায় উপাধি লাভ করেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। ১৯৩০ সালে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়৷ সেই পুজো আজও বহমান।পরিবারের পরিধি বেড়েছে কালের নিয়মে ও কর্মসূত্রে বাড়ির লোকজন অনেকেই আশেপাশে ভিনরাজ্য দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পরেছেন। তবে পুজোর সময় মূল বাড়িতে একত্রিত হন সকলে জানালেন শাস্ত্রী বাড়ির সদস্যরা। চারশো বছর পার করা এই পারিবারিক পুজো আজও পরম্পরা অনেকটাই ধরে রেখেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানালেন সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ভোগের ব্যবস্থা থাকে।