| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শিবরাম স্বেচ্ছায় শিব্রাম হয়েছিলেন : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৭১২ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১১ জুন, ২০২২

রসসাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী (১৩/১২/১৯০৩-২৮/০৮/১৯৮০) তাঁর আত্মজীবনী ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় (‘দেশ’-এ ১৯৭১-এ ধারাবাহিকভাবে শুরু হয় এবং বই আকারে বেরয় ১৯৭৪-এ।) যেভাবে আত্মপরিচয় দিয়েছেন, তাতে মালদার চাঁচল থেকে কলকাতায় এসে মুক্তারাম স্ট্রিটে বসবাসের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। সেখানে মেসজীবনের কথাও উঠে এসেছে, কিন্তু তখনও কলকাতায় তাঁর জীবনের পরিচয় অসম্পূর্ণ ছিল। আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’ (১৯৭৩-এ ‘দেশ’-এ ধারাবাহিক শুরু হয় এবং দীর্ঘকাল পরে ১৯৯৬-এ বই আকারে প্রকাশলাভ করে।)-এ সেই কলকাতার জীবনের কথায় ফিরে এসেছেন। এবিষয়ে সচেতনতাও লক্ষণীয়। প্রথম অধ্যায়ের সূচনাতেই তিনি জানিয়ে দেনঃ ‘পুরনো পোড়োবাড়ির খপ্পর থেকে কলকাতার ফুটপাতে গিয়ে পড়লাম। সেখান থেকে উঠলাম এসে মুক্তারামের মেসে—মালদহের তথাকথিত এক রাজপ্রসাদ থেকে চোরাবাগানের এই বামালদাহে।’ শুধু তাই নয়, ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’কে ঘুরিয়ে নামকরণের বিষয়ে শিবরাম পাঠককে সচেতন করে তুলেছেন। আত্মজীবনের সূচনাতে যেভাবে তিনটি শব্দ দিয়ে নামকরণের ব্যাখ্যায় সামিল হয়েছিলেন, এখানেও তার পরিচয় বর্তমান।‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষের দিকে তিনি পুনরায় সেই ব্যাখ্যায় সামিল হয়েছেন যাতে পাঠকমনে অস্পষ্ট ধারণার অবকাশ তৈরি না হয়। তাতে এটি যে তাঁর উপন্যাস নয়, আত্মমজীবনী, তাও স্পষ্টতা লাভ করে। তাঁর কথায়ঃ ‘ঈশ্বর থেকে পৃথিবীতে এলাম—পৃথিবীকে পেলাম। পৃথিবীর পরিচয়ে ভালোবাসাকে আনলাম। স্বাদ পেলাম ভালোবাসার।

আবার ভালোবাসার থেকে পৃথিবীর পরিচয়ে ঈশব্রকে চেনা—স্নেহের পরিচয় পাওয়া তাঁর।

কখনো রথ, কখনো বা উল্টোরথ। কিন্তু একই পথ—একটাই গৎ—অনন্য গতি।’

অর্থাৎ সেই উল্টোপথে শিবরাম আবার প্রথম অবস্থানে ফিরে আসতে চেয়েছেন। জীবনচক্রের সাধারণ নিয়মে শুরু ও শেষের সঙ্গতিবিধানে তাঁর আঙ্গিক সচেতনতার বিষয়টি গুরুত্মপূর্ণ হয়ে ওঠে। আপাতভাবে শিবরামের আত্মজীবনীটি অগোছালোভাবে উপস্থাপিত হলেও তার মধ্যে তাঁর বিন্যাসভাবনায় শিল্পীসুলভ সচেতনতা বর্তমান। ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় রিনির ভালোবাসায় শিবরামের প্রকৃতি সবুজ হয়ে উঠেছে। ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ বস্তির শিব্রামীয় ভাষায় শ্রাবস্তীদের অর্থাৎ নানু, লালি প্রভৃতিদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সাহচর্যের কথা উঠে এসেছে। অবশ্য কৈশোরের সঙ্গিনী রিনির কথাও স্মরণ করেছেন শিবরাম। আর তা করেছেন তাঁর জীবনে একান্তভাবেই তার অবিকল্পতায়। অন্যদিকে চাঁচল রাজপরিবারের কথাতেও ফিরে গিয়েছেন তিনি। আর তা গিয়েছেন প্রয়োজনে নয়, আয়জনের আড়ম্ভরে। আসলে শিবরামের ঘটনাবহুল জীবনটাই আকস্মিকতার আড়ম্ভরে পূর্ণ। সেই আকস্মিকতায় শুধু বিস্ময়কর পরিসরই নেই, ব্যক্তিক পরিচয়ে অন্য মানুষের অনন্য প্রকৃতিও সুরভিত হয়ে ওঠে। শিবরাম তাঁর সেই ব্যক্তিগত জীবনের কথাই শিব্রামীয় পরশে উপাদেয় করে তুলেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’র কল্পিত সাংবাদিক জনাব সাহেবকে উপস্থিত করা হয়নি। অথচ তাতে শিব্রামীয় সংলাপের অবকাশ বর্তমান। ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের পরিসরে তার সক্রিয়তা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থেকেছে।

অন্যদিকে শিবরামের আত্মজীবনীর পূর্বে তাঁর সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের স্মৃতিকথায় নানা বিষয়ের অবতারণা উঠে এসেছিল। শুধু তাই নয়, তাঁকে নিয়ে ভবানী মুখোপাধ্যায় যে রীতিমতো কল্পনার রঙ মিশিয়ে গল্প ফেঁদেছিলেন, সেকথা তিনি ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় প্রকট করে তুলেছেন। সেদিক থেকে সেসব স্মৃতিকথা প্রসঙ্গে ভ্রান্তি নিরসন করার দায় আত্মজীবনীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রেও ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’র ভূমিকা বর্তমান। শিবরাম অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে রিনির সঙ্গে জেল খেটেছেন। আবার সেই উত্তপ্ত পরিসরে স্বসম্পাদিত নবপর্যায় ‘যুগান্তর’-এ রবীন্দ্রনাথের ‘ঊর্বশী’র প্যারদি রচনা করে রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে। সেকথা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় চাঁচলেরর রাজা শরচ্চন্দ্র রায়চৌধুরীর রোষে পড়ে শিবরামের পিতার মাসোয়ারা বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য শিবরাম সেই রাজার বিরুদ্ধে তাঁকেই সাক্ষী করে হাইকোর্টে একটি আজব মামলা করেছিলেন। সেই মামলা জিতলে অর্ধেক রাজত্ব ও রাজকন্যালাভের মতো রূপকথা ভিড় করে এসেছিল মামলাকারীর মনে। সেই লাখটাকা প্রাপ্তিবোধে এলিট সিনেমায় বসে শিবরাম তাঁর নতুন বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্রকে নিয়ে ‘পৃথিবী ভ্রমণ’-এ মুখর হয়ে ওঠেন। প্রেমেন্দ্রের সেই স্মৃতিকথা (১৯৬০-এর ‘জাগৃহি’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমার বন্ধু শিব্রাম’) শিবরাম ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ উদ্ধৃত করেছেন। সেই আজব মামলার ইতিবৃত্ত বলতে গিয়ে তাঁকে চাঁচলের রাজার কথায় ফিরে যেতে হয়েছে যা তাঁর জীবনকে জানার ক্ষেত্রে অপরিহার্য মনে হয়। পাশাপাশি ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শিশির ভাদুড়ীর তিক্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে লেখকজীবনে শিবরামের ঘনিষ্টজনদের সুমধুর পরিচয় তখনও বাকি। সেদিক থেকে বুদ্ধদেব বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুজফফ্‌র আহমদ, সৈয়দ মুজতবা আলি, প্রমুখ কৃতী মানুষের সান্নিধ্যের কথা পরের খণ্ডে মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া ছেচল্লিশের ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এ শিবরামের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও কীভাবে শিব্রামীয় রঙ্গরসের আধার হয়ে উঠেছে, তার পরিচয়ে খণ্ডটিকে অপরিহার্য করে তুলেছে। অন্যদিকে সাহিত্যজীবনের প্রথমপর্বের প্রতি শিবরাম যে সম্পূর্ণ নির্মোহ হতে পারেননি, তার পরিচয়ও ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ প্রতীয়মান। নিজের টাকায় প্রকাশিত বইগুলির তিনি পুনরায় শিব্রামীয় জনপ্রিয় পরিসরে ছাপতে চেয়েছিলেন। ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’ (১৯৪৩) তারই পরিচয়। শুধু তাই নয়, প্রবন্ধের বইটির প্রতি শিবরামের যে সবিশেষ দুর্বলতা ছিল, সেকথাও জানা যায়। কলকাতায় প্রথম জীবনের হকারবন্ধুর স্মৃতিপথে সেই বইয়ের প্রতি তাঁর প্রত্যাশার কথা আকাঁড়া ভাবে উঠে এসেছেঃ ‘আমার লগুড়ে মারা বিদ্যেও দেখবে। দেখতে পাবে। একটু অপেক্ষা করো। মস্কো বনাম পণ্ডিচেরি লেখাগুলো বেরুক না বই হয়ে ? তোমাদের গুরুদের কাউকে আর আস্ত রাখিনি—শ্রীঅরবিন্দ থেকে শুরু করে……।’ শুধু তাই নয়, বন্ধুকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে শিবরাম আসলে মনের কথা বলে ফেলেছেন, ‘আজকে না বুঝলেও পাঁচ দশ বিশ বছর বাদ আলবৎ আমি পাঠক পাব’। অথচ সেই শিবরামই প্রবন্ধের বইটির তৃতীয় সংস্করণ ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরি’র (১৩৫৯) ভূমিকায় রসিকতা করে বলেছেন, বইটি আসলে মস্কো নিয়ে পণ্ডিতি আর পণ্ডিচেরি নিয়ে মস্করা। অর্থাৎ শিব্রামীয় পরিসরে শিবরামের আত্মগোপনের প্রয়াস সেখানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অথচ আত্মজীবনীতে তাঁর পরিচয় স্ববিরোধিতার অবকাশ তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, লিখে প্রথম অর্থপ্রাপ্তির কথা নিয়েও শিবরাম পাঠককে স্ববিরোধিতায় ফেলে দিয়েছেন। সেই হকারবন্ধু রামকৃষ্ণকে তাঁর লিখে টাকা পাওয়ার কথায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠাটা তাই বিস্ময়কর হয়ে ওঠেঃ ‘না, কাগজ বেঁচতে হ্য় না এখন আর। আমি এমন একটা কাগজের সম্পাদক… মাস গেলেই শখানেক টাকা পাই। সেটা আমার মাইনে। তার পরে এধারে ওধারে লিখেটিখেও দু পাঁচ টাকা এসে যায়।’ অথচ ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’তেই শিবরাম গল্পলেখার জন্য আগাম টাকা পাওয়ার মধ্য দিয়ে হাসির জগতে পদার্পণের কথা ফলাও করে বলেছেন। সেদিক থেকে ‘মৌচাক’ (১৯৩৫)-এ ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’ গল্পটির সূত্রে প্রথম দক্ষিণা পাওয়ার বিষয়টি আপনাতেই প্রশ্নাতুর করে তোলে। তাঁর ‘টাকা ছাড়া কেউ লেখে নাকি এ বাজারে’র প্রশ্নই সে প্রশ্নের সূচিমুখে উঠে আসে। ফলে ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’ আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড’র জন্যই শুধু নয়, শিবরামের সাহিত্যজীবনের দ্বিধাবিভক্ত প্রকৃতির মূলে পৌঁছানোর সূত্রাধার হিসাবেও অপরিহার্য মনে হয়।

জীবনের ব্যর্থতার সোপানে তার সাফল্যের বুনিয়াদটি ফিরে দেখার মধ্যে আভিজাত্যবোধের পরিসরটি আরও আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে শিবরাম তাঁর শিব্রামীয় রাজপথটি প্রদর্শনে যেভাবে জীবনের খানাখন্দমুখর কাঁকর বিছানো পদে পদে কণ্টকিত দুর্গমপথের পরিচয় দিয়েছেন, তাতে যেমন সেই রাজপথের গরিমাবোধ সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে, স্বকীয় পথের স্বচ্ছন্দতাও তেমনই স্বাভাবিক মনে হয়। সেই গরিমাবোধের কথা ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় স্বতঃস্ফূর্ত্তায় উপাদেয় হয়ে উঠেছে। স্বচ্ছন্দতার কথা তখনও বাকি। কলকাতার মেসজীবনে শিবরামের সেই শিব্রামীয় পরিসরই‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ গতিলাভ করেছে। শুধু তাই নয়, জীবনে যা পেয়েছেন তাতেই তিনি তৃপ্ত ছিলেন, যা পাননি, তা নিয়ে তাঁর কোনো আফশোস ছিল না। সেই সহজানন্দ প্রকৃতির আশ্রয়ে ফিরে গিয়েছেন শিবরাম। অথচ সেই প্রাপ্তিযোগে মহত্ত্ব বিস্তারে তাঁর কোনো সক্রিয় উদ্যোগ নেই। খ্যাতনামা কৃতীজনদের পাশাপাশি বস্তির অন্তেবাসী মানুষ থেকে ফুটপথের নিরন্ন অসহায় বন্ধুরা মিলে সকলেই তাঁর অনাবিল জীবনের শরিক হয়ে উঠেছে। সেই অনামা-অচেনা মানুষের প্রাধান্য যেমন তাঁর অনন্যতাকে প্রকট করে তোলে, তেমনই তার আবেদনে উপন্যাসের আস্বাদ বয়ে এনেছে। শুধু তাই নয়, শিবরাম তাঁর ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশব্র’-এর শেষের দিকে ফুটপথের জীবনের স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছেন। সাধারণত আত্মজীবনী যেখানে পরিণতিকামী জীবনের উত্তরণের কথার সূত্রধরে সমাপ্তি লাভ করে, সেখানে শিবরাম আত্মস্মৃতি ফিরে গিয়েছে সাহিত্যজীবনের সূচনা পর্বে। তখনও তাঁর সংবাদপত্র ফেরি করার সংযোগ মন থেকে মুছে যায়নি। সেই একদা একসঙ্গে ফেরিকরা ফুটপথের বন্ধু মন্টু ওরফে রামকৃষ্ণর সঙ্গে শিবরাম তাঁর সংবাদপত্র হকারি করতে গিয়ে লেখক থেকে সম্পাদক হওয়ার কথায় ফিরে গিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাতে তাঁর আত্মজীবনীতে লেখকসত্তার উত্তরণের পরিচয়ের অভাববোধে ও আকস্মিক সমাপ্তিচেতনায় ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশব্র’-এর ভূমিকাটি পাঠকমানসকে প্রশ্নশীল করে তোলে। অথচ একটু সচেতন ভাবে দেখলে সেই প্রশ্নের উত্তর তাতেই লক্ষ করা যায়। শিবরাম স্বকীয় সাহিত্যপ্রতিভা সম্পর্কে আত্মসচেতন ছিলেন বলেই তিনি সাহিত্যের পথে আত্মপ্রতিষ্ঠায় সফলকাম হতে পেরেছিলেন। সেক্ষেত্রে তাঁর রঙ্গরসিক শিব্রামীয় মুখোশের আড়ালে ট্রাজিক মুখের প্রতিচ্ছবিকে তুলেধরার প্রয়াস চলুক না কেন, শিবরাম কোনোভাবেই তাতে সক্রিয় হয়ে ওঠেননি। শিব্রামই যে তাঁর সাহিত্যিক আত্মপরিচয়, তা কখনও বিস্মৃত হতে দেননি। শুধু তাই নয়, আত্মজীবনীতেও সেকথা নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন। জনাব সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে শিবরাম অকপটে জানিয়েছেনঃ ‘যারা নিজের দায় আর যুগের দায় একসঙ্গে মেটায়, সেই মহৎ স্রষ্টা মহারথীদের সগোত্র আমি নই। আমার কোনো দায় নেই—নিছক আদায়।’ অন্যদিকে ‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ বিভূতিভূষণের শিল্পিসত্তার পরিচয় সম্পর্কে যা বলেছেন, তা তাঁর সম্পর্কে আরও নিবিড়ভাবে প্রকট হয়ে ওঠেঃ ‘শিল্পকে প্রচ্ছন্ন রাখতে পারাতেই যেমন যথার্থ শিল্প, তেমনি নিজের ব্যক্তিত্বের মহিমাকে লুকোতে পারলেই শিল্পীর সত্যিকার বাহাদুরি।’ সেই ‘বাহাদুর’ শিল্পী স্বয়ং শিবরাম। তিনি নিজেকে বাংলা সাহিত্যের হাস্যরসের ধারায় শিব্রামের মুখোশে শুধু আত্মগোপন করেননি, সেইসঙ্গে সেই সাধনায় উদ্যোগী ভূমিকাও সৎসাহসে ব্যক্ত করেছেন।

‘ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এর সমসাময়িক পরিসরে ১৯৭৪-এ শিবরাম তাঁর শিব্রামীয় রচনাবলিকে পাঁচখণ্ডে সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছিলেন যা পরবর্তীতে ‘পুনশ্চ’ প্রকাশনা থেকে ১৯৯৯-এ পুনর্মুদ্রিত হয়। তার প্রথম খণ্ডে শিবরামের স্বহস্তে মুদ্রিত অভিব্যক্তিই তাঁর সচেতন সাহিত্যচর্চার পরিচয়টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেঃ ‘সার্কাসের ক্লাউন যেমন। সবখেলাতেই ওস্তাদ, কিন্তু তার দক্ষতা হোলো দক্ষযজ্ঞ ভাঙার। সব খেলাই জানে, সব খেলাই সে পারে, কিন্তু পারতে গিয়ে কোথায় যে কী হয়ে যায়, খেলাটা হাসিল হয় না ; হাসির হয়ে ওঠে। আর হাসিল হলেই তার খেলা হাসিল হয়। কিন্তু আমি তা পেরেচি কি! স্বীকারের ঔদার্যে যোগ্যতার উৎকর্ষই প্রতিপন্ন হয়। শিবরাম শুধু পারেননি, সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে তিনি আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন তাঁর আত্মপরিচয় নিয়ে। সাহিত্যে দ্বিজত্ব লাভে এজন্য তাঁকে ছদ্মনাম ধারণ করতে হয়নি। নিজের নামকেই বিকৃত করে স্বকৃত পথে সামিল হয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় প্রসঙ্গক্রমে শিবরাম জনাব সাহেবকে বলেছেন, ‘সাহিত্য জগতে দ্বিত্ব লাভ না করলে দ্বিজত্বলাভ করা যায় না’। শিবরাম দ্বিজত্বলাভ করেছেন স্বনামেই শুধু নয়, তার শূদ্রায়ণের মাধ্যমেও। সেই দ্বিজত্বের বিষয়টি নিয়ে শিবরাম কতটা সচেতন ছিলেন, তা বোঝা যায় ‘ভালবাসা ঈশ্বর পৃথিবী’-এর অন্তিম পর্বে। হকারবন্ধু মন্টুকে শিবরাম জানিয়েছেন ডাকনামে নামডাক হয় না। শুধু তাই নয়, বিখ্যাত কোনো নামে পুনরায় বিখ্যাত হওয়া সম্ভব হয় না। শিবরামের নিজের ক্ষেত্রেও তা স্বীকার করে নেন, ‘সেইজন্যেই তো ফেমাস্‌ হতে পারলাম না।’ সেই ‘ফেমাস’ হওয়ার জন্য রামকেষ্টও স্কুলের খাতায় নাম পাল্টে ফেলেছিল। ইতিমধ্যে তার মৃত্যু হয়। তার মাসদুয়েক পরে সেই স্কুলের ছাত্র বটুক এসেছিল কেষ্টরামের খোঁজে। সেই রামকেষ্টই যে কেষ্টরাম হয়েছে, তা অবশেষে শিবরাম জানতে পারেন। সেইসঙ্গে তিনিও পাঠককে জানিয়ে দেন রামকেষ্টের মৃত্যুশোকে বটুকের কালো মুখে সময়ান্তরে ‘আলোর ঝিলিক’ এসে পড়ে ‘যাই, হেডমাস্টারকে মশাইকে বলি গে, ইস্কুলের বেস্ট বয় ছিল সে—পড়াশোনা খেলাধূলায় সবদিকেই চৌকস। একদিন স্কুলের ছুটি পাওয়া যাবে নিশ্চয় তার জন্যে।… আর, আজও হাফ হলিডে।’ তার অব্যবহিত পরিসরেই শিবরাম জানিয়ে দেন, ‘বটুকের মুখ আবার টুকটুক হয়ে ওঠে। এবং প্রায় লাফাতে লাফাতেই সে চলে যায়।’ আসলে এভাবে তেতাল্লিশটি অধ্যায়ের শেষে শিবরামের তুলির শেষ আঁচড়েই তাঁর শিব্রামের ভাববিগ্রহটি স্বমূর্তি লাভ করে। সেখানে শোকের চেয়ে ছুটির বাস্তবতাই প্রকট। শিবরাম জানতেন পাঠক তাঁর মধ্যে শিব্রামকে খোঁজে, দেখে থাকে, পেতে চায় এবং সেটাই বাস্তব সত্য। তিনিও আপনা থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। শোকের চেয়ে ছুটিটাই বাস্তব এবং আবেদনক্ষম। এবং শিবরাম তাঁর আত্মজীবনীতে শিব্রামের জীবনী রচনাই তাঁর লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। সেই লক্ষ্যে তিনি অর্জুনের সাফল্য পেয়েছেন। নিজের জীবনকেও সেই লক্ষ্যে শৈল্পিক সত্তায় সঁপে দিয়েছেন। শিবরাম ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’য় বলেছেন, ‘আমি চাই আমি হতে।’ ‘পান’ সম্রাট শিব্রাম এসে হয়তো বলবেন ‘আম’ই তো হয়েছি। কাঁচায় অম্লমধুর, পাকায় রসে টইটুম্বর। ‘দেওয়ান-ই-আম’ তথা আমজনতার দরবারে তো শিব্রামের অবাধ সমাদর। শিবরাম তাঁর আত্মজীবনীতেও শিব্রামের স্থায়ী আসন পাকা করে তুলেছেন। এরকম বিচিত্র প্রকৃতির আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্য তো বটেই, পৃথিবীর সাহিত্যেও বিরল মনে হয়।

স্বপনকুমার মণ্ডল প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev