| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

জননীর পাশে শওকত ওসমান : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

Reporter
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী / ১৫৬৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৩

শওকত ওসমান আমার প্রিয় লোকদের একজন। পরিচয় কিশোর বয়সে, যখন গল্পের বই পড়তে শিখেছি, সেই বয়সে। তিনি নিয়মিত লিখতেন, তাঁর বই পাওয়া যেত। তাঁর অনেক রচনার কথাই মনে আছে, বিশেষভাবে মনে পড়ে ‘জননী’ উপন্যাসটির কথা। এটি তাঁর প্রথম জীবনের লেখা। লিখেছেন ১৯৪৪ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ে, নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয় চব্বিশ বছর পর, ১৯৬৮ সালে। আমার পড়াটাও ওই সময়ই।

উপন্যাসের নামই বলে দিচ্ছে যে এর কেন্দ্রে আছে একজন নারী, যার প্রধান পরিচয় জননী হিসেবে। মাকে নিয়ে আরো অনেক রচনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। ম্যাক্সিম গোর্কির মা তো খুবই বিখ্যাত। ব্রেখট নাটক লিখেছেন সাহসিকা এক জননীকে নিয়ে। পার্ল বাকের নোবেল-সম্মানিত উপন্যাস দ্য গুড আর্থের কেন্দ্রেও মা আছেন একজন। শওকত ওসমানের জননী কিন্তু অন্য রকমের। হতেই হবে, তিনি আমাদের সমাজের এক মাকে নিয়ে লিখেছেন; আমাদের সমাজ অন্য দেশের সমাজ থেকে ভিন্ন, আমাদের দেশের মায়েরাও অন্য দেশের মায়েদের মতো হয়েও ভিন্ন হতে বাধ্য।

‘জননী’ উপন্যাসের নায়িকা দরিয়া-বিবি বাঙালি সমাজের গরিব ঘরের মায়েদের একজন প্রতিনিধি। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকেও বঙ্গভূমি ভীষণভাবে শ্রেণিতে বিভক্তই ছিল। দরিয়া-বিবি প্রান্তিক কৃষিজীবী শ্রেণির মানুষ। স্নেহ-ভালোবাসা, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা এবং সর্বোপরি দুঃখ ও যন্ত্রণায় দরিয়া-বিবি দরিদ্র ঘরের মায়েদেরই একজন। কিন্তু সে আবার স্বতন্ত্রও এবং স্বতন্ত্র বলেই নায়িকা সে। দরিয়া-বিবি সর্বংসহা। কিন্তু কেবল ওই গুণেই সে যে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে, তা মোটেই নয়। দরিয়া-বিবি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে, একটি পুত্রসন্তান নিয়ে। সম্পত্তির শরিয়া মতে ভাগাভাগিতে স্বামীর অংশ সে পেল না। দেবর-ভাশুরেরা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করল। দারিয়া-বিবি ঠিক করল দাসীবৃত্তি করবে না। সে বেরিয়ে পড়েছে। সন্তানটি ওরা কেড়ে নিল। দরিয়া-বিবি তাতে দমেনি। সে বিপত্নীক আলী আজহার খাঁকে বিয়ে করেছে। জননী হয়েছে পর পর তিনটি সন্তানের। অভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। দিন কিছুতেই চলে না। তাকে ঠেলতে হয়। কিন্তু দরিয়া-বিবি দাসী নয়। অন্যরা হামাগুড়ি দিয়ে চলে। দরিয়া-বিবি হামাগুড়ি দিতে প্রস্তুত নয়। পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ বিরূপ। স্বামীর আয়-রোজগার অতিসামান্য। তদুপরি জীবিকার সন্ধানে মাঝেমধ্যেই স্বামী কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে যায়। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। আবার যায়।

দরিয়া-বিবির সমস্যা কেবল যে অভাবের তা নয়, নিরাপত্তাহীনতারও। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতাটাই প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। দরিয়া-বিবি ধর্ষিত হয় স্বামীর ফুপাতো ভাইয়ের দ্বারা। সে লোকটি চরিত্রে লম্পট, পেশায় ব্যবসায়ী। সে ধনী। আত্মীয়তার সূত্র ধরে এবং স্বামীর অনুপস্থিতে সে আসে এবং এক অন্ধকার রাতে একাকী শায়িতা অরক্ষিতা দরিয়া-বিবিকে ধর্ষণ করে।

জননী দরিয়া-বিবিকে আবারও জননী হতে হয়। এবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। অবৈধ সন্তানের মাতৃত্বজনিত অপরাধবোধ ও গ্লানি বহন করতে সে সম্মত নয়। তার চরিত্রে আত্মসমর্পণ নেই, দাসত্ব তার স্বভাববিরুদ্ধ। মুক্তির একটি মাত্র পথই তার জন্য উন্মুক্ত ছিল। দরিয়া-বিবি সেই পথের যাত্রী হয়ে যায়। নিজের জীবনকে সে নিজেই শেষ করে দেয়।

একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে রাত্রি শেষ হওয়ার আগেই দরিয়া-বিবি আত্মহত্যা করল। ভয়াবহ সেই রাত্রে একই সঙ্গে প্রসূতি, ধাত্রী ও জল্লাদের ভূমিকা তার। ঘরের মাচানের ওপর উঠে চালার সঙ্গে গরু বাঁধার দড়ি ঝুলিয়ে নিজেকে ঝুলিয়ে দেয় সে। উপন্যাসের শেষ কথার কয়েকটি এ রকম, ‘দড়ির ফাঁসের দিকে দরিয়া-বিবি তাকাইল। সারা জীবনে কত উদ্বেগ, কত সংগ্রামজনিত ক্লান্তি — সব ওইখানে ঝুলাইয়া রাখিয়া সে নিশ্চিত হইতে চায়। তার আগে দরিয়া-বিবি ডিপা নিভাইয়া ঘর অন্ধকার করিয়া দিল।’

ঘর অন্ধকার, কিন্তু দরিয়া-বিবি উজ্জ্বল। দরিয়া বিবি অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার, দুঃখ-দারিদ্র্য, অপরাধবোধ সব কিছুকে নিচে রেখে দরিয়া-বিবি রয়েছে উঁচুতে।

মহিষডাঙা গ্রামে মৃত্যু অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। সেখানে সময় হওয়ার আগেই মানুষগুলো চলে যায়, বিশেষ করে পুরুষরা। গ্রামটি নারীতে ভরপুর। দরিয়া-বিবির বাড়িতেই অল্প ব্যবধানে তার শাশুড়ি ও স্বামী মারা গেছে। কেউ কোনো খবর করেনি। কিন্তু দরিয়া-বিবির মৃত্যুতে সাড়া পড়ে গেছে। অনেকে এসেছে। একটা কারণ, দরিয়া-বিবি অনেক অনুরাগী ও শুভানুধ্যায়ী ছিল। তার কোনো শত্রু ছিল না। সবাই তাকে ভালোবাসত। সদ্ভাব ছিল সবার সঙ্গেই। দ্বিতীয় কারণ এবং সেটাই প্রধান, কৌতূহল। দরিয়া-বিবি কেন আত্মহত্যা করল? শওকত ওসমান লিখছেন,

কিছুক্ষণের মধ্যে জনবিরল গ্রামের এই অখ্যাত অঙ্গনটি ক্ষুদ্র জনতায় ভরিয়া উঠিল। আসিল রহিম বখ্শ, রোহিনী চৌধুরী, চৌকিদার, সাকের আমিরণ-চাচি—অনেকে। রহিম বখ্শ চৌধুরী — যাহাদের পা’র ধুলা কোনো দিন দীন আজহারের অঙ্গনে পড়ে নাই, তাহারাও আসিয়াছিল। সংসারে প্রতিদিন মৃত্যুর তোরণ যারা সাজাইয়া রাখে, মৃত্যুর প্রতি তাহাদের কৌতূহল বেশি। কৌতূহল মিটাইতে হইবে বৈকি! তাঁহারা আসিয়াছিলেন। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টের সার্টিফিকেটেই সব কাজ হইল। থানা পর্যন্ত আর দাঁড়াইল না।

অভিমান? না, অভিমান করার মতো মানুষ দরিয়া-বিবি নয়। অভিমান করে আত্মহনন করে এমন উপাদানে গঠিত নয় এই জননী। ধারণা করি, দরিয়া-বিবি জীবনের ওই শেষ কাজটি ছিল একটি ধিক্কারধ্বনি। জীবনভর সে তার কপালকে দায়ী করেছে, মৃত্যুতে সে কপালকে নয়, দায়ী করে গেল গোটা ব্যবস্থাটাকে। যে ব্যবস্থা তাকে সুখ দিতে পারেনি, কেবলই দুঃখ দিয়েছে। অপমান করেছে। সুযোগ নিয়েছে তার অসহায়ত্বের। ওই ব্যবস্থাটা পুরুষতান্ত্রিক।

