| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

তথ্যচিত্র ছোটগল্প লিখেছেন নলিনী বেরা

Reporter
নলিনী বেরা / ৭৩৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

ট্রেন থেকে নেমেই প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে ষ্টেশন চত্বরের বাইরে এসে একটা চায়ের দোকানেই বসল ওরা দুজন। সুনীপ আর রূপা। ঝকঝকে দু’জন তরুণ-তরুণী। সঙ্গে লট-বহর।

বাতাসে শীতের আমেজ। মাঠ থেকে সব ধান প্রায় উঠে এল বলে। মফঃস্বল শহরের এই চায়ের দোকানে তাই এখন রাজা-উজীর মরামারির গল্প। সুনীপ-রূপা চায়ের দোকানে ঢুকে বেঞ্চিতে বসতেই সে গল্প কিছুক্ষণ থেমে থাকল।

কী খাবি?

রূপা বলল, স্রেফ চা।

দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিল সুনীপ।

ফের গল্প শ্তরু হল। ওরা গল্প করছিল কখনো গ্রেগ চ্যাপেল-সৌরভ গাঙ্গুলী নিয়ে, কখনো বুশ-লাদেন-সাদ্দাম হোসেন নিয়ে। তাদের ভিতর একজন খুবই চুপচাপ, চিন্তিত। শ্তধুই বিড়ি টানছিল।

একটুবাদে উঠেও গেল।

উঠলে ভৈরব?

হুঁ যাই, এই নিয়ে সাতদিন হল

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরণের জামা-প্যান্টও ততোধিক ময়লা। উঠে যেতেই চায়ের দোকানী বলল, ভৈরবের রাইস মিলের গেট বন্ধ আজ সাতদিন! নেট ওয়ার্ক নো পে। বযলার ফেটে একটা একটা লেবার মরেছে। মিল মালিক হাজতে।

সুনীপ-রূপা গন্ধ পেয়ে গেল খবরের। চায়ের দাম মিটিয়ে পড়ি-কি-মরি ছুটল ভৈরব নামের লোকটার পিছনে।

শুনুন।

হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়ল ভৈরব। চেনা চেনা লাগছে। কোথায় আপনাদের দেখেছি বলেন ত?

‘এই ত একটু আগে চায়ের দোকানে।’

‘তাই বলেন।’ ফের বিড়ি ধরাল ভৈরব। চুপচাপ, চিন্তিত, চিন্তিত।

কোথায় বাড়ি আপনার?

‘মাধবডিহি।’

নাম-ধাম নোটবুকে টুকে সুনীপ-রূপা বলল, কাল আপনার বাড়ি যাব আমরা।

আপত্তি নেই ত?’

ভৈরব হাসল।

পরের দিন। কাঁধে ক্যামেরা, ব্যাগে তৈজস টুকি-টাকি। সুনীপ-রূপা চলল মাধবডিহি। ভৈরব দাশের বাড়ি।

নামী কাগজ ‘নতুন হাওয়া’র দুই তরুণ সাংবাদিক। ভাড়া করা গাড়ি শহর ছাড়িয়ে নদী নদী-ব্রিজ পেরিয়ে ছুটল মাধবডিহির দিকে।

চারধারে ধান, চষা-চষা ধানক্ষেত। আর শ্তধু চালকল। চালকল, চালকল। চিমনি নিয়ে ধোঁয়া উঠছে। কে জানে এমনি কোনো একটা চালকলে ভৈরব দাশ কাজ করত। আজ সে কলে তালা ঝুলছে।

সুনীপ হঠাত্ বলল, ‘‘দ্যাখ্‌ রূপা-’

‘কী ?’

‘ঐ যে রাইস মিল-’

‘হুঁ?’

‘ঐইটাই হয়ত ভৈরব দাশের-’

‘রাইট সুনীপ, ধোঁয়া উড়ছে না, বন্ধ!’

