| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পার্থ রায়-এর ছোটগল্প ‘এক গোছা লাল গোলাপ’

Reporter
পার্থ রায় / ৩৭১ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৪

নারসিংহোমটার নাইন্থ ফ্লোরে আদিত্যর বেডটা জানলার পাশে। আধুনিক জানলা দিয়ে নির্নিমেষ নয়নে আদ্যিকালের অপরিবর্তিত আকাশটা দেখতে বেশ লাগে ওর। অদূরে বড় বড় গাছগুলো অজস্র পাখির আশ্রয়। কিচিরমিচির করে ভোরকে জাগিয়ে একসময় দল বেঁধে এদিক সেদিক খাবারের খোঁজে উড়ে যায়। নিজের আর পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য মানুষও তো এইভাবে বেরিয়ে পড়ে। দিনের শেষে ক্লান্ত পায়ে ঘরে ফেরে। পাখিরাও নীড়ে ফেরে। ক্লান্ত ডানায় ভর করে।

আদিত্যর মনে হয় দুপুরে সাময়িক নিস্তব্ধতা নেমে আসে। আসলে দশ তলায় গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজ খুব ক্ষীণ শোনায়। শাখা প্রশাখাদের মধ্য দিয়ে রোদের লুকোচুরি দেখতে দেখতে চোখে ঘুম নেমে আসে। ওর দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস নেই। এখানে ওষুধের প্রভাবে অথবা দুর্বলতার জন্যে ওর দুপুরে ঘুম পায়। অন্য কোন কারণেও হতে পারে। ঠিক কী কারণে এমন ঘুম পায় আদিত্য জানে না। ওর এখন দিন তারিখও খেয়াল থাকছে না।

একটু আগে কৃষ্ণা ওকে ঘুম থেকে তুলেছে। হাতের কনুই অবধি স্যানিটাইজ করে তুলো দিয়ে চোখ মুখ মুছিয়ে দিয়েছে। কৃষ্ণা আইয়ার। দক্ষিন ভারতীয়। এই শিফটের নার্স। আদিত্য ওদের সবার নাম জেনে গেছে। ছয়টার পরে নাইট শিফট ধরতে আসবে নিনা চানম। মনিপুরের মেয়ে।

“দুপুরে এতো ঘুমালে নাইটে আর ঘুম আসবে? আর একটু পরেই তো বাড়ির লোকজনরা আসবে”। আদিত্য হাসে। সত্যিই রাত্রে চট করে ঘুম আসতে চায় না। অবশ্য কোন অসুবিধা হয় না। দৃষ্টি রাতের আকাশের দিকে কিন্তু মনের আকাশে ভেসে ওঠে রিনার মুখ। একটা রিমঝিম ভাল লাগার আবেশ ওর মস্তিষ্কের সমস্ত শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। কারুর কথা ভাবতে এত ভাল লাগে? ওর সাথে ঘনিষ্ঠতার আগে জানা ছিল না আদিত্যর। রিনা কাকতি। তেজপুরের মেয়ে। বাবা অসমীয়া, মা বাঙালি। পরিচয় গড়াতে আদিত্য জেনেছে রিনার মুখ ওর বাঙালি মায়ের মতো। মঙ্গোলীয় ধাঁচের দুধে আলতা রঙের মাখন মসৃণ ত্বক। নাক খুব টিকলো না হলেও চ্যাপ্টা একেবারেই নয়। ওর মুখের সাথে দারুণ মানিয়ে গেছে।

এক বিশেষ দুপুরে আদিত্য ওকে বলেছিল, “তোমার চোখ দুটো স্বাভাবিক অবস্থায় শান্ত দিঘীর টলটলে জল। কিন্তু রেগে গেলে বাঘিনীর মতো জ্বলজ্বল করে”। রিনা পাহাড়ি ঝর্ণার মতো হেসে ওর বুকে মাথা রেখেছিল।