দরিয়া-বিবির সমাজে পুরুষরাও বন্দি। তারাও ক্রীতদাস। এই ক্রীতদাসরা বিদ্রোহ করবে এমন ক্ষমতা রাখে না, ধিক্কার জানিয়ে তারা যে হাসবে এমন সাহসও তাদের নেই। এই মানুষরা বাড়ির গৃহপালিত ছাগল, গাভি, হাঁস, মুরগি, চাষ করার জমি ইত্যাদির মতোই আটক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু এই বন্দিশালার ভেতরেও আবার নারী-পুরুষে ভেদাভেদ আছে। নারী-পুরুষরাই এখানে কর্তৃত্ব করে। তারাই কর্তা। তবে তাদের এমন শক্তি নেই যে নিজেদের মুক্ত করবে। ওই ক্ষেত্রে এই পুরুষদের পৌরুষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ব্যবস্থাটি বড় কঠিন ও শক্ত, তার পাহারাদারি অবিচল ও নিশ্ছিদ্র। মেয়েরা তো আটকা থাকবেই; বিশেষ করে মুসলমান ঘরের মেয়েরা, যাদের আব্রু মানতে হয়। হিন্দু ঘরের যে মেয়েরা পথে বের হয় তারাও কাজ পায় না, এবাড়ি-ওবাড়ি গিয়ে ফুটফরমাশ খাটা কিংবা মাঠ থেকে শাক সংগ্রহ করার বাইরে। তা-ও অল্প বয়স্করা যেতে পারে না। যায় বৃদ্ধারা। সব বৃদ্ধাই অসম্ভব অসহায়; তারা অপেক্ষায় থাকে মৃত্যুর।

জীবনযাত্রা অতিশয় সামান্য। দরিয়া-বিবির ছেলে আমজাদ মক্তবে পড়তে যায়। গ্রামে স্কুল নেই, মক্তবও বেশ দূরে। সেখানেও নিয়মিত যেতে পারে না বেতন বাকি পড়ায়। ওদিকে আবার মক্তবে পড়েছে বলে আমজাদের খুবই আপত্তি কৃষিকর্মে। দরিয়া-বিবির প্রথম পক্ষের পুত্র মক্তবে পড়ত। থাকত চাচাদের সঙ্গে, একসময় তারা তাকে তাড়িয়ে দেয়। আশ্রয়ের খোঁজে মোনাদির চলে আসে মায়ের কাছে। মায়ের অবস্থা ভীষণ কাহিল। তার মেয়েটি চোখে দেখে কম, অন্ধ হয়ে যাবে আশঙ্কা। এরই মধ্যে আরেকটি মেয়ে জন্ম নিয়েছে। অর্থাভাবে উত্তরাধিকা সূত্রে প্রাপ্ত পিতলের ঘড়াটি বন্ধক রাখে। তবু জীবন যা হোক চলছিল কোনোমতে। প্রচণ্ড ধাক্কা খেল, একদিন যখন দরিয়া-বিবির স্বামী আজহার তুচ্ছ কারণে খুব করে পিটুনি দিল মোনাদিরকে। মোনাদির, বয়স যার মাত্র বারো, অভিমানে বের হয়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। দরিয়া-বিবিরা কত দিক সামলাবে?

সব কিছু মিলিয়ে গ্রামবাংলার ছবিটি দুঃসহ দারিদ্র্যের। শওকত ওসমান সেই ছবিটিই নিয়ে এসেছেন তাঁর এই উপন্যাসে, কয়েকজন মানুষের জীবনকাহিনী তুলে ধরে। যাদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে দরিয়া-বিবি।

দুই.

দরিয়া-বিবি বাংলার নদীর মতোই। বড় নদী নয়, খুবই ছোট একটি নদী। তাকে নদী বলাটাই হয়তো অন্যায়। কিন্তু এই জলধারাটি প্রবহমান থাকতে চায়। তাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটা চলে। চারদিক থেকে উতপাত এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। তবু সে বশ্যতা মানে না, আত্মসমর্পণ করে না। ধিক্কার জানায় উতপাতগুলোকে। পরোক্ষে অন্তর্নিহিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পুরুষতান্ত্রিকতাকে।

উপন্যাসটি ১৯৪৪ সালে লেখা। তখন যুদ্ধ চলছে। তার উল্লেখ অবশ্য কাহিনীতে নেই। তবু টের পাওয়া যায় যে যুদ্ধের চাপটা এসে পড়েছে, ফলে অর্থনৈতিক সংকটটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সময়ে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম চলছিল। কাহিনীর মানুষগুলোর জীবনে তার কোনো ছাপ নেই। কারণ হলো গ্রামীণ জীবনের প্রান্তবর্তিতা। কংগ্রেসে-লীগের ঝগড়াঝাঁটি — এসব গ্রামে এসে পৌঁছতে পারেনি। তবে সাম্প্রদায়িকতা যে আসেনি, তা নয়। একবার তো দেখা গেছিল, কেবল যে এসেছে তা নয়, সাম্প্রদায়িকতা বুঝি পাকাপোক্ত হয়ে বসে যাবে।

বিরোধটা বাইরে থেকে আসেনি, ভেতর থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছে। এলাকায় খুব বড় একটা জলাশয় আছে। দুই জমিদারের ভেতর বিরোধ লেগেছে এর ওপর আধিপত্য নিয়ে। একদিকে হিন্দু জমিদার রোহিণী চৌধুরী, অন্যদিকে মুসলমান জমিদার হাতেম বখ্শ খাঁ। একসময় জমিদারিটি অখণ্ড ছিল; পরে, ঘটনাক্রমে, ভাগ হয়েছে ছয় আনা দশ আনায়। দুই পক্ষের বিরোধটা লড়াইয়ে পরিণত হলো।

লড়াইটা যেহেতু স্থানীয়, তাই বেশি দিন টেকে না। অল্প দিন পরেই ধরা পড়ে যায় যে এ লড়াইয়ে খাঁ ও চৌধুরী কারো কোনো ক্ষতি হয়নি; তারা অক্ষতই আছে, মাঝখান থেকে গরিব মানুষ শিবু ও ইসমাইল রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে গেছে, জমিদাররা তাদের খোঁজও নেয়নি। তারা দুজনই মারা যায়। উগ্রতাটা চন্দ্রকোটালেরই ছিল বেশি, ফাঁকিটা তার কাছেই ধরা পড়ে সবার আগে। নেশাটা কেটে যায়। চন্দ্রকোটাল ও আজহার উভয়ই বোঝে যে লড়াইটা তাদের নয়। জমিদারদের। দুই বন্ধু আবার এক হয়।

কিন্তু আলী আজহারকে তো বাঁচানো গেল না। চন্দ্রকোটাল বন্ধুর বিপদে উদ্বিগ্ন হয়, খোঁজ নেয়, পাশে এসে বসে। আজহার বাঁচে না। দরিয়া-বিবি নতুন করে বিপদে পড়ে। এখন গোটা সংসার তার ঘাড়ের ওপর। মনের জোর ছিল অসাধারণ, তাই টিকে থাকতে পেরেছে; কিন্তু দরিয়া-বিবি তো গোর্কির উপন্যাসের মা নয়, তার আশপাশে কোনো বিপ্লবী আন্দোলন নেই; মা নয় সে ব্রেখটের নাটকেরও, যে চলমান দোকান ঠেলে খাবার বিক্রি করবে রেলস্টেশনে। সে দুই দুইবার বিধবা, অসম্ভব দারিদ্র্যে আক্রান্ত এক নারী, যার সম্বল ওই মনের জোর। জোরটা নতুন করে ধাক্কা খায় অবৈধ সন্তানের জন্মে। লুকোচুরি না করে দরিয়া-বিবি বিদায় নেয় সেই জগৎ থেকে, যেখানে কোনো দিন সে স্বস্তি পায়নি। চারপাশের সব মানুষকে তো বটেই, পিতৃতান্ত্রিকতার পক্ষপাতে-পুষ্ট পুরুষ মানুষগুলোকেই ধিক্কার জানিয়ে নীরবে সে প্রস্থান করে। এটি তার মনের জোরের চূড়ান্ত প্রকাশ। তার ধিক্কার কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে নয়, গোটা ব্যবস্থাকেই।

মায়ের মৃত্যুর পর দরিয়া-বিবির প্রথম সন্তান মোনাদির ফিরে এসেছে মায়ের ভিটাবাড়িতে। তার পিতা তো আগেই গেছে চলে, এখন মাও নেই। মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল, এক বাড়িতে জায়গির থাকত, তারা আর রাখতে রাজি নয়। সে এখন কাজ নিয়েছে পাটের কলে। শরত্চন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে গফুর জোলা একদা তার কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিল, পাটকলে চাকরির খোঁজে; মোনাদিরকেও সেখানেই যেতে হয়, গ্রামে তো কর্মের কোনো সংস্থান নেই। কিন্তু থাকবে সে গ্রামেই। এখানে তার ভাইবোন আছে, যারা তার মায়ের সন্তান। মা নেই, তবে আমিরুন চাচি আছে। আমিরুন চাচি তাকে আদরযত্ন করে। বিধবা চাচির নিজের একটা পরিকল্পনা আছে, একমাত্র সন্তান চঞ্চলা আম্বিয়াকে বিয়ে দেবে সে মোনাদিরের সঙ্গে। মোনাদির কাজ করবে পাটকলে, থাকবে কমলডাঙ্গায়, যেখান থেকে একদিন সে চলে গিয়েছিল। প্রথমবার যায় সত্বাবার হাতে প্রহূত হয়ে, দ্বিতীয়বার যায় রাতের বেলায় মায়ের সঙ্গে ইয়াকুবকে গোপনে কথা বলতে দেখে।

ইতিহাস বলছে, কমলডাঙায় যে সাম্প্রদায়িক দাঙা দেখা দিয়েছিল তার একটা সর্বভারতীয়রূপ ছিল, যার দরুন ১৯৪৭-এ কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয় এবং পরে এক বছরের মধ্যেই বাংলা ভাগ হয়ে যায়। জমিদারির ছয় আনির মালিক হাতেম বখ্শ খাঁ ও দশ আনির মালিক রোহিণী চৌধুরীরা কোনো মীমাংসায় আসতে পারেনি; বিশেষভাবে তারাই ঠিক করেছিল, ভাগ হয়ে যাবে।

বিভক্ত বঙ্গের কাহিনী এর পরেও এগিয়েছে। লেখক শওকত ওসমান ওপার থেকে এপারে চলে এসেছেন। এপারের কথা লিখেছেন। ১৯৬৮ সালে ‘জননী’ যখন নতুন করে প্রকাশিত হয়, সেই সময়ে এপারে দারুণ অস্থিরতা। এবার আর দাঙা নয়, পুরোপুরি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি। যুদ্ধটা অনিবার্য ছিল। কারণ ছয় আনির মালিকরা দেখতে পেয়েছে, নতুন দশ আনিওয়ালাদের আগমন ঘটেছে। আগের দশ আনিওয়ালারা ছিল বাঙালি, কিন্তু হিন্দু; নতুন উতপাতকারীরা মুসলমান, কিন্তু অবাঙালি। অমীমাংসেয় এই দ্বন্দ্বে অনিবার্য হয়ে উঠেছে যুদ্ধ। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছে, প্রতিষ্ঠা ঘটেছে স্বাধীন বাংলাদেশের।

কারা করল যুদ্ধ? মূলত মোনাদিরেরাই। যুদ্ধটা গ্রামের মানুষ শুরু করেনি, কিন্তু তাদের লড়তে হয়েছে গ্রামে থেকেই। হানাদাররা যে হেরে গেছে, তার কারণ গ্রামের ওই মোনাদিররাই। এপারের চন্দ্রকোটাল ও এলোকেশী টিকে থাকতে পারেনি, শুরুতেই তাদের ওপারে চলে যেতে হয়েছে, শরণার্থীর বেশে। তারাই ছিল প্রথম শিকার। দরিয়া-বিবিদের সন্তানরা প্রাণপণে লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে, হাঁকিয়ে দিয়েছে হানাদারদের। কিন্তু রক্ষা পায়নি দরিয়া-বিবি ও তার কন্যারা। তারা ধর্ষিত হয়েছে। সেবার দরিয়া-বিবিকে ধর্ষণ করেছিল তার দেবর, এবার তাকে ধর্ষণ করল হানাদার দস্যুরা। দরিয়া-বিবিকে রক্ষা করবে এমন কাউকে দেখা যায়নি। সেবারও নয়, এবারও নয়।

দস্যুদের হাতে নির্যাতনের মর্মন্তুদ কাহিনী নিয়ে অনেকে লিখেছেন। বিশেষভাবে লেখার কথা শওকত ওসমানের। সে দায়িত্বও তিনি গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে পালন করেছেন। গল্পে ও উপন্যাসে। স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু মেয়েদের নিরাপত্তা বাড়েনি। হিজাব ও বোরকার সংখ্যা বৃদ্ধি মেয়েদের নিরাপত্তার নয়, নিরাপত্তাহীনতারই স্মারক এবং একই সঙ্গে সেটা ধিক্কারের কালো পতাকাও, পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে।

তিন.

পিতৃতান্ত্রিকতা অব্যাহত রয়েছে। এর পেছনে আছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যেটা আগাপাছতলা পিতৃতান্ত্রিক। ব্যবস্থার পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থনও কাজ করছে। বুদ্ধিজীবীরাও সমর্থন সরবরাহে কার্পণ্য করেননি। যেমন নীরদ সি চৌধুরী; যিনি ইংরেজভক্ত এবং পুঁজিবাদের সমর্থক। সে হিসেবে শওকত ওসমানদের প্রতিপক্ষ তিনি। শওকত ওসমান এ বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। নীরদ চৌধুরীর পিতৃতান্ত্রিকতা নিয়ে আমি লিখেছি, সে লেখা শওকত ওসমান পড়েছেন সেটা জানতাম। বিশেষভাবে টের পেলাম দৈনিক ‘সংবাদ’-এ লেখা আমার সাপ্তাহিক কলাম ‘সময় বহিয়া যায়’তে নীরদ চৌধুরী নারীচিন্তা বিষয়ে মন্তব্যের আলোচনা পাঠে শওকত ওসমানের প্রতিক্রিয়া দেখে। ফোন করে তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানালেন, বললেন — এ লেখার কথা তিনি নীরদভক্তদের জানাবেন এবং এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রচারের ব্যবস্থা করা যায় কি না তা-ও দেখবেন। আমার খুব ভালো লেগেছিল তাঁর প্রতিক্রিয়া।

প্রসঙ্গটি এখানে আসছে জননীদের পক্ষে এবং পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে শওকত ওসমানের অবস্থানের প্রসঙ্গ সূত্রে। আমার লেখায় উল্লেখ ছিল নীরদ চৌধুরীর রচনায় চট্টগ্রামে স্বাধীনতার পক্ষে যুব-অভ্যুত্থানের নায়কদের মূর্খ বলে অভিসম্পাত করার এবং মেয়েদের আন্দোলনে যুক্ত করার জন্য তাদের গালমন্দ করার। নীরদ চৌধুরী ‘বাঙালী রমণীর মুসলমানী পোশাক’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। মেয়েদের রমণী বলতে আমার আপত্তি ছিল; আমার মন্তব্য ছিল এই রকমের যে ওই সম্বোধনের ভেতর দিয়ে একটি পুরনো অভ্যাসের ও মনোভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। শওকত ওসমান আমাকে শাবাশ দিয়েছেন। পরে জেনেছি, তাঁর ডায়েরিতে এই লেখাটির উল্লেখ আছে।

নামে-বেনামে নীরদপন্থীরা বাংলাদেশে খুবই তৎপর আছেন। অপর দিকে অনেক কিছুই বদলেছে বটে, কিন্তু সামাজিক সম্পর্ক রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। এখন দরিয়া-বিবির ছেলেদের কেউ যায় মধ্যপ্রাচ্যে, কেউ পড়ে মক্তবে-মাদ্রাসায়। তার মেয়েরা সন্ত্রস্ত থাকে মনুষ্যরূপী শ্বাপদদের ভয়ে; সত্তর বছর আগে দরিয়া-বিবিরা যেমনভাবে থাকত, অনেকটা সেভাবেই। সামাজিক মুক্তি যে আসেনি তার প্রমাণ মেয়েদের ওই নিরাপত্তাহীনতা।

শওকত ওসমান সেটি জানতেন। তিনি তাদের পাশেই ছিলেন। তাঁর লেখা ছিল ভরসার একটা জায়গা। এখনো আছে এবং থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev