| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৌমেন দেবনাথ-এর ছোটগল্প ‘বুড়ো সঙের ভীমরতি’

Reporter
সৌমেন দেবনাথ / ৭১০ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১০ মে, ২০২৩

দেহের বয়স বাড়লেও মনের বয়স বাড়ে না। তাই বয়স গেলেও খায়েশ যায় না। খরস্রোতা নদী স্রোত হারালেও বয়েসী মানুষ আয়েশী চাওয়া থেকে পিছপা হয় না। নিজেকে নিয়ে ভাবনা থাকলেও অন্যকে নিয়ে ভাবনা পুরাতন হয় না। তারুণ্য দেখে ভালো লাগা কমেই না। তারুণ্য জোয়ার সামনে এলেই ছানিপড়া চোখেও সুন্দর দেখা যায়। সেই যৌবনের চাওয়া যেমন রঙিন ছিলো বার্ধক্যে এসেও তেমনটিই আছে। মনের কথা মনেই থাকে, মনের মধ্যে কতই কথা। মন হয় না জীর্ণ, রঙিন তেমনই যেমন ছিলো বয়স কালে। জীবনে গোধূলি বেলা নামে, মনে গোধূলি বেলা বলে কিছুই নামে না। বুদ্ধি পেকে পচলেও মনের চাওয়া কমে না।

অশীতিপর মান্নান সাহেব বিপত্নীক নন, মহিলা দেখলেই রসিয়ে রসিয়ে কথা বলেন। বয়স্ক মানুষ বলে তাঁর কথা কেউ গায়ে মাখে না। আদিলের মেয়েকে সেদিন দেখেই বললেন, দেখতে তো ডাগর হয়েছিস, শাড়ি পরা শেখ্। শাড়ি পরলেই পিছে পিছে ছুটবে মন ভ্রমর।

মান্নান সাহেবের কথা শুনে খিলখিল শব্দে হাসে আদিলের মেয়ে টুনি। মান্নান সাহেব আবার বলেন, দেখতে ডাগরদের নাগরের অভাব হয় না।

টুনি আবার হেসে নেয়। তারপর বলে, কুড়ির পেছনে কুড়ি থেকে আশি সবাই ঘোরে, নিজেদের পুরুষ দাবি না করে ভেড়া-ছাগল দাবি করা উচিত।

মান্নান সাহেব শকুন চোখে চেয়ে বলেন, পুরুষ লোহার অস্ত্র না যে মরীচা ধরবে, ধার কমবে, শান দিতে হবে। পুরুষ মানেই ঝাঝালো, শুরু থেকে শেষ।

টুনি মান্নান সাহেবের ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল কথাতে হতবাক বা বিরক্ত না হয়ে হালকা করে নিলো আর বললো, মানুষ শক্তির পক্ষে, ক্ষয়ের বিপক্ষে। মানুষ ঘাটের মাঝির পক্ষে যে বিক্ষুব্ধ নদীতে দাঁড় শক্ত করে ধরতে জানে, ঘাটের মরার পক্ষে না।

এই বলে টুনি চলে গেলো। মান্নান সাহেব টাক মাথায় হাত বুলিয়ে ভাবতে থাকলেন, মাছ ধরতে গেলে এমন মোচড় না মারলে কি মাছ ধরে মজা আছে?

বাড়ি ফেরার পথে রাজনের বৌর সাথে দেখা মান্নান সাহেবের। রাজনের বৌকে দেখেই বললেন, কুচিয়ে শাড়ি পরবি, স্বামী সোহাগ বাড়বে। স্বামীকে বশে রাখতে তোর সাজগোজের বিকল্প নেই। তার চোখে তুই যদি সুন্দর না হোস, তোকে সে সুখ দেবে কোন দুঃখে?

হঠাৎ এমন কথা শুনে রাজনের বৌ আশ্চর্য হয় ও ভীষণ লজ্জায় আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। মান্নান সাহেব আবার বলেন, আগুন জ্বালাতে শিখতে হবে- ঘরে না, মনে। জ্বলতে শেখ্, না জ্বললে জ্বালাবি কীভাবে? নেতিয়ে পড়া লতায় ছাগলও মুখ দেয় না।

লজ্জায় আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো রাজনের বৌ। সে দ্রুত হেঁটে কেটে পড়তে চাইলো। মান্নান সাহেব তারপরও রাজনের বৌকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকলেন, স্রোতের নদীও থেমে যায়। একটু বায়ু পেলে তাই নাচতে নেই। কত কত খরস্রোতা নদী মরে গিয়েছে তার ঠিক নেই। বর্ষায় নদী বুক ফুলিয়ে চলে, গ্রীষ্মে তার দশা নামে। বেশি চাহিদা পেশ করে করে রাজনকে মারিস না।

রাজনের বৌ ফিরে দৃঢ়কণ্ঠে বললো, আপনি একজন লম্পট।

মান্নান সাহেব বললেন, মিথ্যা। আমি তারুণ্যের জয়গান করি অকপটে। জোয়ার দেখলেই উচ্ছ্বসিত হই। জলোচ্ছ্বাস দেখলে আমার পুলক জাগে। গগন দেখি না আগুন দেখলে। পাথর হয়ে যাই পাবক দেখলে।

রাজনের বৌ শব্দ উচ্চারণ করে বলতে পারলো না, তাই গুণগুণ করে বলতে বলতে চলে গেলো, বেহায়া বুড়ো।

আর একদিনের ঘটনা। পাশ কেটে চলে যাচ্ছিলো আব্বাসের বৌ। খুব ধীরেই হাঁটছিলো, যেন বার্ধক্য ধরেছে। সূক্ষ্ম চোখে দেখে মান্নান সাহেব বললেন, কী হলো, রসহীন লতার মতো নেতিয়ে যাচ্ছিস যে! সাপ ফোঁসফোঁস না করলে কী বেজি তার সাথে যুদ্ধে নামবে?

আব্বাসের বৌ দ্রুত হেঁটে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলো। জোরে জোরে শুনিয়ে মান্নান সাহেব বললেন, সবল হয়ে উঠতে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। সবল হরিণকেই বাঘ ধরে, বুঝতে হবে। চিতাবাঘ কখনো রুগ্ন হরিণের সাথে দৌঁড় যুদ্ধে নামে না।

আব্বাসের বৌ ফিরে বললো, বয়স হলো হুশ হলো না, দোষ গেলো না। ঠোঁটের দোষে মেরুদণ্ড যায়, মরলেও বুঝবেন না, নির্লজ্জ বুড়ো।

মান্নান সাহেব বিস্ময় নিয়ে বললেন, দেখে লাগে রুগ্ন, কণ্ঠ দেখি বজ্রাস্ত্র। অবয়বে নেই তেজ, ঠোঁট দেখি করাতকল। নগণ্য যদি অতি কথা কয়, সেটা হয় উৎপাত। অগ্রগণ্যের উৎপাত মিষ্টি সুবাতাস।

এভাবে পথে-ঘাটে গ্রামের মেয়ে থেকে মহিলাদের বৃদ্ধ মান্নান সাহেব নানান অশোভন কথা বলেন। পরের দিন রাজন এসে ধরলো, আঙ্কেল, বয়স কত হলো?

মান্নান রেগে বললেন, আমার বয়স জানতে হবে না, তোর বয়স কত? বৌ বাইরে ছটফট করে কেন? ঘরে সন্তুষ্টি থাকলে কেউ বাইরে এসে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে না। সুন্দরী বৌগুলো বাইরে এসে সুন্দর ছেলেদের সাথে মেশে না, কারণ বর অসুন্দর হলেও সক্রিয়।

রাজন এদিক-ওদিক চেয়ে দেখলো এসব কথা কেউ শুনলো কিনা। তারপর বললো, সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়েও তো বৌর মন পাচ্ছি না। জীবনের মধ্য দুপুর আমার, রৌদ্রের তেজ কি কম? আমি যদি পাই তৃপ্তি, তার না তৃপ্তির কারণ কী?

মান্নান সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে বললেন, সবলদের দুর্বল করার উপায় তাকে বারবার দুর্বল বলা। সেই বুদ্ধি প্রয়োগ করছে তোর বৌ। এবার তার ত্রুটি ধর্ তুই, তার ত্রুটি না থাকলেও ত্রুটি ধরা শেখ্। ত্রুটি না ধরলে শক্তি দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারবি না। বারবার বলে বলে বোঝা তার থেকে তুই সুখ পাচ্ছিস না।

রাজন আবার এদিক-ওদিক চেয়ে ফিসফিস করে বললো, ত্রুটি ধরবো মানে? ত্রুটি ধরলে তাকে দমন করতে পারবো?

মান্নান সাহেব বললেন, অবশ্যই। তাকে বলবি তোমার মাথার চুল ভালো না, দুর্গন্ধে মোড়া। হাতের আঙুল শিশুদের মতো ছোটো ছোটো। হাতে লোম, পায়ে লোম। নাক দেখতে দৃষ্টিকটু। চোখে নেই মায়া। দুর্দমনীয়কে দমন করতে হলে নিন্দা করতে শিখতে হবে। নিন্দা করে করে মনোবল ভেঙে দিবি। তোর বৌ তোকে বোগলদাবা করে ফেলেছে তুই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারছিস না এই বলে বলে। এবার তোর পালা, তুই যে তার থেকে সন্তুষ্টি পাচ্ছিস না, তৃপ্তি পাচ্ছিস না, বুঝিয়ে দে।

বুদ্ধিটা রাজনের মাথায় খেললো। সে ডাক্তার-কবিরাজের কাছে না গিয়ে মান্নান সাহেবের বুদ্ধি প্রয়োগ করতে বীর সেজে গৃহে প্রবেশ করলো।

দুদিন পরেই আদিলের মেয়ের সাথে আবার দেখা হলো মান্নান সাহেবের। আজ সে শাড়ি পরেছে। প্রশংসা না করে পারলেন না মান্নান সাহেব। বললেন, একেই বলে অষ্টাদশীর রূপ। দেখলেই মনে ঝড় বয়ে যাবে যে কারোরই। যাস্ কোথায়? যেদিক যাবি শো শো বেগে ধেয়ে আসবে ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্র।

বয়োবৃদ্ধ মানুষের মুখ থেকে এমন কথা শুনে টুনি মিটিমিটি হাসে। তা দেখে মান্নান সাহেব বলেন, বল্লম দিয়ে সেনা ঘায়েল করা যাবে, এমন হাসি দিয়ে সেনাপতিকেও ঘায়েল সম্ভব।

হাসি আটকানোর চেষ্টা করে টুনি চলতে থাকে। মান্নান সাহেব বলেন, এখনই তো বয়স, একজন মনের মানুষ দরকার যে জীবনকে রাঙিয়ে দেবে। অভুক্ত থাকলে রঙিন পোশাকেও কিন্তু মন ভরবে না।

টুনি বলে, আপনি বলতেও জানেন। দহন বাড়ানো কথা জানেন। চুল পেকেছে, পাকেনি মন, মন একেবারেই কাঁচা।

তারপর টুনি মনে মনে বলে, বখাটে বুড়ো, পথ আটকে বেফাঁস কথা বলিস? এমন ভেলকি দেখাবো ভোঁ ভোঁ করে ঘুরবি।

তারপর মুখে বললো, ঘরনি কি পান বেটে দেন না? ঘরনি কি পান বেটে খান না? লাল ঠোঁটে আর হাসেন না? মরুভূমি দেহে তাঁর কি মরুভূমি মন?

মান্নান সাহেব বললেন, বিরিয়ানি পেলে মানুষ ভাত ভুলে যায়।

টুনি আড়চোখে চেয়ে বলে, বিরিয়ানি মানুষ সব সময় খেতে পারে না। প্রয়োজন ভাতই। ভাতে সন্তুষ্টি, বিরিয়ানিতে অতি সন্তুষ্টি। অতি সন্তুষ্টিতে বমি।

মান্নান সাহেব বলেন, মানুষ ভাতের প্রশংসায় করে, বাস্তবে মানুষ বিরিয়ানিই খোঁজে।

টুনি লজ্জার হাসি হেসে হাঁটতে থাকে। পিছু নেন মান্নান সাহেব। বলেন, বটবৃক্ষ যত বৃদ্ধ হয় তত ছায়া দেয় বেশি, প্রশান্তি দেয় বেশি, তত বায়ু তৈরি করে, তত সজীব-সুন্দর হয়। মন হয় আরও বড়ো, আরও বিশাল।

টুনি না দাঁড়িয়ে যেতে যেতে বলে, আমি জানি, চন্দ্রবোড়া সর্প বুড়ো হয়, কিন্তু তার বিষ কখনো কমে না। দ্রুত হজমশীল খাদ্য খোঁজে না, আহার থাকে সেই আগের মতো একই।

বেশ খুশি মনে মান্নান সাহেব টুনির কথা শুনে বলেন, জমি আছে, ঘর আছে, ব্যাংকে টাকা আছে।

টুনি থেমে গাল ফুলিয়ে বলে, আমার কড়ি লাগবে না, আমার মন লাগবে।

মান্নান সাহেব শকুন চোখে চেয়ে বলেন, কড়িও দেবো, মনও দেবো, আমার লাগবে গরম ভাত।

টুনি কৌণিক চোখে চেয়ে বলে, দশ টাকা প্লেট গরম ভাত। হোটেলে যান।

টুনি দ্রুত হাঁটতে থাকে। আজ আর সময় দেবে না সে। মান্নান সাহেব দ্রুত হেঁটে টুনিকে ধরার চেষ্টা করে, টুনি বলে, বটগাছ একবার পড়লে জীবনাবসান হয়। ধীরে হেঁটে বাড়ি যান। ঘরনির হাতের রান্না খান।

মান্নান সাহেব বলেন, পান খাবো না। পান খাওয়ার বয়স আমার আসেনি।

এই বলে তিনি পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটি নোট বের করে টুনিকে দিতে চাইলেন। দেখে টুনি বললো, পয়সা দিয়ে গণিকার সময় কেনা যায়, পয়সা দিয়ে টুনির মন পাওয়া যায় না।

মান্নান সাহেব আরও দুই হাজার টাকা যুক্ত করে টুনিকে দিতে চাইলেন। টুনি নিলো না, বললো, যৌবন ভাঙিয়ে পকেট ভরাট আমার কাজ না। বলেছি তো আমার দরকার মন, আমার দরকার হৃদয়। আমার হৃদয় সস্তা নয়।

মান্নান সাহেব বললেন, তুমি সস্তা হবে কেন? তুমি দামি। সস্তা জিনিস খোলা থাকে, তাতে মাছি বসে।

টুনি রিক্সায় ওঠে আর বলে, তুই থেকে তুমি, বুড়োর কত ভাঁড়ামি! বাইরটা দেখা যায়, ভেতরটা বোঝা যায়; দুটো আবরণেই কদর্য আছে আপনার।

মান্নান হেসে বলেন, নৈবেদ্য যত দামিই হোক, যত সুন্দরই হোক খাদকের পেটেই যায়। ফোয়ারা জলে ভিজবে, না ভিজবে মগের জলে সিদ্ধান্ত নিও।

টুনি ভীষণ অসন্তুষ্ট প্রকাশ করে চলে গেলো। মান্নান সাহেব মনে মনে বললেন, তেজ কী! তেজের গন্ধও সুগন্ধময়!

রাগাগ্নি মুখে সামনে এলো আব্বাস। আর বললো, আমার বৌকে পথে-ঘাটে দেখলে যা-তা বলেন কেন? ভীমরতিতে ধরেছে? এক পা কবরে…

মান্নান হাত দুটি উচিয়ে আব্বাসকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন, বৌ তো আর বৌ নেই, হয়ে গিয়েছে শীতে ধরা মাঘের সাপ। বৌর যদি না থাকে বাড়াবাড়ি, কীভাবে হবি তুই প্রবল? মৌন নদীতে সাঁতার কেটে সাঁতারু মজা পায় না।

আব্বাস ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, মুখের লাগাম টানেন। বয়স গিয়েছে বোধ ফেরেনি। বয়স গিয়েছে বয়স কালের বদমাশি যায়নি। বৃদ্ধ হয়েছেন, প্রগলভ উচ্চারণ কমেনি। শরীর চলে না, কিন্তু ঠোঁট চলে সবেগে।

মান্নান সাহেবের রাগ উঠলেও না রেগে বলেন, বৌর ভেতর তো চটক নেই, কিন্তু তোর তো চাঞ্চল্যের শেষ নেই। যে জীবনে খামামা, তাকে নিয়ে দামামা বাজাবি কীভাবে? আমি তো জানি তুই হিংস্র শ্বাপদ, কিন্তু তোর ঘরে তো অস্তমিত সূর্য। ঘর করিস কার সাথে? উত্তাপ না পেলে উপ্তপ্ত হোস কীভাবে? যে নদী হারায় স্রোত সে নদী আর ফেরে না বর্ষায়ও।

কথায় হেরে ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে আব্বাস চলে যাচ্ছিলো। মান্নান সাহেব বললেন, সেচ না দিলে খরায় খাক ক্ষেতে সবজি ফলে না।

আব্বাস ফিরে বলে, আপনার মতো জঘন্য, নির্লজ্জ গ্রামে আর দ্বিতীয়টি নেই।

একটুও রাগ না করে মান্নান সাহেব বললেন, কার্পণ্য কমিয়ে ফেল্, বাজার কর্। পুষ্টিকর খাবারে শক্তি ফেরে, তুই শক্তি ক্ষয়ের জায়গা পাবি। তৃষ্ণায় জল খাবার না পেলে উচ্ছ্বসিত হতে পারবি?

মান্নান সাহেবের এই সব ভাঁড়ামি তাঁর বৌ, ছেলে-মেয়ে জেনে গেলো। আজ বাড়ি ফিরতেই তাঁর বৌ তাঁকে ধরলেন। বললেন, তোমার দোষ তোমার বয়স গেলেও গেলো না। পশু কখনো মানুষ হয় না।

মান্নান সাহেব রেগে বললেন, ঘরে মানুষ শান্তি না পেলে মানুষ শান্তি খোঁজে বাইরে।

মান্নান সাহেবের বৌ বললেন, স্বভাব তোমার জন্তু-জানোয়ারের। বয়স বাড়লে মানুষের ওজন বাড়ে; কথার ওজন, বিবেকের ওজন। আর তোমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে হয়েছো ততোধিক লম্পট। তোমার এখন বিচার করার বয়স, আর তোমার বিরুদ্ধে আসে নালিশ। তাও সব জঘন্য নালিশ। বুড়ো বান্দরের জন্য মুখ দেখাতে পারি না। এসব যে করে বেড়াও, তোমার দৌঁড় আমি জানি না? তোমার দৌরাত্ম্য শুধু ঠোঁটে; ঠোঁটের বাক্যে, অশ্লীল উচ্চারণে। বয়স বাড়লে মানুষ সভ্য হয়, আর তুমি হয়েছো অসভ্য। তোমার সন্তানরাও গ্রামে মুখ দেখাতে পারে না।

মান্নান সাহেব বলেন, বয়স বাড়লে মানুষ ফুরিয়ে যায় না, তুমি ফুরিয়ে গিয়েছো। আমার এখনো উপভোগের অনেক বাকি। পতনের সাথে উত্থানের মাখামাখি নেই।

মান্নান সাহেব চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন। আদিল ছিলো চায়ের দোকানে। মান্নান সাহেবকে দেখতে পেয়ে ডেকে একপাশে নিয়ে বললো, বানর বুড়ো হলেও গাছে উঠে, মানুষ বুড়ো হলে সভ্য হয়। আপনি মানুষ হবেন কবে?

মান্নান সংকোচে সংকোচে বললেন, আপনার মেয়ের রঙিন প্রজাপতির বর্ণবৈভবা মনের চঞ্চলতায় আমি মুগ্ধ। তার কণ্ঠস্বর, হাসি, কথা বলার ধরন সবই আমাকে বিপুল আনন্দ দেয়। একরাশ ঘনকালো চুল, ছিপছিপে তন্বীদেহ খুব আকুল করে।

প্রচণ্ড রেগে গেলো আদিল। বললো, আজ গেলে কাল মরবেন, বয়সটা খেয়ালে আছে উল্লুক?

মান্নান সাহেব বললেন, পুরুষ কি পুরাতন হয়? পুরুষ মানেই নতুন, নবীন, নান্দনিক।

আদিল বললো, আমার মেয়ের সাথে আর কথা বলবেন না। বখাটেপনা করার বয়স কি আছে আপনার?

মান্নান সাহেব আদিলের কানের কাছে এসে বললেন, আমি কিন্তু নিঃস্ব নই, না শক্তিতে, না সম্পদে।

আদিল পূর্বাপেক্ষা রেগে বললো, লোভ দেখাবেন না, লোভে পড়ে মেয়ের জীবন নষ্ট করবো?

মান্নান সাহেব বললেন, মেয়ের সুখের চিন্তা বাবা-মা না করলে কে করবে? মেয়ের ভবিষ্যৎ বাবা-মা নষ্ট করে না। যৌবন ছাড়া জীবন চলে, সম্পদ ছাড়া জীবন চলে না।

আদিল চমকে উঠে মান্নান সাহেবকে ভালো করে একবার দেখলো। তারপর মান্নান সাহেবের সম্পদের বিশালতা একবার ভাবনায় আনলো।

দুইদিন অপেক্ষার পর টুনির দেখা পেলো মান্নান সাহেব। দেখেই খুশি মনে বললেন, কি দারুণ তুমি?

টুনি হেসে বলে, শারীরিক সৌন্দর্য দেখতে হয় না, দেয় ধোকা, দেয় ধাঁধা। সৌন্দর্য মুখে নয়, মনে। সৌন্দর্য মুখে নয়, সৌন্দর্য হলো হৃদয়ের আলো। মুখ দেখে সৌন্দর্য খুঁজতে হয় না, মন দেখে সৌন্দর্য খুঁজতে হয়।

মান্নান সাহেব অভিজ্ঞ মানুষের স্বরে বললেন, চেহারায় তো আগে দেখতে হয়, হৃদয়েশ্বরী।

টুনি কাঁচাকণ্ঠে পাকা কথা বললেন, চেহারায় যে শূন্য, মন-মননে সে হয়তো পরিপূর্ণ।

মান্নান সাহেব বলেন, বাস্তবতার কাছে আবেগীয় কথা তুচ্ছাতিতুচ্ছ। আবেগ বেশি থাকলে অসুখী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হবে।

টুনি বলে, তাই বলে মিথ্যা নাটকের অংশ হওয়ার অর্থ কী? মিথ্যা নাটকের অংশ হলে জীবন তো শেষ। একটি মায়াময় হৃদয়ের সান্নিধ্য পেলে সব পাওয়া হয়।

তা শুনে মান্নান সাহেব রসিয়ে রসিয়ে বললেন, উঠতি বয়স তোমার, চেহারা দেখে মুগ্ধ হওয়ার স্বভাব। চেহারা দেখে ঠকতে পারো, ব্যক্তিত্ব দেখলে ঠকবে না। মোহের চোখে সবাই চাই, আমি চাই মনের চোখে। মোহের চোখের চাহিদায় চেহারা প্রাধান্য পায়, মনের চোখের চাহিদায় চেহারা নয়, মনই প্রাধান্য পায়।

টুনি হঠাৎ রেগে বললো, জীর্ণ যেজন জয় করবে কীভাবে? ঘাটের মরার আবার শখ! নড়তে পারেন? দৌঁড়ানোর চিন্তা যে করছেন?

মান্নান সাহেব হেসে বলেন, পুরুষের শরীরে একবার যৌবন এলে মরার আগে তা আর যায় না।

টুনি আশ্চর্য হয়ে বললো, আপনার আর আপনার ছেলের মধ্যে দৌঁড় প্রতিযোগিতা দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নেবো।

টুনি এই বলে চলে যাচ্ছিলো। মান্নান সাহেব জানেন আধুলি লোভে ব্যাঙও হাতির নাকের ডগায় উঠে। আর তাই পথ আগলে টাকা বের করে বললেন, এই নাও পাঁচ হাজার টাকা।

টুনি বললো, অনেক টাকা, বেশ্যাদের কাছে যান।

মান্নান এবার জমির দলিল বের করে বললেন, এক বিঘা।

টুনি বললো, স্তিমিত সূর্যের কাছ থেকে কোনো পাওয়ায় পাওয়া নয়। রিক্তের সাথে কেউ যুক্ত হয় না।

মান্নান রেগে বললেন, কে বলেছে আমি রিক্ত? আমার সম্পদও অঢেল। আমার যৌবন সূর্য স্তিমিত নয়, ঊষালোকের মতো উদিত, ক্ষিপ্র। তুমি শুধু স্পর্শ নাও, পাবে স্বাদ অনন্য, যুবকের মতো আমিও লুট করতে পারি।

টুনি বলে, এই বয়সে আপনার ভালো থাকাটা জরুরি। নিজের ভালো থাকার কারণ নিজেকেই খুঁজতে হয়। আর সেটা এখন বিয়েতে পাবেন না, পরিবারের সবার সাথে মিশে থাকেন। শেষ বেলাতে জাগা ক্ষুধা মুহূর্তেই কমে যাবে। প্রয়োজনটুকুর পরেই বিরক্তি লাগবে। শরীরের ক্ষুধা পাঁচ মিনিটে শেষ, জীবনের ক্ষুধা জীবনভর থাকে। গৃহে যান।

মান্নান সাহেব নিঃসঙ্কোচে বললেন, বাইরেই রুচি, ঘরেতে ফেরার রুচি নেই।

টুনি আবার বলে, আপনি খুব খারাপ।

মান্নান সাহেব বলেন, আর তাই আমার শাসনের ভার তোমায় দিতে চাই। তোমার শাসন পেলে হয়ে উঠবো শান্ত, ভদ্র।

টুনি বলে, ঘুণপোকায় খেয়ে ফেলা কাঠ দেখতে শৈল্পিক মনে হয়, কিন্তু ঘর শেষ হয়ে যায়। ঘুণপোকায় খাওয়া ঘরে বুঝে-শুনে কেন যাবো?

মান্নান সাহেব বিরক্ত হয়ে আবার বলেন, বাতিল সারির বস্তু নই আমি।

টুনি রাগতস্বরে বলে, আপনি খুব উগ্র, খুব বেহায়া।

মান্নান সাহেব না রেগে বলেন, কিশোরী তো, বাস্তবতা জানো না। মন কলাপাতার মতো, একটু জলে ভেজে, একটু রোদে শুকায়। সুখ বুঝলে হাত বাড়াতে। বয়সটা একটু বেশি বলে আমার মায়ার মূল্য দিলে না। বয়স বেশি বলে মনের চাওয়ার গুরুত্ব দিলে না। বয়সটা একটু বেশি বলে ভাবনাতেই নিলে না।

অভিমান করে মান্নান সাহেব বাসায় চলে গেলেন। মন ভার করে বাড়ি এলো টুনি। আদিল মান্নান সাহেবের প্রস্তাবটি মেয়েকে অনেকবার চেষ্টা করেও বলতে পারলো না। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভাবতে গিয়ে মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চাইলো না। একজন সুস্থ সঙ্গী সাথে থাকা হাজার সম্পদ থাকার চেয়েও সুখের। সমাজের চোখে হেয় হওয়ার চেয়ে অভাবে থাকা শ্রেয়।

এরপর তিন থেকে চারদিন পর মান্নান সাহেব টুনিদের বাড়ি এলেন। আদিল মান্নান সাহেবকে বের করে দেওয়ার জন্য হৈ-হট্টগোল করলো। আর তাতেই আশপাশ থেকে অনেক মানুষ জড়ো হলো। সবাইকে মান্নান সাহেব বললেন, টুনি এখন আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না। আমার সাথে প্রেম করেছে, টাকা নিয়েছে। অঢেল টাকা।

টুনি ঘর থেকে কেঁকিয়ে বললো, মিথ্যা। উনি আমাকে চলার পথে কুপ্রস্তাব দিতেন। তাঁর চারভাগের এক ভাগ বয়স আমার, তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল প্রস্তাব আমি মজার ছলে নিতাম। কিন্তু তিনি এভাবে জবরদস্তি করবেন কল্পনাও করিনি।

গ্রামের মানুষের শোরগোলে টুনির কথা চাপা পড়ে গেলো। শোরগোল পড়ে গেলো গ্রাম থেকে গ্রাম্য বাজার, সবখানে। পরদিন স্থানীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশ হলো “আশি বছরের বৃদ্ধের সাথে কুড়ি বছরের তরুণীর প্রেম, অতপর…”।

রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ থেকে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev