আশ্বিনের আঙিনায় এখন খ্যাপা শ্রাবণের ছোটাছুটি। সারাদিন বৃষ্টিতে থমকে যাচ্ছে পুজো প্যান্ডালের কাজ। কুমোরটুলির দুর্গারা প্লাস্টিকে ঢাকা। নদীর চরে ভিজে কাশের দোলা নেই। কোনোমতে শরীরটুকু নিয়ে বেঁচে আছে আগমনীর সৌরভ ছড়ানো কোমল শিউলিফুলেরা।
বাজারে ছোটো বড় রংবেরঙের বড়ি বেচে এক মাসি। আজ তার বড়ির সঙ্গে খবরেকাগজে রাখা দুভাগা শিউলি ফুল। দশটাকা করে একভাগা। তার সামনে দাঁড়াতেই সে বললে, পুরোটাই নাও। পনেরোটাকা দেবে। বর্ষায় তার বড়ির বেশি বিক্রিবাটা নেই। নেতিয়ে পড়া শিউলি ফুলই বা পয়সা দিয়ে কে কেনে? ফুল আর ফুলওয়ালির মায়া ছেড়ে বেরোতে পারলাম না। একগুচ্ছ স্মৃতি বাজারের থলিতে ভরে আনলাম।
তখন থাকতাম ছত্তীশগঢ়ের এক কোলিয়ারীতে। বাংলার সুর, রূপ, রস, গন্ধে ব্যাকুল হতাম। পুজো আসলেই মন উচাটন। এক পশলা বৃষ্টিধোওয়া শরতের আকাশ ঝকঝকে নীল হয়ে উঠত। সন্ধ্যে হতেই কলোনীর বাতাসে শিউলি গন্ধ। প্রবাসী প্রাণ থমকে দাঁড়াত। দুবেভাবী বলত, “দাঁড়ালে কেন? চলো।

— শিউলি ফুলের গন্ধ পাচ্ছ না ভাবী?
— পসন্দ হ্যায় তুমহে হরশৃঙ্গার?
— শিউলির নাম হরশৃঙ্গার! আগে তো কখনো শুনিনি। শিবের পছন্দ বুঝি এ ফুল!
— হবে। তাইতো এমন নাম!
সীতালক্ষ্মী রেড্ডি বলেছিল, এই ফুলকে ওরা বলে পারিজাত। ওষধি গুণে ভরপুর এই গাছ নাকি সমুদ্রমন্থনে উঠে এসেছিল। দেবরাজ এটি তাঁর নন্দনকাননে স্থাপন করেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রাণী সত্যভামার জন্যে এই গাছ স্বর্গের নন্দনকানন থেকে মর্ত্যে এনেছিলেন। ইন্দ্র ক্রোধিত হয়ে শিউলিগাছকে অভিশাপ দিলেন। দেবরাজের অভিশাপে এ ফুল শুধু রাতেই ফোটে। অভিশাপ যাই হোকনা কেন, যে ফুল শারদলক্ষ্মীর আগমনের বার্তা আনে, তাতে তো মিশে থাকবেই স্বর্গের মাধুরী!
নাগপুরের ইন্দু আপ্তে বলেছিল মারাঠিরা একে প্রাযুক্তা বলে। আমাকে গুগল করতে হয় নি। কলোনী থেকেই জেনেছিলাম শরতপ্রাতের শিশির ভেজা শেফালির নামাবলী। তাকে ঘিরে নানা গল্প, কাহিনী।
কমলা রঙের সকালে কুয়োতলায় বিছিয়ে থাকত রাতে ফোটা শিউলি। আমি ফ্রকের কোঁচড়ে ভরে নিতাম।

আজ বদুদাদু আসবে পলির চিঠি নিয়ে। ওদের কোলকাতার বাড়িতে শিউলি ফুলের গাছ নেই। আমি বঙ্গলিপি খাতার পাতা ছিঁড়ে গোটা গোটা অক্ষরে লিখব, পলি কেমন আছিস? তুই পুজোয় কবে আসবি? তোদের কুয়োতলায় কত শিউলি ফুল ঝ’রে পড়ে থাকে জানিস। পুজোর সময় এবার আমরা দু-জনে শিউলির গোড়ের মালা গাঁথব লক্ষী-সরস্বতীর। আমি তোকে দু-চারটে শিউলি চিঠিতে ভ’রে পাঠিয়ে দিলাম।
শিউলির রঙে রাঙা হয়ে উঠত চিঠির রুলটানা কাগজ। গীতাঞ্জলির গোলঘরে অলোক ‘দা শেখাতেন, ‘শিউলি ফুল, শিউলি ফুল/ কেমন ভুল, এমন ভুল!’ শিউলি ফুল কি ভুল করতে পারে সেই ভেবে ভেবে সারা হতাম।
বেসনের পাতলা গোলায় ডুবিয়ে কচি শিউলিপাতার বড়া ভাজত মা। সদ্য জ্বর থেকে উঠেছে বাবা। মুখে স্বাদ নেই। অরুচি দূর হবে গরম গরম শিউলি পাতার বড়ায়।

পুজোর সময় চিত্তঠাকুর রাঁধবেই শিউলি পাতা দিয়ে ছাঁচিকুমড়োর শুক্তো। তাতে মটর ডালের বড়া পড়বে। শিলেবাটা সরষে আর রাঁধুনির পরিমাপ ঠিকঠাক না হলে স্বাদ যাবে বিগড়ে। নারকেল কোরা, গাওয়া ঘি, সামান্য মিষ্টি দেওয়া গরম শুক্তোর সুঘ্রাণ ছড়িয়ে যাবে কলাপাতায় গরম ভাতের ওপর। এই পদটি যে উড়িয়া পাচকদের হাতেই সবথেকে স্বাদু হয়, সেকথা সবাই স্বীকার করে নেবে।
শরত ফুরোলে একদিন শেষ কুঁড়িটুকুও ফুল হয়ে ঝ’রে বিদায় নেবে ক্ষণিকের অতিথি। সব উৎসবের শেষে বিষণ্ণ হেমন্তে খসখসে পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে পুষ্পবিহীন লম্বা গাছটা। আবার ফুলে ফুলে সেজে উঠতে তার একবছরের প্রতীক্ষা। শিউলির শুকনো বীজ মাটিতে ছড়িয়ে পড়বে। পরের বর্ষায় জল পেয়ে ছোটো ছোটো চারাগাছের জন্ম হবে। কোনোটা বাঁচবে। কেউ বাঁচবে না। এক বছরে ঘটে যাবে কত ঘটনা। চলে যাবে কত চেনা অচেনা মানুষ। স্মৃতির ঘরে রয়ে যাবে অবহেলায় মাটিতে ঝ’রে পড়ে থাকা শিউলির মৃদু গন্ধ।