‘ধর বয়লার ফেটে যে লেবলরটা মারা গেছে সে না হয়ে যদি ভৈরব দাশ-ই মারা যেত?’

‘চুপ কর সুনীপ, কী যা-তা বলছিস্‌!’

‘নাঃ বলছি এই কারণে যে- শ্রমিকদের জীবন কতটা ইন্‌সিকিওরড্‌! আর বলছি এই জন্য যে- আজ তা হলে ভৈরব দাশের পরিবর্তে ঐ লোকটারই বাড়ি যেতাম আমরা।’

রূপা বলল, ‘হ্যাঁ, মাধবডিহি না হয়ে হয়ত যেতাম যাদবডিহি।’

ফের চুপচাপ। বাঁয়ে নদীর বালি খাদান থেকে ট্রাক্টর-কাম-লরি করে বালি আসছে। বালির লরি পারাপারের জন্য নদীর উপর অস্হায়ী সাঁকো। কালো কালো মানুষগুলো সাঁকোয় উঠছে নামছে।

মাধবডিহি গ্রামটি ভাড়া-গাড়ির ড্রাইভারের চেনা। প্রায় আধঘন্টার ভিতর সে সুনীপ-রূপাকে পৌঁছে দিল সেখানে। বর্ধিষ্ণু গ্রাম। ক’ঘর পাকাবাড়িও আছে। তবে ভৈরব দাশের বাড়ি গ্রামের সেই একপ্রান্তে।

গাড়ি ঢুকতেই কৌতুহলী মানুষজনের ভিড়। চোখাচোখি। তার ভিতর একজোড়া কুটিল চোখ যেন সুনীপ-রূপাকে গ্রামে ঢোকার পর থেকেই ফলো করছে।

তার উপর গ্রামে এত তাবড় তাবড় লোক থাকতে হেঁজি-পেঁজি গরীবগুর্বো ভৈরব দাশকেই খোঁক করছে জেনে লোকটা হাতের আধপোড়া সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে এগিয়ে এল।

বকের মতো গলা উঁচিয়ে জানতে চাইল, ‘কাকে খুঁজছেন?’

‘ভৈরব দাশকে।’

‘কোত্থেকে আসা হচ্ছে?’

‘নতুন হাওয়া’ খবর কাগজের অফিস থেকে।’

‘ও, আপনারা রিপোর্টার?’

মাথা নাড়ল সুনীপ-রূপা।

ফের সিগারেট ধরাল লোকটা। টান দিয়ে রিং বানিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘তা ভৈরব দাশকে কী দরকার?’

‘উনি আমাদের পরিচিত। কাল ট্রেন থেকে নেমেই আলাপ হযেছিল।’

‘অঃ।’

বলেই সিগারেটটা ফের ছুঁড়ে ফেলে দিল লোকটা। দিয়েই কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাচ্চা ছেলেকে নাম ধরে ডেকে বলল, ‘এ্যাই পন্টু যা ত, খনার বাপের কাছে এনাদের নিয়ে যা! যান, লোকটা ঘরেই আছে, মিল বন্ধ!’

গাড়ি থেকে নেমে সুনীপ-রূপা হেঁটেই চলল। গ্রামের রাস্তা। পিছনে পিছনে কচি কাঁচারা। লম্বা ঘাড় সাদা সাদা রাজহাঁস রাস্তা এ-পার ও-পার করছে।

ছবি তুলল সুনপি। তারপরেই ভৈরব দাশ-

‘আয়েন আয়েন!’

একেবারে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসাল সুনীপ-রূপাকে ভৈরব। একটা বারো তের বছরের মেয়েকে কাছে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিল, ‘বাবুরা, এই আমার মেয়ে খনা।’

বলেই মেয়ের পিঠে আলতো থাপ্পর মেরে ভৈরব বলল, ‘যারে মা তোর মাকে চাতাল থেকে ডেকে আন!’

‘চাতাল? তার মানে ?’

‘আমরা ত বি.পি. এল-’

বলেই ভৈরব দাশ বিস্তারিত বলল। দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে তারা। তাদের পাঁচটা বি.পি. এল. কার্ড আছে। রেশন কার্ড। তার স্ত্রী ঝুমরি ‘আশা’ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য। এস-এইচ-জি করে।’

‘SHG? ও Self Help Group!’

ঝুমরিকে ডাকতে হবে না। সুনীপ-রূপা দুজনেই বলল, তারা নিজেরাই যাবে সেখানে। সামনের সিটে ভৈরব দাশকে বসিয়ে গাড়ি ফেরত চলল ‘আশা’ স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর চাতালের দিকে। ধুলো উড়ছে। ‘ধুলোর’ ভিতর ঢাকা পড়ে আছে ‘ফলো’ করা কুটিল সেই চোখ দুটো!

সূর্য হেলে পড়েছে। স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর চাতাল জুড়ে খল্‌বলে রোদ। চাতালের চারধারে খড়-বড় দিয়ে মরাই বাঁধা হয়েছে। প্রতিটি মরাইয়ের গায়ে স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর নাম লেখা। যেন খোদাই করা ‘আশা’ ‘নিবেদিতা’ ‘নেতাজী’ ‘নীরু’।

চাতাল জুড়ে গোষ্ঠীর মেয়েরা ধান ঠেলছে ধান মেলছে। আকাশ থেকে ধানের উপর নেমে এসেছে একঝাঁক শালিক-চড়ুই।

হাসাহাসি করছে মেয়েরা, কথার পিঠে কথা বলে হঠাত্ হঠাত্ কেউবা জোরে জোরে হেসে উঠছে। দলটায় ১০ জন। ঝুমরি, বিনতা, রমা, প্রতিমা, সবন্তী, স্বর্ণ, সোমবারি, দীপা, ভারতী আর আলপনা।

ঝুমরিই দলের নেতা। ঝুমরি দাশ। তারা কাজ পেয়েছে ধান কেনা, সিদ্ধ ও শ্তকনার এবং ধান ভাঙানোর। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য দপ্তরই তাদের এ-কাজ দিয়েছে। প্রায় ২০০ দিনের কাজের গ্যারেন্টি, তার উপর মাস গেলে মোটা টাকা রোজগার।

কী কম কথা!

প্রতিমা বলল, ‘জানিস ঝুমরি-’

‘কী?’

‘নুরুল্লা বলছিল-’

‘কী বলছিল?’

খোঁটা দিয়ে বলছিল- এ্যা প্রতিমা, তোরা নাকি এবার রাইসমিলার হবি? মিল মালিকদের সঙ্গে পাল্লা দিবি?’

‘ডাঁট দেখিয়ে আমিও বললাম- মিল মালিকদের ম্যালা টাকা, তাদের সঙ্গে কী পাল্লা দেওয়া যায় নুরুল্লা? তবে হ্যাঁ, শুধু ট্যাকায় কী মিল চলে? মিল চলে আমাদের গতরে। কই আসুক ত মিল মালিকদের বৌ-ঝিরা চাতালে ধান মেলতে কুলায় করে ধান পাছ্‌ড়াতে!’

প্রতিমার কথা শুনছিল বিনতা, রমা, বাসন্তরী। শুনতে শুনতে বাসন্তীই বলল, ‘বেশ করছি সরকারী ট্যাকায় কেনা ধান ভাঙছি, চাল করছি। খেটে তো খাচ্ছি-’ বলেই সে এক পাক নেচে গেয়ে দিল-

‘‘ও ধান ভাঙবো না তো কি,

ভাঙবো না তো কি।

নিজের চাতাল নিজের গতর

ও ধান ভাঙবো না তো কি-’’

সকলে হো হো করে হেসে উঠল। ঝুমরি কেবল হাসল না। তার স্বামী ভৈরব দাশের মিল আজ আটদিন বন্ধ! আর এসময়ই গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে মাঠ ভেঙে চাতালের দিকে ছুটে আসছে।

গাড়ি থেকে নামল সুনীপ-রূপা। আর নামল মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভৈরব দাশ। ঝুমরির বর ভৈরবকে নামতে দেখে ঝুমরিকে ঠেলাঠেলি শ্তরু করে দিল চাতালের মেয়েরা।

এ কাদের নিয়ে এল ভৈরব?

ফের একচোট হাসাহাসি। ঝুমরি কিন্তু হাসছ না।

একটার পর একটা ধান বোঝাই গরুর গাড়ি আসছে মাঠের রাস্তাধরে। চাতালে টাঙানো কাঁটা পাল্লা। ওজন হচ্ছে। সব আশেপাশের চাষীদের ধান। খাদ বা আগড়া বাদ দিয়ে সরকারী ন্যায্য মূল্যে ধান কেনা হচ্ছে।

সবটাই তদারকি করছে ঝুমরি।

বন্ধ হয়ে গেছে ‘অভাবী বিক্রি’। এতদিনে চাষীদের মুখে হাসি ফুটছে। তারা নগদ টাকা নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফিরছে। মুখে গান- ‘‘মন রে কৃষিকাজ জান না। এমন মানবজমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।’’

‘বাবু এই আমার পরিবার ঝুমরি।’

‘নমস্কার।’

দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করল ঝুমরি।

সুনীপ-রূপাও দুহাত জড়ো করল।

‘আপনাদের চাতালে ধান সংগ্রহ দেখতে এলাম। কী নাম আপনাদের গোষ্ঠীর?

হেসে জানতে চাইল রূপা। দোনা-মনো করছিল ঝুমরি। তাকে ভরসা দিয়ে ভৈরব বলল, দিদিমণিরা খবর কাগজের লোক- সব কথা খুলে বল্‌ ঝুমরি ।’

চাতালের অন্যান্য মেয়েদের হাত ছানি দিয়ে ডাকল ঝুমরি। বসন্তী, প্রতিমারা দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে গেলে বিস্তারিত বলল সে।

শ্তনে রূপা-সুনীপের মনে হল- একটা নতুন বাঙলার মুখ দেখা দিচ্ছে। ভাবতে না ভাবতেই যেন চারধারে আলো জ্বলে উঠল ঝল্‌মল করে।

আর এসময়ই পা ফস্‌কে কীভাবে পিছন পিছন আসা লোকটা যেন পড়ে গেল উঁচু রাস্তার পাড় থেকে! মুহূর্তেই একটা কুকুর তাকে ঘিরে ডেকে উঠল ঘেউ ঘেউ করে।

চাতালের মেয়েরা সমস্বরে বলে উঠল, ‘হায় হায় ডেকা পড়ে গেল!’

সুনীপ-রূপা জানল লোকটার নাম ‘ডেকা’। ঐ পর্যন্তই। তারা আর বিশেষ কৌতুহল দেখাল না। ততক্ষণে ডেকা নামের লোকটা রাস্তায় উঠে ফের সিগারেট ধরিয়েছে।

বাসায় ফিরে সুনীপ সুনীপের ঘরে ডেস্কে বসে গেল নিউজটা লিখে ফেলতে। শিরোনামটাই আগে লিখল। ‘বাঙলার নতুন মুখ’।

রূপা তখন ও-ঘরে ফ্রেস হচ্ছে। স্ন্ান সেরে উজ্জ্বল হয়ে ফিরে এলে সুনীপ এক ঝলক রূপাকে দেখল।

‘এ্যাই শোন্‌!’

‘হ্যাঁ পড়।’

পড়তে শুরু করল সুনীপ।

‘বাঙলার নতুন মুখ। মাধবডিহি গ্রামের ভৈরব দাশই নিয়ে গেল আমাদের পিপুলদহে। পেশায় রাইস মিলের শ্রমিক। তাও মিল বন্ধ আজ সাত-আট দিন। বয়লার ফেটে একজন শ্রমিক মারা গেছে, মিল মালিক হাজতে।

কাজ নেই। তার বউ ঝুমরি। তার কিন্তু বিপুল কাজ। পিপুলদহের চাতাল জুড়ে ছড়ানো তার রাজ্যপাট। আশা স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর দলনেত্রী সে। তার সঙ্গে আছে বিনতা, রমা, প্রতিমা, বসন্তী, স্বর্ণ, সোমবারি, দীপা, ভারতী আর আলপনা।

খেতে জুটত না। ধানরোয়া ধান কাটার তিনমাস বাদ দিলে বাকি ন মাসের কাজ নেই। এখন ছ’মাসের কাজ বাঁধা। ছ’মাস কেন বলতে গেলে ন’মাসেরই কাজ বাঁধা।

ধান কেনা, মরাই বাঁধা, আছড়ানো-পাছড়ানো, সিদ্ধ-শ্তকনো, ধানভাঙা, চাল বেচা। কাজ আর কাজ!

বি.পি. এল. তারা। তাদের আর কোনো জাত নেই। দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে- এখন এটাই তাদের জাত। এটাই তাদের পরিচয়।

দশ জন মিলে ‘আশা’ স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী। গোষ্ঠীর জীবনই এখন তাদের ধ্যান-জ্ঞান। গ্রামোন্নয়ন দপ্তর গড়ে দিয়েছে চাতাল। নেই নেই করে সারা জেলায় ৯০ টা চাতাল। সেই চাতাল জুড়ে দু হাজার গ্রুপ ঝাঁপিয়ে পড়েছে!

বসন্তী, প্রতিমা, রমা, দীপা, সোমবারি, ঝুমরিয়া এখন অমলকান্তির রোদ্দুরের মতো হাসছে। খাদ্য দপ্তর বেনফেডের মাধ্যমে ধান কেনার টাকা দিচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও জেলাপরিষদ বি.ডি. ও.-দের নির্দেশ দিয়েছে ‘অ্যাকাউন্ট’ খুলতে। সেই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চলে যাচ্ছে Self Help Group-এর সেভিংস অ্যাকাউন্টে।

টাকা তুলে নগদে চাষীদের কাছ থেকে ধান কিনছে। এতদিন ধান যেত মহাজনের ঘরে, ফড়ে বা দালালদের আড়তে। এখন চলে যাচ্ছে স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মরাইয়ে, সরকারী গুদামে।

৪টা চাতাল জুড়ে একেকটা গুদাম, ১০টা গুদাম জুড়ে একেকটা মিনি মডার্ন রাইস মিল-’

এটুকু পড়ে মাথা তুলল সুনীপ।

‘বোর করছি রূপা?’

খানিক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল রূপা। পরে বলল, ‘মহাভারত শ্তনছি সুনীপ। মহাভারত কী কখনও বোর্‌ করে? এর মধ্যেই তুই এতটা ভিতরে ঢুকে পড়েছিস! একস্‌সেলেন্ট! পড়ে যা-’

ফের গড়তে শ্তরু করল সুনীপ।

গরুর গাড়ি করে গাড়ি গাড়ি ধান আসছে, আসছে ট্রাক্টরে। কাঁটায় ওজন দেখছে খাতায় টুকে রাখছে ঝুমরিই।

জানতে চাইলাম, অসুবিধে হচ্ছে না?

কিসের অসুবিধা? বাপের বাড়ি সালানপুরে ক্লাস সিক্স অব্দি পড়েছি-

ধান ভাঙিয়ে চাল কিভাবে দিচ্ছ?

বেনফেডকে জানাচ্ছি এত ধান থেকে এত চাল ভাঙিয়েছি। চাতালের গুদামে মজুত আছে। ফুড কন্ট্রোলার তার লোক দিয়ে সে চাল নিয়ে যাচ্ছে, রেশনে বিলি হচ্ছে। আমাদের চাল আমরাই পাচ্ছি, আমরাই খাচ্ছি-

হাসি ফুটে উঠল ঝুমরির মুখে। মনে হল এক সঙ্গে গোটা ভারতবর্ষটাই হেসে উঠল। ঝুমরির মুখেই শুনলাম- এক কুইন্টাল ধান ভাঙিয়ে খরচ-খরচা বাদ দিয়েও তারা পাচ্ছে নগদে ৬০ টাকা। একজনে যদি প্রতিদিন ৩ কুইন্টালও ধান ভাঙায় তবে ১০ জনে ৩০ কুইন্টাল। তার মানে মাসে ৫৪০০০ টাকা !

অচিরেই বি.পি. এল.  থেকে এ. পি. এল. -এ পদোন্নতি! ঝুমরিই বলল, তিন-চার বছরের মধ্যে আমরা বি. পি. এল কাট্‌ জমা দিয়ে দুব বাবু!

বিদ্যায়তনের ছাত্রছাত্রীদের মতো একদল স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী পাস করে বি.পি.এল.  ছেড়ে এ.পি.এল হবে দরিদ্রসীমার উর্ধে উঠবে। আরেক দল নতুন ছাত্রের মতো আসবে নতুন গ্রুপ হয়ে। দেখা দেবে বাঙলার নতুন মুখ!’’

পড়া শেষ হতেই, এতদিন কখনও যা করেনি, সুনীপকে জড়িয়ে ধরল রূপা। সুনীপ হতবাক। কোনো মতে বলল, ‘একটা কবিতাও লিখেছি রূপা। শুনবি ?’ ঈষত্ লজ্জিত রূপা নিজের জায়গায় বসে পড়ে ঘাড় নাড়ল।

সুনীপ কবিতা পড়ল-

‘‘আজ গিয়েছিলাম রায়না-টু ব্লকের পিপুল দহে

ধানকাটা মাঠে চাষীরা জল ঢেলে সব্‌জি করছে

আমাদের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে ঢেকে দিল তাদের

যখন ধুলো নেই মেঘ সরে গিয়েছে ফটো উঠল

তখন চাতাল জুড়ে স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরা

নিবেদিতা আশা-টু আশাবরী জয়চণ্ডী বিদিশা

ফটোগ্রাফার ক্যামেরা তাক করেছে : একটু হাসুন

বৃত্তাকারে মেয়েরা কুলোয় ধান নিয়ে হেসে উঠল

আর তখনই ফ্রেমে বাঁধা পড়ল গোটা ভারতবর্ষ।

ধানের বোরা নিয়ে রাস্তায় গরুর গাড়ি আসছে

কাটা পাল্লায় ওজন হয়ে সে ধান মরাইয়ে উঠছে

শহর থেকে যারা এসেছে তারা সাগ্রহে জেনে নিচ্ছে-

কাকে বলে ‘ধাস্‌’ ‘ধলতা’ ‘ধানের গু’ ‘কালোমাছি’

কোনো মামুলি ফটো তোলা তো নয় আসলে ডকুমেন্টারি

ফটোগ্রাফার ক্যামেরা তাক করেছে : একটু হাসুন

 

‘এ্যা ঝুমরি কাঁদছিস ক্যানে, হাঁস্‌ : বলে বাকি মেয়েরা

সলজ্জ হেসে উঠলে চাতাল ছেড়ে উড়ে গেল শালিকরা

এ বছর মরশুমী ধানের অভাবী বিক্রি রুখে দিতে

স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী কিনে নিচ্ছে চাষীদের সমুদয় ধান

রায়না টুয়ের মাঠ তাই ভরে আছে চাতালে, স্বপ্নে-

দশটা চাতাল পিছু একটা নতুন ধানের কল-

ধান থেকে চাল স্বয়ম্ভর চাল থেকে মিড-ডেমিল

গ্রামোন্নয়ন কাকে বলে তুই এসে দেখে যা নিখিল ।।’’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev