দেবী কালিকা বাঙালির বড়ো আপনজন। লোলজিহ্বাধারী ভীষনা দেবীকে আমরা চিরকাল মাতৃরূপে বন্দনা করেছি। তিনি আমাদের মা। কালীর দক্ষিণকালী রূপটি বাংলায় বহুল প্রচলিত। গৃহী, সন্ন্যাসী সকলেই মায়ের এই রূপের পুজো করেন। তিনি জগৎ প্রসব করেন আবার জগতের মধ্যেই থাকেন। তিনি নানাভাবে লীলা করেন। সংসারিক কলহ কীভাবে ঈশ্বর আরাধনা ও দর্শনের সহায়ক হয়ে ওঠে তার নজির ধরা পড়ে রাজা হরিশচন্দ্র দত্ত রায়ের জীবনে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীনিস্তারিণী কালী ভক্তগণের আরাধ্য। আজ এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠার গল্প শোনাব।
বর্ধমান জেলার অন্তর্ভুক্ত পাটুলির দত্ত রাজবংশজাত শেওড়াফুলি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা মনোহর রায়।
তাঁর নাতি রাজা হরিশচন্দ্র থাকতেন বর্ধমানের কাছে নারায়ণপুরে। মা চম্পকলতার ইচ্ছাতে হরিশচন্দ্রকে তিনটি বিবাহ করতে হয়। তিন সতীন রানী সর্বমঙ্গলা, হরসুন্দরী এবং রাজধন–এর মধ্যে সর্বদাই ঝগড়া, অশান্তি লেগে থাকতো। সাংসারিক কলহে রাজা একেক সময় অতিষ্ট হয়ে উঠতেন।
একদিন সেই রকম এক প্রলয়ঙ্করী ঝগড়ার সম্মুখীন হলেন রাজা। রানীদের হাজার বোঝানো সত্ত্বেও কোনো সমাধান হলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা তরবারি নিয়ে আক্রমণ করলেন। ভুলবশঃত ঘটনাস্থলে বড়রানী সর্বমঙ্গলা প্রাণ হারান। শোকের ঢেউ আছড়ে পড়লো ঝগড়ার উত্তাপে। প্রাণাধিক প্রিয় সর্বমঙ্গলার মৃত্যুতে হরিশচন্দ্র মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেলেন।

একরাতে অনুতাপের জ্বালায় নিজের প্রিয় ঘোড়ায় চড়ে অজানার পথে পাড়ি দিলেন রাজা হরিশচন্দ্র। প্রায় সত্তর মাইল ঘোড়ায় ছুটে এসে উপস্থিত হলেন শ্রীরামপুরে। হরিশচন্দ্র জানতে পারলেন এটি তারই জমিদারির এলাকা। উপস্থিত হলেন তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত দেবালয় শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত রাজা মন্দিরের সিঁড়িতেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে শুনলেন কে যেন বলছেন, — ‘তুমি শেওড়াফুলি চলে যাও। সেখানে গঙ্গার পশ্চিম তীরে মাটি খুঁড়লে পাবে দুটি পাথর। সেই পাথরে দক্ষিণাকালীর মূর্তি তৈরি করে আমার পুজো করো। এতেই তোমার স্ত্রীহত্যার মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে।’
হরিশচন্দ্রের ঘুম ভাঙলে মন্দিরের পূজারিকে ভোররাতের স্বপ্নাদেশ বলেন। পূজারী তক্ষুনি জমিদারের নায়েব এবং জ্যোতিষকে ডেকে আনলেন।
সেই সময় হঠাৎ করেই সেখানে উপস্থিত হলো এক কৃশকায় ব্যক্তি। নিজেকে ভাস্কর পরিচয় দিয়ে বলেন, সেও স্বপ্নাদেশ পেয়েছে যে তাকে একটি কালীমূর্তি গড়ে দিতে হবে। জ্যোতিষ নানারকম গণনা করে সকলে মিলে গঙ্গাতীরে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে উদ্ধার করলেন কষ্টিপাথর। এইসময় থেকেই হরিশচন্দ্রের জীবন পালটে যায়। রাজবৈভব ছেড়ে মাতৃসাধনায় মেতে উঠলেন।
১২৩৪ সালের জৈষ্ঠ্য শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা হলো। হরিশচন্দ্র কালীর নাম রাখলেন ‘শ্রীশ্রী নিস্তারিণী দক্ষিণাকালীমাতা’। নিজের ইষ্টমন্ত্র-সহ দেবীর ধ্যানমন্ত্র লিখে মায়ের পুজার ব্যবস্থা করলেন। হরিশচন্দ্রের ভক্তির টানে মা আজও জাগ্রতা। ভক্তদের দুর্গতিনাশ করার জন্যই তিনি এখানে নিস্তারিণীকালী রূপে বিরাজিতা।
হরিশচন্দ্রের কালী সাধনা ছিলো মধুর ভাবের। স্ত্রী হত্যার পাপ থেকে মুক্তির জন্য তাঁর এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা। প্রিয় পত্নী সর্বমঙ্গলাকে তিনি মা নিস্তারিণীর মধ্যে সর্বদা উপলব্ধি করতেন। এমনকি রাজকার্য ছেড়ে মন্দির সংলগ্ন কুটিরে বসবাস করতে লাগলেন। প্রজাহিতকারী রাজারূপে তাঁর নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
দেবী চতুর্ভূজা। এখানে মায়ের হাতে খাঁড়া নেই। তার বদলে আছে সোনার তলোয়ার। মা এখানে রাজমহিষীর প্রতিরূপ। তরোয়াল রাজ্য শাসনের প্রতীক। দেবীর বাম দিকের নিচের হাতে নরমুণ্ড এবং দক্ষিণের দু-হাত দিয়ে প্রজাদের বর ও অভয় দান করছেন। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বড় পাপড়িযুক্ত তামার পদ্মফুলের ওপর শিবের বুকে দণ্ডায়মানা মা।
মন্দিরটি বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ নয়। এই মন্দিরে আছে পরিবারের গৃহদেবতা বঙ্কুবিহারী, কৃষ্ণরায়, মাতা মহিষমর্দিনী ও অন্নপূর্ণার মন্দির। মন্দিরের সামনে বড়ো বড়ো থামযুক্ত নাটমন্দির আছে।

রানী রাসমণি একবার অদ্ভুতভাবেই নিস্তারিণী মায়ের দর্শন পান। একবার গঙ্গাবক্ষে বজরা করে যাওয়ার সময় শেওড়াফুলি ঘাটে এলে একটি ন-বছরের বালিকা রাণীকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা কোথায় যাবে?’
রাণী তাকে নিস্তারিণী মায়ের দর্শনের কথা বললে, সেই বালিকা আশ্বস্ত করে বলে তারা ঠিক স্থানেই যাচ্ছে।
‘আমি মন্দিরের রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি’ বলে পথ দেখিয়েই অদৃশ্য হয়ে যায় বালিকা। মায়ের একান্ত ভক্ত রাণী রাসমণি চিনেছিলেন এই বালিকাকে। মা নিস্তারিণী বালিকার বেশে এসে দেখা দিয়ে পথের হদিশ দিয়ে গেলেন। নিস্তারিনী কালীর মুখটি রানী রাসমণি কে এতটাই প্রভাবিত করেন যে, তিনি আদেশ দেন মা নিস্তারিনীর মুখের আদলেই তৈরি হবে দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণীর মন্দির।
শেওড়াফুলি স্টেশনের কাছে এই মন্দিরে মায়ের নিত্যপুজো হয়। এছাড়া বিশেষ পুজো হয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন, কৌশিকী অমাবস্যায় এবং দীপান্বিতা কালীপুজোয়। এবছর ১৯৬ তম বছরে পা দিল এই পুজো। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন মাতৃদর্শনে। এখানে এসে নিয়ে যান মায়ের আশীষ ও অপার শান্তি।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ : সুধীর কুমার মিত্র, প্রয়াত প্রণয়েশ চন্দ্র দত্ত রায়ের ডায়েরি থেকে ও অন্যান্য।
⭐কালী কালী ভহাকালী,কালীকে পাপনাশিনী⭐
প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদনে মুগ্ধতা।মঙ্গল হোক????
অনেক ধন্যবাদ ????
খুব ভালো লাগলো আপনার লেখাটা।
অজস্র ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????