আদিত্যর মুখে অভিমানের মেঘ ঘনায়। সে তো একদিনের জন্যেও ওকে দেখতে এল না। একবারও আসা যেত না? কী অবস্থায় আছে কে জানে? ওর সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারছে না। কারণ জামাইবাবু আর বন্ধুরা ছাড়া কেউ আদিত্যর কাজকে খুব একটা সমর্থন করেনি। হোয়াট্স অ্যাপে আদিত্যর অজস্র মেসেজের উত্তরে শুধু একটা ছোট্ট উত্তর “ব্যাডলি বিজি। প্লিজ টেক কেয়ার অব ইওরসেলফ। লাভ ইউ”। ফোনে নট রিচেবল নাহলে সুইচড অফ। অস্থির হয়ে ওঠে আদিত্য।

***

লিকার চা আর বিস্কুট দিয়ে গেছে। মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ বাঁধা। মাথাটা ভার হয়ে আছে। গালের ফোলাটা কমেছে। ভাগ্যিস আঘাতগুলো চোখে লাগেনি। এখানের চা বেশ ভাল। দার্জিলিং চায়ের ফ্লেভার। চা খেয়ে ভার ভার ভাবটা একটু কম লাগছে। ভিজিটিং আওয়ার শুরু হতে এখনও মিনিট পঁয়তাল্লিশ বাকি।

পাশের পেশেন্টকে ওষুধ খাওয়াতে খাওয়াতে কৃষ্ণা চোখ মটকে বলে, “আর এক কাপ চাই?”

আদিত্যর মুখ জুড়ে শিশুর হাসি। যেন কেউ আর একটা চকোলেট বাড়িয়ে দিয়ে বলছে, “আর একটা চাই?”।

“বাড়ি গিয়ে এই চা খুব মিস করব”।

কপট রাগ দেখিয়ে কৃষ্ণা বলে, “ওহ! দেন ইউ উইল মিস দ্য টি। নট আস। সো ব্যাড!”

আদিত্য ড্যামেজ কন্ট্রোল করার জন্য তড়িঘড়ি বলে, “অবভিয়াসলি আই উইল মিস ইউ অল”।

“কী বলছে আদিত্য?”

“দিদি, ও এখানকার চা মিস করবে। আমাদের না”

খেয়াল করেনি কখন নির্মলাদি এসে দাঁড়িয়েছেন। নির্মলা সেনগুপ্ত। এই ওয়ার্ডের মেট্রন। আদিত্যর বেডের সাথে রাখা ডক্টর্স ইন্সট্রাকশন চার্টে চোখ। স্নেহের হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলেন, “এই বাজে কথা বলবি না। আমার ভাই মোটেই অমন নয়’। গ্লাভস পরা হাত আদিত্যর পিঠে রেখে বললেন, “কেমন লাগছে রে ভাই? বেশ ফ্রেশ দেখাচ্ছে। কাল একবার ব্যান্ডেজ খুলে ইনজুরি দেখতে হবে। ডক্টর চৌধুরী লিখে দিয়ে গেছেন”।

“ভাল আছি দিদিভাই। মাথার পেছনে ব্যথাটা আছে এখনও”। নির্মলাদির আবদারে ওঁকে দিদিভাই বলে।

“কমে যাবে। ঈশ্বরের অসীম কৃপা যে তুই বেঁচে গেছিস। কোন ইন্টারন্যাল ইনজুরি নেই। তবে প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে! বেশ কটা স্টিচ হয়েছে। তুই তো কিচ্ছুটি টের পাসনি”

ওয়ার্ডের অন্য দিকে যাবার আগে নির্মলাদি সস্নেহে বলে গেলেন, “ভিজিটররা এলে কিন্তু মাস্ক পরে নিবি। মনে থাকবে?”। আদিত্য সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। ইতিমধ্যে কৃষ্ণা আর এক কাপ চা আনিয়েছে।

খবরের কাগজ এবং নিউজ চ্যানেলের দৌলতে আদিত্যর ঘটনা এই নারসিং হোমের প্রায় সবাই জেনে গেছে। তাই আদিত্য নাহয় এখানকার নার্স, ডাক্তারদের চোখের মণি। অন্য রুগীদের সাথেও তো একইরকম আন্তরিক ব্যবহার! যেন কতকালের পরিচয়। ছেলেবেলায় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গিলের গল্প পড়েছিল। ও যেন চোখের সামনে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গিলদের দেখছে।

