কলকাতার দর্জিপাড়ায় নয়নচাঁদ দত্ত স্ট্রিটে মামার বাড়িতে চোখ মেলে তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। জীবনের অধিকাংশ শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-বসন্ত কাটিয়েছিলেন কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসবাড়িতে। কাজে, অকাজে বা নিছক খামখেয়ালে ঘুরে বেড়াতেন কলকাতার রাস্তায়, অলিতে গলিতে, কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো বাসে ট্রামে চেপে, কখনো বা ট্যাকসিতেও। এবং চিরকালের মতো চোখ বন্ধও করেছিলেন তাঁর ‘পৃথিবী’ কলকাতার বুকে।
তাঁর ছোটছোট সুখদুঃখ মাখা নিস্তরঙ্গ জীবনযাপনে শীতের চাদরের মতো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকতো কলকাতা। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিট্যুটের কাছে রেলিং এর বাইরে ফুটপাতে তাঁকে মাঝেমধ্যে দুপুরের বিশ্রাম নিতে দেখা যেত। একবার তো চাঙ ওয়ার বিখ্যাত চাইনিজ রেস্তোরার কাছে ফুটপাতে তাঁকে চিত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তরুণ লেখক শেখর বসু তাঁকে ঐভাবে শুয়ে থাকতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন কাছেই আনন্দবাজারের অফিসে। ঐভাবে কেন শুয়েছিলেন? এক এক জনকে এক এক রকম কারণ দেখিয়েছিলেন চরম খামখেয়ালী মানুষটি। হয়তো কলকাতার ফুটপাথে শুয়ে আকাশ কেমন দেখায় তাই দেখছিলেন।
কলকাতার সঙ্গে তাঁর মাখামাখির প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির পাতায় পাতায়। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাসট্রাম সব নিয়েই কলকাতা বারে বারে উঁকি দিয়েছে তাঁর গল্পগুলিতে। এমনকি কলকাতার ব্যাঙ্কও। একটি গল্পে দেখা যায় বিশ্বপতিবাবু গাড়ি কেনার জন্য যে চেক লিখে দেন, সেটি হলো ক্যালকাটা ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বর্তমানে অবলুপ্ত ব্যাঙ্কটির অফিস ছিল মিশন রো এক্সটেনশনে।
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত চরিত্র হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন। আসাম থেকে এসে বাসিন্দা হয়েছিলেন কলকাতার চেতলায়। তাঁদের কাঠচেরাই কারখানা আর দোকানও সেখানে। লেখকের মতোই কলকাতা তাঁদের বিচরণভূমি, লীলাস্থল। লেখকের মতোই তাঁরা কখনো ট্রামে চেপে গ্যালিফ স্ট্রিট যান, কখনো বাসে চেপে এলগিন রোড। হর্ষবর্ধন পরোপকারের নেশায় শিয়ালদায় হাঁটেন, হাওড়া স্টেশনে ভুল ট্রেনে চাপেন।
কলকাতার অঞ্চলের নাম নিয়েও শিব্রামী পান আছে। গোবর্ধন তার দাদাকে কলকাতার ‘স্থানাস্থানের ইতরবিশেষ’ বোঝাচ্ছিল — ‘কলকাতায় নেমেই তুমি ধরামতলায় ধড়াম করে পড়ে গেছলে কেন? মনে নেই? সে তো জায়গাটা ঐ ধরামতলা বলেই। …তেমনি উল্টোডাঙ্গায় গেলে তুমি উলটাবে, চিৎপুরে গিয়ে চিৎ হয়ে পড়বে, বেহালায় গেলে বেহাল হতে হবে নির্ঘাত। ‘দাদা বাধা না দিলে আরো কিছু চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যেত গোবর্ধনের কাছ থেকে!
তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র কল্কেকাশি। ‘তপ্ত কল্কের মতো গনগনে আর কাশির মতোই খনখনে তাঁর দাপট’। এমন গোয়েন্দা কল্কেকাশি হাওয়া খেতে যান গোলদীঘিতে, তদন্তের কাজে ঘুরে বেড়ান মির্জাপুরের মোড়ে, হ্যারিসন রোডে, ডালহৌসি চত্বরে, আমহার্স্ট স্ট্রিটে। সম্ভবত তাঁর লেখা একমাত্র ক্রাইম স্টোরি ‘হাতেনাতে পাকড়ানো’। এতে অপরাধীর বাসস্থান মলঙ্গা লেন।
কলকাতার বাসরুটও আসে তাঁর গল্পে। চেতলা থেকে মানিকতলা রুটের ৩৩ নং বাসের উল্লেখ রয়েছে ‘গোবর্ধনের কেরামতি’ গল্পে। সিনেমায় গিয়ে গোবর্ধন পাশে বসা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করছে, ‘এটা তেত্রিসের বাস তো? …মানে মাপ করবেন বড়দি, এটা চেতলার বাস তো’?
তিনি যখন কলকাতায় থাকতেন, তখন কলকাতার ল্যান্ডমার্ক ছিল মেট্রো সিনেমা। তাই দেখা যায় যে ‘বিনি প্রত্যয়’ গল্পে মেট্রোতে বিলিতি ছবি দেখতে যাওয়ার উল্লেখ আছে। তিনি যখন কলকাতায় থাকতেন, তখন কলকাতার রাস্তায় চলত কলকাতার এক সময়ের গর্বের দোতলা বাস। তাই দেখা যায় যে ‘ভ্যানিটি ব্যাগ বনাম মণিব্যাগ’ গল্পে দোতলা বাস হয়ে গেছে ঘটনার অকুস্থল।
তিনি যখন কলকাতায় থাকতেন তখন কলকাতার নামকরা অভিজাত দোকান ছিল ‘হল এণ্ড এণ্ডারসন’। (এই দোকানকে কলকাতার প্রথম ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বলা যায়। ১৮৯৪ সালে উইলিয়াম এন্ডারসন ও পি এন হল দুই বন্ধু মিলে এই দোকানটি স্থাপন করেছিলেন। মূলত সাহেব আর অভিজাত নাগরিকদের প্রিয় ছিল এই দোকানটি)। তাই দেখা যায় যে হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন বাসে চেপে চৌরঙ্গির সাহেবি দোকান ‘হল এণ্ড এন্ডারসন’-এ কেনাকাটা করতে যান।
ইউনিভার্সিটি ইনস্টিট্যুট আর মহাবোধি সোসাইটির নাম আছে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে গল্পে। আছে এলবার্ট হল। ১৮৪২-৪৩ সালে কলুটোলায় মতিলাল শীলের প্রতিষ্ঠা করা শীল’স ফ্রি স্কুল এর নাম পাওয়া যায় একটি গল্পে।
‘কালান্তক লালফিতা’ গল্পে তো পাঠককে প্রায় পুরো কলকাতা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। ক্যাম্বেল হাসপাতাল (বর্তমানে নীলরতন সরকার) গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল, মেডিকেল কলেজ, ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী (এখনকার ন্যাশনাল লাইব্রেরী), আলিপুরের আবহাওয়াখানা, এসপ্ল্যানেডের ট্রাম ডিপো থেকে বেলগেছের (এখনকার বেলগাছিয়া) ভেটারিনারি কলেজ!
কলকাতার প্রেমে জারিত ছিল শিবরাম চক্রবর্তীর জীবন। তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে পাঠকরাও সেই প্রেমের শরিক হয়ে যান।
তথ্যের সাহায্য : শিব্রাম বনাম শিবরাম : মিত্র ও ঘোষ প্রকাশন, শিবরাম রচনাসমগ্র ও উইকিপিডিয়া
ছবি : অন্তর্জাল