বড় মসজিদ হাফেজিয়া মাদ্রাসার ডানে নিউ স্টার ইংলিশ একাডেমী স্কুল। সামনে বড় রাস্তার ওপারে দশতলা শপিংমল। বামে বাসন্তী দেবী বালিকা বিদ্যানিকেতন। পেছনে স্থাপত্য ধসে পড়া জরাজীর্ণ কালী মন্দির। চারতলা মসজিদের তিনতলা জুড়েই মাদ্রাসা। প্রায় শ দেড়েক অনাথ ও দরিদ্র পরিবারের ছেলে এখানে থাকে। তাদেরই একজন কম কথার নবী। হুজুরের কাছে শোনা যায় নবজাত নবীকে এক শ্রাবণের ভোরে তিনি মসজিদ গেটে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই দিন থেকেই নবী এখানে আছে। এখন তার বয়স আঠারো। এই বয়সের বাকী সবার চেয়ে তার ভিন্নতা সবার চোখে পড়ে। অন্য সবাই যখন অবসরে গল্প করে বা ধর্মালোচনা করে সে ছাদের একেক কোণায় দাঁড়িয়ে কখনো ইংলিশ স্কুলের বিদেশি কায়দার ছেলেদের দেখে কিংবা বালিকা বিদ্যানিকেতনের মেয়েদের দেখে। কেউ কেউ রাস্তা দিয়ে যাবার সময় দেখেছে তাকে একদৃষ্টিতে শপিংমলের দিকে তাকিয়ে থাকতে। কালী মন্দিরের পুরোহিত নরেন ঠাকুরের সাথেও তার বেশ ভাব। নরেন ঠাকুর অফিস যাবার আগে নিয়ম করে নিত্যপূজা দিয়ে যান। কোন কোন দিন নরেন ঠাকুরের আসতে দেরী হলে নবী মন্দির প্রাঙ্গন ঝেড়ে দেয়। মাদ্রাসা বা মন্দির কমিটির কেউ কেউ এই কাজটি নিয়ে কথা বললেও নরেন ঠাকুর বা নবী কেউই তোয়াক্কা করে নি। কখনো কখনো মন্দিরে গেলে দেখা যায় নবী নাট মন্দিরের নীচে দাঁড়িয়ে নরেন ঠাকুরের পূজা দেয়া দেখছে নিমগ্ন হয়ে।
নবী তার ওস্তাদের কাছে শুনেছে। মাদ্রাসার ছাদ থেকে ডানে বামে সামনে পেছনে যতদূর চোখ যায় সব জায়গার মালিক ছিলো নরেন ঠাকুরের ঠাকুরদাদা। দেশভাগের সময় নরেন ঠাকুরের কাকা জ্যাঠারা সবাই সব ফেলে চলে গেছিলো। শুধু নরেন ঠাকুরের বাবা নারায়ন কর্তা যাননি। থেকে গিয়েছিলেন এখানে। জমিজামা সব কিভাবে বেদখল হলো তার গল্প ও ওস্তাদ বলে কিন্তু নবীর কানে সেই গল্প আর ঢোকে না। নবীর কেবল শূন্য লাগে। নরেন ঠাকুরের জন্য তার কষ্ট হয়। চোখে দৃশ্যের পরে দৃশ্য উড়ছে নরেন ঠাকুরের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে যেন কারা।
কয়দিন ধরেই মাদ্রাসার সবাই খুব চিন্তিত কারণ গত সপ্তাহ থেকে নবী খুব ক্লান্ত ও অসুস্থ এবং খুব পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারছে না। গত সপ্তাহের সারাদিন নবীকে যারা দেখেছে তারা পরেরদিন থেকে নবীকে মেলাতে পারছে না। নবীকে দেখলে মনে হচ্ছে তার সাথে একটা লোক চলাফেরা করছে। কথা কম বলা নবী সারাদিন অদৃশ্য সেই লোকটির সাথে কথা বলছে। জলপড়া খেয়েও কাজ হয়নি। নবী দেখে লোকটি পাশে শুয়ে থাকার সময় বিভিন্ন বিষয়ে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। নবী লোকটির কথা শোনার সময় বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে, প্রথমে বিরক্তি, তারপর ব্যাপক উৎসাহ, এরপর আহ্লাদ, তারপর চিত্ত বিক্ষেপ, তারপর আবার বিরক্তি, এরপর আবার আহ্লাদ। লোকটি নবীকে জিজ্ঞেস করে তার বাচালতায় সে কিছু মনে করছে কিনা এবং সে কথা বলা বন্ধ করবে নাকি চালিয়ে যাবে। এখন তার প্রস্তুত হওয়ার সময়—এই বলে নবী বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। সবাই তাকে ধরে জোর করে ধরে। অনেকক্ষণ দাপাদাপি করে নবী ঘুমিয়ে পড়ে।
নবী আবার খুঁজতে শুরু করে এবং লোকটি এবারও তাকে ইতিহাস খুঁজতে সাহায্য করে। নবী জানতে চায় দেশভাগের গল্প, নরেন ঠাকুরের ঠাকুরদার সেইসময়ের ভাবনার কথা, নারায়ন কর্তার জীবন সংগ্রাম এবং নরেন ঠাকুরের দরিদ্রতার গল্প। লোকটি নবীর সব প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে দেয়। এরপর লোকটি বিছানা ছাড়ে এবং নবী জানতে চাওয়ার আগেই কিছু গল্প বলতে থাকে। নবী যখন সব জেনে বেরিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত, তখন নবী পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে যে তার পরিস্থিতি অনেকটা সেই বইটির মতো যা সে কিছুদিন আগে মাদ্রাসার সবাইকে লুকিয়ে পড়েছে। বইটি এখনো ছাদের এককোণে লুকানো আছে। নবী লোকটিকে জিজ্ঞেস করে তাকে সে একটি লেখা পড়ে শোনাতে পারে কিনা, লোকটি ইতস্তত করে। নবী ভাবে লোকটি সম্ভবত চায় না সে তাকে বইটি পড়ে শোনাক। নবী বলে একটি মাত্র অনুচ্ছেদ তাকে পড়ে শোনাবে, লোকটি রাজি হয় এবং তারা টেবিলের সামনে বসে। বইটি থেকে নবী তাকে পড়ে শোনায়।
“ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো গরজ থাকা চলবে না এবং ধর্মীয় সংস্থাসমূহের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংগে জড়িত হওয়া চলবে না। যে কোনো ধর্মে বিশ্বাস অথবা কোনো ধর্মই না মানায় (অর্থাৎ নাস্তিক হওয়া) সকলেই থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ধর্ম বিশ্বাসের জন্য নাগরিকদের অধিকারে কোনো প্রকার বৈষম্য কোনোক্রমেই সহ্য করা হবে না। এমনকি সরকারী নথিপত্রে যে কোনো নাগরিকের ধর্মের উল্লেখমাত্রও প্রশ্নাতীতভাবে বর্জিত হবে। রাষ্ট্রানুমোদিত গির্জাকে কোনো অর্থ-মঞ্জুরি অথবা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক সংস্থাকে কোনো প্রকার সরকারী বৃত্তিদান করা চলবে না। এগুলোকে হতে হবে সমমনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ স্বাধীন, সরকারী সংশ্রব-বর্জিত প্রতিষ্ঠান।”
###
নবী পড়া থামায়। আর ভাবে সে কি চায়। শুধু এই কারণে নয় যে, জন্মসূত্রে সে পারিবারিক ধর্ম পরিচয় জানেনা। কোরান তালাওয়াতের মতো নরেন ঠাকুরের মন্ত্র ও তাকে মুগ্ধ করে। তবে বেশিরভাগ এই কারণে যে, সে প্রায়ই বুঝতে পারে রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা হলে সে হয়ত ইংলিশ স্কুলে পড়তে পারতো। নরেন ঠাকুরদের বাড়ি পুড়তো না।
কোথায় এবং বিশেষ করে এই লোকটির দিক থেকে নবী জানে না নবী কোথায়। নবী ভাবে এই লোকটির জীবনে সম্ভবত তার কোনো জায়গা নেই, লোকটি অবশ্য শুধু তার সাথে নেই, ঠিক তেমনিভাবে নবীও তার নিজের সাথে নেই যখন সে লোকটির সাথে দেখা করতে এসেছিলো তখন সে জানতো না কোথায় লোকটি থাকে তবে ঠিকই সে রাস্তায় হোঁচট খেতে খেতে এবং পড়ে যেতে যেতে সেখানে পৌঁছায় যেখানে বাস্তবতা স্বপ্নের মতো, তবে সে বোঝে লোকটি মোটেই লোকটির নিজের জীবনে আর নেই এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করে,‘আমি কোথায়?’
নবী আসলে নিজেকে একজন ভীষণরকম ভাবে মানুষ মনে করতে চায়। নবী কি বলতে পারে না, এই নবী একজন নাগরিক যে দেশ ধর্ম কে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করেছে, ঠিক যেমনভাবে কয়েক সপ্তাহ আগে সে ভেবেছিল সে নিজেকে একজন ইতিহাস সন্ধানী লোক মনে করেছে? কারণ এই বইটির লেখক যা যা ভেবেছে নবী ঠিক তেমনই ভাবতে শুরু করত অথবা ঠিক এই মুহূর্তে তেমন ভাবছে, সে কি নিজেকে ভীষণভাবে ধর্মহীন একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না, ঠিক যেমনভাবে কয়েক সপ্তাহ আগে সে ভেবেছিল দেশভাগ, নারায়ন কর্তা, নরেন ঠাকুরের কষ্টের ইতিহাস অনুসন্ধান করে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষের রাষ্ট্রের লোক হিসেবে পরিগণিত হবে? নবী সেইদিন রাতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলো সে দেখেছিলো ওয়াজের উগ্র ভুলভাল বয়ান কিভাবে নরেন ঠাকুরের বাড়ি ও একটি পাড়াকে কিভাবে দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। অনেকটা ঠিক ২০২০ এর এগারো মার্চ হুজুরের সাথে দিল্লি ঘুরতে গিয়ে দেখা জাফরাবাদ। ব্যাপারটা এরকম নয় যে সে কোনোভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে, তবে ইতিহাস সন্ধানী লোক এই শব্দটি এখন তার ওপর প্রয়োগ করা যায়। অথবা সম্ভবত সে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
নবী উচ্চস্বরে লোকটিকে বইটি পড়ে শোনায় কারণ এটা ঠিক তেমনই যেমনটা তার মন চায়।
সেইদিন সকালে, অথবা সম্ভবত অন্য এক সকালে, লোকটিকে ছেড়ে আসার সময় একই ধরনের অনুভূতি হয় নবীর, মনে হয় তার নিজের জীবনে আর সে নেই, যখন নবী আবার নিজেকে লোকটির সাথে খোঁজ করে এবং নিজেকে কোথাও খুঁজে পায় না, তখন আরো বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নবী কাঁদে এবং সম্ভবত কাঁদে শুধুমাত্র এই কারণে যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে এবং সে জানালার কাঁচে পড়তে থাকা বৃষ্টির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে এবং এরপর সে ভাবে সে বেশি বেশি কাঁদে কারণ বৃষ্টি হচ্ছে অথবা এই বৃষ্টি প্রথমেই তার জন্য কান্না সম্ভব করে তোলে, যেহেতু সে ঘন ঘন কাঁদে না, এবং অবশেষে ভাবে এই দুইটি, বৃষ্টি এবং অশ্রু, আসলে একই। এরপর রাস্তায় একটা বিশাল হঠাৎ হট্টগোল বিভিন্ন জায়গা থেকে একই সময় আসতে থাকে—কিছু গাড়ি হর্ন বাজাচ্ছে, একটি ট্রাকের ইঞ্জিন ঘরঘর শব্দ করছে, অন্য একটি লক্করঝক্কর ট্রাক একটি ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে ঝনঝন করে চলছে, একটি রোড মেন্ডার রাস্তা পিটাচ্ছে—এবং হট্টগোলটি মনে হচ্ছে যেন তার ঠিক ভেতরে ঘটছে যেন তার ক্রোধ এবং দ্বিধা তাকে শূন্য করে দিয়ে গেছে এবং তার বুকের ঠিক মাঝখানে একটি জায়গা তৈরি করেছে এই উচ্চ ধাতব সংঘর্ষ তৈরি হওয়ার জন্য, অথবা যেন সে নিজে এই শরীর ত্যাগ করেছে এবং এই হট্টগোলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছে, এবং এরপর সে ভাবে, আসলেই কি শব্দটি আমার ভেতরে ঢুকছে, অথবা আমার ভেতরের কিছু রাস্তায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এরকম একটা বিশাল হট্টগোল তৈরি করার জন্য।
ফজরের আযানের জন্য মৌলভী সাহেব যখন ঘুম ভেঙ্গে উঠলেন তাকিয়ে দেখলেন নবী ঘুমের অতলে। ঘরময় একটা অজানা ফুলের গন্ধ। চারতলা থেকে নীচতলায় এসে বুঝলেন সেই গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে পাড়া, জেলা থেকে দেশ, দেশ থেকে পৃথিবীতে…