***

ভিজিটিং আওয়ার শেষে সবাই ফিরে গেছে। মা, দিদি, জামাইবাবু, বন্ধুরা। রিনার কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি। কাকে জিজ্ঞাসা করবে? একমাত্র মাকে করতে পারত। কিন্তু মা খুব রেগে আছে। মা আর পাড়ার বন্ধু রাতুল, সুচিন্তনরা কিছুটা আঁচ করলেও করতে পারে। আদিত্য অবশ্য কাউকেই কিছু ভেঙ্গে বলেনি অথবা বুঝতে দেয়নি যে ওদের দুজনের সম্পর্ক বন্ধুত্বের সীমারেখা অতিক্রম করে অনেকটা এগিয়ে গেছে।

ডিনার দিতে কিছু দেরি আছে। আদিত্য বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বোজে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে লক ডাউনের এক সকাল। বোস আঙ্কলদের বাড়ি থেকে পেয়িং গেস্ট নর্থ ইস্টের তিনজন নার্সের উৎখাতে শাসক দলের যুব নেতা সুবীরের নেতৃত্বে তাণ্ডব চলছে। অভিযোগ ওরা চাইনিজ এবং এলাকায় কোভিড-১৯ ছড়াবে। অবশ্য জনান্তিকে অন্য কথা শোনা যায়। সুবীরের কু-প্রস্তাবে রিনা বলে মেয়েটি বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় ও সাড়া না দেওয়াতে ওদের ওপর এই আক্রমণ।

সে এক অভাবনীয় দৃশ্য! পথের ওপর ছড়ানো ছেটানো মালপত্রের ওপর বসে মুখ ঢেকে দুজন কাঁদছে। শুধু একজন ক্রোধে ফুঁসছে। এক অনমনীয় বহ্নিশিখা! ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আদিত্য ভাবে ভয়ঙ্কর অতিমারিতে সারা বিশ্বে প্রতিদিন কতো মানুষ মারা পড়ছে। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ডাক্তার নার্সরা আর্তের সেবায় দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছেন। ওঁদের শরণাপন্ন হচ্ছে বিপদাপন্ন মানুষ। কিন্তু ওঁরা যখন শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছেন, এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মানুষ হিংস্র উন্মত্ততায় তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল আদিত্যর সবুজ মন।

এলাকার বাসিন্দাদের সমর্থন না পেয়ে সুবীর মেজাজ হারাল। নিজের কাজের সাফাই দিতে গিয়ে ওই তিনজন মেয়েকে বারবনিতা সম্বোধন করে বসল। সেই নোংরা মন্তব্য নিশ্চুপ দর্শক আদিত্যর ভেতরে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলল। আসলে প্রতিটা মানুষের ভেতরেই তার অজ্ঞাতসারে একটা প্রতিবাদি আগ্নেয়গিরি বসবাস করে। হয়ত পরিস্থিতির চাপে এবং সমঝোতা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকে। তীব্র প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল মেধাবী এবং নির্বিরোধী বলে সুপরিচিত আদিত্য। তারপরে ক্রমান্বয়ে যা যা ঘটল তার জন্যে ছিল না কোন আগাম ইঙ্গিত অথবা প্রস্তুতি–ওর প্রতিবাদে উজ্জীবিত হয়ে সেই অগ্নিশিখার পাহাড়ি চিতার গতিতে ছুটে এসে সুবীরের গালে সপাটে চড়, সুবীরের প্রত্যাঘাতের প্রচেষ্টাতে আদিত্যর বাধা, আদিত্যকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া, রায় জ্যেঠুর নেতৃত্বে পাড়ার মহিলারা সহ এলাকাবাসিদের প্রবল বাধায় সুবীরের সদলে পিছু হটা, যাবার আগে আদিত্যকে ‘জানে মেরে ফেলার’ হুমকি, বোস আঙ্কলের ওদের ফিরিয়ে নিতে অনীহা এবং অবশেষে মায়ের শঙ্কা অগ্রাহ্য করে ওদের তিনজনকে নিজেদের বাড়ির কোনের দিকের একটা ঘরে থাকতে দেওয়া।

আদিত্যর মা অনিচ্ছাসত্বেও মেনে নিয়েছেন। বরং রান্নার লোককে বলে ওদের খাবারের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। যদিও ওদের মধ্যে দুজন কয়েকদিন পরে অন্য পিজিতে শিফট করে যায়। রিনাকেও সাথে যেতে বলেছিল। এক অজ্ঞাত কারণে রিনা যায়নি।

আদিত্যর বাবা বেঁচে থাকতে ছাদে একটা ঘর করেছিলেন। ওখানে একটা ছোট খাট, টেবিল, চেয়ার আর শেলফে ওর পছন্দের কিছু বই এবং মিউজিক সিস্টেম রয়েছে। নিচের তলায় তিনটে রুম তবুও ছাদের ঘরটা ওর খুব প্রিয়।

সেদিন দুপুরে আদিত্য সেই ঘরে। শুয়ে শুয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনছি্ল। নিম্নচাপ হেতু প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। ওর মা অভ্যাসজনিত দ্বিপ্রাহরিক ঘুমে। একটু চোখ লেগে এসেছিল। আচমকা ঠোঁটের ওপর একজোড়া ভেজা ঠোঁটের আগ্রাসী চাপ আর মুখে গরম শ্বাস অনুভব করল। অবশ হয়ে গ্রহণ করে জীবনে কোন নারীর প্রথম চুম্বন। অস্ফুটে সদ্যস্নাতা রিনা বলেছিল, “আই অ্যাম গ্রেটফুল, আদিত্য”। আহত হয়েছিল আদিত্য। “ফার্স্ট কিস ফ্রম আ গার্ল। বাট উইদাউট লভ”। ওর দুচোখে চুমু দিতে দিতে রিনা বলে, “সব কথা মুখে বলতে হয়, বুদ্ধুরাম? আমি সোনম, সমিচিনদের সাথে গেলাম না কেন? কার টানে থেকে গেলাম?”। ওর শরীর জুড়ে মেঘের ঘ্রাণে উতল হয়ে ওঠে আদিত্য। রিনাকে বুকে টেনে নেয়। উথালি পাথালি ঢেউয়ের মতো ওদের শরীরে জোয়ার আসে। পরের দিনগুলোতে হোয়াট্স অ্যাপ আর ফোনে শাখা প্রশাখা মেলেছে প্রেমের গাছ। লক ডাউন আর রিনার প্রবল ব্যস্ততার কারণে দেখা করার সুযোগ হতো না।

***

একটু আগে মাথার বড় ব্যান্ডেজটা খুলে দিয়েছে। ব্যথাটা অনেক কম। ডক্টর চৌধুরী দুই একদিনের মধ্যে ছেড়ে দেবার আশ্বাস শুনিয়েছেন। বাড়ি গিয়ে রিনার সাথে বোঝাপড়া আছে। জানতে হবে কেন একদিনও আসেনি? কেন শুধুমাত্র একটা মেসেজ পাঠিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেছে? অথচ ওর মেসেজগুলো যে সিন করেছে তার প্রমাণ প্রতিটা মেসেজের নীচে দুটো নীল টিক মার্ক।

মাথার পেছনে আলগোছে হাত দেয় আদিত্য। মনে পড়ে সেদিন সন্ধ্যার পরে রাতুলদের বাড়ি থেকে ফিরছিল। রাস্তায় ত্রিফলা আলোগুলো জ্বলছিল না। আচমকা মাথার পেছনে একটা জোরাল আঘাত আর সামনে থেকে কয়েকটা ঘুসি। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে আদিত্য। ভর্তি হবার পরের দিন পুলিশ এসে ওর স্টেটমেন্ট নিয়ে গেছে। নর্থ ইস্টের স্টেটগুলো, নিউজ চ্যানেল, খবরের কাগজ আর সোশ্যাল মিডিয়ার চাপে পড়ে পুলিশ সুবীর আর কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে।

শারীরিক নয়, মানসিক ভাবে একটা শূন্যতা আর ক্লান্তি বোধ করছে আদিত্য। কেউ জানে না পরের মুহূর্তে তার জীবনে কী ঘটতে চলেছে। আদিত্যর জন্যেও তেমনি এক চমক অপেক্ষা করছিল।

রিনা দাঁড়িয়ে আছে। ওর বেডের একপাশে। হাতে এক গোছা আদিত্যর প্রিয় লাল গোলাপ। হাসছে কিন্তু বিষাদ মাখা। আদিত্যর মুখে একরাশ ছেলেমানুষি অভিমান।

“জানি খুব রাগ করেছ। আমি প্রতি মুহূর্তে তোমার খোঁজ রেখেছি। তোমাকে পরশু ছেড়ে দেবে। কাল আর একবার উন্ড দেখে নেবে”

“কেন? কী দরকার ছিল খোঁজ নেবার? কেউ তো বলেনি”, অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নেয় আদিত্য।

“কে আবার বলবে? আমার অন্তর বলেছে। তাই প্রিয় মানুষের খোঁজ রেখেছি। প্লিজ, আর রাগ করো না। ফুলগুলো নেবে না?”

বোকেটা নিয়ে আদিত্য বলল, “এলে কী করে? এখন তো ভিজিটিং আওয়ারস নয়”

“এখানে আমার অনেক চেনাশোনা। কে আটকাবে আমায়?”

“আদিত্য, আমি মানে আমরা কাল চলে যাচ্ছি। নর্থ ইস্টের স্টেটগুলো গাড়ি পাঠাচ্ছে”

আদিত্য কেঁপে ওঠে। “হোয়াট? চলে যাবে মানে? কতো দিনের জন্য? কবে ফিরছ?”

“জানি না। অনবরত প্রেসার ক্রিয়েট, থ্রেটনিং চলছেই। কতো সহ্য করব? শুনেছিলাম কলকাতা সবাইকে আপন করে নেয় কিন্তু……”

“তাছাড়া মা, বাবা চাইছেন না। ভয় পাচ্ছেন”। রিনার চোখে জল। এক দলা কষ্ট আদিত্যর বুকের মধ্যে আটকে যায়।

“রোজ অনেক মেসেজ করবে। ফোন করবে। আমি অপেক্ষা করে থাকব”

“কী হবে? রিপ্লাই তো পাব না”

“পাবে। প্রমিস! এই কয়দিন ইচ্ছে করে দেইনি। একজন আমার মনের কষ্ট অনুভব করেছেন। আন্টি আমাকে এমন ভাবে আগলে রাখতেন যেন আমি একটা বাচ্চা মেয়ে। রাতে নিজের কাছে নিয়ে শুতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন”। মেঘ চিরে রোদ্দুরের ঝিলিক দেবার মতো রিনার মুখে এক চিলতে সলাজ হাসি ফুটে ওঠে।

“বাড়ি ফিরে খুব সাবধানে থাকবে। ডাক্তারদের ইন্সট্রাকশন ফলো করবে। মন খারাপ হলে আমার কথা ভাববে…” গলা বুজে আসে রিনার। আদিত্যের গালে হাত বুলিয়ে হনহন করে হাঁটা দেয়।

বিমর্ষ আদিত্য নিজেকে বড় নিঃস্ব বোধ করে। বুকের ভেতরটা খালি। রিনা আসাতে যে শূন্যতা মিলিয়ে যাচ্ছিল, আবার ফিরে আসে। আরও প্রবল ভাবে। রিনার রেখে যাওয়া গোলাপের বোকেটার দিকে চোখ পড়ে। নিচের দিকে ডাঁটির কাছে একটা ছোট্ট ভাঁজ করা কাগজ। পিন দিয়ে আটকানো। আদিত্য অবাক হয়। খুলে দেখে। তাতে লেখা, “তোমার কথা মা বাবাকে বলেছি। ওঁরা সময় সুযোগ মতো আনটির সাথে কথা বলবেন। অবশ্য আনটিও কিছু আন্দাজ করেছেন। আমার অ্যাবসেন্সে যদি অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকিয়েছ, আমার দুচোখ বাঘিনীর মতো জ্বলে উঠবে। ফিরে আসব খুব তাড়াতাড়ি। ভালবাসার টানে। আমার বুদ্ধুরামের কাছে। — তোমার রিনা”।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev